Monday, 16 October 2017

একটি প্রেমের ছোটগল্প "বৃষ্টির আকাশ "



একটি প্রেমের ছোটগল্প "বৃষ্টির আকাশ "

গল্পপড়ুয়া ফেসবুক পেজে লাইক করুন : https://www.facebook.com/golpoporuya


(১)

আমার কথায় দেবু মাথা উপর-নীচ করলো। বলল,-" যে কেসে এখন পড়েছিস, সত্যিটাই বলে দেওয়া ভাল।"
-" কিন্তু, ভয় করছে আমার। যদি...."
-" আবার যদি কেন ভাই এর মধ্যে। এক দিন আলাদা করে ঢেকে সব খুলে বল।"
-" সেটাই ভাবছি। বলতেই হবে কথাটা। কিন্তু...।
খ্যাঁক করে উঠে দেবু। -" আবার কিন্তু কি? সত্যি টা তো জানবেই।"
আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলি। বুকের ভেতর থেকে শুকনো হাওয়া বেরিয়ে আসে যেন।

গ্রীষ্মের সন্ধ্যা। এখন সন্ধ্যা ঠিক বলা যায় না। আবার বিকেল ও নয়। একটা মাঝামাঝি অবস্থান চলছে। আকাশে হলুদ, লাল, কালো রঙের অনবদ্য মিশেল। যেন কোনো এক বিখ্যাত চিত্রকরের আনমনা হাতের তুলির টান। ভারী সুন্দর লাগে দেখতে। আমি তাকিয়ে থাকি। বিকেলে একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে, রঙবাহারি দেখা যায়। ক্লাবের সামনে সবুজ মাঠের উপর বসে আছি আমরা। একটা শান্ত বাতাস দুলকি চলে ভঙ্গিতে ঘাসের মাথা ছুঁয়ে আমাদের গায়ে এসে লাগছে। কিন্তু আমার কি অবস্থা হবে!

আমার নাম ও আকাশ। আকাশ কুমার মিত্র। বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। আমার আগে একজন দিদি আছে। আমার থেকে বছর দুয়েকের বড়। এখনো বিয়ে হয়নি। তার নাম মেঘলা। আবার আমি যাকে ভালো বাসি, তার নাম বৃষ্টি। কি অবস্থা ভাবুন! এই মেয়েকে আমি বিয়ে করে আনলে,আমাদের বাড়িটি হবে আবহাওয়া দপ্তরের হেড অফিস। যেখান থেকে প্রতিদিন আকাশ, মেঘলা না, রৌদ্রজ্জ্বল ; বৃষ্টি হবে কি হবে না- তার লাইভ টেলিকাস্ট করা হবে। যাইহোক সে অনেক পরের কথা। এই মুহুর্তে  উপরের আকাশে যতই রঙের মেলা থাকুক না কেন, আমার মনে কালো আলকাতরার মতো কালো প্যাচপেচে রঙ।

মাঠের ঘাস গুলো বেশ লম্বা। একটা সবুজ ঘাসের শিস ছিঁড়ে নিয়ে চিবোতে চিবোতে বলি,-" আমি সত্যিই ভালোবাসি রে।"
দেবু আমার দিকে তাকায়। বলে,-" জানি রে বাবা। তাই বলছি, গরুর মতো ঘাস না চিবিয়ে একদিন আলাদা ভাবে দেখা করে সব বুঝিয়ে বল।"
আমি মুখ থেকে ঘাস ফেলে দিই। কিছুক্ষন চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আকাশের গায়ে সাদা পাউডার ছড়িয়ে এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্তে একটা রকেট চলে যায়। রকেট চোখের আড়ালে চলে যেতেই, দেবুর দিকে ফিরে বলি,- যদি ভুল বোঝে!"
-" কিছু ভুল বুঝবে না।"
-" ভয় করে। যদি ও খুব আঘাত পায়। "
-" তোকে তো বলতেই হবে। না বললে ও দিন ধরা পড়ে যাবি।"
-" হু। ভাবছি। অন্য কোনো প্লান করা যায় না?"
-"ভেবে কোন লাভ নেই। কি প্লান?"
-"যদি অসুস্থতার ভান করে, ওদিন না যাই; কেমন হয়?"
-" ওই  ভুল টা আর করিস না। একটা মিথ্যে ঢাকতে, আর কত মিথ্যের জাল বুনবি? তার থেকে সত্যি টা বলে দে।"
-" হ্যাঁ বলবো।"

কালো হয়ে আসে চারিদিক। মাঠের ঘাস গুলোও রঙ পরিবর্তন করে। ক্লাবের পাশে ঝুরি নামা বুড়ো বট গাছ টিতে  ঘরে ফেরা পাখিদের বিচিত্রানুষ্ঠান শুরু হয়। দুজন উঠে পড়ি। বাড়ির দিকে পা বাড়াই।



(২)

বৃষ্টির সাথে আমার প্রথম দেখা এক বৃষ্টির বিকালে। সেদিন ছিল শনিবার। কিছু জিনিষ ভোলা যায় না। আবার কিছু জিনিষ মন থেকে আপনা আপনি মুছে যায়। আমিও ভুলিনি সেই প্রথম দেখার দিন। এই পাঁচ মাস পর আজও পরিষ্কার মনে আছে।

কলেজের একটা বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম। ঠিক বেরোবার মুখের আকাশ কথা বলে উঠল। চিৎকার করে ডেকে উঠল। সাইকেল টা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি, উত্তরের কোনে কালো মেঘ জমছে। গাছ-গাছালি সব ঝিমিয়ে আছে। তখনই ভেবেছিলাম বৃষ্টি আসবে। আসেনি বৃষ্টি। বৃষ্টি এল মাঝ রাস্তায়। প্রথমে টিপ টুপ টাপ। তারপর ঝমঝমিয়ে। আসেপাশে কোনো  খোলা দোকান দেখতে পেলাম না। সাইকেলের গতি বাড়ালাম। কিছুটা এগিয়ে যেতেই একটা দোকান পড়ল। সাইকেল টা কোনোরকমে স্ট্যান্ড দিয়ে, সামনে ঢালু হয়ে নেমে আসা দোকানের শেডের নীচে ঢুকে পড়লাম। আরও দু'-তিন জন দাঁড়িয়ে আছে। নজরে পড়ল আমার।হঠাৎ বৃষ্টিতে পুরোটাই ভিজে গেছি। মাথাটা হালকা করে ঝাঁকাতেই জল ছিটকালো। তখনই মেয়েটিকে দেখলাম। আমার দিকে চোখ মোটা করে তাকিয়ে আছে। একটা শক লাগলো আমার মনে ভেতর। কি অদ্ভুত মায়াভরা চোখ! কি রুপ!  চোখ ফেরানো যায় না। হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম আমি। মেয়েটিও বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। কানের পাশ দিয়ে ভেজা চুল, মেয়েটির খোলা পিটের উপর এসে পড়েছে। ভেজা চুল, ভেজা ঠোঁট, ভেজা চোখের পাতা, ভেজা পিট, ভেজা ত্বক- আমিও ভিজে উঠলাম মেয়েটিকে দেখে। আমার মন ভিজে গেল। চমক ভাঙলো মেয়েটির ধমকে।
-" হাঁ করে তাকিয়ে আছেন কেন? আস্তে মাথা ঝাঁকাতে পারছেন না। জল এসে লাগছে।"
-" সরি!" কাল্পনিক জগত থেকে ধপাস করে বাস্তবে এসে পড়লাম।

বেশ কিছুক্ষন কেটে যায়। বাইরের দিকে তাকাই। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা কালো পিচের রাস্তার উপর পড়ে গলে যাচ্ছে। প্রতিটা বৃষ্টির ফোঁটায় যেন আমি, মেয়েটির মুখ দেখতে পাচ্ছি। আড় চোখে একবার মেয়েটির দিকে তাকালাম। মেয়েটিও বৃষ্টি দেখছে। ও কি বৃষ্টির মধ্যে আমার মুখ দেখতে পাচ্ছে? ধুর কি ভাবছি এসব!
ঘড়ির দিকে তাকায় মেয়েটি। আনমনে বলে,-" কখন যে থামবে বৃষ্টি টা!" তার মুখে একটা বিরক্তিকর চিহ্ন ফুটে উঠে।
-"যে জোরে বৃষ্টি পড়ছে, আরও ঘন্টা খানেক ধরে চলবে বলে মনে হয়।" আমি বলি।
আমার দিকে তাকায় মেয়েটি। আমি হাসি মুখের পজ দেওয়ার চেষ্টা করি। মেয়েটি চোখ ফিরিয়ে আবার বাইরের বৃষ্টি দেখে। কিছুটা হতাশ হই আমি। তবে হাল ছাড়িনা আমি।
-" কোথায় যাবেন আপনি?" আমি জিজ্ঞেস করি।
-" হেলিকপ্টার মোড়। আপনি?" বলে মেয়েটি।
-"আমি, রেল গেট।"
-"ওহ।" মেয়েটি আর কথা বাড়ায় না।

আমার নির্নয় ভুল ছিল। দশ মিনিট পর বৃষ্টি ধরে আসে। মেয়েটি বলে,-" কি হল, বৃষ্টি যে থেমে গেল! আপনি যে ঘন্টা খানেকের কথা বলেছিলেন।"
যেখানে মুখে কিছু বলা যায় না, সেখানে ফিক করে হেসে দেওয়াটাই বেটার। মেয়েটির কথায় আমিও হাসি। তারপর দোকানের শেডের নীচে থেকে বের হয়ে রাস্তার উপরে দাঁড়াই।মেয়েটির ও সাইকেল আছে। আমি লক্ষ্য করিনি। দোকানের দেওয়ালের পাশ থেকে সাইকেল টা নিয়ে সিটের উপর চেপে বসে মেয়েটি। দুজন সাইকেল চালাই জলভেজা রাস্তার উপর দিয়ে।

আমার বাড়ি রেল গেটের গাছে। রেল গেট টা পেরিয়ে যে রাস্তাটা ডান দিকে ঢুকে গেছে, তার প্রথম বাড়িটা আমাদের। রেল গেট যেতে গেলে হেলিকপ্টার মোড়ের উপর দিয়ে যেতে হয়। সাইকেল চালাতে চালাতে গল্প করি দুজন।
-" আপনার নাম টাই কি জানা হলো না!" হেসে জিজ্ঞেস করি আমি।
-" বৃষ্টি। বৃষ্টি বিশ্বাস। আপনার?" বলে মেয়েটি।
নিজের নাম বলি আমি।-" আমি আকাশ।"
মেয়েটি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়। ভুরু কোঁচকায়।-" বেশি স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করবেন না।"
-"মিথ্যে বলিনি। সত্যি বলছি, আমার নাম আকাশ।"
-"কি করেন?"
-"গতবছর গ্রাজুয়েশন শেষ হল।গান করি। গীটার বাজাই।"
-"শখ না প্রফেশন? "
-"শখ বলতে পারেন। তবে প্রফেশন আলাদা আছে।"
-" কি,সেটা?"
-" তেমন কিছু নয়। এখন একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করি। ভালো কাজ। আর সরকারি চাকরীর পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছি।"
-" বাবা! আপনি তো অনেক কিছু করেন!"
মুচকি হাসি আমি। তারপর জিজ্ঞেস করি,-" আপনি কি করেন?"
-" এবছর থার্ড ইয়ার শেষ হল। জ্যুলজি অনার্স। এবার এম.এ করবো।"


হেলিকপ্টার মোড় এসে যায়। সাইকেল থামায় বৃষ্টি। আমিও থেমে যাই। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে,-"আপনার গান শুনবো একদিন।"
-" ওকে। আবার দেখা হয়ে যেতে পারে কোনো দিন। পাশাপাশি ই তো থাকি। " আমি বলি।
বৃষ্টি হেসে, সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয়। চোখের আড়াল হয়ে যায় এক মুহুর্তে।

বাড়ি ফিরে ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুক টা লগ ইন করি। ও কে পাব ফেসবুকে! বৃষ্টি বিশ্বাস লিখে সার্চ করি। প্রথমেই নামটাই এসে যায়। যেন নামটি আমারই সার্চের অপেক্ষায় ছিল। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাই। রাতের বেলা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট হয়। মনটা পাখির মতো উড়ে যায়। মেসেজ লিখে পাঠাই। -" হাই! আমি আকাশ।"
তিরিশ সেকেন্ড পর রিপ্লাই আসে। সাথে একটা স্নাইলি।-" বুঝতে পেরেছি।"
-" কিভাবে পারলে?"
-" যেভাবে সবাই পারে।"
খসখস করে টাইপ করি আমি।-"কি করছো।"
-" নাথিং। সবেমাত্র খেয়ে উঠলাম। ইউ?"
-" আমিও নাথিং। খেয়ে জাস্ট শুয়ে পড়লাম।"
সাথে একটা স্মাইলি পাঠালাম।
রাত একটা বেজে কুড়ি মিনিট। তবুও ফোনের কীবোর্ডে খসখস আওয়াজ চলছে। দুটোর সময় শুভরাত্রি জানায় বৃষ্টি। আমিও জানাই। ঘুমিয়ে পড়ি দুজন।

দিনের পর দিন কেটে যায়। বেশ কয়েকমাস পেরিয়েও যায়। আপনি ছেড়ে তুমি হয়। ফেসবুক ছেড়ে ফোন। আমি ভালোবেসে ফেলি বৃষ্টি কে। আমি জানি, বৃষ্টিও আমাকে খুব ভালোবাসে। প্রতিদিন বিকেলে সাইকেল নিয়ে যখন বৃষ্টিদের পাড়ায় ঘুরতে যাই, তখন দেখতে পাই বৃষ্টি কে। বারান্দায়, কখনো বা, পাড়ার মোড়ে, পাড়ার মেয়েদের সাথে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টিকে দেখলে, আমার আকাশে বৃষ্টি নামে। রিমঝিমে বৃষ্টি। ভিজিয়ে দেয় সারা শরীর। কেঁপে উঠি যেন আমি।

সেদিন রাতে বৃষ্টির ফোন আসে। সবেমাত্র খেয়ে শুয়েছি। আলোটা এখনো অফ করা হয়নি। ফোনটা রিসিভ করে, আবার উঠে আলোটা নিভেয়ে দিই। -"বলো। খাওয়া হল?"
-" হু।তোমার?"
-"আমার ও। এই জাস্ট তোমাকে ফোন করতে যাব ভাবছিলাম আর তুমি আমাকে ফোন করলে।"
-"ভালো লাগছে না।"
মেয়েদের হঠাৎ হঠাৎ মন খারাপ করে জানি। আমার যে করে না, তা নয়। আমি বলি,-" কেন?  কি হল আবার?"
-" তোমার গান শুনে ইচ্ছে করছে। ফোনের মধ্যে শুনে শুনে আর ভালো লাগে না। "
-" তাই বুঝি?"
-"চলো না, কোথাও ঘুরে আসি। কোনো নির্জন জায়গায়। সেখানে তুমি আমাকে গান শোনাবে।"
-"আচ্ছা, কোথায় যাবে?"
-" যেখানে কেউ যায় না।"



হেলিকপ্টার মোড় দিয়ে একটা বড় পিচের রাস্তা চলে গেছে বারুইপুরের দিকে। সেই রাস্তা দিয়ে ১৫ মিনিট সাইকেলে গিয়ে ডান দিকে একটা চওড়া খোয়া বিছানো রাস্তা মাঠের উপর দিয়ে উত্তর দিক ধরেছে। রাস্তাটা শেষ হয়েছে একটা প্লাটফর্মে। চাঁদখালি হল্ট। এখনো চালু হয়নি প্লাটফর্ম টি। কোনো ট্রেন থামে না। ফাঁকা মাঠের উপর একাকী পড়ে আছে প্লাটফর্ম টি। বিকালে আমরা সেখানে যাওয়ার মনস্থির করি।

বিকাল চারটে। এখনো রোদের তেজ কমেনি। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমি। বৃষ্টিদের গলির সামনে গিয়ে ও দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে অবাক হয়ে বলে,-" এই তুমি গীটার নাও নি? গান শোনাবে কি করে?"
-'এই রে!  তোমার সাথে প্রথম বেড়াতে যাওয়ার আনন্দে সব ভুলে গেছি। সরি বৃষ্টি। আচ্ছা, পরে কোনোদিন হবে।"
বৃষ্টি হেসে বলে,-" পরের বার যেন কোনো ভুল না হয়।"
-"জি ম্যাডাম।" আমি মুচকি হাসি। তারপর দু'জন সাইকেলে এগিয়ে যাই।

একটা বন্ধ টিকিট ঘর,আর দুটো হালকা সবুজ রঙের প্লাস্টিকের ছাউনি প্লাটফর্ম টির উপর। পিছনের দিকে কোমর সমান ইট দিয়ে গোল করে ঘেরা নারকেল গাছের সারি। গাছ এখনো ছোটো। দুপাশেই খোলা সবুজ মাঠ। একটা ছাউনির নীচে, সিমেন্টের তৈরী করা বসার জায়গা। সেখানে গিয়ে বসি দু'জন। রোদ পড়ে এসেছে মাঠের উপর। গরুর পাল চরে বেড়াচ্ছে। কয়েক জন লোক লাঠি হাতে বসে আছে মাঠের মধ্যে। গরু চরাচ্ছে। দখিনের দিকের খোলা মাঠের উপর দিয়ে বিকেলের বাতাশ হু হু করে ছুটে আসছে। বৃষ্টি আমার দিকে তাকিয়ে বলে,-"একটা গান শোনাও এবার।"
-"কি গান শুনবে বলো!"
-"রবীন্দ্রসঙ্গীত।"
একটু ভাবি আমি। তারপর গান শুরু করি।
" কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ
দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ –
সে তরঙ্গে,ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে
তাতা থৈথৈ , তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।।
মম চিত্তে নৃতে নৃত্যে কে যে নাচে........।

আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বৃষ্টি।
-"কি হল!" বলি আমি।
-"তুমি সত্যিই ট্যালেন্টেড। এত ভালো গান করো, গীটার বাজাও, আবার চাকরী ও করো!"
-"আর একটা কথা বললে না?"
-" কি কথা?"
-" আমি তোমাকে ভালোও বাসি।"

একটু একটু করে সন্ধ্যা নেমে আসছে মাঠ জুড়ে। দূরের গ্রাম গুলো কালো আসে। আর আমার দিকে সরে আছে বৃষ্টি। খুব কাছে। একহাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে নিজের গলার কাছে টেনে নেয়। ফিসফিস করে বলে, -"আমিও তোমাকে ভালোবাসি।"
শরীর কাঁপে। আমার গলা ধরে আসে। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলি,-" জানো, আমার এটা বিশ্বাস হয় না। আমার মতো এরকম একটা বাজে দেখতে ছেলেকে, তুমি ভালোবাসতে পারো!"
-" ভালোবাসা ওভাবে হয় না। তোমাকে আমার ভালো লাগে, তোমার সাথে আমার সারাদিন কথা বলতে ইচ্ছে হয়, তোমার মন খারাপ থাকলে, আমার মন খারাপ হয়....এটাই ভালোবাসা। আর তুমি সত্যি খুব ভালো গান গাও।" বৃষ্টি হাসে। ঝরঝরে বৃষ্টির মতো।
-"আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?"
-" কখনোও না। তবে কোনোদিন আঘাত দিও না যেন।"
-"সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, বৃষ্টি!"
-" বিশ্বাস হচ্ছে না তো? আচ্ছা বিশ্বাস করিয়ে দিচ্ছি। "

আমার মুখের কাছে বৃষ্টির মুখ। ঠোঁটের কাছে ঠোঁট। হাত - পা কাঁপতে থাকে আমার। হার্ট ফেল করবো বলে, একবার মনে হয় আমার। অজ্ঞান হয়ে যেতেও পারি। তবে তার আগেই বৃষ্টি ভেজা ঠোঁট এসে আমার ঠোঁট কে ভিজিয়ে দেয়। নিস্তব্দ হয়ে যাই আমি। লাল বলের মতো সূর্য টাও সেই সময় মাঠের ওপারের গ্রাম গুলোর মাঝে ডুব দেয়।

(৩)

আমি অনেক বার চেষ্টা করেছিলাম সত্যিটা বলতে। সম্পর্ক যত গভীর হয়েছে, তত আমি চেষ্টা করেছি কথা টা বলে দেওয়াই ভালো। কিন্তু বৃষ্টিকে হারানোর ভয়ে বলতে পারি নি যে, আমি গীটার বাজাতে পারি না। আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করি। আমি চাকরীও করি না। বাবার হোটেলে বসে খাই, আর ক্লাবে আড্ডা মারি। কোনো চাকরীর প্রস্তুতি, কোনো ইনকামের ধান্দা নেই অমার জীবনে।

আমার বন্ধু প্রীতম ভালো গীটার বাজায়। কলকাতায় গীটার শিখতে যায়। লম্বা লম্বা চুল প্রীতমের। আবার একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে ডাটা এন্ট্রির কাজ করে। প্রীতম বলে, একটা ছোটো খাটো চাকরী, আর  হাতে গীটার থাকলে মেয়েরা পাগল হয়ে ওঠে। পটাতে হয় না, পটে যায়। আর আমি কি করি? আমি শুধু গান করি। তাও আবার হারমোনিয়াম। কোথায় হারমোনিয়াম আর কোথায় গীটার!
তাই বৃষ্টিকে দেখার পর, ও কে পাওয়ার জন্যে মিথ্যে কথা বলি। তারপর একটু একটু করে অনেকবার কথা টা বৃষ্টি কে বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারি নি। ও যদি চলে যায় আমাকে ছেড়ে! আমাকে আর ভালো না বাসে!

আজ সেই পরিস্থিতির তৈরী হয়েছে। ধরা পড়ে গেছি আমি। এখন কি বলবো? ঘটনাটা খুলেই বলি। দিন কয়েক আগে বৃষ্টির ফোন আসে।
আমি ফোন তুলতেই বৃষ্টি বলে,-" সামনের রবিবার তুমি ফাঁকা আছো?"
-" হ্যাঁ আছি।  কেন?"
-" রবিবার সকালে আমাদের বাড়িতে একটা অনুষ্টান আছে। তোমাকে গীটার বাজিয়ে গান গেয়ে শোনাতে হবে। বাবা- মা কে বলেছি, আমার কলেজের এক বন্ধু খুব দারুন গান করে। "
-" কি! গীটার বাজিয়ে গান!"
-" একদম না করবে না। তুমি আমায় গীটার শোনাবে বলেছিলে।"
-" না মানে..আমি.."
-" কোনো এক্সকিউজ নয়। তুমি রবিবার আমাদের বাড়িতে আসছো, এটা কর্নফাম।"
ফোন কেটে দেয় বৃষ্টি। আমি আহত পাখির মতো চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ি। আর এক দিন পর রবিবার। কি করবো আমি?

দেবু সত্যি কথাটা বলতে বলেছিল। কিন্তু বৃষ্টি সত্যি টা শুনলে খুব আঘাত পাবে। ও নিজেই আমাকে বলেছিল,যেন কোনোদিন আঘাত না দিই। অনেক ভেবে চিন্তে আবার একটা পরিকল্পনা মাথায় আসে আমার। এটাই বলবো বলে ঠিক করি। শনিবার রাত এগারোটার দিকে ফোন করি বৃষ্টি কে। ফোন রিসিভ হয়। ওপার থেকে বৃষ্টির গলার আওয়াজ পাই। -" বলো।"
-" বৃষ্টি, গান প্রাকটিস করতে গিয়ে, এখুনি আমার গীটারের কর্ড ছিঁড়ে গেছে। কি হবে এখন? খালি গলায় করলে হবে না?"
বিরক্ত হয় বৃষ্টি। -"কি যে করো না! গীটার বাজাও না, যুদ্ধ করো? "
-" আমি কি করব বলো!"
-" চিন্তা করো না! তুমি কাল এসো তো। আমি একটা গীটার জোগাড় করে রাখব।"
-"অ্যাঁ! না মানে, বৃষ্টি আমার কথা শোনো..."
আমাকে থামি দেয় বৃষ্টি। বলে,-" কোনো কথা শুনবো না। তুমি কাল আসবে। আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব।"
ফোনটা কেটে যায়। আমার মাথা ধরে আসে। কাল ওর বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই আলাদা করে সব বলতে হবে। নইলে সন্মানের এক ছিঁটে ফোঁটাও বাকি থাকবে না।

(৪)

বৃষ্টিদের বাড়িটা দোতলা। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এল টাইপ প্যাটার্ন। আমি পাঁচিলের গেট খুলে ভেতরে ঢুকি। কলিং বেল টিপি। বৃষ্টি এসে দরজা খুলে দেয়। ভেতর থেকে অনেক কথা- বার্তার আওয়াজ পাই। দরজা দিয়ে ঢুকতেই ডান দিকে উপরে ওঠার সিঁড়ি। বৃষ্টি হেসে বলে,-" আমরা তোমার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।"
বৃষ্টির মা এগিয়ে আসে আমাদের দিকে। বলে-' দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরো চলো। তোমার গান শোনার জন্য সবাই অপেক্ষা করে আছে। এই বৃষ্টি, আকাশ কে ভেতরে নিয়ে যা।"
কথাগুলো বলে বৃষ্টির মা, সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। কিছু বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে এসে আমার চারিদিকে জড়ো হয়। বৃষ্টি বলে,- চলো। "
ঘরের ভেতর এগিয়ে যায় বৃষ্টি। কথাটা বলতে পারি না। আমার বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ শুরু করে দিয়েছে। আমি বৃষ্টির পিছন পিছন অনাসৃষ্টির মতো ঘরের ভেতরে যাই।


এত বড় একটা শক খাবো আমি নিজেই বুঝতে পারিনি। সোফার পাশে একটা টি পয় টেবিল রাখা। তার উপর হালকা গোলাপি বেড কভারের উপর একটা হারমোনিয়াম বসানো। অবাক হয়ে বৃষ্টির দিকে তাকাই আমি। চোখে দিয়ে ইশারা করে ওখানে বসতে বলে বৃষ্টি। আমি তবুও দাঁড়িয়ে থাকি। বৃষ্টি বলে,-" কি হল, যাও তোমার মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্ট তো রেডি।"
কি করে জানল বৃষ্টি! আমার মাথা ঘোরে।কাঁপা কাঁপা পায়ে গিয়ে বসে পড়ি। সবার সাথে আলাপ হয়। অনেক গল্প হয়। একটু ভয় কেটে গেছে আমার। হালকা জল-খাবারের পর বেশ কয়েকটা রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনাই। বৃষ্টির অনুরোধে আরও কয়েকটা গান গাইতে হয়। সবাই বেশ তারিফ করে আমার। বিশেষ করে বৃষ্টি মা।

এই মুহুর্তে দোতলার বারান্দায় আমি আর বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছি। আর কেউ নেই। চুপ চাপ আমি।  ওর মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। নিজেরই লজ্জা লাগছে। সামনের পাঁচিলের গায়ের কাঁঠাল গাছটির দিকে তাকিয়ে থাকি। নীরবতা ভেঙে বৃষ্টি কথা শুরু করে।-" তোমার সাথে পরিচয় হওয়ায় কিছু মাস বাদে আমি জানতে পারি তুমি সব মিথ্যে বলেছো। তোমার পাড়ায় আমার এক কলেজের বান্ধবী থাকে, তার থেকেই জেনেছি। তখন রাগ হয়েছিল খুব। কিন্তু তোমাকে আমি ছেড়ে যেতে পারিনি। খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তাই আমি চাইতাম, তুমি নিজেই আমাকে সত্যিটা খুলে বলো।"
 -"সত্যি টা আমিও বলতে চেয়েছি বার বার তোমাকে।  কিন্তু এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোমায় যে,তোমাকে হারানোর ভয়, তোমাকে আঘাত দেওয়ার ভয় আমাকে পিছু টেনে রেখেছিল। অনেক চেষ্টা করেও আমি পারছিলাম না তোমাকে সত্যিটা বলতে।" বৃষ্টির মুখের দিকে তাকাই আমি।

বৃষ্টি ও আমার দিকে তাকায়। শান্ত চাহনি। ঠোঁটের কোনায় হাসি। আমার ও হাসি। কিছুসময় এক ভাবে তাকিয়ে থাকি দুজন। বৃষ্টিই কথা বলে,-" এর পর থেকে আর কিছু লুকাবে না।"
আমি হেসে বলি,-" জি ম্যাডাম।"

দুটো ঘুঘু পাখির ঝটপটির শব্দ আসে কাঁঠাল গাছের পাতার ভেতর থেকে।



স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

Saturday, 7 October 2017

একটি অন্যপ্রেমের ছোটগল্প " অন্য দু'জন "



গল্পপড়ুয়া ফেসবুক পেজে লাইক করুন : 
http://www.facebook.com/golpoporuya


অন্য দুজন

পুরানো আলমারি টা,সাজাতে গিয়ে চমকে উঠল শ্রীময়ী।আলমারি টা বিয়ের পর থেকে শুধু একবার খুলে দেখেছিল সে।ভেতরের অবস্থা দেখে আর হাত দিতে ইচ্ছে হয়নি।বোঝা বোঝা কাগজপত্র,পুরানো জামা- প্যান্ট।ঝাঁপ করে রাখা।নীচের তাকে কিছু বাংলা,ইংরাজী মিলিয়ে বই আছে।এলোমেলো করে সাজানো। কোনোদিন পড়েছে বলেও মনে হয় না।কিছু কিছু মানুষ থাকে,যাদের শুধু বই কেনার শখ। কিন্তু কোনোদিন পড়েও দেখে না।সৌম্যদীপ ঠিক সেই রকম ধরনের মানুষ।এই তো সেদিন একটা পূজাবার্ষিকী কিনে আনল,কিন্তু টেবিলের উপর সেই ভাবে পড়ে আছে।শ্রীময়ী মাঝে মাঝে খুলে একটু পড়ে। কিন্তু মন বসে না।

সৌম্যদীপ এখন বাড়িতে নেই।অফিস গিয়েছে। বড্ড আগোছালো ছেলে সৌম্যদীপ।নিজের কোনো জিনিষ পত্র তার ঠিক থাকে না।তাই আজ অফিসে যাওয়ার পর আলমারি টা নিয়ে বসল শ্রীময়ী।ধুলো জমছে ভিতরে।বই গুলো একটা একটা করে বাইরে বের করতে গিয়ে,চমকে উঠল........।


(১)

বিয়েটা হঠাৎ করেই হল শ্রীময়ীর।এরকমটা হবে সে নিজেও ভাবিনি।ঝড়ের আগে অন্তত একটা পূর্বাভাস দেওয়া তো উচিত ছিল!তার সবথেকে কাছের বন্ধু রিমি বেশ কিছু দিন ধরে মিউ মিউ করে তার কোলের কাছে এসে ডাকছিল।বিরাট কোনো ঝড় বৃষ্টি আসার আগে প্রথম সেটা, জীবজন্তুরা বুঝতে পারে।তাই রিমি ই সম্ভবত বুঝতে পেরেছিল তার আসন্ন বিয়ের কথা। প্রথমে শুনে,একদম না করে দিয়েছিল শ্রীময়ী। এই মুহুর্তে বিয়ে কেন,মৃত্যু তার পক্ষে সম্ভব নয়।সময় নেই বিয়ে করার।গ্রাজ্যুয়েসান কমপ্লিট করার সকাল-বিকেল, টিউসন আর চাকরীর পরীক্ষার প্রিপারেসশন।একটুকুও সময় নেই হাতে।আসলে শ্রীময়ী সময় রাখতে চায়নি হাতে। কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিল নিজেকে।কিন্তু হঠাৎ করেই বিয়েটা সব বানচাল করে দিল।যদি মা-বাবা এসে ধরত,তবে কোনো পাত্তাই দিত না।কিন্তু এক সাথে সব আত্মীয় স্বজনের মুখের কথা ফেলতে পারিনি সে।মেসোমশাই এর ঠিক করা পাত্র।সৌম্যদীপ সরকার।বেশ লম্বা,চওড়া ফিগার।দেখতেও মন্দ নয়।মাথায় ঘন কালো চুল।সরকারি চাকুরে।এরকম ছেলেদের মেয়ে কেন,মেয়ের মা দেরই আগে পছন্দ হয়ে যায়। অপছন্দের কোনোও কারন ছিল না।তবুও মনের মধ্যে কেউ যেন খোঁচা মারছিল শ্রীময়ীর। যেরকম টা ভেবেছিল,তেমনটা হয়নি।বিয়ের পর বুঝতে পারল,সৌম্যদীপ ছেলেটি মন্দ নয়।বেশ ভাল মানুষ।যদিও এত ভালো মানুষ তার যেন আবার অসহ্য লাগে।যেটা আবদার করে সেটা কিনে আনে।এই ব্যাপারটা তার ভালো লাগে না। চাইলেই পেয়ে গেলে,তার মধ্যে ঠিক আনন্দ থাকে না।না বলবে,কয়েক দিন দেরি করবে, এটাই ভালো।ছেলেটির একটা ব্যাপার বেশ ভালো লাগে,রাতের বেলা হামলে পড়ে না।সব কিছুর ও একটা ধৈর্য রাখা উচিত।শ্রীময়ীও সাহস দেখায় না।চুপ করে থাকে।যতক্ষণ না আদর করে কাছে টেনে নেয়,ততক্ষন। বিয়ের প্রথম প্রথম সৌম্যদীপ খুব একটা কাছে আসতো না।কেউ কেউ এরকম হয়।শ্রীময়ী জানে সেটা। সে ও তো বিছানায় সাবলিল হতে পারি নি। কিন্তু কিছু দিন কাটতেই আকাশ পরিষ্কার।
মাস দু'য়েক হল শ্রীময়ীর বিয়ে হয়েছে।বেশ মানিয়েও নিয়েছে নতুন বাড়িতে।দু'টো ঘর, একটা কিচেন,আর টয়লেট,বাথরুম।যেমন টা থাক।দু'জনের জন্য এটাই অনেক।সৌম্যদীপের বাবা-মা বড় ছেলের কাছে কাছে থাকে।মাঝে মাঝে মাসে একবার করে বেড়াতেও আসে। সৌম্যদীপ কোনো কিছুতেই শ্রীময়ী কে জোর করে না। রান্না করতে চাইলে করো,না করতে চাইলে না করো।বাইরে থেকে খেয়ে নেবে। কিন্তু বার বার করে শ্রীময়ী কে বলে যায়,দুপুরে অন্তত নিজে রান্না করে করে খেয়ে নিও।শ্রীময়ী নিজের জন্য রান্না করে।সৌম্যদীপের কথা মতো খেয়েও নেয়।তারপর লম্বা ঘুম দেয়।

(২)
আজ রবিবার।সৌম্যদীপের অফিস ছুটি।তাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার ও কোনো প্রশ্ন নেই।
রবিবার সকালে একটু বেশি বেশি শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।জানালা দিয়ে সকালের নরম আলো এসে ঢুকছে।একবার চোখ খুলে তাকাতেই, বিরক্ত হল সৌম্যদীপ।চোখ বন্ধ করল।কেন যে সকাল সকাল জানালা টা খুলে দেয় মেয়েটা! উপুড় হয়ে আবার বালিশে মাথা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলো সৌম্যদীপ।ঘুম ঠিক নয়। আলসেমি করে পড়ে থাকা।কিচেন থেকে শ্রীময়ী হাঁক পাড়ল,-"সৌম্য, উঠলে তুমি?"
-"না,তুমি এসে তুলে দাও।"ঘুম জড়ানো চোখে বলল সৌম্যদীপ।
-"একটু,দাড়াও।যাচ্ছি।"
এক মগে করে জল এনে সৌম্যদীপের চোখে মুখে ছিটিয়ে দেয় শ্রীময়ী।ঘুম জড়ানো চোখে শ্রীময়ীর হাত টা ধরে বুকের উপর টেনে সৌম্যদীপ।
-"ছুটির দিনে এত তাড়াতাড়ি উঠো কেন,শ্রী?"
বিয়ের কয়েকদিন পর একদিন টিভি তে হরর ফ্লিম দেখতে দেখতে সৌম্যদীপ কে জড়িয়ে ধরে শ্রীময়ী বলেছিল,-"তোমার নাম টা খুব বড়। কে রেখে ছিল বলো তো?অত বড় নাম ধরে ডাকা যায় না।"
-"বরের নাম ধরতে নেই,জানোনা।"হাসল সৌম্যদীপ।
-"রাখতো তোমার ওসব,নাইনটিন থার্টি সিক্সের ধ্যান ধারনা।আমি তোমাকে শুধু সৌম্য বলে ডাকবো।"
সৌম্যদীপের ঠোঁটে একটা চুমু খেল শ্রীময়ী।
-"আচ্ছা তাই ডেকো।আর আমিও তোমাকে আদর করে শ্রী বলে ডাকবো।"
শ্রীময়ী হেসে বলল,-"আমার বাড়ির লোক-জন, বন্ধু বান্ধব সব শ্রী বলেই ডাকে।"
সেই থেকে  শ্রীময়ী কে আদর করে শ্রী বলে ডাকে সৌম্যদীপ।

সৌম্যদীপের ঝটকা টানে বুকের উপর গিয়ে পড়ে শ্রীময়ী।তার মুখের ঠিক উপরেই শ্রীময়ীর মুখ।-"একটা চুমু দাও না।" বলল সৌম্যদীপ।
-"বাসি মুখে,চা খেতে হয়, সৌম্য।"
-"না,বউয়ের চুমু।কে যেন বলেছিল,সকালে বউয়ের চুমু দিয়ে দিন শুরু করলে,সারাদিন টা তার ভালো কাটে,কোনো বিপদ আপদ
হয় না।"
-"ছাড়তো তোমার ঢঙের কথা।যে ব্যাটা বলেছিল,তার বউ নিশ্চয় তাকে কোনোদিন চুমু দিত না।তাই ওরকম একটা ফালতু কথা বলে গেছে।"
শ্রীময়ী কে আরও জোরে বুকে টেনে নিল সৌম্যদীপ।বলল,-"শ্রী,একটা চুমু শুধু।"
-"একটা কেন,হাফ ও দেব না, সৌম্য।" হাসল শ্রীময়ী।
-"আচ্ছা,হাফ দিতে হবে না।সিকি ভাগ টাই দাও।"
-"ধুর,তুমিও না।"
বিরক্ত হয়ে সৌম্যদীপের গালে একটা চুমু খায় শ্রীময়ী।তারপর বলে,-"এই তোমার সাত দিনই অফিস হয় না কেন গো?"
-"কেন?
-"সারাদিন বাড়িতে বাড়িতে থাকলে তোমার দুষ্টমির পরিমান বেড়ে যায়।"হাসে শ্রীময়ী।
-"বাড়লেও বা কি! নিজের বউ তো।"
দুজনেই হাসে।

(৩)

একটু বেলার দিকে উঠে বাজারে যায় সৌম্যদীপ।নীচথেকে বাইক টা বের করে স্টার্ট দেয়।বাজারে গিয়ে একটা মাঝারি সাইজের ইলিশ মাছ কেনে।সরষে বাটা দিয়ে ইলিশ মাছ মন্দ লাগে না।শ্রীময়ী ও রান্না করেও দারুন। দুপুরে সরষে ইলিশ খেতে খেতে সৌম্যদীপ বলে,-"শ্রী,চলো না একটা সিনেমা দেখে আসি ইভিনিং শো এ।ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড।"
দুষ্ট হাসি হেসে শ্রীময়ী বলল,-"রাতের পর রাত তো,বেশ আমার সাথে স্ট্যান্ড করে যাচ্ছ।তবে আবার কার সাথে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড করার শখ হল?"
-"তোমার সতীনের সাথে।"
-"কি!"
সৌম্যদীপ হাসে।হো হো করা হাসি।
-"আমি ছাড়া, আর কোনো মেয়ের দিকে তাকালে তোমার গলা টিপে দেব সৌম্য।"
-"চলো,না শ্রী।" আবদুরে সুর সৌম্যের গলায়।
-"না,আজ শুধু আমার কাছে থাকবে তুমি।"
-"তোমার কাছে বসে বসে কি করব?"
-"কি করবে আবার! চুপ করে বসে থাকবে।নইলে গল্প করবে।"
-"পারব না।যদি পাঁচ মিনিট পর পর একটা করে চুমু দাও,তবে থাকব।"হাসে সৌম্যদীপ।
-"পাঁচ মিনিট কেন! তোমাকে পাঁচ সেকেন্ড পর পরই চুমু দেব সৌম্য।তবে প্রতি চুমুতেই একটা করে কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট রেডি রেখো।"খিল খিল করে হাসে শ্রীময়ী।
-"পাঁচশো!..এই ওটা পাঁচ টাকা করো, শ্রী।তবে পারবো হয়তো।"
-"না,এক পয়সা ও কম হবে না।তবে তুমি ওই সরষে মাখা ইলিশ খাও।"
শ্রীময়ীর খাওয়া শেষ।হেসে উঠে যায় সে। সৌম্যদীপ আরও কিছুক্ষন বসে থাকে।সরষে মাখা হাত টা চেটে চেটে পরিষ্কার করে।তারপর উঠে যায়।

বিকালে ছাদে উঠে দু'জন।প্রতি ছুটির দিনের মতো।সাদা আকাশের মাঝে মাঝে নীলের ছোঁয়া।মৃদু ঠান্ডা হাওয়া ভেসে আসছে,সামনের বাড়ি গুলো ফাঁক দিয়ে। চেয়ার নিয়ে অনেক গল্প করে দু'জন।হাবিজাবি গল্প।এ সব গল্পের না থাকে মাথা, না থাকে মুন্ডু।যা হোক একটা করলেই হল।তারপর সন্ধ্যা হলেই নীচে নেমে যায়। সৌম্যদীপ টিভি নিয়ে বসে পড়ে।শ্রীময়ীর একটা অভ্যেস আছে,যেটা সৌম্যদীপের খুব ভাল লাগে।শ্রীময়ী সিরিয়াল দেখতে পছন্দ করে না।তাই সন্ধ্যা বেলা,নিউজ,খেলা দেখার সুযোগ টা পেয়ে যায় সে।
রাত সাড়ে ন'টা।একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়ার জন্যে জোরাজুরি করে সৌম্যদীপ।সব দিন এরকম করে না।মাঝে মাঝে করে।কেন করে, সেটা বেশ ভালোরকমই বোঝে শ্রীময়ী।তার ও খারাপ লাগে না।খারাপ লাগবেই বা কেন! ভালো লাগারই কথা।রাতের খাওয়া শেষ করে,সব কিছু গুছিয়ে, বাইরের গেট দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢোকে শ্রীময়ী।তাকে দেখে হাসে সৌম্যদীপ। আজ অন্যরকম মুডে আছে! মনে মনে ভাবে শ্রীময়ী। আয়নার সামনে কিছুক্ষন দাঁড়ায়।মাথায় চিরুনি দেয়।নিজেকে একটু দেখে নেয়।তারপর সৌম্যদীপের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
-"আলোটা,নেভাবে না।" বলে সৌম্যদীপ।
-"না,আজ থাক।"
-"ভালোই তো।তবে আলো থাক।"
হাসে সৌম্যদীপ।তারপর শ্রীময়ী কে কাছে টেনে নেয়।খুব কাছে।কিছু বলে না শ্রীময়ী।আজ তার ও বাঁধন হারা হতে ইচ্ছে করছে।
-"আজ আর একদম না বলবে না,শ্রী।"নীচু স্বরে ঠোঁটের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলে সৌম্যদীপ।
শ্রীময়ী বলে,-"না,সৌম্য।আজ আর কোনো না নয়।"
তারপর সৌম্যদীপের ঠোঁটের ভেতর ডুবে যায় শ্রীময়ী।ঠোঁট ছেড়ে বুকে নেমে আসেসৌম্যদীপের মাথা।শ্রীময়ীর চোখ বন্ধ।একবার কেঁপে উঠে।-"সৌ-ম-অ।"
তারপর জোরে সৌম্যদীপ কে বুকে জড়িয়ে ধরে।-"তোমাকে কোনো দিন ভুলবো না সৌম্য। খুব ভালোবাসবো তোমায়।"
সৌম্যদীপ মাথা তুলে শ্রীময়ীর দিকে তাকায়। আবারঠোঁটে চুমু খায়।-"তোমাকেও,খুব ভালোবাসবো শ্রী।সব সময় তুমি আমার কাছে থাকবে।"
তারপর ধীরে ধীরে শ্রীময়ীর শরীরের সবকিছু এক টানে খুলে ফেলে সৌম্যদীপ.....।পাশাপাশি শুয়ে আছে দু'জন।শ্রীময়ীর মাথাটা সৌম্যদীপের বুকের কাছে রাখা।অনেক অ্যাটাক,কাউন্টার অ্যাটাক চলেছে।শ্রীময়ী হেসে বলে,-"এবার ঘুমাও সৌম্য।"
শুভরাত্রি জানিয়ে দুজনই ঘুমিয়ে পড়ে।

(৪)

.....সৌম্যদীপ এখন বাড়িতে নেই।অফিস গিয়েছে। বড্ড আগোছালো ছেলে সৌম্যদীপ।নিজের কোনো জিনিষ পত্র তার ঠিক থাকে না।তাই আজ অফিসে যাওয়ার পর আলমারি টা নিয়ে বসল শ্রীময়ী।ধুলো জমছে ভিতরে।বই গুলো একটা একটা করে বাইরে বের করতে গিয়ে, চমকে উঠল।নীচের তাকের বই গুলো একটা একটা করে বাইরে বের করে ধুলো ঝাড়তে গিয়ে একটা কাগজ নজরে এল তার।বেশ পুরানো কাগজ। কিছু লেখা আছে তাতে।কালি ফ্যাকাশে হয়ে গেলেও পড়া যায়।আর সেটা পড়েই চমকে উঠল শ্রীময়ী।-"প্রিয়তমা,শ্রী তুমি আমাকে ভুলে গেলেও,আমিতোমাকে ভুলতে পারব না।কারন, আমি তোমাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আমার প্রথম ভালোবাসা তুমি।তোমাকে ভোলা সম্ভব নয়।হয়তো আমার মনে এক কোনে তুমি সারাজীবন জায়গা নিয়ে থাকবে।"ইতি তোমার
সৌম্যদীপ।
থরথর করে কাঁপছে শ্রীময়ী। সৌম্যদীপের এক্সের নাম তবে 'শ্রী' ছিল!বুক ধুকপুক করছে তার।সৌম্যদীপ তাকে কেন,শ্রী বলে ডাকে, সেজন্য নয়।নিজের কাছেও ধাক্কা খাওয়ার জন্য। কাগজ টা নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় শ্রীময়ী।মনের মধ্যে সব আগোছালো হয়ে যাচ্ছে। এত বড় সত্যি টা জানার পর,তার রাগ হচ্ছে না সৌম্যদীপের উপর।
কেন রাগ করতে পারছে না সে?সে ও তো নিজের প্রথম প্রেম সৌম্য কে আজও ভুলতে পারেনি।তাই তো প্রতি টা মুহুর্তে সৌম্যদীপ কে শুধু সৌম্য বলে ডাকতে শুরু করেছিল..............।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)


সমস্ত ধরনের চাকরীর পরীক্ষার প্রস্তুতির সমস্ত স্টাডি মেটিরিয়ালস, পিডিএফ বুক পেতে ক্লিক করুন : http://www.gksolve.com

Sunday, 24 September 2017

একটি ভূতুড়ে গল্প " হত্যা কারী "




গল্পপড়ুয়া ফেসবুক পেজ :
http://www.facebook.com/golpoporuya

ভূতুড়ে গল্প " হত্যা কারী "


ভোর বেলা হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে একটা লাশ পড়ে থাকতে দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠল হোটেলে স্টাফ রা। ভেতর থেকে ছুটে এল সবাই।এই ভোরে কি হল আবার! সকলের চিৎকার -চেঁচামেচি তে ঘুম ভেঙে গেল শিউলির।পাশে নরেন কে দেখতে পেল না।ছুটে নেমে এল নীচের তলায়। চাপ বাঁধা জমাট রক্ত মৃত নরেনের মাথার চারিদিকে।শিউলি দৌড়ে গিয়ে কেঁদে পড়ল নরেনের মৃত শরীরের উপর।দেহে যে প্রান নেই সেটা দেখলেই বোঝা যায়।নরেনের বডি টা এমন জায়গায় পড়ে আছে দেখলে মনে হয়, ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে সুসাইড ই করছে।হয়তো পোস্ট মোর্টেম রিপোর্ট সেটাই বলবে।কিন্তু নরেন সুসাইড করতে যাবে কেন? কোনো ঝগড়া, ঝামেলা, ঋন-দেনা -কিছুই তো ছিল না নরেনের।তবে.........?


গতকাল রাতের ঘটনা।মাঝ রাতে দরজায় দু'বার ঠক ঠক করে আওয়াজ হল।মনে হল বাইরে থেকে কেউ নরম হাতে দরজায় চাপড় মারছে।হয়তো আরও আগে থেকে আওয়াজ টা
হচ্ছে।নরেনের যখন ঘুম ভাঙলো,তখন দুবারই শুনলো।খাটের উপর উঠে বসে, দু'হাতে চোখ কচলালো নরেন।
-"এত রাতে আবার কে এল?
রাত একটা বাজে।বাইরে তখনও ঝড়ের চোখ রাঙানি।মেঘের তীব্র গর্জন,সেই সাথে বিদ্যুতের চিরিক।পাশে কোথাও যেন বিকট শব্দে বাজ পড়ল।বুকের ভেতরটা চমকে উঠল নরেনের। যেদিন থেকে হোটেলটি তে এসেছে সেদিন দিন থেকে এই রাক্ষুসে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভালো করে চোখ রগড়ে,পাশে তাকালো নরেন।শিউলি ঘুমিয়ে আছে।কোনো সাড়া শব্দ নেই।যেন মড়া পড়ে আছে।গায়ে হাত দিয়ে দেখলো,চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।তাই নিশ্বাস-প্রশ্বাস এর শব্দ ও আসছে না।নরেন বিরক্ত হল। কয়েক বার ধাক্কা দিল বউ কে।
-"এই শুনছো!"
-"কি হল আবার,এত রাতে?"
শিউলি আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষন চুপচাপ।শব্দটা আর নেই।ঢুলু ঢুলু চোখে বউ এর চাদরের নীচে নরেন যেই ঢুকতে যাবে,ঠিক তখনি আবার দরজা চাপড়ানোর আওয়াজ কানে এল।বিরক্ত হয়ে এবার বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল নরেন।কারেন্ট নেই সেই সন্ধ্যে থেকে।দেওয়ালে ইন্ডিকেটরের দিকে তাকালো সে।না,এখনো কারেন্ট আসেনি।আসলে,নিশ্চয় আলো জ্বলতো।সন্ধ্যা বেলা রুম বয় এসে খবর দিয়ে গিয়েছিল,রাস্তার পাশের ট্রান্সমিটারে বাজ পড়ে আগুন ধরে গেছে।কখন আবার কারেন্ট আসবে তার ঠিক নেই! মরতে,কেন যে এই সস্তার হোটেলে উঠতে গেলাম! মনে মনে নিজেকে গালাগালি করলো নরেন।অবশ্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী,এই হোটেল তাদের পক্ষে আদর্শ। টাকা-পয়সা যে ছিল না,এটাও ঠিক বলা যায় না। আসলে শিউলির পিছনেই সব খরচ হয়ে গেছে।বালিশের নীচে থেকে হাতড়ে হাতড়ে টর্চ লাইট টা খুঁজে পেল নরেন।সুইচ টা টিপতেই সারা ঘর আলো।তারপর খাট ছেড়ে উঠে দরজার কাছে গিয়ে,দরজা খুলে বাইরে তাকাতেই,একরাশ ঝোড়ো হাওয়া,বৃষ্টিকে সঙ্গে করে এনে মুখে ঝাপটা মারলো নরেনের।ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার বাইরের টানা করিডোরে।মাঝে
মাঝে বিদ্যুৎতের ঝলকানি এসে আলো জ্বালিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।বিদ্যুৎতের চমকানি থেমে গেলেই আবার সেই নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে হোটেল টা।নরেন টর্চ মারলো টানা লম্বা বারান্দায়।কই,কেউ নেই তো! সে টর্চ জ্বালিয়ে সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত গেল।নীচের তলায় নামার সিঁড়ির মুখ থেকে একটা সিঁড়ি ডান দিয়ে ঘুরে উপরের ছাদে উঠেছে।নরেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে নীচের তলায় টর্চের আলো ফেলল।পরিষ্কার দেখা গেল সব।না,নীচের বারান্দায় ও কেউ নেই।
তবে কে দরজা ধাক্কালো?টর্চ টা নিভিয়ে আবার উপরে উঠে এল নরেন।নিজের রুমের দরজার কাছে আসতেই,আৎকে উঠল সে। ঘরের ভেতরে শিউলির অস্পর্ষ্ট গোঁগানোর আওয়াজ পেল।জোর পায়ে ঘরে ঢুকে টর্চ জ্বাললো।শিউলি উঠে বসেছে।হাতের একটা আঙুল উঁচু করে ঘরের ডান কোনের দিকে তাক করে রাখা।মুখ দিয়ে অস্ফুট আওয়াজ বেরুচ্ছে।মুখ দেখে মনে হচ্ছে,কোনো কিছু দেখে সে খুব ভয় পেয়েছে।ছুটে গিয়ে শিউলির পাশে গিয়ে বসল নরেন।বলল-"কি, কি ওখানে?"
কাঁপা কাঁপা গলায় শিউলি বলল,-"ওখানে কে একটা দাঁড়িয়ে ছিল।হাসছিল আমার দিকে চেয়ে।"
-"কে,কে.. কিরকম?" নরেনের গলার স্বর বেড়ে গেল।
শিউলি বলল,-"অস্পর্ষ্ট চেহারা,আবছায়া।কিছু বোঝা যাচ্ছিল না।"
নরেন সারা ঘরে টর্চ মেরে ভালো করে দেখলো।কোথাও কিছু নেই।
-"কই, কিছুই নেই তো!"বলল নরেন।
শিউলি জোর গলায় বলল,-"আমি সত্যি বলছি,বিশ্বাস কর,ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।"
-"ও সব তোমার চোখের ভুল শিউলি।মনের ভ্রম।আমি বাইরে গিয়ে নীচের তলা পর্যন্ত দেখে এসেছি,কেউ কোথাও নেই।"
-"না,তা কি করে হয়।আমি নিজের চোখে দেখেছি।"
-"তোমার মন টা এখন ভালো নেই শিউলি, তাই তুমি শুধু ভুল ভাল জিনিষ কল্পনা করছো।"

নরেনের সাথে তর্কে শিউলি পারে না।তাই সে চুপ করে বসে রইল।টেবিলের উপর থেকে সিগারেটের প্যাকেট টা হাত বাড়িয়ে নিয়ে একটা সিগারেট ধরালো নরেন।ধোঁয়া ছাড়লো।তারপর শিউলির কাঁধের দু'পাশ টা ধরে বললো,-"একটু শান্ত হয়ে ঘুমোও।সব ঠিক হয়ে যাবে।"
চাদর টা টেনে আবার শুয়ে পড়ল শিউলি।বাইরে ঝড়ের দাপট একটু কমেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ এর ঝলকানি আর বৃষ্টির ধারা সেই একই ফর্ম
অব্যাহত রেখেছে।নরেন হাতের ঘড়ির উপর টর্চের আলো ফেলল।রাত দু'টো বেজে গেছে।চোখের ঘুম ভাব টা আর নেই।অনেক আগেই চলে গেছে।এবার হয়তো তাকে সারাটা
রাত জেগে কাটাতে হবে।কপালের উপর হাত টা রেখে শুয়ে পড়ল নরেন।এরকম ঘটনাশিউলি আগেও ঘটিয়েছে।আসলে তার পেটের ভিতরে
বাচ্চা টি মরে যাওয়ার পর থেকেই শিউলি মাঝে মাঝে এরকম করতে শুরু করেছে।মাঝ রাতে কখনো ভয়ে চিৎকার করে ওঠে।বলে,আমার পাশে কে এসে দাঁড়িয়েছে।আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

বিয়ের এক বছরের মধ্যেই পেটে সন্তান এসেছিল শিউলির।প্রথম সন্তান, তাই শিউলি মনে মনে খুব খুশি ছিল।সবাই যেমন থাকে।মনে মনে অনেক কিছু স্বপ্ন বোনাবুনি চলছিল।কি নাম রাখবো বাচ্চার,কি ড্রেস পরাবো,কি খাবে, সারক্ষন কাঁদবে না,হাসবে,.......কার মতো দেখতে হবে,এরকম অনেক কিছু।নরেনের মা বলেছিল আমার দাদুভাই চাই।নরেনের বাবাও তাই। এমন কি নরেন ও শেষ পর্যন্ত বলল,আমার ছেলে দরকার।শিউলি প্রশ্ন করেছিল,-"কেন?মেয়ে হলে কি ক্ষতি?আমার মেয়েই ভাল। মেয়ে বড় হলে,চিরুনি দিয়ে তার চুল আঁচড়ে দেবো,তেল দিয়ে দেবো,লাল ফিতে দিয়ে চুল বেঁধে দেবো...সব সময় আমার কাছে থাকবে।"
-"রাখতো তোমার ন্যাকামোপনা। প্রথম সন্তান ছেলে হওয়াই ভাল।"
-"না,মেয়ে হওয়াই ভালো।"শিউলিও
জেদ ধরেছিল।
নরেন আর কোনো কথা বলেনি।রাগ করে উঠে চলে গিয়েছিল শিউলির পাশ থেকে।এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল।এ বিষয় নিয়ে আর কোনো কথা হয় নি।একদিন রাতে শিউলির বুকে হাত রেখে নরেন বলল,-"এ্যাই,তুমি রাগ করেছো?আসলে আমি সেদিন ওরকম ভাবে বলতে চাইনি!"
শিউলি হেসে বলল,-"ধুর না,আমি রাগ করি নি।"
নরেন মাথাটা আরও বুকের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল,-"এই তো,লক্ষী সোনা বউ আমার।কাছে এসো একটু আদর করে দিই।"
শিউলি আরও কাছে সরে এল।নরেনের কোলের মধ্যে।নরেন বউ কে আদর করতে করতে বলল,-" জানো,আমরা একটা জিনিষ আগে থেকে খুব জানতে ইচ্ছে করছে!"
-"কি?"
-"আমাদের ছেলে না,মেয়ে হবে?"
-"ধুর,আগে থেকে জেনে কি হবে!যখন হবে,তখন দেখতে পাবে।"
-"সে তো পাবো।কিন্তু আমার এখন খুব ইচ্ছে হচ্ছে।চলো না,কাল ডাক্তারের কাছে যাই।"
শিউলির ও যে ইচ্ছে ছিল না,তা নয়।তার ও খুব জানতেইচ্ছে করছিল।নরেনের চুলের ভেতর হাত বুলিয়ে বলল,-আচ্ছা,ঠিক আছে কালকে যাব।"
বউ এর কথা শুনে খুব খুশি হল নরেন। আরও জোরে কাছে টেনে নিল শিউলি কে।
-"আ! কি করছো,লাগবে তো!"শিউলি হাসলো।
-"কিচ্ছু হবে না।" বলল নরেন।
পরদিন সকালে শিউলি কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল নরেন।তার বাবার পরিচিত ডাক্তার। ডাক্তার বাবু সব কিছু দেখে, ইউ.এস.জি (আল্ট্রাসনোগ্রাফি) করালেন।রিপোর্ট হাতে নিয়ে, ভালো করে দেখে তিনি বললেন,-"ফিমেল বেবি।"
শিউলি মনে মনে খুব আনন্দিত হল।নরেনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আমি বলেছিলাম না,আমাদের মেয়ে হবে।"
নরেন হাসলো।ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দিলেন।
বললেন,-"এ গুলো নিয়ম করে খাবে।"
ফার্মেসী থেকে ওষুধ গুলো কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল দু'জন।

পেটের ভেতর বাচ্চা টি কে মারতে বেশি সময় লাগেনি নরেনের।সামন্য কয়েকটা ট্যাবলেটেই কাজ হয়ে গিয়েছিল।সেদিন বাড়ি ফিরে,নরেন তার মাকে কন্যা সন্তানের কথা বলতেই,হায় হায় করে উঠেছিল তার মা।কি হবে এখন! মেয়ে কোন কাজে লাগবে?এখানেও খাবে,আবার পরের বাড়ি যাওয়ার সময় এক গোছা নিয়ে যাবে।এই বাজারে একটা মেয়ে মানুষ করতে কম খরচ লাগে! নরেন বলেছিল,-"তুমি চিন্তা করো না মা।আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি।"
-"কি করবি এখন আর?যা হবার তো হয়ে গেছে?" নরেনের মা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলেছিল।
-"কি আর করবো,বাচ্চা টি কে মেরে ফেলবো।"
-"কি বলছিস তুই?"
-"ঠিকই বলছি।"
-"বৌমা যদি জেনে ফেলে?"
-"কেউ জানতে পারবে না।"
-"দেখিস,আমার যেন কেমন ভয় করছে!"
-"ভয়ের কোনো কারন নেই মা, ডাক্তার, নার্সিংহোম আমার সব ফিট করা হয়ে গেছে।এখন শুধু সময়ের
অপেক্ষা।"

বেশ কিছুদিন ধরে মাথা টা ঝিম ঝিম করছিল শিউলির।ডাক্তারের থেকে ওষুধ নিয়ে এল নরেন। নিজে হাতে আদর করে বৌকে ওষুধ খাইয়ে দিল।সন্দেহর কোনো জায়গা ছিল না শিউলির মনে।কিছুদিন পর থেকে একটু একটু করে বাচ্চার নড়া-চড়া বন্ধ হয়ে গেল পেটের ভেতরে।একদিন মাথা ঘুরে টয়লেটে পড়ে গেল শিউলি।পেটে সামন্য আঘাত পেল।আর নরেনের সাপে বর হল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে,
ডাক্তার আবার আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে বললেন, বাচ্চা মৃত।শিউলি নরেন কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে পড়ল।-"আমি নিজে হাতেই বাচ্চা টাকে শেষ করেছি! আমি খুনি একটা"
নরেন ও কাঁদলো। নাকি কান্না।বউ এর পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিল।এত কিছু কান্ড করতে গিয়ে-ডাক্তার নার্সিংহোম,পেটের ভেতর থেকে মৃত বাচ্চা বের করার জন্য আপারেশন বাবদ নরেনের বেশ কিছু টাকা খসলো।আর তাই আজ এরকম একটা সস্তার হোটেলে এসে উঠতে হয়েছে তাকে।

বাড়িতে থাকতে শিউলি মাঝে মাঝে এরকম ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠত।বলতো,কে যে সবর্দা আমার পাশে পাশে হাঁটছে।সারক্ষন মনমরা হয়ে বসে থাকতো চুপ করে।নরেনের মা বলেছিল,-"বাবু,বৌমা কে নিয়ে বাইরে একটু বেড়িয়েআয়, না।বেচারি সারক্ষন ঘরে বসে থাকে।মন টাও একটু হালকা হবে।"
তাই মায়ের কথা মতো,শিউলি কে নিয়ে দীঘার এই হোটেলে এসে উঠেছে নরেন।কিন্তু ঘোরার ভাগ্য কই হল! যেদিন থেকে হোটেলে উঠেছে,সেদিন থেকে অবিরাম ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে।সকালে একটু বেড়িয়ে আসে।আর বিকেল নামলেই,আকাশে পোড়া ব্যাটারির মতো কালো মেঘ।ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়,যেন বড় বড় দৈত্যরা আকাশ পথে ছুটে আসছে।
কপালের উপর হাত রেখে,এই অবিরত বর্ষনমুখর,নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ময় রাতে এসব কথা গুলো বার বার ভাবছিল নরেন।চোখে ঘুম আসছে না।বেড়াতে এসেও শান্তি নেই! শিউলির দিকে পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করে আবার ঘুমোনোর চেষ্টা করলো নরেন।সবে মাত্র একটু ঝিমুনি এসেছে,ঠিক তখনি আবার দরজা চাপড়ানোর আওয়াজ এল। ওমনি সজাগ হয়ে গেল নরেন। সত্যিই তো!এবার কেউ যেন বার বার দরজা চাপড়াচ্ছে।দ্রুতো টর্চ লাইট জ্বালিয়ে দরজা খুলল নরেন।না,কেউ কোথাও নেই। চারিদিকে টর্চ মেরে ভালো করে দেখলো। ফাঁকা করিডোর।কিন্তু সে যে পরিষ্কার শব্দ টা শুনতে পেল। টর্চের আলোটা নেভাতেই এবার শব্দটা কানে এল।পদ শব্দ।কেউ যেন বারান্দায় হাঁটছে।ধীরে ধীরে।আকাশে বিদ্যুৎ এর চিরিক কাটতেই নরেন দেখতে পেল,কেউ যেন সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে গেল।একটা অস্পর্ষ্ট ছায়া।টর্চ টা জ্বালিয়ে নরেন সেই পদশব্দ অনুসরন করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো।ছাদের দরজা তো রাতে বন্ধ থাকে।কিন্তু এ দরজা খুললো কে?ধীরে ধীরে দরজা দিয়ে ছাদের উপর দাঁড়ালো নরেন।বারে বারে বিদ্যুৎ এর ঝলকানি তে ছাদের উপর স্পর্ষ্ট
সব দেখা যাচ্ছে।বৃষ্টি পড়ছে অবিরাম ধারায়।কিন্তু নরেনের সে সব খেয়াল নেই। এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে জিনিষ টার দিকে। একটা ছোট্টো বাচ্চা যেন গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে ছাদের ঠিক মাঝখানে।বাচ্চা টা এত ছোটো যে বোঝা যাচ্ছে না।যেন একটা বড় মাংস পিন্ডের দলা।হঠাৎ ই একটু একটু করে সেই মাংসপিন্ড শিশুর রুপ নিল।হামাগুড়ি দিতে দিতে এগিয়ে
আসতে লাগলো নরেনের দিকে।সারা শরীর হিম হয়ে গেল নরেনের।মাথা টলতে লাগলো। গায়ের লোম গুলো সজারুর কাঁটার মত খাড়া হয়ে উঠেছে।পিছন ফিরে পালাতে গিয়েও পালাতে পারলো না।অদৃশ্য শেকল দিয়ে কেউ যেন তার পা দু'টো বেঁধে দিয়েছে। শিউলি বলে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরুলো না।গলা শুকিয়ে কাঠ।শিশুটি এখন দাঁড়িয়ে উঠেছে। বিদ্যুতের সেই ঝাঁঝালো আলোয় নরেন পরিষ্কার দেখতে পেল,একটা ছোটো শিশু কন্যা।বছর চারেকের মতো বয়স।
নতুন কথা বলতে শেখা বাচ্চাদের মতো করে,শিশু টি বলল, -"বাবা!"
একটা ঢোক গিলল নরেন।কি বীভৎস সে চাহনি মেয়েটির!
-"আমাকে মারলে কেন তুমি?"
কিছু বলতে পারলো না নরেন।হাত-পা ঠক ঠক করে কাঁপছে।
-"তুমি একটা খুনি।"

আকাশে মেঘের হুঙ্কার আগের বেড়ে গেছে।সাথে বিদ্যুৎ এর ঝলকানি।ছোট্টো মেয়েটি ধীরে ধীরে হেঁটে গেল ছাদের কার্নিশের দিকে।নরেন কে অদৃশ্য কেউ যেন টানছে।নিজের উপর আর কোন নিয়ন্ত্রন নেই। সে এবার টলতে টলতে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগলো বাচ্চা মেয়েটির পিছন পিছন।বাচ্চা মেয়েটি এখন কার্নিশ বেয়ে তার উপর উঠে দাঁড়ালো।তার পর ঝাঁপ মারলো নীচে।নরেন কে ও আজানা নেশায় পেয়ে বসল। নেশাগ্রস্তের উঠে পড়লো কার্নিশের উপর।তারপর বাচ্চা মেয়েটিকে অনুসরন করে ঝাঁপ দিল নীচে।

.........হোটেলের সবার ঘুম ভেঙে গেছে। নরেনের মৃতদেহ কে ঘিরে হোটেলের সমস্ত লোকজন জোড়ো হয়ে আছে।পুলিশ এল সাত টার দিকে।তারপর নরেনের মৃত লাশ টি কে নিয়ে থানায় চলে গেল।



স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

Thursday, 21 September 2017

একটি ছোটগল্প " ফুচকা "




আজ গল্প শুরুর আগেই একটি ভালো লাগার মুহুর্ত শেয়ার করতে চাই।প্রথমেই, আমার 'গল্পপড়ুয়া' পাঠক দের জন্যে  অনেক অনেক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও প্রণাম।আজ আপনাদের ভালোবাসায়, আমার প্রথম বই " যদি তোমার প্রেমের গল্প এমন হয় " প্রকাশিত হল।
আঠেরো টি মিষ্টি প্রেমের ছোটগল্প  বই টি তে সংকলিত করা হয়েছে।যারা আমার ছোটগল্প পড়তে ভালোবাসেন,প্রেমের গল্প পড়তে ভালোবাসেন, সর্বোপরি বাংলা সাহিত্য ভালো বাসেন-বইটি তাদের মনে একটুখানি ভালোলাগা, আনন্দ জাগাতে পারলে তবেই নিজেকে সার্থক মনে করব।সবাই কে অনুরোধ রইল বইটি পড়ার এবং এভাবেই পাশে থাকবেন।
আর আমার, ওপার বাংলার (বাংলাদেশ) 'গল্পপড়ুয়া'  বন্ধুদের কাছে দু:খিত, কারন এই মুহুর্তে বই টি তাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারলাম না। তবে যদি তারা বইটি পড়তে ইচ্ছুক হয়, অথবা যদি সৌভাগ্য হয় তবে বইটি ঢাকা বইমেলাতে পাঠানোর চেষ্টা করবো।

বইটির  মূল্য : ১২০/- টাকা মাত্র।বইটি পাওয়া  যাচ্ছে কলেজ স্ট্রিট, অন্নপূর্ণা প্রকাশনী, ৩৬ নং কলেজ রো, কলকাতা।

সবাই কে দূর্গাপূজার আগাম অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।ভালো থাকবেন সবাই।
                                                                                                           
                                                                                                                       -স্বদেশ কুমার গায়েন।




ফুচকা


(১)

হেড মাস্টারের রুম থেকে বেরিয়ে,স্কুলের গেটের কাছে আসতেই থমকে দাঁড়াল সৌম্যদীপ।সাব-ইনেস্পেকটর সৌম্যদীপ রয়। লোকাল থানার নতুন সাব- ইনেস্পেকটর।ছ'ফুটের উপরে লম্বা, ফর্সা চেহারা,চওড়া কাঁধ,বেশ স্বাস্থ্যবান।মাথায় ছোটো করে করে ছাঁটা কালো চুল।গায়ে খাঁকি রঙের ড্রেস।চোখে কালো সানগ্লাস।বয়েস বত্রিশ কি,তেত্রিশ হবে।মুখমন্ডল তেমনটাই বলে। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলল সৌম্যদীপ।ভুরু কুঁচকে,চোখ দুটো সরু করে তাকালো।ব্যাপার টা বেশ আশ্চর্যের। অবাক করার মতো বটে।স্কুলে এখন টিফিন আওয়ার।শহরের একটা নামি স্কুল এটা। দু'ঘন্টার বেশি হয়ে গেছে, স্কুলে এসেছে সৌমদীপ। সাথে আরও দু'জন পুলিশ আছে। আসলে স্কুলের অডিট সংক্রান্ত একটা ছোটো খাটো সমস্যার ইনেস্পেকসনের দায়িত্ব এসে পড়েছে তার উপর।সাধরনত এসব দায়িত্ব তার থাকে না।কিন্তু ভিজিলেন্স অফিসারের সাথে হেড মাস্টারের ছোটো মনোমালিন্যের জন্য,কেস টা এসে পড়ল তার ঘাড়ে।যদিও আরও একটা ছোটো কাজ আছে।আশে পাশের বাড়ি গুলোর সাথে,স্কুলের সীমানা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ঝামেলা।আর সেই কারনেই আজ এই স্কুলে আসা।আজকাল স্কুলে এরকম ইনেস্পেকসনের কাজে এলে কাজের থেকে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনটা একটু বেশি পরিমানে হয়। ইনেস্পেকসনে আসার আগের দিনই সেই স্কুল কে জানিয়ে দেওয়া।অনেকটা চুরির আগে চোর কে সাবধান করে দেওয়ার মতো।সেই মতো স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে সবরকম ব্যবস্থা করে রাখে।শুধু স্কুল বলে কেন,দেশের সমস্ত সরকারি ডিপার্টমেন্টে এই একই সিস্টেম।সকাল সাড়ে এগারোটায় সৌমদীপ স্কুলে ঢুকতেই,হেডমাস্টার আর ক্লার্ক হাসি মুখে ছুটে এসে পড়ল।-" নমষ্কার স্যার! নমষ্কার স্যার!....আসুন স্যার,........বসুন স্যার!"
সৌমদীপের মনে হয়েছিল,এই মনে হয় দু'জন তার পায়ে এসে পড়ে।তারপর সোজা হেডমাস্টারের রুম।দেড় ঘন্টার আলাপ আলোচনা।তারপর  খাওয়া-দাওয়া।চা,বিস্কুট থেকে শুরু,তারপর বিরিয়ানি,শেষে কচি ডাবের জল দিয়ে ইতি।সৌমদীপ কিছুই ছাড়েনি।খাবার গুলোও ছাড়েনি,হেড মাস্টারকে ও ছাড়েনি। হয়তো আইনি ভাবে কিছু করবে না।ভয় ও দেখায় নি।কিন্তু হাসি মুখে এমন কথার ছুরি চালিয়েছে যে,ওনার সাত পুরুষের কেউ আর হেড মাস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখবে না।তারপর হেড মাস্টারের রুম থেকে বিদায় নিয়ে স্কুলের গেটের কাছে আসতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
একজন পুলিশ বলল,-"স্যার এখানে গাড়ি ডাকি?"
চশমা টা হাতের আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে সৌম্যদীপ বলল,-" ফুচকা খাবে,সামন্ত?"
-"ফুচকা!"
অবাক হয়ে সৌম্যদীপের দিকে তাকাল সুবীর কুমার সামন্ত।বলল,-"একটু আগেই তো এত কিছু খেয়ে বেরোলেন।এখন আবার ফুচকা!"
সৌম্যদীপ হাসলো।বলল,-"ফুচকার প্রতি লোভ আমার স্কুল লাইফ থেকেই।আজ আবার সেটা যেন একটু নড়ে চড়ে উঠল।চলো যাই।"
তারপর আরেক জন পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল,-"কি,বিশ্বাস, ফুচকা চলে তো?"
প্রসান্ত বিশ্বাস মাথা থেকে টুপি টা খুলে হেসে বলল,-"একসময় খুব চলতো।কিন্তু এখন আর তেমন খাওয়া হয় না।তবে বউ আর মেয়ে বাইরে বেরোলেই ফুচকা চাই ই-চাই।"
তিন জনেই হেসে উঠল।হা হা হা শব্দে।

(২)

স্কুলের গেট থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে কয়েক পা হাঁটলেই,পাঁচিলের দেওয়াল ঘেঁষে ফুচকার স্টল। বেশ বড় স্টল।তিনজন ছেলে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে।তবুও দিয়ে উঠতে পাচ্ছে না।টিফিন আওয়ার,তাই এত ভিড়।সৌম্যদীপ দেখে বুঝতে পারল স্কুলের সব ছেলে-মেয়েই এখান থেকে ফুচকা খায়।সৌমদীপ আর দু'জন পুলিশ এগিয়ে গেল স্টলটির দিকে।অনেক ছাত্রছাত্রী ঘিরে আছে স্টলটিকে।বড়,ছোটো মিলিয়ে সব ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা আছে। সৌম্যদীপ রা সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই,স্টলের একটা লম্বা করে, হানি সিং স্টাইলে কাটা চুলের ছেলে বলল,-"আসুন স্যার! চঞ্চলদার স্পেশাল ফুচকা।"
ঢং ঢং ঢং করে স্কুলের ঘন্টা পড়ল।তার মানে টিফিন আওয়ার শেষ।একটু একটু করে ভিড় কমতে শুরু করবে এবার।প্রশান্ত,সৌম্যদীপের দিকে তাকিয়ে বলল,-"স্যার,সামনের ওই ফাঁকা স্টল টি তে চলুন না।এখানে যা ভিড়!"
সামনে একটা ফুচকার স্টল নয়।দু'টো ফুচকার স্টল।কিন্তু সেখানে কেউ নেই।এক,দু'জন আছে। কিন্তু তারা খাচ্ছে কম,গল্প করছে বেশি। প্রশান্তের কথায় সৌমদীপ হেসে বলল,-" আরে! এত ব্যস্ত কিসের?এখানকার ফুচকা নিশ্চয় খুব ভাল।নইলে এত ভিড় হয় নাকি?"
পাশ থেকে একটা,ক্লাস এইট কি, নাইনের মেয়ে হেসে বলল,-"পুলিশ কাকু,এই স্টলের ফুচকা সব থেকে বেস্ট।একবার খেলে বুঝতে পারবেন।"
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সৌম্যদীপ হাসলো।ভিড় এখন অনেকটাই কমেছে।সৌম্যদীপরা একদম স্টলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।একটা বেঁটে ফর্সা মতো ছেলে তিনজনের হাতে তিনটে পাত্র দিল। না,আলাদা তো তেমন কিছুই নেই।ফুচকা যেমনই লাগে ঠিক তেমনই লাগলো সৌম্যদীপের।আরও কয়েকটা ফুচকা খাওয়ার পর,হানি সিং চুলের ছেলেটিকে সৌম্যদীপ জিজ্ঞেস করলো,-"তোমার এই ম্যাজিক টা কি?"
ছেলেটি ফুচকা দিতে দিতে বলল,-"কি ম্যাজিক স্যার!"
-"এই যে,পাশে দু'টো ফুচকার স্টল আছে।কিন্তু স্কুলের সব ছেলে মেয়ে গুলো তোমার স্টলের ফুচকা খায়।"
ছেলেটি ফুচকার মধ্যে আলু দিতে দিতে বলল,-"চঞ্চল দার ফুচকা,এ এলাকায় পরিচিত নাম। বিয়ে বাড়ি,থেকে যেকোনো অনুষ্টান বলুন, চঞ্চলদার ফুচকা পাবেন।আর আমি স্কুলের ছেলে-মেয়েদের এক দু'টো বেশিও দিই ভালোবেসে,তাই ওরা আমার এখানেই আসে।"
-"ওহ! তো,তুমিই কি সেই চঞ্চল দা?"
ছেলেটি হেসে বলল,-"হ্যাঁ,স্যার।আমার নাম চঞ্চল দাস।"
দু'জনের কথার মাঝে,প্রশান্ত বিশ্বাস বলল,-" এই একটু টকজল দাও তো দেখি বেশী করে।"
-"স্যার, আসলে টকজল কমে এসেছে, আর এখনও অনেক বাকি, তাই একটু অল্প করে দিচ্ছি।কিছু মনে করবেন না স্যার।" বলল ছেলেটি।

দশটা করে ফুচকা খাওয়া হয়ে গেছে তিন জনের।আরও একটা নিয়ে সৌম্যদীপ বলল,-"এত ফুচকা কখন তৈরী করো?"
-"ভোর থাকতেই কাজে লেগে যাই স্যার।আমার বাড়িতেই তৈরী করি। তারপর সাড়ে ন'টা বাজতেই এখানে চলে আসি।"
-"বাহ! তাহলে তো আপনার ফুচকা বানানো দেখতে হয়।পরিষ্কার-পরিছন্ন করে বানাও তো? তবে কোনো অনুষ্টানে আমিও অর্ডার করতে পারি!"
-"সে বিষয়ে একদম ভাববেন না স্যার।আপনি নিজে গিয়েও দেখে আসতে পারেন।"
সৌম্যদীপ হেসে বলল,-"আচ্ছা,এবার ফুচকা বন্ধ করো।পনেরো টা হয়ে গেলে।আর তোমার ফোন নাম্বার টা দাও।আমি ফোন করে নেব।
ছেলেটির নাম্বার নিয়ে ফোনে সেভ করে নিল সৌম্যদীপ ।তারপর টাকা মিটিয়ে,রাস্তার একপাশে রাখা জিপ গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

(৩)

-"অনেক দিন পর আপনার ইচ্ছেতে ফুচকা খাওয়া গেল।"সামন্ত বলল।
জিপ গাড়ি পিচ রাস্তা ধরে থানার দিকে চলেছে।এবড়ো খেবড়ো রাস্তা।ঢিমে তালে চলছে গাড়িটা।সৌম্যদীপ একটু চিন্তা গ্রস্থ হয়ে বলল,-" একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছো সামন্ত ,স্কুলের ছেলে মেয়ে গুলো কিন্তু আর কোথাও যায় না।শুধু ওই স্টল থেকে ফুচকা খায়।
বেশ ইন্টারেস্টিং!"
ইস্টারেস্টিং এর কোনো কিছু খুঁজে পেল অন্য দু'জন।এপাশ থেকে বিশ্বাস বলল,-"পরিচিতি স্যার!কেউ একবার পরিচিতি পেয়ে গেলেই এমন হয়।আর দু'একটা ফুচকা ফাউ দিলে তো বাচ্চারা সেখানে যাবেই।"
-"তাই?"
-"তা,নয় তো কি!অনেকদিন থেকে ফুচকা নিয়ে বসছে তো,নতুন কেউ এলে সেখানে চান্স পাওয়াই মুসকিল।"
সৌম্যদীপ হেসে বলল,-"তা ঠিকই বলেছো, বিশ্বাস।"

থানার সামনে এসে থামলো জিপ গাড়ি।গাড়ি থেকে নামলো তিনজন।তারপর থানার ভেতর ঢুকে গেল।

পরদিন আবার গাড়ি নিয়ে বের হল সৌমদীপ।নতুন সাব-ইনেস্পেকটর হওয়ার এই একটা জ্বালা।প্রতিদিন একবার এ থানা,ও থানা, সে থানা করতে হয়।এলাকা ঘুরে দেখতে হয়। যদিও ঘুরতে বেশ ভালোই লাগে সৌম্যদীপের।আজকে তার সাথে শুধু সামন্ত আছে।স্কুলের সামনে দিয়ে গাড়ি যেতেই, গাড়িটি কে থামাতে বলল সৌম্যদীপ।ড্রাইভার রাস্তার একপাশে দাঁড় করালো গাড়িটা।
সামন্ত ,সামনে ঝুঁকে গিয়ে বলল,-"কি হল,স্যার?"
সৌম্যদীপ হাসল।বলল,-"আজ ফুচকা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না?আমার তো ইচ্ছে করছে।"
-"ইচ্ছে তো করছে।কিন্তু, কাজ টা!"
সৌমদীপ জিপ থেকে নেমে বলল,-"কোনো কিন্তু নয়! আগে ফুচকা,পরে কাজ।"

সুবীর কুমার সামন্ত ও গাড়ি থেকে নেমে পড়ল সৌম্যদীপের পেছনে পেছনে। তারপরসৌম্যদীপ কে উদ্দেশ্য করে বলল,-"আপনি,ছাত্র জীবনে যে ফুচকা পাগল ছিলেন, সেটা এখন দেখেই বোঝা যাচ্ছে।"
কিছু বলল না সৌম্যদীপ।হাসল শুধু।
দু'জন ফুচকা স্টলটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েকটা একদম বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে ফুচকা খাচ্ছে। সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়ে এরা।স্টলের ছেলে গুলো চিনতে পারলো দু'জন কে দেখে।
সৌম্যদীপ নিজে হাতেই একটা পাত্র তুলে নিয়ে হানিসিং চুলের ছেলেটির দিকে চেয়ে বলল,-"তোমার ফুচকার জবাব নেই ভাই। দেখো,আবার টেনে আনলো আমাদের।"
ছেলেটি একটি ফুচকা ফাটিয়ে তার মধ্যে আলু দিতে দিতে বলল,-"বললাম না,স্যার চঞ্চলদার ফুচকা সেরা।এই জন্যেই তোসবাই আমার এখানে খায়।কোনো অনুষ্টানে দরকার পড়লে, ফোন করবেন।"

আজ বেশী খেল না।সকালে খেয়েই ডিউটি তে বেরিয়েছিল সৌম্যদীপ। কিন্তু ফুচকা দেখে
আর লোভ সামলাতে পারলো না।মনে হচ্ছে যেন,ফুচকা তাকে টানছিল।পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে সৌম্যদীপ ছেলেটিকে হেসে জিজ্ঞেস করলো,-"কত দিন এই স্কুলের সামনে একা রাজ করছো?"
ছেলেটি ভেবে বলল,-"তা,স্যার প্রায় বছর তিনেক হয়ে গেল।"
-"ওহ।"
সৌম্যদীপ টাকা বের করে ছেলেটির হাতে দিতে গেল।ছেলেটি নিতে চাইল না।-"না,স্যার আজ থাক না।অন্যদিন দেবেন।"
অনেকটা জোর করেই টাকা গুলো ধরিয়ে দিল সৌম্যদীপ ।আজকাল পুলিশের ড্রেসে বাজারে কিছু কিনতে গেলে অনেক দোকানি দাম নিতে চায় না।কিন্তু সৌম্যদীপ সেটা পছন্দ করে না। ছেলেটিকে টাকা মিটিয়ে আবার জিপ গাড়িতে চেপে বসল দু'জন।ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল।

(৪)

বেশ কয়েকদিন পর।নিজের রুমে চোখ বন্ধ করে বসে আছে সৌম্যদীপ।নিঝুম হয়ে ভাবছে।শেষ পর্যন্ত তাকেও টানছে! ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে তার কাছে।বেশ ভাবাচ্ছে ও।
কি হতে পারে?কি এমন ম্যাজিক?
অনেক রাত পর্যন্ত ভাবলো সৌম্যদীপ।অনেক রকম সন্দেহ,উত্তর,মনের কাছে পেয়েছে।বেশির
ভাগ পছন্দ হয়নি তার।কিন্তু একটা সন্দেহ তার বেশ মনে ধরেছে।আর সন্দেহটা যদি ঠিক হয়, তবে তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার।হতেই পারে এরকম। না,হওয়ার তো কিছু নেই।যদি সত্যিই এরকম হয়! তাহলে তো সর্বনাস! না,মনে সন্দেহ রাখা একদম ঠিক না।সারারাত এপাশ-ওপাশ করে ভোরবেলা সুবীর কুমার সামন্ত কে ফোন লাগালো সৌম্যদীপ।-"হ্যালো! স্যার বলুন।"ফোনের ওপার থেকে বললো সামন্ত।
সৌম্যদীপ বলল,-"চঞ্চল দাস! ফুচকা!মনে আছে তো?তাড়াতাড়ি ওর বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করো।"
-"কেন! কি হল!"
-"পরে বলছি।তুমি ওর বাড়ির সামনে গিয়ে আমাকে ফোন করবে।"
-"আপনার কাছে তো,ওর ফোন নাম্বার আছে।ফোন করে জেনে নিতে পারেন।"
-"না,ফোন করলে হবে না।তুমি তাড়াতাড়ি কাজ টা করো।"
সকাল পৌনে সাত টার সময় ফোন এল সৌম্যদীপের কাছে।সামন্তর ফোন।ফোনেই ঠিকানা বলে দিল সামন্ত।প্যান্ট টা পরে, জামাটা মাথায় গলালো সৌম্যদীপ।তারপর ড্রাইভার কে ডেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।থানা থেকে আরও দু'জন পুলিশ কে তুলে নিল।পনেরো মিনিট পর নির্দিষ্ট ঠিকানায় জিপ গিয়ে থামলো।সামন্ত দাঁড়িয়ে আছে।
সৌম্যদীপ জিপ থেকে নেমে বলল,-"কোন বাড়ি টা?"
ডান হাত দিয়ে রাস্তার ওপারের বাড়িটা দেখিয়ে দিল সামন্ত।পুলিশ দু'জন কে বাড়ির গেটের কাছে দাঁড়াতে বলল সৌমদীপ।তারপর সামন্ত কে উদ্দেশ্য করে বলল,-"চলো,আমার সাথে।"
সৌমদীপের পিছন পিছন ছুটলো সামন্ত।
ঘরটা ছোটো নয়।মোটামুটি বড়।সেই ঘরে ঢুকে ছেলেটি কে চিনতে পারল সৌম্যদীপ। আরও কয়েকজন আছে।সম্ভবত এরা বাড়ির লোক।
ফুচকা তৈরী করছে সবাই।এত সকালে পুলিশ কে দেখে থতমত খেয়ে উঠে পড়ল চঞ্চল।বলল,-"স্যার!আপনি এখন!ফোন করে আসবেন বলেছিলেন.......!"
সৌম্যদীপ হেসে বলল,-"না,তেমন কিছু নয়।এ পথেই যাচ্ছিলাম, শুনলাম এটাই তোমার বাড়ি।তাই ভাবলাম একটু দেখা করেই যাই।"

চঞ্চল হাসার চেষ্টা করল।কিন্তু সে হাসি ভয় পেয়ে
হাসির মতো দেখাল।সারা ঘরটাতে চোখ ঘোরাল সৌম্যদীপ।ঘরের এক কোনে শুকনো ডাল-পালা,শুকনো কাঠের নীচে একটা প্যাকেট দেখতে পেল।সেই দিকে এগিয়ে গেল সৌম্যদীপ।চঞ্চল ছুটে গেল।হেসে বলল-"স্যার ও দিকে,কিছু নেই।ডাল পালা।"
সামন্ত কে ডেকে সৌমদীপ প্যাকেট টা দেখিয়ে বের করার নির্দেশ দিল।শুকনো ডাল-পালা সরালো সামন্ত।একটা নয়,চার-পাঁটপ্যাকেট।সব গুলোই টেনে বের করলো সে।
-"কি আছে,ওর ভেতর বের করো?"সৌম্যদীপের নির্দেশ।
চঞ্চল ভয়ার্ত সুরে বলল,-"কিছু নেই স্যার। ময়দা....।"
কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা প্যাকেট খুলে ফেলল সামন্ত।ভেতরে আরও ছোটো ছোটো সাদা প্যাকেট। তার মধ্যে থেকে একটা তুলে নিয়ে সৌমদীপের হাতে দিল সামন্ত।প্যাকেট টা ভালো করে দেখলো সে। ভেতরে সাদা সাদা গুড়ো গুড়ো কি আছে।সেটা খুলে কিছুটা হাতের
উপর নিল কিছুটা।তারপর হাতটা নাকের কাছে আনলো।যা ভেবেছিল ঠিক তাই।
"হেরোইন!"
চঞ্চলের দিকে তাকিয়ে তার জামার কলার টা ধরে সৌমদীপ বলল,-"তাহলে তোর ফুচকার জনপ্রিয়তার রহস্য এটাই।হেরোইন মিশিয়ে ফুচকা তৈরী! বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে গুলো
কে এই ভাবে শেষ করছিস?"
এক ধাক্কায় জামার কলার ছাড়িয়ে নিল চঞ্চল। পালাবার চেষ্টা করেও পালাতে পারলো না।বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ধরে ফেলল তাকে।সৌম্যদীপ কড়া সুরে নির্দেশ দিল,-"সব কটাকে ধরে থানায় নিয়ে চল।আর প্যাকেট গুলোকেও গাড়িতে তোলো।"
গাড়িতে যেতে যেতে সৌম্যদীপ সামন্তকে বলল,-"ফুচকা ম্যাজিক টা দেখলে! কেন ওই স্কুলের বাচ্চা গুলো প্রতিদিন ওই একই স্টলের ফুচকা খায়!দিন দিন ওরা নেশা গ্রস্থ হয়ে পড়েছে।"

সত্যিই!ভাবা যায় না।আমি তো বাচ্চা গুলোর কথা ভাবছি। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল সামন্ত।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

Friday, 15 September 2017

একটি প্রেমের গল্প " ভালোবাসা "




(১)

–"এইডস!"
সবেমাত্র কফিকাপে চুমুক লাগিয়েছি।গলা দিয়ে আর নীচে নামল না।আল–টাগরায় বেধে গেল।একরকম বিষম খেতে খেতে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিলাম। সত্যিই তো!বিষম কেন, আমার চেয়ার থেকে উলটে ডিগবাজি খেয়ে নীচে পড়ে যাওয়াই উচিত ছিল।
–"হ্যাঁ, এইডস! তোর ব্লাডটেস্ট করতে হবে।" কালো কালো চোখের উপর থেকে এক টুকরো সোনালি চুল সরিয়ে আমার দিকে তাকালো সৃজিতা।

হালকা সাদা টিউব লাইটের আলো সৃজিতার ঘরে।এই মুহুর্তে আমি সৃজিতার বেডরুমে একটা চেয়ারের উপর বসে আছি।আমাদের সম্পর্কটা টা দু'জনের বাড়ির সবাই জানে। এবং বিয়েও এক প্রকার ঠিক ও হচ্ছে।তাই যখন মাঝে মাঝে এদিকে কোন কাজে আসি, তখন সৃজিতার বাড়ি থেকে ঘুরে যাই।কিন্তু আজ তার কথায়, আমার বিয়ের আনন্দ টা দপ করে ফিউজ কাটা বাল্বের মত নিভে গেল।সৃজিতার বেডের পায়ের দিকে দেওয়ালে একটা বড় করে বাচ্চা শিশুর ছবি লাগানো।কফি খেতে খেতে সেদিকে তাকিয়ে হাসছিলাম।কিন্তু আর হাসব কোথায়?সৃজিতার কথা শুনে,আমার কান্না পেয়ে গেল।
–" এইডস! ব্লাডটেস্ট! তুই আমাকে সন্দেহ করিস, সৃজিতা?"
–"আজকাল কার ছেলেদের আমার একদম বিশ্বাস হয় না,বুঝলি! কোথায় কি সব ঘোটলা করে আছে কে জানে। আর শুধু ব্লাডটেস্ট নয়, কয়েকটা মেডিকেল চেক আপ করতে হবে তোর।তুই আমার ভবিষ্যৎ এর লাইফ পার্টনার হবি,–সব কিছু তো জানা দরকার।"সৃজিতা চাপাস্বরে একটা ঝড় বইয়ে দিল আমার কানের কাছে।
–"বিয়ের করতে গিয়ে মেডিকেল পরীক্ষা দিতে হবে!"
একবার রেলে চাকরী পেয়েছিলাম,সেসময় মেডিকেল পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।ডাক্তারের সামনে মা-ইজ্জত সব শেষ।কিন্তু এটা কি রকম!এ তো 'রামের অগ্নি পরীক্ষা!"
কফি আর মুখে ঢালতে ইচ্ছে হল না।মনে হল কাপ সমেত মাথায়ঢেলে বসে থাকি।এক মিনিট ভাবতে থাকলাম,–এ মেয়ে আমেরিকা, না, চায়না কোন দেশের আবিষ্কার এটা?আমাদের
দেশে তো এ জিনিষ দেখিনি।
–" কিরে! চুপ করে কি ভাবছিস?মেডিকেল চেক আপ করাতে ভয় পাচ্ছিস?" আমার অসহায়,নির্বাক মুর্তি দেখে সৃজিতা হসে বলল।
এটা " ইজ্জত কা সাওয়াল!"আর সহ্য করতে পারলাম না।আমি তো জানি,–আজ পর্যন্ত আমি কোনো মেয়ে কে ইচ্ছেকৃত স্পর্শ করেও দেখিনি। তবে ভয় কি! ভয় এইডস নয়,–যদি মেডিকেল পরীক্ষায় ফেল করি! সৃজিতা কে ছেড়ে কোনো দিন একা একা থাকতে পারবো না।
কফি কাপ টা শক্ত করে চেপে বললাম–" ভয় পাব কেন?তুই যেটা বলবি সেটাই হবে।"
সৃজিতা হাসল।তারপর উঠে আয়নার সামনে গিয়ে কয়েক ঘুরে ফিরে চুল গুলো এলোমেলো আমার দিকে তাকিয়ে বলল,–" তাহলে পরশু,ঠিক সময়ে চলে আসবি হসপিটলে।ফোন যেন না করতে হয়।"
আমি বোকার মতো এক মুহুর্ত বসে রইলাম।তারপর বললাম,-" ওকে,মেরি জান। আজ তবে উঠি।"

আজ কিছুক্ষন সৃজিতার মায়ের সাথে কথা বলে, তাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম আমি।


(২)

মাস এগারো আগে সৃজিতার সঙ্গে পরিচয় ফেসবুকে।তারপর আলাপ, বন্ধুত্ব,ভাললাগা থেকে ধীরে ধীরে যেটা হয় আর কি! আপনারা বুঝতে পেরেছেন,তাই আর বললাম না। কলকাতার একটা বেসরকারি হসপিটলের নার্স সৃজিতা।দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলার একটা শহরে তার বাড়ি।শহুরে স্মার্ট মেয়ে,ভাসা ভাসা চোখ,মিষ্টি হাসি, কথা–বার্তায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ স্পর্ষ্ট।সারক্ষন ফর্সা শরীর টাতে একটা  চার্মিং ভাব।
আমার বাড়িটিও দক্ষিন ২৪ পরগনার অন্যএকটা শহরে।শহর দুটি প্রায় পাশাপাশি। একটা ছোটো খাটো সরকারি চাকরী করি আমি, তাই শুধু প্রতি রবিবার আমাদের দেখা হয়।মাস দ'শেক সেরকমই হচ্ছে।আর দেখা হতে হতে,কথা বলতে বলতে এমন হয়ে গেছে যে,এখন মনে হয়, এ মেয়ের সাথে সারাজীবন কথা না বলে থাকা যায় না।তাই সম্পর্কটা একদম বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে চলে গেছি।সৃজিতার মায়ের আমাকে দেখে খুব পছন্দ হয়।আর মেয়ের মায়ের ছেলে পছন্দ হলে, জানেন তো কি হয়! আমার ও তাই হল।এতদিন চুরি করে দেখা করতে হত, এখন আর সেটা নেই।বাড়িতে ঢোকার পাসপোর্ট পাক্কা।

সৃজিতার সাথে প্রথম দেখা করার দিন টা মনে পরলে আমার বুক টা এখনো ধক করে ওঠে।আমার সারা মুখে ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি,গোঁফ দেখে বলেছিল,–" এক চড় মারব জানিস।সব সময় ফ্রেশ হয়ে থাকবি।"
ভয়ে আমার মুখটা শুকিয়ে গিয়েছিল। কিছু বলার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু মুখ দিয়ে আর বের
হয়নি।ঢোক গিলে খেয়ে ফেলেছিলাম।তারপর থেকে সপ্তাহে দুবার করে সেভিং করতে শুরু করে দিলাম।আর আজ একেবারে ব্লাডটেস্টে,মেডিকেল চেক আপ পর্যন্ত চলে গেল! কি ডেঞ্জারাস মেয়ে রে !
এই জন্যেই ডাক্তারি পড়া,বা ডাক্তারি করা মেয়েদের সাথে প্রেম করতে নেই- এরা কোনোকিছু করার আগে সব কিছু চেক আপ করে নেয়।

(৩)

ঘড়িতে সকাল দশটা।সৃজিতা যে হসপিটলে চাকরী করে সেখানে বসে আছি।ও ভেতরে একটা কাজে ব্যাস্ত মনে হয়। ফোন করলেও তুলছে না।একজন নার্স কে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম,–" দিদি,সৃজিতা ম্যাডাম কি খুব ব্যস্ত আছেন?"
উনি হাতের কাগজ গুলো একের পর এক উলটাতে উলটাতে বললেন,–"হ্যাঁ।দশ মিনিট পর আসবেন।একটু অপেক্ষা করুন।"তারপর হন হন করে নার্স টি অন্যদিকে চলে গেল।

হসপিটলের মধ্যে বসে থাকতে আমার একদম মন টেকে না।খুব ভয়করে।কেমন একটা অস্বস্তি হয়। তাই যতটা সম্ভব পারা যায় হসপিটল থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি।আজ বার বার মনে হতে লাগল,–জীবনে প্রথমবার কোনো পরীক্ষায় ফেল করতে চলেছি।
মিনিট বারো পর সৃজিতা কে দেখলাম।একদম চিনতে পারিনি।আসলে নার্সদের ড্রেসে আগে কখনো ওকে কখনো সামনে থেকে দেখিনি তো তাই।হাতে সাদা গজ কাপড়, ইনজেকসানের সিরিঞ্জ,আর কিছু ওষুধ। চোখের পলক না ফেলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।–এ মেয়ে নার্স হওয়ার জন্যই এ পৃথিবীতে জন্মেছে।
আমার চোখের সামনে হাত নেড়ে হেসে বলল,–"ওই,ওভাবে কি দেখছিস?"
ফিল্মি স্টাইলে বললাম,–"তোকে।"
–"আর দেখতে হবে না। এবার চল
আমার সাথে।"
আমাকে নিয়ে একটা ডাক্তারের ঘরে ঢুকলো সৃজিতা।
–"আরে এসো এসো।"ডাক্তার বাবু বললেন।যেন আগে থেকে সব ঠিক ঠাক হয়েই ছিল।
চেয়ারে বসে ডাক্তারের কেবিন টা ভাল করে দেখলাম।মনে হচ্ছে মরন কূপে বসে আছি।সৃজিতা,ডাক্তারের সাথে আলাদা করে চাপাস্বরে কথা বলতে লাগল।কিছু কানে এল না।
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করে দিয়েছে অনেক আগে থেকেই।কথা–বার্তা শেষ করে সৃজিতা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাসল।বলল,–" উনি তোর চেক আপ করবেন।
বেস্ট অফ লাক।"তারপর দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল।

প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে ডাক্তার কি সব করল আমি তার 'অ, আ..ক,খ' বুঝতে পারলাম না।চল্লিশ মিনিট পর,ডাক্তারের ঘর থেকে বেরিয়ে একটা বড় করে শ্বাস নিলাম।যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।অনেকক্ষন বড় পাথরের নীচে চাপা থাকার পর মুক্তি পেলে যেমন মনে হয় ঠিত তেমন মনে হল।সৃজিতা বাইরেই চেয়ারে বসে ছিল।আমাকে বাইরে বেরোতে দেখে দ্রুতো উঠে এল।– "হয়ে গেল?"
আমি মাথা নীচু করে এক পাশে মাথা কাত করলাম।
–"কি বলল?রিপোর্ট কবে দেবে?"
–"কিছু বলেনি।বুধবার তিনটের সময় আসতে বলল, রিপোর্ট নিয়ে যেতে।"
সৃজিতা আমার চোখে চোখ রাখল।একটু হাসল।তারপর আমার হাত ধরে বলল,–"চল,তোকে বাইরে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি।"
একটা বিষন্ন হাসি হাসার চেষ্টা করলাম।গাড়িতে ওঠার পর সৃজিতা হাত নাড়ল।বলল –" বুধবার।মনে থাকে যেন।"

(৪)

আজ সেই বুধবার।আধ ঘন্টা কেটে গেল। টেনসনে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঘেমে উঠেছে। বার বার পকেট থেকে ফোন বের করে টাইম দেখছি।বিকেল তিনটে চল্লিশ হয়ে গেছে।সৃজিতা
আমাকে বসিয়ে রেখে সেই যে গেল,এখনো তার দেখা নেই।একজন বেঁটে করে মোটা নার্স এসে বলল,–" এখানে অভিজিৎ সেন কে আছে?"
–"আমি।" উঠে দাঁড়িয়ে নার্সটির দিকে তাকালাম।
–"আপনাকে ভেতরে ডাকছেন ডাক্তার বাবু।"
পকেট থেকে রুমাল টা বের করে মুখের ঘাম মুছলাম।তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম ডাক্তারের ঘরের দিকে।ডাক্তারবাবু আমাকে চেয়ারে বসতে বললেন।রিপোর্ট গুলো ভাল করে উলটে পালটে দেখে বললেন,–" এই নাও তোমার রিপোর্ট গুলো। সৃজিতা কে দেখাবে,ও সব বলে বুঝিয়ে দেবে তোমাকে।"

বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করল।আর করবেই না বা কেন?এরকম পরিস্থিতিতে আমার যে
এখনো হার্টফেল করিনি এটাই অনেক।কাঁপা কাঁপা স্বরে বললাম,–"খারাপ কিছু নেই তো ডাক্তার বাবু?"
রিপোর্ট গুলোর থেকে একটা কাগজ বের করে, ডাক্তার বাবু আমার হাতে দিলেন।তারপর কাগজের উপর মোটা কালির লেখা একটা লাইনের উপর আঙুল ধরলেন।সেটার উপর চোখ রাখতেই বুকের ভেতর টা ধড়াস করে উঠল আমার।ডাক্তারের ঘর থেকে রিপোর্ট গুলো নিয়ে বাইরে বেরোতেই সৃজিতা দেখতে পেলাম। আশেপাশে আর কাউকে দেখলাম না। আমাকে দেখেই ছুটে এল কাছে।সাদা সাদাদাঁত বের করে হাসল।খুব কাছে এসে চাপাস্বরে বলল,–কিরে! এইডস ধরা পড়ল নাকি! আমি জানি তোর ওসব কিছু নেই।" ওর চোখে মুখে একটা দুষ্টুমি খেলে গেল। রিপোর্ট গুলো ওর হাতে দিলাম।সব গুলো এক এক করে দেখতে লাগল।মুখে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল।তারপর সেই কাগজটিতে চোখ রাখতেই,থমকে গেল।ভাল করে বার বার পড়তে লাগল।তারপর আমার দিকে তাকালো।মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা স্বর বেরিয়ে এল।–"ইম্পোটেন্ট! "
(Impotent)

ভেতরে ভেতরে কষ্ট হলেও,একটা বিষন্ন হাসির চেষ্টা করলাম।যেন অনেক কষ্টে হাসিটা ভেতর থেকে টেনে বের করে আনছি।সবথেকে বেশী কষ্ট হল সৃজিতা কে হারাতে হবে ভেবে।অনেক্ষন পর মুখ দিয়ে কথা বেরুলো আমার।বললাম,–" রিপোর্ট গুলো তোর কাছে রাখিস।আমি আসি রে।"

সামনের দিকে পা বাড়াতেই,আমার হাত চেপে ধরল সৃজিতা।–"কোথায় যাচ্ছিস তুই?"
চুপ করে মাথা নীচু করে রইলাম।হঠাৎ আমাকে,ওর কাছে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।আশে পাশে কেউ নেই।মুখ টা আমার মুখের খুব কাছে এনে বলল,–"আমি তোকে খুব ভালবাসি। শুধু তোর সাথেই থাকতে চাই, আর কিছু না।"
আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল।কি বলছে এ মেয়েটা!খুব জোরে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল ওকে।আমার কপালের উপর থেকে চুল গুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল,–" এবার বাড়ি যা।একদম মন খারাপ করবি না। আমি সারা জীবন তোর সাথে থাকব।"

রিপোর্ট গুলো নিয়ে হসপিটলের বাইরে বেরিয়ে এলাম।গোধুলি নেমে এসেছে ধুলো মাখা পিচ রাস্তায়।আকাশ টা একদম পরিষ্কার,ঝকঝক করছে। মেঘেদের কোনো দেখা নেই।

স্বদেশ কুমার গায়েন  (২০১৫)