তৃতীয় প্রেম ~ ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


ধুর! শালা আর কোনো দিন প্রেমে পড়ব না । অনেক হয়েছে আর না,এত টেনসন আর নেওয়া  যায় না। আসলে আমার মন টাই না বিশ্রী ,দুম  দাম করে যেখানে সেখানে প্রেমে পড়ে যায়। বেশ  তো ছিলাম, খাচ্ছিলাম, ঘুরছিলাম, খেলছিলাম  কিন্তু আমার মন টার তা সহ্য হল না; দুম করে  পপি র প্রেমে পড়ে গেল এই প্রথম বার। পপি  আর আমি এক সাথেই টিউসান পড়ি। যেমন  ফর্সা, তেমন মিষ্টি তার হাসি। ফুলের মতো সুন্দর  একটা মেয়ে,– যেই দেখবে সেই প্রেমে পড়ে  যাবে। ব্যাস, প্রথম প্রথম চোখাচোখি, মিটি মিটি  হাসি তারপর থেকে পাশাপাশি বসা, একসাথে  যাওয়া আসা, গলির মোড়ে ফুচকা খাওয়া; মানে  প্রথম প্রেম একেবারে জমে ক্ষীর। প্রথম প্রেমের  অনুভূতি , ঠিক লিখে প্রকাশ করা যায় না;  অনুভব করতে হয়। আর আপনারা নিশ্চয় সেই  অনুভব টা জানেন। আমার ও ঠিক সেই রকম  হচ্ছিল। কিন্তু শনির দশা চললে যে, কোনোকিছু  ঠিক থাকে না। বেশ কয়েকদিন ধরে দেখছি পপি  একটু অন্যমনষ্ক। একদিন গান শোনা নিয়ে তর্ক  বাঁধল। আসলে আমি খুব গান পাগল, সব ধরনের, সব ভাষার গান শুনি। বাংলা পুরানো দিনের গান ও ভাল লাগে। কিন্তু ও বলে বসল বাংলা পুরানো দিনের গান গুলো কোনো গানের মধ্যে পড়ে না,সোওওওও বোরিং.....।
– তুমি, গানের কিছু বোঝ? ও সব গান শুনলে মনে প্রেম জাগে,ফিলিংস।
ব্যাস! আগুনে ঘি পড়ল। তুমি একটা ওল্ড মডেল, আনস্মার্ট,একদম আপডেটেড না ইত্যাদি ইত্যাদি  আরও অনেক কথা শুনালো। আর কতক্ষন ধৈর্য  রাখা যায় বলুন। এমনি শনির দশা চলছিল,তাই  মাথাটা একটু গরম হয়ে গেল।রেগে গিয়ে  বললাম,–আমি কি হোয়াটঅ্যাপস যে বছরে  আমার দু তিন বার আপডেট ভার্সান বেরোবে?
কোনো কথা না বলে পপি চলে গেল। পরের দিন দেখি, হিরো বাইকের উপর একটা হিরোর  পিছনের সিটে চিপকে বসে আসে। সেদিন  সত্যিই খুব কষ্ট হয়েছিল। হাজার হোক, প্রথম  প্রেম ছিল তো!
না! মনের দু:খে সেদিন বনে যায়নি,ঘরবন্দি  ছিলাম কিছুদিন। ভালকরে খাওয়া, পড়া কিছুই  হচ্ছিল না। দিন পনেরো পর একটু স্বভাবিক  হওয়ার চেষ্টা করলাম। না! আর প্রেম নয়।  পড়াশুনা খেলা ধুলায় মন দিলাম দু:খ ভুলতে।  কিন্তু মনটা যে আমার, মেয়েরা একটু মিষ্টি করে  হাসলেই মন টা আমার ভিজে যায়। এতো  বোঝানোর চেষ্টা করলাম মনটাকে শুনল না  আমার কথা। দুম করে আমাদের ক্লাবের  ক্রিকেট টিমের কোচ সঞ্জয় দার বোনকে পছন্দ  হয়ে গেল। ক্লাবের পেছনের দোতালা বাড়ির ছাদ  থেকে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন আমাদের প্রাকটিস  দেখত মেয়েটি । আর আমি বেছে বেছে ঠিক  ওদিক টাতে ফিল্ডিং নিতাম। শুধু ব্যাটস ম্যান  ছিলাম, তাই বল করতে ডাকত না। সারক্ষন  ওখানে দাড়িয়ে মেয়েটিকে দেখতাম। নানা  অজুহাতে সঞ্জয় দার বাড়িতে গিয়েছি, মেয়েটি  কে শুধু দেখতে। অনেকবার চারটি চোখ  একসাথে মিলিত ও হয়েছে। ব্যাস! আমার মনে  ওর জন্যে আবার ভালবাসা জমতে শুরু করল।  আস্তে আস্তে খুব ভালবেসে ফেললাম। আমার  একটাই সমস্যা যখন যাকে ভালবেসে  ফেলি, সেই প্রথম প্রেমের মতো মন প্রান দিয়ে ভালবাসি।
ক্লাব মাঠে যখন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হত, তখন মেয়েটি সঞ্জয় দার সাথে আমাদের গ্যালারি তে খেলা দেখতে আসত। মেয়েটি গ্যালারি তে থাকলেই, আমি মাঠে নেমে হয়ে যেতাম গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। মাঠে একটা ঝড় উঠত।চার আর ছয়ের। কিন্তু ওনার তো ম্যাক্সওয়েল পছন্দ ছিল না,পছন্দ ছিল মিচেল জনসন। আমাদের ক্রিকেট টিমের বাহাতি পেস ব্যাটারি সমীরন কে ও পছন্দ করত। পার্ক, রেস্টুরেন্ট ,সিনেমা হল, আরও অনেক জায়গায় সমীরনের বাইকে চড়ে ওকে ঘুরতে দেখলাম। বাইক ফেলে সাইকেল এখন আর কেউ পছন্দ করে! বলুন?
যেদিন জানতে পারলাম মেয়েটি, সমীরন কে ভালবাসে, মনটা আবার সেই প্রথমবারের মতো খারাপ হয়ে গেল। না! এবার আর ঘরবন্দি ছিলাম না। ক্রিকেট খেলাটাই ছেড়ে দিলাম। আর গঙ্গার ঘাটে গিয়ে ফুল, তুলসী, বেলপাতা, রেখে মানত করে এলাম , –প্রেম তো দুরের কথা ,মেয়েদের দিকে আর কোনোদিন তাকাব না।
বাড়ি থেকে আর বেরোতে ভাল লাগত না। ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে নীল আকাশ দেখতাম। সাহিত্য আমার আসে না, নইলে দু:খে, বিরহে এতদিন খাতার প পর খাতা কত বিরহী প্রেমের কবিতা লিখে ফেলতাম! প্রতিদিনের মতো একদিন বিকালে ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি পাশের বাড়ির ছাদ থেকে নীলা কাকিমার মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি পিছন ফিরে আসেপাশের ছাদ গুলোর দিকে তাকালাম, – অন্য কোনো ছেলে দাঁড়িয়ে নেই তো?
না! কাউকে দেখতে পেলাম না। তাহলে মেয়েটি আমাকে দেখছে! মেয়েটিকে আমি চিনি। ছোটোবেলায় পিলু বলে ডাকতাম, আমার দু ক্লাস নীচে পড়ত । ফোর পাশ করার পর ও মাসীর বাড়ি চলে যায়। এখন মাধ্যমিক পাশ করে এই দিন পনের হল বাড়ি ফিরেছে। এখন আর ওর সাথে কথা হয় না, আর আমিও ইন্টারেস্টেড নই। কিন্তু আমার দিকে ওভাবে কি দেখছে! মন টা যেন আবার নড়ে চড়ে উঠল আমার। এবার মন টাকে টুটি চেপে বললাম, — ফের যদি প্রেমে পড়িস তবে রাম ধোলাই খাবি।
নিজেকে বোঝালাম,— কন্ট্রোল বিট্টু, কন্ট্রোল। একদম মেয়েদের প্রতি দুর্বল হওয়া যাবে না। তাড়াতাড়ি ছাদ থেকে নেমে গেলাম। কিন্তু লেজুড় কি ছাড়ানো যায়!, যখনি ছাদে উঠি, তখনি মেয়েটা ছুটে ছাদে আসে। মহা সমস্যায় পড়লাম, বাধ্য হয়ে বিকালে ছাদে ওঠা বন্ধ করে দিলাম। এবার থেকে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে দখিনা বাতাশে বসে থাকব ঠিক করলাম। কিন্তু ওই যে বললাম, লেজুড় কিছুতেই পিছু ছাড়বে না। একদিন দেখলাম আমার থেকে কিছুটা দূরে মেয়েটি বসে আছে। নিজের মন টাকে অনেক কষ্টে দমিয়ে রেখেছি, ঝড়, তুফান, প্রলয় যাই আসুক প্রেম ট্রেম আর করা যাবে না। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতে যাব,হঠাৎ পেছন থেকে মেয়েটি ডাকল,– একটু শুনবে?
– বলো।
– মানে, তোমার সাথে একটু খানি কথা বলা যাবে কি?
মন টা যেন আবার নেচে উঠল। দিলাম মনে মনে এক থাপ্পড়। নাচ বন্ধ হয়ে গেল।
আমি বললাম,– এখন কথা বলার সময় হবে না।
– তাহলে, তোমার ফোন নাম্বার টা বলো।
মেজাজ টা কেমন হয়ে গেল। বললাম,— তুমি তো আমার বাড়ির ঠিকানা চেনো,চিঠি লিখ কেমন!
মেয়েটি আর কোনো কথা বলল না। আমি চলে এলাম। কিন্তু বাড়ি এসে মনটা খারাপ হয়ে গেল। না! এভাবে বলা ঠিক হয়নি মেয়েটিকে। ফোন নাম্বারটি দেওয়াই যেত। আর তাছাড়া মেয়েটি যদি আমাকে সত্যিকারের ভালবাসে তাহলে আমার যেমন কষ্ট হয়েছিল ভালবাসা হারিয়ে, ওর তাই হবে। আমি তো জানি ভালবাসা হারানোর কষ্ট কতখানি! মনে মনে আবার একটা অন্যরকম কষ্ট অনুভব করলাম। পরের দিন বিকালে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে দেখি মেয়েটি আগে থেকেই বসে আছে। ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে বললাম,— পিলু, এই নাও আমার ফোন নাম্বার।
আমার দিকে একবার ফিরে চাইল, আবার অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। বুঝলাম আমার কালকের কথায় কষ্ট পেয়েছে।
– পিলু, সরি! তোমার কথা বলতে হবে না,শুধু আমার নাম্বার টা নাও।
এবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর হঠাৎ আমার হাত টা টেনে তার পাশে বসালো। আমার মন টা আবার ছট ফট করতে লাগল বেরোনোর জন্য, দিলাম তাকে মুক্ত করে। জলের অন্তহীন ছলাৎ ছলাৎ শব্দ,আর শির শির বাতাশ মেখে পাশাপাশি বসে আছি দুজন। পিলু আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল, তখনি ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে গেল গঙ্গার বুকে; আর আমিও তৃতীয় বারের মতো প্রেমে পড়ে গেলাম।।
স্বদেশ কুমার গায়েন ( ২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.