একাকিত্ব~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]

                  

গল্পটি আমার জীবনের– আবার শুধুমাত্র আমার বললেও ভুল হয়।আপনার জীবনের ও হতে পারে। আবার এটাকে গল্প না বলে,নিজের একাকিত্ব নিয়ে আজগুবি ডায়রী লেখাও বলতে পারেন। সে আপনারা যাই মনে করুন,– এটা আমার জীবনের গল্প। যাইহোক আগে আমার সাথেই একটু পরিচয় করিয়ে দিই আপনাদের।
আমার নাম শুভঙ্কর। একটু বড় হলে মায়ের মুখে শুনেছিলাম,– নামটা নাকি জন্মের আগেই আমার বাবা দিয়ে গিয়েছিল।আর বাবার নাম ঠিক করে যাওয়ার সুবাদেই আমি নাকি শ্বেত শুভ্রের মতো রঙ নিয়ে জন্মেছিলাম– এটা আমার মায়ের বিশ্বাস। আমার বয়েস খুব একটা বেশী নয়,– এই আঠাশের কাছাকাছি। সাড়ে পাঁচ ফুটের কাছাকাছি লম্বা ,মাথায় হাল্কা কালো রঙের চুল; মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখে একটা চেঞ্জার টাইপের চশমা– এর থেকে আর বেশী বর্ননা নিজের সম্পর্কে দিতে পারলাম না। জন্মের পর যখন বুঝতে শিখলাম, তখন ঘরের দেওয়ালে ছবিতেই বাবাকে প্রথম দেখেছিলাম। দুবছর হল,মা ও গত হয়েছে। মা, আমাকে ছোটো থেকেই শুভ বলে ডাকত। আর এখন, অফিসের স্টাফ রা ডাকে।


পশ্চিম মেদনীপুরের মফস্বলের ছোট্টো একটা রেল স্টেশন কলাইকুন্ডা। মফস্বল বললেও ভুল হয়– তার থেকে গ্রাম বলাই ভাল।শহর থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ফাঁকা । লাল কাঁকর বিছানো প্লাটফর্ম টা রেল লাইল থেকে খুব বেশী হলে এক হাত উঁচু তে। অনান্য প্লার্টফর্ম গুলোর মতো নয়। এদিকে লোকাল অথবা প্যাসেঞ্জার ট্রেন গুলো থেকে লোকজন নামার জন্যে ট্রেনের দরজায় সিঁড়ি আছে,– অনেকটা এক্সপ্রেস ট্রেন গুলোর মতো। আর সেই কারনেই বোধ হয় এদিককার প্লাটফর্ম গুলো এমন নীচু। বেশীরভাগ টাটানগর গামী লোকাল,আর দু' একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন স্টেশনটিতে দাঁড়ায়। দিনের অন্যান্য সময় মালগাড়ি আর এক্সপ্রেস চলাচল করে। মানুষ জন অপেক্ষা, গাছ গাছালিতে প্লার্টফর্ম টা ভর্তি,– আম, বট, অশথ্ব, ইত্যাদি গাছ ছাতার মতো মুড়ে রেখেছে পুরো প্লার্টফর্ম টি কে। সারি সারি নাম না জানা লাল, হলুদ রঙের ফুল গাছ গুলো কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। সব থেকে বড় বট গাছ টির নীচে ছোট্টো একটা ঘর স্টেশন মাস্টারের। প্লার্টফর্ম থেকে নামতেই একটা লাল মাটির রাস্তা, উওরের ধূ ধূ মাঠ টির উপর দিয়ে সাপের মতো এঁকে বেঁকে চলে গেছে দুরের গ্রামের মধ্যে। একটা ছোট্টো নি:সঙ্গ চায়ের দোকান লাল রাস্তাটার উপর। দিনের বেশীর ভাগ সময় হাতে গোনা লোকজন আসা যাওয়া করে এই স্টেশন দিয়ে, শুধুমাত্র দু টো সময় বাদ দিয়ে,–সকালবেলা ন'টা তিরিশের লোকাল আর বিকালের পাঁচটা দশের। কারন এই সময় বেশ কিছু রেলের কর্মচারীদের ভিড় দেখা যায় প্লার্টফর্ম টিতে। আমিও রেলে চাকরী করি তাই কর্মসূত্রে,রবিবার বাদে প্রতিদিন এখানে আমাকে আসতে হয়। চার বছর আগে দক্ষিন চব্বিশ পরগনা ছেড়ে, চলে এসেছিলাম এই লাল মাটির গ্রামে। এখন ছ'মাসে, ন'মাসে একবার হয়তো ওদিকে যাই।

গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেল। আকাশের হলুদ রঙ টা ধীরে ধীরে সিঁদুরে লাল হচ্ছে। প্রতিদিনের মতো আজও বসে আছি প্লার্টফর্ম টি তে। চারিপাশে অফিস যাত্রীদের ভিড়। সামনের খোলা মাঠটার ওপার দিয়ে দখিনের বাতাস যেন বরফের কুচি উড়িয়ে আনছে। চারিদিক টা একটু একটু করে কালো হয়ে আসছে। একটু পরেই ট্রেন ঢুকবে স্টেশনে।তারপর চারিপাশের মানুষের কথা ছড়িয়ে পড়বে প্লাটর্ফমের কোনায় কোনায়। বিকেলের লাল সূর্য টা আকাশ টাকে এক চিলতে সিঁদুর রঙে রাঙিয়ে দুরের বড় বড় ইউক্যালিপটাস গাছের বনের আড়ালে যেতে চাইছে। দিনের শেষে সবার মতো সে ও হয়তো বিশ্রাম চায়। একটু দুরে সাত নং জাতীয় সড়কের উপর দিয়ে বড় বড় মাল বোঝাই ট্রাক গুলো ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলেছে।

প্লার্টফর্ম থেকে নেমেই লাল রাস্তার উপরের ছোটো চায়ের দোকানের,পাশে পাতা লম্বা চেয়ার টার উপরে বসলাম। দূরের গ্রামের কিছু আদিবাসী মেয়ে শালের জঙ্গল থেকে শুকনো ডাল পালা কুড়িয়ে, মাথায় করে সারি বদ্ধ ভাবে হেঁটে চলেছে অাঁকা বাঁকা লাল রাস্তাটির উপর দিয়ে। আমি মাঝে মাঝে এদের কে আমার মোবাইলের ক্যামেরায় বেঁধে রাখি। এদের এই হেঁটে যাওয়া যেন ইতিহাসের সাক্ষী। কত ক্যানভাসে বার বার ভেসে ওঠে এরা।পিঠের ব্যাগ থেকে জলের বোতল টা বের করে, এক ঢোক জল খেয়ে দোকানি ছেলেটিকে বললাম,—" দেবু, এক কাপ চা দে ।"
 গত চার বছরে এই ছেলেটি যেন আমার খুব চেনা হয়ে গেছে। চা খেতে খেতে অনেক কথা বলি ওর সাথে। বয়স খুব একটা বেশী নয়,— এই সতেরো, আঠেরো হবে। পরনে একটা থ্রী কোয়ার্টার প্যান্ট,আর হাফ হাতা গেঞ্জী। দোকানের একটা ছোটো সাউন্ড সিস্টেমে সব সময় হানি সিং আর ভোজপুরি গান চলে। মাথার চুল টাও অনেক টা হানি সিং স্টাইলে কাটা।
ছেলেটি বলল,—" দাদা, লাল চা না,দুধ চা?'
আমি বললাম,– "আগে লাল চা দে, সঙ্গে একটা বিস্কুট ও দিবি।"
ছেলেটি হেসে বলল,–" সে কথা তোমাকে বলে দিতে হবে না।"
চা খেতে খেতে চুপচাপ বসে ঐ দুরের লাল রঙা আকাশটিকে দেখছিলাম । পিছনের মাঠের মাঝে কালো কালো বাঁশ বনের ঝোপ।আর তার মাথায় ঝাঁকে ঝাঁকে বক পাখি এসে বসছে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বক ফুল ফুটে আছে।পাঁচটা বাজতে আর মিনিট তিনেক বাকি। লোকাল ট্রেনের হর্ন শোনা গেল। প্লাটফর্মে ট্রেন ঢুকছে। যাত্রীদের এলোমেলো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ।
পাশেই আমার এক কলিগ ও চা খাচ্ছিল।আমার  দিকে তাকিয়ে সে বলল,- "কি রে শুভ, এ ট্রেনে যাবি ?
আমি চুপ করে রইলাম। ও জানে আমি বেশীর ভাগ দিন এ ট্রেনে যাই না। তাই ও চলে গেল। সবাই ব্যস্ত ট্রনে ওঠার জন্যে।শুধু ব্যস্ততা নেই আমার মধ্যে। এক মনে চা খেতে খেতে তাকিয়ে আছি লোহার অজগর টির দিকে। আসলে সবার ব্যস্ততা টাই স্বাভাবিক। সারা দিনের কাজের পর সবাই ,তার প্রিয়জনের মুখ টা একটু দেখতে চায়। তারাও অপেক্ষায় বসে থাকে........ কখন সে অফিস থেকে ফিরবে,– কারও বাবা, মা কারও দিদি, কারও ভাই, বোন, কারও প্রিয়তমা, ছেলে মেয়ে.....।
শুধু আমার কোনো তাড়া নেই।কারন, আমার জন্য তো আর কেউ অপেক্ষা করে বসে নেই।না! একটু ভুল বললাম–আমার জন্যেও অনেকে অপেক্ষা করে থাকে– আমার ঘরের তালা, রাতে কখন ফিরে আমি চাবি দিয়ে আগে তাকে খুলব! তারপর টিবউ লাইট, ও ফ্যানের সুইচ গুলো,– কখন তাদের কে অন করব ! টি.ভি, ফ্রিজ, শোবার খাট, –এগুলোও আমার অপেক্ষা করে থাকে। মনে মনে কথা গুলো ভাবতে ভাবতে, একটা মন খারাপের বিষন্ন হাসি পেল আমার।

ঝম্ ঝম্ শব্দ করতে করতে ট্রেন টি প্লার্টফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আবার দু ঘন্টা পর শেষ ট্রেন। ট্রেনটি বেরিয়ে যেতেই সারাটা স্টেশন নিস্তব্দ হয়ে পড়ল।শুধু গ্রামের কত গুলো মানুষ চা য়ের দোকানে বসে তাদের সারাদিনের গল্প করছে। আবার একটা চা য়ের অর্ডার দিলাম আমি। চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। স্টেশনের টিউব লাইট আর গ্যাসবাতি গুলো জ্বলতে শুরু করে দিয়েছে। দূর থেকে শুধু কিছু রাস্তার কুকুরের তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে আসছে । দোকানি ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,- "দাদা! একটা কথা বলব, কিছু মনে করবে না তো ?"
আমি বললাম,–" বল, কিছু মনে করব না ।"
ছেলেটি চায়ের গ্লাসে এক চামচ চিনি দিয়ে, চামচ টা নাড়াতে নাড়াতে বলল,— "সবাই ওই ট্রেনে বাড়ি চলে যায়, কিন্তু তুমি যাও না কেন? বৌদি কি বাড়িতে উঠতে দেয় না, না বাপের বাড়ি গিয়েছে?"
কথাটা বলে ছেলেটি হাসতে লাগল।আমার ও হাসি পেল খুব।ছেলেটি হয়তো ভেবেছে আমার বিয়ে হয়ে গেছে।আমি হাসতে হাসতে বললাম,- " না। আসলে আমি সন্ধ্যায় বাড়ি গেলে, তোর বৌদির সিরিয়াল দেখার অসুবিধা হয়।তাই একটু রাত করে যাই।"
চায়ের দাম টা মিটিয়ে দিয়ে প্লাটফর্মের টিনের শেডের নীচে এসে বসলাম। কালো আকাশে রাতের তারা গুলো ঝিকমিক করছে। এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি আকাশের তারা গুলোর দিকে। কতক্ষন কাটলো জানিনা। আবার লোকাল ট্রেনের হর্নের শব্দ শুনতে পেলাম। কিছুক্ষনের মধ্যে ট্রেনটি সাপের মতো এঁকে বেঁকে প্লাটফর্মে এসে ঢুকলো। একটা ফাঁকা কামরায়,জানালার পাশের সিটে গিয়ে বসলাম। এ ট্রেনটাও ঠিক আমার মতো একাকিত্বে ভোগে। সারা ট্রেনে হাতে গোনা দশ বারো জন লোক। ট্রেনটি হেলতে দুলতে আস্তে আস্তে চলতে শুরু করছে । জানালার রডে মাথা ঠেকিয়ে বাইরের কালো অন্ধকারে তাকিয়ে আছি।

পাঁচ বছর আগের বিদিশার মুখ টা আজ এই মুহুর্তে খুব মনে পড়তে লাগল। আজ যদি , তুই আমাকে ভালোবাসতিস, আমার সাথে থাকতিস, আমিও সবার মতো আগের ট্রেনে ফিরতাম। বুকের ভেতরের বেলাভূমিতে একটা জল তরঙ্গ যেন আছড়ে পড়ল। হঠাৎ চোখটা যেন কেমন ঝাপসা হয়ে এল। চশমা টা,চোখ থেকে খুলতেই এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল আমার জামার উপর।
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.