কয়েকটি খারাপ ছেলের গল্প ~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]




[ গল্পটি একটা বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রানিত।'সত্যমেব ও জয়তে' অনুষ্টানে  প্রথম শুনেছিলাম।তবে নীচের গল্পে, প্রয়োজনে সেই ঘটনা বা চরিত্রের অনেকাংশ পরিবর্তন।]

কয়েকটি খারাপ ছেলের গল্প ~ ছোটোগল্প

— "ওই দেখ দীপু,কালো ব্লাউজের ভিতর দিয়ে সাদা ব্রা টা স্পর্ষ্ট দেখা যাচ্ছে।"
আমি চোখ কচলে বললাম,—"কথা বলিস না, রবি।শুধু দেখে যা।"
-" উফফ! কি জিনিষ রে!— জিজু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি বাঁ হাত দিয়ে মুখ টা বন্ধ করে দিলাম। কারন মেয়েদের শরীরের বর্ননা দেওয়ায়, জিজুর মতো ছেলে খুব কম পাওয়া যায়।"
আমার বাঁ দিকে বসা বুবাই বলল,—" মামু! এটা এই পশ্চিম মেদনীপুরের ধ্যাড়ধেড়ে জঙ্গলমহলের মাল নয়। কলকাতার সাজানো গোছানো জিনিষ। আমাদের গোপাল দার বাড়ি ভাড়া থাকে, আর স্কুলে ইংরাজী পড়ায় ।"
আমি হাঁ করে বুবাই এর মুখের দিকে তাকালাম। বললাম,—"এর মধ্যে তোর এত কিছু খবর নেওয়া হয়ে গেছে।"
পিছন দিক থেকে ক্যালানে মধু টা বলল,—"খুব বেশি হলে ছাব্বিশ হবে!"
আমি বললাম,— "কোনটা?"

মধু বিরক্ত হয়ে বলল,— "আরে ধুর বাবা! আমি বয়েসের কথা বলছি।"
চুপ কর সবাই !

ম্যাডাম রাস্তার উপর আমাদের পাঁচজনের সামনে আসতেই, আমরা যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। জিজু কানে হেড ফোন টা গুজে দিয়ে চোখ বন্ধ করে যেন সুরের জগতে ভেসে গেল। রবি আর মধু ফোনটা এমনি এমনি কানে লাগিয়ে,এমন ভাব করতে লাগল যেন কতক্ষন ধরে একটা নাম্বার ট্রাই করে যাচ্ছে। বুবাই সঙ্গে সঙ্গে উলটো দিকে ঘুরে গেল,আর আমি আকাশের দিকে চেয়ে দিনের বেলায় যেন তারা গুনতে লাগলাম।সামনে দিয়ে ম্যাডাম চলে যেতেই, বিদ্যুৎ গতিতে আমাদের পাঁচ জোড়া চোখ, খোলা ফর্সা পিঠ থেকে কোমরের নীচ পর্যন্ত ঘোরাফেরা করতে লাগল।


স্কুল লাইফ দু বছর আগে শেষ হয়ে গেছে পাঁচ জনের। তারপর থেকে কেউ আর কলেজ মুখো হয়নি। সকাল ন'টা থেকে ক্লাবের পাশের বড় শিরিশ গাছের নীচে কাঠের গুড়িটার উপর বসে স্কুলে যাওয়া মেয়ে গুলোকে দেখা আমাদের কাজ। এগারো বারো ক্লাসের মেয়ে গুলো কে আর প্রতিদিন দেখতে ভালো লাগে না। হঠাৎ এই নতুন ম্যাডাম আসাতে ,নিরামিষের মধ্যে একটু আমিষের স্বাদ পাওয়া গেল। পাড়ায় যদি একটা অভদ্র, লম্পট, খারাপ, বাউন্ডুলে ছেলেদের লিস্ট বানানো হয়, তাহলে আমাদের পাঁচজনকে প্রথম পাঁচ থেকে কেউ সরাতে পারবে না।

প্রতিদিনের মতো আজ ও আমরা পাঁচ জন বসে আছি গাছের নীচে। সামনের লাল মাটির রাস্তা দিয়ে স্কুলের বাচ্চা গুলো যাওয়া শুরু করেছে। কখন ম্যাডাম আসবে সেই অপেক্ষায় বসে আছি। হঠাৎ জিজু বলল,—" ঐ দেখ আসছেন।"
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনের মতো আমাদের পাঁচ জোড়া চোখ ঘুরে বেড়াতে লাগল বুক থেকে কোমর পর্যন্ত। নীল শাড়িতে যা লাগছে না!— মনে হচ্ছে নীল অপরাজিতা ফুলের মালা।
আজ ম্যাডাম আমাদের সামনে এসে থেমে গেল। পাঁচ জন এমন একটা ভাব করতে লাগলাম, যেন ভাজা মাছ টা উলটে খেতে জানিনা। ম্যাডাম রাস্তা থেকে নেমে একেবারে আমাদের সামনে এসে বললেন,- "এই যে! তোমাদের বলছি।"
জিজু কান থেকে হেড ফোন টা খুলে বলল,-" হ্যাঁ! বলুন।"
- "তোমারা সবাই একটা কাজ করবে?"
মধু পেছন দিক থেকে হুড়মুড় খেয়ে বলল,— "বলুন ম্যাডাম! আপনার জন্য কি করতে হবে?"
আমি মধুর হাত ধরে পিছনে টেনে আনলাম। ম্যাডাম আমাদের ক্লাবের মাঠটার দিকে তাকিয়ে বললেন,-" তোমাদের প্রত্যেক কে প্রতিদিন দশ টাকা করে দেব আর একটা ফুটবল দেব।এখানে বসে বসে মেয়ে না দেখে ঐ মাঠে গিয়ে খেলা করবে।"
প্রস্তাব শুনে মধুর মুখ টা বাংলার পাঁচের মতো আকার নিল,আর বুবাই এর শুকনো আলুর চিপস। আমি ব্যাপার একটু ভাবলাম,- আমরা পাঁচজন,মানে প্রতিদিন পঞ্চাশ  টাকা। সন্ধ্যা বেলা গোপাল দার চায়ের দোকানের টাকা টা উঠে যাবে। আর তাছাড়া বই তো পড়তে বলছে না,শুধু ফুটবল খেলতে হবে।
প্রস্তাব টা খারাপ নয়।কিন্তু বুবাই কিছুতেই রাজী হতে চাইছিল না। অবশেষে অনেক বুঝিয়ে,পাঁচজন রাজী হয়ে গেলাম। ম্যাডাম হেসে বললেন,- খুব ভাল।আর আমাকে ম্যাডাম বলবে না, রিমি দি বলে ডাকবে।"
মনটা কেমন হয়ে গেল। চলে যাওয়ার সময় আজ আর বাজে মানসিকতা নিয়ে ম্যাডামের দিকে চাইলাম না। মুখ হাঁ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম পাঁচজন।পরদিন সকালে রিমি দি একটা ফুটবল আর পঞ্চাশ টাকা আমাদের কাছে দিয়ে গেল। ফুটবল টা মাঠে নিয়ে পাঁচজন খেলতে শুরু করে দিলাম। দিদি প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে ফুটবল দিয়ে যেত আর স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাদের থেকে ফুটবল টা নিয়ে যেত। দশদিন ভালই কাটল, আমরা পাঁচজন বাদে আরও বেশ কিছু ছেলেও জুটে গেছে। ফুটবলের মধ্যে যেন নিমগ্ন হয়ে গেলাম। বেশ ভাল একটা চাকরী-বাউন্ডুলের মতো বসে না থেকে,জলখাবারের টাকাও উঠে যাচ্ছে আবার আনন্দ ও হচ্ছে।বারো দিনের মাথায় রিমি দি ফুটবল টা হাতে নিয়ে এসে বলল,- "আজ থেকে আর তোমাদের খেলতে হবে না।"
আমরা এক সঙ্গে বলে উঠলাম,- "কেন দিদি?"
- "আমার কাছে টাকা নেই বুঝলি।"
মনটা খারাপ হয়ে গেল আমাদের। সবথেকে খারাপ লাগছিল, ফুটবল খেলা টা আর হবে না বলে। জিজু পাশ থেকে বলে উঠল,— "দিদি, তোমার টাকা দিতে হবে না। শুধু ফুটবল টা দাও,আমার ফুটবল খেলব।"
আমরা চার জন একসাথে জিজুর দিকে ফিরে তাকালাম।ও দিদির হাত থেকে ফুটবল টা নিয়ে মাঠের দিকে চলে গেল। আমরা জিজুর পিছন পিছন এগিয়ে গেলাম। দিদি কিছু বলল না, শুধু হেসে স্কুলের দিকে চলে গেল।


দু বছর কেটে গেল কিভাবে,বুঝতে পারলাম না। পা থেকে আর ফুটবল টা নামেনি আমাদের। রিমি দি আর আমাদের পঞ্চাশ টাকা দেয় না। খেলার সমস্ত সরঞ্জাম কেনার টাকা দেয়। আর আজ আমরা পাঁচজন পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা একাদশ ফুটবল টিমের প্রথম এগারো জনের সেরা পাঁচজন। বাংলা ফুটবল দলের হয়ে খেলার জন্য জিজু আর বুবাই ট্রায়ালে ডাক পেয়েছে। জামার উপর থেকে খারাপ ছেলের দাগটা মুছে গেছে অনেক আগেই।সত্যি! জীবন কখন কোন স্রোতে বয়ে যায়,সেটা কেউ জানতে পারে না।
এখন বিকাল হলে রিমি দি কে নিয়ে আমরা পাঁচজন ঘুরতে বেরোই। সাপের মতো আঁকা বাঁকা লাল মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নির্জন শাল গাছের বন দেখি। বিকেলের লাল বড় সূর্য টা যখন সবুজ মাঠের ওপারে আস্তে আস্তে ডুবে যায়,তখন রিমি দি বলে,—"তোরা আমাকে ভুলে যাস,কিন্তু ফুটবল টাকে কখনো ভুলিস না যেন।"
আমরা পাঁচজন হেসে উঠি,- "ধুর! তোমাকে কখনো ভুলতে পারব না।"

কিছুদিন কাটলো।আজ সকাল থেকে আকাশ টা কেমন মুখ ভার করে বসে আছে। কালো মেঘের একটা পুরু স্তর ঘিরে রেখেছে আকাশটিকে। মাঝে মাঝে ঝির ঝির করে এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে যাচ্ছে। সকাল সাড়ে ন'টা বাজে। প্রতিদিনের মতো আজও আমরা ফুটবল নিয়ে প্রাকটিস করছি ক্লাবের মাঠটিতে। হঠাৎ রিমি দি মাঠের পাশে এসে দাঁড়াল। ফুটবল রেখে আমরা পাঁচজন ছুটে এলাম। রিমি দির মন টা যেন আজ খুব খুশি খুশি দেখাল। আমি বললাম,- "দিদি, কিছু বলবে?"
রিমি দি হাসি মুখে বলল,- "একটা ভাল খবর আছে। আমার ট্রান্সফার হয়ে গেছে,আমার বাড়ির পাশের স্কুলে।"
আমরা পাঁচজন বিস্ময়ের সাথে বলে উঠলাম,- "মানে?"
— "মানে হল, আমি বাড়ির পাশের স্কুলে যাওয়ার জন্য একটা অ্যাপলিকেসন করেছিলাম,সেটা ওরা অ্যাকসেপ্ট করেছে; আর আমাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিচ্ছে।"
আমার বুকের মধ্যে টা হু হু করে কেঁদে উঠল। হয়তো সবার। একটা তীক্ষ্ণ কান্না যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। জিজু অসহায় ভাবে বলল,- "তার মানে, তুমি আর এখানে থাকবে না?"
— "অনেক দিন তো এখানে থাকলাম,তাই না! এবার একটু বাড়ির দিকেও যেতে মন চাইছে।"


সেদিন সকালে আর খেলা হল না। একরাশ বিষন্নতা যেন আমাদের জড়িয়ে ধরল। কেউ কারও কারও সাথে কথা বলতে পারছিলাম না। রিমি দির সাথে এটাই আমাদের শেষ বিকেল। সারাটা আকাশ জুড়ে নীল,আর সাদা মেঘের টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে। সবুজ শালবনের জঙ্গলের উপর এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল আমাদের মাথার উপর দিয়ে। ফাঁকা মাঠের লাল পাথুরে মাটির রাস্তার পাশে সবুজ ঘাসের উপর বসে আছি রিমিদির সাথে। আকাশের নীল মেঘটির দিকে চেয়ে রিমি দি বলল,- "তোদের এই লাল মাটির গ্রাম টি সত্যি খুব ভাল। প্রথম প্রথম তোরা যে ভাবে তাকাতিস,সত্যি খুব ভয় পেতাম। খুব মন খারাপ করত। এখন আর ভয় করে না।"
রিমি দির কথা শুনে আমরা পাঁচ জনেই লজ্জা পেলাম। মাথা নীচু করে এক বিষন্ন হাসি হাসতে লাগলাম। আমি বললাম,-" দিদি, আর কখনো এখানে আসবে না?"
দিদি হাসতে হাসতে বলল,—" সময় পেলে নিশ্চই আসব।"
 চুপ করে রইলাম আমরা। কেউ কথা বলতে পারছিলাম না। আজ যেন সব কথা হারিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। বাড়ি ফিরে সারা রাত ঘুম হল না আমার। খোলা জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে ছিলাম ।

সকাল ছ'টার মেদিনীপুর হাওড়া গ্যালোপিন ট্রেন। রিমি দির সব ব্যাগ নিয়ে আমরা মেদিনীপুর স্টেশনে এলাম। জিজু গিয়ে একটা টিকিট কেটে আনল। ট্রেন ছাড়তে আর মিনিট পাঁচেক বাকি। রিমি দি হাসতে হাসতে বলল,- "কেউ মন খারাপ করবি না। ভাল করে ফুটবল টা খেলবি, দেখবি একদিন কলকাতার বড় ক্লাবে হয়তো ডাক পেয়ে যাবি। তারপর একদিন তোদের কে হয়তো টি.ভি তে দেখতে পাব।"
আমাদের পাঁচজনের বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে উঠল। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছে,একটা শূন্যতা আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরছে আমাদের। রিমি দির সেই মিষ্টি হাসির মধ্যেও তার দু' চোখে জল ভরে উঠেছে, সেটা স্পর্ষ্ট দেখতে পেলাম। ট্রেন হুইসেল দিল।দিদি কে ট্রেনে তুলে দিলাম। ধীরে ধীরে ট্রেন টা প্লার্টফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমরা পাঁচজন অপলক, এক অন্ত:সার শূন্য দৃষ্টি নিয়ে ট্রেন টির দিকে তাকিয়ে আছি। রিমি দি ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে হাত নাড়ছে। একটু একটু করে চোখের সামনে থেকে হাত টা অস্পষ্ট হয়ে গেল। শুধু চোখের পলক পড়তেই কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে প্লাটফর্মের ধুলোয় মিশে গেল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.