শাস্তি~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


– "আমার একটা ছেলে চাই!"
রাতে ঘরে ফিরে জামাটা খুলতে খুলতে নরেন বলল। মিনতি খাটের উপর শুয়ে শুয়ে শরৎচন্দ্রের একটা গল্পের বই পড়ছিল। নরেনের কথা শুনে কেউটে সাপের মতো ফোঁস করে উঠল,-" কেন,ছেলে কেন? আমার একটা মেয়ে হলেই হবে।"
বিয়ের চার বৎসর পর মিনতি যখন সন্তানসম্ভবা হলো,তখন বীরেন্দ্র নাথের বাড়ি,একপ্রকার উৎসবের ধুম পড়ল। বীরেন্দ্রনাথ মুখুজ্জে,গ্রামের সব থেকে ধনী ব্যক্তি।পৈতৃক ভিটে বাড়ি, জমি– জমা মিলিয়ে প্রায় ষাট বিঘে মতো সম্পত্তি। তার উপর নিজ চেষ্টায় চার–পাঁচ রকমের ব্যবসা সাজিয়েছেন। বাজারে বড় বড় দুটো গারমেন্টস এর দোকান, রাসয়ানিক সারের দোকান,এছাড়া ডেকোরেটিং এর জিনিষপত্র তো আছেই।নিজে লোকজন নিয়ে জমি জায়গা গুলো দেখাশোনা করেন। আর ছেলে নরেন্দ্রনাথ ব্যবসা–বানিজ্য একা হাতে সামলায়। বি.এ পাশ করানোর পর ছেলেকে আর লেখা পড়া করান নি। বাবার এত সম্পত্তি, ব্যবসা–বানিজ্য দেখা শোনা করার তো একটা লোক চাই? তার ছেলেকে না পড়িয়ে ব্যবসার কাছে লাগিয়ে দিয়েছেন।

বাড়িতে গৃহকর্তা বীরেন্দ্রনাথের দাপট অনেক খানি। ছেলে নরেন্দ্রনাথ ও বাবার সামনে মুখ তুলে কথা বলতে পারে না। শুধু বাড়ি বলে নয়, পাড়ায়ও তার দাপট দেখার মতো। তাকে গ্রামের মোড়ল বলে মানে সবাই।অনেক টাকা–পয়সা থাকলে যা হয় আর কি! তোষামোদ করার লোকের অভাব হয় না। ছেলে নরেন্দ্রনাথ কে বিয়ে দিয়েছেন এই তিন বছর হল। মেয়ের বাড়ি এই গ্রামেই। মিনতি দেখতে শুনতে মন্দ নয়। গায়ের রঙ একটু চাপা হলে কি হবে,শরীর স্বাস্থ্য,ফুটন্ত কুড়ির মতো যৌবন দেখে,ছেলে নরেন্দ্রনাথের মনে ধরেছিল।
গৃহকর্ত্রী সুজতাবালা প্রথমে একদম রাজী হয়নি। এরকম রঙ চাপা মেয়ে একদম বৌমা করে ঘরে আনবেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বীরেন্দ্রনাথের কথায় বিয়ের দিনক্ষণ সব পাকা হয়ে গেল। মিনতি সবে শহরের কলেজে পড়ত। ভেবেছিল কলেজের পড়াশুনাটা শেষ করে,তারপর বিয়ের কথা ভাববে। কিন্তু তার বাবা এরকম একটা বড় ঘরের সম্বন্ধ হাত ছাড়া করতে চায়নি। সত্যিই তো! এত বড় বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দেওয়া একপ্রকার ভাগ্যের ব্যাপার। কি হবে অত পড়াশুনা করে? সেই তো শ্বশুর বাড়ি গিয়ে হেঁসেল ঠেলতে হবে! তাই মিনতির কোনো কথা তিনি কানে নেননি।শেষ পর্যন্ত বাবার কথা রাখতেই,তাকে পড়াশুনা শিকেয় তুলে বিয়ের পিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়।
আর বিয়ের পরেই সমস্যাটা শুরু হল। মিনতির শাশুড়ি অল্পদিনের মধ্যে বুঝে গেলেন,– এ মেয়ে মুখরা। প্রতি কথায় চটপট করে উত্তর দেয়।বয়স ও যতেষ্ট কম।তাই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেওয়া শ্রেয় মনে করলেন না। মনে মনে এটাও ভাবলেন,–আধুনিক পড়াশুনা জানা মেয়ে তো! তার উপর শহরের জল–হাওয়া গায়ে লেগেছে। একটু মুখরা তো হবে। কিন্তু যে সমস্যাটা নিয়ে সব থেকে বেশি গোল বাঁধল,সেটা এবার বলি।
বিয়ের পর বছর দেড়েক কেটে গেল কিন্তু মিনতির সন্তান সম্ভবা হওয়ার কোনো প্রকার লক্ষন দেখা দিল না। সমস্যা টা যে কোথায়,এবং কার সেটা কেউ বুঝে উঠতে পারল না। গিন্নী সুজাতাবালা পড়লেন মহা সমস্যায়। তার এত বড় বংশে প্রদীপ দেওয়ার মতো একটা নাতি কি আসবে না? অবশেষে অনেক ডাক্তার দেখানো, ওষুধ খাওয়ানোর পর আজ মিনতি সন্তান সম্ভবা।বাড়ির সবাই একটা স্বস্তিকর নিশ্বাস ফেললেও,ডাক্তারের কথায় একটা অস্বস্তি রয়ে গেল মনের মধ্যে। ডাক্তার সবকিছু চেক আপ করার পর,অনেক চিন্তা ভাবনা করার পর বললেন,–প্রথম ডেলিভারির সময় খুব অসুবিধা হলে,দ্বিতীয়বার মিনতির সন্তান সম্ভবা হওয়ার সময় একটু সমস্যা হতে পারে।

শীতের সকালের কুয়াশা ভাঙা রোদের আমেজ টা দারুন লাগে সবার। পুকুর পাড়ের লেবু গাছের সবুজ পাতা গুলো থেকে টুপ টুপ করে কুয়াশার জল পড়ছে।বাইরের সাদা আস্তরন কে একটু একটু করে সরিয়ে দিয়ে ইষৎ উষ্ণ রোদ গ্রিলের ভেতর দিয়ে বারান্দায় উঁকি ঝুঁকি মেরে যাচ্ছে। গায়ে গোলাপি চাদড় টা জড়িয়ে মিনতি চুপ করে বসে আছে চেয়ারে। পা দু'টো একটু রোদে ছড়িয়ে দিল। একটা উষ্ণতা যেন ক্ষনিকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে। শরীরটা অনেক ভারী হয়ে গেছে।এই অবস্থায় তার একদম হাঁটতে চলতে বারন করে দিয়েছে ডাক্তার। শাশুড়ি নীচে বসে বটি দিয়ে সবজি কাটছে,দুপুরের রান্নার জন্য। পালং শাক টা কাটতে কাটতে তিনি বললেন, " বৌমা,ভগবানের কাছে কামনা কর,তোমার যেন একটা ছেলে হয়।"
একরম একটা শীতের সকালে শাশুড়ির কথা শুনে,মিনতির মেজাজটাই বিগড়ে গেল। সত্যিই তো! বার বার যদি একই কথা সবার মুখে শুনতে হয়,তাহলে মেজাজ বিগড়ে যাওয়ারই কথা। তাই শাশুড়ির কথায় আর উত্তর না দিয়ে পারল না। " কেন মা,ছেলের কামনা করব কেন?মেয়ের কামনা করলে কি ক্ষতি?"
মিনতির শাশুড়ি সবজি কাটা থামিয়ে দিলেন। " মেয়ে কোন কাজে লাগবে শুনি,আমাদের পরিবারে?এত সম্পত্তি,ব্যবসা–বানিজ্য কে দেখাশুনা করবে শুনি?"
-" কেন,মেয়েরা আজকাল কিছু করছে না? আজকের দিনে মেয়েরা কিনা না করছে! সকাল বেলা সংসারের কাজ গুছিয়ে,বেরিয়ে পড়ছে আর সেই রাতে বাড়ি ফিরছে। কেউ স্কুলে চাকরী করছে,কেউ কলেজে,কেউ বড় বড় অফিসে কাজ করছে, দেশ বিদেশে খেলা ধুলা থেকে শুরু করে দেশ শাসন করা, কিনা না করছে মেয়েরা!– সে খোঁজ খবর কি রাখেন? আর আপনার এই সামন্য সম্পত্তি সে দেখা শোনা করতে পারবে না?"
সত্যিই তো! আজকাল কার মেয়েদের সম্পর্কে কোনো ধারনা নেই মিনতির শাশুড়ি সুজাতা বালার।আর থাকবেই বা কি করে? সারা জীবন তো চার দেওয়ালের মধ্যে হেঁসেল ঠেলে কাটিয়ে দিলেন। বাইরে কি ঘটছে তার খবর কি করে রাখবেন!
-" অত,মুখের উপর ফোটর ফোটর করে কথা বলো না তো! বংশে প্রদীপ জ্বালানোর জন্যে ছেলের দরকার হয় বুঝলে!"
-" শুধু ছেলে নয়, তার সাথে একটা মেয়ে ও লাগে। আপনারা যদি সবাই ছেলে ছেলে করেন, তাহলে পৃথিবীতে তো ছেলে ভর্তি হয়ে যাবে। তখন কি হবে ভেবেছেন?
-" অত কিছু ভেবে লাভ নেই বাপু! আমাদের শুধু ছেলে দরকার তাই জানি। দ্বিতীয়বার কিছু হবে কিনা ঠিক নেই,এই প্রথমবার যদি ছেলে না হয়, তাহলে এই বাড়িতে তোমার জায়গা হবে কিনা, সেটা সবাইকে ভেবে দেখতে হবে।"
সুজাতাবালার এই কথাটা সজোরে বুকে এসে আঘাত করল মিনতির। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল।চেয়ারে আর বসে থাকতে পারল না। হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে নিজের ঘরে গিয়ে খাটের উপর শুয়ে পড়ল। সামনের জানালা দিয়ে উত্তুরে হাওয়া একটু একটু করে ভেতরে প্রবেশ করছে। জানালার পাশে বড় বড় দুটো নারকেল গাছের ডালের ফাঁকে তিন চারটে শালিক পাখি ঝগড়াঝাঁটি শুরু করে দিয়েছে। ছোটোবেলার কথা গুলো খুব মনে পড়ল মিনতির। ওরা দুইবোন,ওদের বড় জলপাই গাছটির নীচে বসে পুতুল নিয়ে সারক্ষণ বর–বউ খেলা করত। পুতুলের মধ্যে বিয়ে দিত,তার মাটির পাত্রে খাওয়া–দাওয়া আরও কত কিছু। ওর বোন বলত– পুতুল দুটোর ছেলে হবে। মিনতি বোনকে পাত্তাই দিত না। বলত–দেখবি ওদের মেয়ে হবে। বোনটা খুব জেদ ধরত,– "না ছেলে হবে। আমার ছেলে খুব পছন্দ।"
মিনতিও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়,–" মোটেও না। আমার মেয়ে পছন্দের।"
সেদিনের ছোটোবেলার সেই পুতুল নিয়ে পাগলামির কথাটা আজ মনে পড়ল। মনে মনে ভাবল,বোনু তুই ঠিক বলেছিলি,–"কন্যা সন্তান কেউ পছন্দ করে না! মিনতির চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল।"
সারাদিনটা আজ মিনতির মনটা ভার হয়ে থাকল। সন্ধ্যা থেকে খাটের উপর চুপ করে একভাবে শুয়ে রইল। রাতে নরেন ঘরে ফিরে বলল,-" মায়ের সঙ্গে অত মুখে মুখে ঝগড়া করো কেন?"
মিনতি বুঝতে পারল,ছেলে বাড়ি ফিরতেই,মা সকালের ব্যাপারটা নিয়ে লাগিয়েছে। চুপ করে থাকার মেয়ে মিনতি নয়। নরেনের প্রশ্নের উত্তরে জবাব দিল,-" ঝগড়াটা তোমার মা ই বাঁধিয়েছে। বার বার শুধু মুখের সামনে ছেলে চাই,ছেলে চাই করলে,চুপ করে বসে থাকবো?"
–" ভুল তো কিছু বলে নি। ছেলেই তো দরকার।মেয়ে এসে কি করবে শুনি?"
মিনতি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাগে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলল,-"মেয়ে হলে তোমাদের অসুবিধা কোথায়? মেয়েরা কি তোমাদের কাছে অস্পৃশ্য!মেয়েরা এতই যখন খারাপ,তবে আমাকে বিয়ে করতে গেলে কেন? একটা ছেলেকে বিয়ে করতে পারতে।"
—" মুখের উপর বেশি কথা বলোনা।" নরেন জামাটা খুলে আলনার উপর ছুড়ে দিল।
–" কেন,বলবো না ? বিয়ের সময় মেয়ে দরকার,আর নিজের একটা মেয়ে হোক সেটা চাও না কেন শুনি?"
ঝগড়া টা আরও কিছুসময় বোধহয় চলতো,কিন্তু শ্বশুর মশাই ঘরের সামনে আসতেই সব থেমে গেল।

কয়েকদিন ধরে পেটে মাঝে মাঝে ব্যাথা করে উঠছে মিনতির। ডাক্তার বলে দিয়েছে আর দিন পাঁচেকের মধ্যে ডেলিভারি হয়ে যাবে। সন্ধ্যা বেলার কৃষ্ণা চতুর্দশীর চাঁদের আলো বাইরের কালো কালো গাছ গুলোর উপর ছড়িয়ে পড়েছে। একটা মায়াময় অদ্ভুত পরিবেশ। উত্তরের জানালাটা একটুখানি খুলে মিনতি বাইরের চাঁদের আলোয় স্নাত বাঁশবন টিকে দেখছিল। চাঁদের আলো দেখতে তার খুব ভাল লাগে।কিন্তু ঠান্ডা এসে শরীরে প্রবেশ করতেই জানালাটা বন্ধ করে দিল। তারপর খাটের উপর শুয়ে নিজের পেটের উপর একটা হাত রাখল। খুব অবাক হল সে।আরেক টা জীবন নাকি তার এই শরীরের ভেতর!
– " আমি জানি,তুই মেয়েই হবি।আমার মন সেটাই বলছে। মায়ের মন সব বুঝতে পারে। কিন্তু এই অমানুষের বাড়ি তুই জন্ম নিস না। এরা কেউ তোকে চায় না। মরে যা তুই। বেঁচে থাকলে এরা,তোকেও কষ্ট দেবে,সেই সাথে আমাকেও। তোর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারবো না।" মিনতির দু'চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়তে লাগল।

কয়েকদিন নীরবে কেটে গেল। এইসময় বেশী উত্তেজনাও ঠিক নয়। তাই নানা ধরনের কথা শুনলেও, মিনতি কোনো কথার উত্তর দেয়নি। আজ সকাল থেকে মিনতির প্রসব যন্ত্রনা টা বেড়েছে। ঘরে খাটের উপর শুয়ে আছে সে। ডাক্তার তো আজই ডেট দিয়েছিল। বেলা যত বাড়ছে ততই প্রসব যন্ত্রনা বাড়তে লাগল। নরেন গিয়ে ডাক্তার ডেকে এনেছে।পাড়ার একজন বৃদ্ধা মহিলা সবসময় পাশে আছে সকাল থেকে। ঘরের বাইরে বারান্দায় নরেন, বীরেন্দ্রনাথ, সুজাতাবালা বসে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছে একটা পুত্র সন্তানের জন্য। পাড়ার আরও অনেক বউ রা এসে মুখোজ্জ্যে বাড়ি হাজির হয়েছে। অনেক সময় কেটে যাওয়ার পর ঘরের ভেতর থেকে মিনতির একটা তীব্র যন্ত্রনার চীৎকার বাইরে এল। তারপর সব চুপ হয়ে গেল। বাইরে সবাই ভগবানের নাম জপ করতে লাগল।সুজাতাবালা আর বসে থাকতে পারলেন না। ছুটে গেলেন ঘরের মধ্যে। সেই সাথে,নরেন ও বীরেন্দ্রনাথ ছুটলো,পেছন পেছন।
ঘরে ঢুকেই সবাই জানতে পারল,মিনতি একটা মৃত পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে।
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.