প্রেমিকা ভূত ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]


আমার নাম রনজয়,সবাই ছোটো করে রনি বলে ডাকে। বয়ষ এই তিরিশের কাছাকাছি। একটা ছোটো বেসরকারি কোম্পানি তে কাজ করি। বিয়ে থা আর করিনি,সেহেতু আমি একলা একটা মানুষ। শখ বলতে এই বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় একটু লেখালেখি করা।সামনেই পূজো সংখ্যা বেরোবে তাই পত্রিকার সম্পাদক মহাশয় একটা লেখা দিতে বলেছেন।আর সমস্যা টা বেঁধেছে সেখানেই।—একটা গল্প অবশ্য লিখেছি 'একটি মেয়ের কাহিনি' কিন্তু তার শেষ টা কোন দিকে নিয়ে যাব সেটা ভাবতে ভাবতেই তিনদিন কেটে গেল। তাই আজ খাওয়া দাওয়া করে ডায়রী আর পেন নিয়ে বসে পড়লাম একটু তাড়াতাড়ি।
রাত তখন কটা বাজে খেয়াল নেই,হঠাৎ পেছন দিক থেকে একটা নারী কন্ঠের আওয়াজ পেলাম,–"আপনি বুঝি লেখালেখি করেন?"
আমার কলম হোচট খেল।আরেকটু হলেই   চেয়ার থেকে পড়ে যেতাম।নিজেকে সামলে  নিয়ে পিছনে ফিরে তাকালাম।না, কেউ নেই; আর কে বা থাকবে? –এই ঘরে আমি একাই থাকি।
-"কি হল এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন যে, আপনি আমাকে দেখতে পাবেন না।" সেই মহিলা কন্ঠস্বর।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম।পা দুটো কাঁপছে আমার। এরপর সেই মেয়ে কন্ঠ টি বলল, –"একটু বসতে পারি?"
কোনোরকমে হ্যাঁ বললাম। নিজের কন্ঠস্বর ও যেন চিনতে পারলাম না।পাশ থেকে একটা চেয়ার শূণ্যে উড়ে গিয়ে টেবিলের ওপাশে আমার ঠিক সামনে গিয়ে থামল। একটা বসার আওয়াজ পেলাম।এতক্ষন টের পায়নি,এই অশরীরী মেয়েটি যখন থেকে এসেছে একটা মন ভোলানো সুগন্ধ সারা ঘর ছড়িয়ে পড়েছে।ভূতের মুখে এত মিষ্টি কথা শুনে অনেকটা ভয় ও কতকটা কেটে গেছে আমার।
-"আপনি কি সাহিত্যিক?"
আমি বললাম – "না,শখের বসেই লেখালিখি করি।"
-"কি লিখছেন?"
-"একটা গল্প।"
-"আপনি একাই থাকেন ?"
-"হ্যাঁ ।"
এরপর মেয়েটি বলল,—"আপনার নামটাই জানা হল না।"
বললাম,–"আমার নাম রনজয়।"
-"ও! আপনি বুঝি আগে যুদ্ধ করতেন?"
হাসি পেয়ে গেল আমার,–"আপনি তো বেশ মজা করতে পারেন!"
মেয়েটিও মৃদু হেসে বলল,-"আমার নাম সোহিনী ছিল।কিন্তু এখন তো আর নেই, ভূতেদের কি আর মানুষের নাম থাকে!"

আমি জলের বোতল টা খুলে এক ঢোক জল খেলাম। বুকের ভেতর টা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
-"অনেক রাত হল, এবার আসি" – মেয়েটি বলল।
তার চলে যাওয়া আমি স্পর্ষ্ট অনুভব করলাম।এই ভাবে বেশ কিছুদিন আমাদের আলাপ চলতে থাকল।আমি বেশ বুঝতে পারলাম মেয়েটির মোহে পড়ে গেছি। ওর আসার অপেক্ষায় বসে থাকি।সারক্ষন ওর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে,ওর সাথে থাকতে ইচ্ছে করে। মনে মনে খুব হাসি পেল, –অবশেষে একটা ভূতের প্রেমে পড়লাম!

একদিন রাতে লিখতে বসেছি।মেয়েটিও আমার সামনে বসে আছে। জিজ্ঞাসা করলাম,-"আপনি ওপারের বাসিন্দা হলেন কি করে?"
মেয়েটি বলল— "উঁ হু, আপনাকে বলা যাবে না। আপনারা হলেন সাহিত্যিক মানুষ,আমার জীবন কাহিনি নিয়ে শেষে একটা গল্প,উপন্যাস, সিনেমা বানিয়ে দেবেন।"
আমি আর বিশেষ কিছু বললাম না।
মেয়েটিই বলল,–"আপনি কবিতা লেখেন না? আমার জন্যে একটা কবিতা লিখবেন?"
কবিতা আমি লিখিনা খুব একটা। কিন্তু মেয়েটি যখন বলছে, তখন লিখতে তো হবেই।পরের দিন বেশ করে একটা প্রেমের কবিতা লিখে মেয়েটিকে দিলাম,যেন অনেকটা প্রেম নিবেদনের মতো। মেয়েটি খুব মন দিয়ে পড়ে বলল–"আমি যদি বেঁচে থাকতাম,তাহলে আপনার প্রেমে পড়ে যেতাম,আপনাকে খুব ভালবাসতাম।"
মেয়েটির কথা শুনে আমার মনের বনে সাতটি কোকিল যেন একসাথে ডেকে উঠল।ময়ূর গুলো পেখম মেলে নাচতে শুরু করল, বৃষ্টি নামলো, ঝড় উঠল,আর আমি ভূতড়ে মেয়েটিকে সত্যিকারের ভালবেসে ফেললাম।


এদিকে আমার সেই গল্পটা শেষ করে ফেলেছি। গল্পটি অনেকটা এরকম।একটা ছেলে আর মেয়ের গল্প।ছেলে মেয়ে দুটি ভালবেসে,বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় একটা অচেনা যায়গায়। তারপর বিয়ে করে দুজন।কিন্তু ছেলের পরিবার ঠিক খুঁজে বেরকরে তাদের ছেলেকে নিয়ে চলে আসে। আর মেয়েটিকেরেখে আসে সেই অচেনা ,অজানা যায়গায়।দিনের পর দিন,রাতের পর রাত এই অন্ধকার সমাজের নরপিশাচ রা মেয়েটিকে গ্রাস করতে থাকে। অবশেষে একদিন রেল লাইনে তার ছিন্ন ভিন্ন দেহটি পাওয়া যায়।যন্ত্রনা থেকে চিরমুক্তি নেয় সে।

আজকে রাতে আমার আর তেমন কাজ নেই। মেয়েটির আসার অপেক্ষায় বসে আছি। কিছুক্ষন পর সেই সুবাস নাকে এল।বুঝলাম সে এসে গেছে,চেয়ারটাতে গিয়ে বসার শব্দ পেলাম। আমি বললাম— "আমার লেখা গল্পটা পড়বেন না?
-"হ্যাঁ। অবশ্যই .....।"
আমি কাগজ গুলো এগিয়ে দিলাম,আমার অদৃশ্য প্রেমিকার দিকে।মেয়েটি পড়তে লাগল। বেশ কিছু সময় পর হঠাৎ টপ টপ করে জল পড়তে লাগল আমার লেখা গুলোর উপরে। বুঝলাম মেয়েটি কাঁদছে।
আমি বললাম,—"কাঁদছেন কেন? এ সব মনের কল্পনায় লেখা গল্প। এ সব পড়ে কেউ কাঁদে নাকি?"
পড়া শেষ হতেই মেয়েটি যেন উঠে দাঁড়াল। "আপনি খুব খারাপ....আমি আর কখনো আপনার কাছে আসব না। আপনি আমারই জীবন কাহিনি নিয়ে গল্প লিখেছেন"— এই বলে মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল হাওয়া হয়ে। আমি ছুটে গেলাম বারান্দায়।সোহিনী!..সোহিনী!
না,আর তাকে পায়নি।সোহিনী আর আসেনি। আজও রাত জেগে বসে থাকি।সোহিনীর অপেক্ষায়।সে এলে বলব,-"সোহিনী,তোমার গল্পটা পড়ে,সবাই কেঁদেছিল।"


স্বদেশ কুমার গায়েন [২০১২ ]

No comments

Powered by Blogger.