আদর ~অনুগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


আমি যেখানে ভাড়া থাকি,তার ঠিক সামনের দোতলা বাড়িতে বৌদি টি থাকে। আমার ঘরের সামনে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা। তারপর পাঁচিল ঘেরা সেই দোতলা বাড়ি। বাড়িটির চারিপাশে রঙবেরঙের ফুল বাগানে ঘেরা। এক কথায় সাজানো গোছানো। সত্যিই তো! একরকম বাড়িতেই, ওই রকম বউ ই মানায়। কর্মসূত্রে দু'বছর এখানে আছি আমি। মাস সাতেক হল ওই বাড়ির দাদা,মেয়েটিকে বিয়ে করে এনেছে। তাই সেই সূত্রে আমি মনে মনে বৌদি বলে ডাকি। টুকটুকে ফর্সা গায়ের রঙ। পটল চেরা চোখ,আর হালকা গোলাপি রঙের ঠোঁট টা আমি দুর থেকেও দেখতে পেতাম। ছিপছিপে পাতলা ভরন্ত যৌবনা পুর্ন শরীরের উপর হালকা হলুদ রঙের শাড়ীটা টা বেশ মানাতো। মনে হত এক হলদে রঙের প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। স্নান সেরে ভেজা শরীরে দোতলার বারান্দায় এসে,মাথার কালো চুল গুলো থেকে জল ঝাড়তো; তখন সেই জলের ফোঁটা যেন ছিটকে এসে আমার পাঁজরের উপর টুপ টাপ করে কম্পনের ঢেউ তুলতো।
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে,বাইরে বেরোতেই বৌদিকে দেখতে পেতাম দোতলার বারান্দায়। আমাকে অবস্য সে কোনোদিনও দেখিনি। কোনো কোনো দিন সকালে উঠেই দেখতাম, বারান্দার লোহার গ্রিল ধরে বৌদি দাঁড়িয়ে আছে। চুল গুলো এলোমেলো,অবিনস্ত্য; বুকের উপরের কাপড় টা একপাশে সরে গেছে। অস্পষ্ট হলেও তবু দেখা যেত যে,মাথার সিঁদুরটা, সারা কপালে লেগে আছে। মনে মনে খুব হাসি পেত আমার। বিয়ে থা না করলেও বুঝতে পারতাম,– এসব রাতে, দাদার অতিরিক্ত আদর করার ফল। সত্যিই তো! ঘরে অমন সুন্দর বউ থাকলে, সবারই বেশী বেশী আদর করতে ইচ্ছে হয়। মনে মনে একপ্রকার খুশিই হতাম যে,বৌদি খুব সুখেই আছে। দাদা, কোনো কিছুরই অভাব রাখেনি।
সেদিন রাতে রান্নার জোগাড় করছিলাম। বাজার থেকে রুই মাছ কিনে এনেছি। ফুলকপি আর আলু দিয়ে ঝোল হবে। হঠাৎ আমার মালিকের বাড়িতে একটা চাপা মেয়েলি কন্ঠের আওয়াজ পেলাম। বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখি,পাশের বাড়ির সেই বৌদি দাঁড়িয়ে। মনের মধ্যে একটা কোকিল ডেকে উঠল,– আজ খুব কাছ থেকেই বৌদিকে দেখতে পাব। কাঁচা লঙ্কা নেওয়ার বাহানায়, মালিকের বাড়ি পা বাড়ালাম। ভেতরে ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করলাম। বৌদি বারান্দার ওঠার সিড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু আগে যে খুব কেঁদেছে, সেটা চোখ দেখেই বুঝতে পারলাম। একটু পাশে যেতেই চমকে উঠলাম,আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। ইলেক্ট্রিক শক খেলে, বোধ হয় এত জোরে ধাক্কা লাগতো না। হাল্কা টিউব লাইটের আলোয়,পরিষ্কার দেখতে পেলাম ধবধবে সাদা হাত দুটোতে চুল বাঁধা ফিতের মতো কালো কালো দাগ। রক্ত জমাট বেঁধে যেন কালসিটে পড়ে গেছে। পিট ও ঘাড়ের কাছেও লাল হয়ে আছে। মনের ভেতর খুব কষ্ট অনুভব করলাম।
আদরের দাগ এত কালো হয় বুঝি!
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.