রাতের বিভীষিকা ~ছোট গল্প [স্বদেশ কুমার গায়েন]



এঘাটে-ওঘাটে ধাক্কা খেতে খতে অবশেষে রেল পুলিশে একটা চাকরী পেলাম। আমার পোস্টিং হয়েছিল খড়গপুর। বাড়ির সবাই তো খুশি। আমারও যে খুব একটা খারাপ লাগছিল তা নয়। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে অত দূরে গিয়ে চাকরী করতে হবে ভেবে কষ্ট হচ্ছিল। যাইহোক,নিদিষ্ট দিনে বাক্স,প্যাঁটরা গুছিয়ে রওনা দিলাম খড়গপুর। চাকরীতে যোগ দেওয়ার পর, আমার ডিউটি পড়ল খড়গপুর থেকে টাটানগর লাইনে যেতে ঠিক তিনটি স্টেশন পর একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যে।
— কি, অবাক হলেন তো!
আমিও প্রথম অবাক হয়েছিলাম। একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যে আর.পি.এফ. এর কি ডিউটি থাকতে পারে? আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস অ্যাক্সিডেন্টের কথা। তারিখ টা ২৮ মে, ২০১০। একটা ভয়ঙ্কর রেল দুর্ঘটনা পশ্চিমমেদনীপুরের খেমাশুলি ও সারদিয়া স্টেশনের মাঝে। হ্যাঁ, খবরের কাগজে পড়েছিলাম সেই সময়,কিন্তু সেই দুর্ঘটনাগ্রস্থ এক্সপ্রেস ও মালগাড়ীর বগি পাহারা দেওয়া আমার ডিউটি হবে, সেটা কখনো কল্পনাতেও ভাবিনি।

দুপুরে দুজন পুলিশ আমাকে পৌছে দিয়ে গেল আমার ডিউটি স্থানে। যদিও আমি একা নই, একজন সিনিয়র পুলিশ ও থাকবেন আমার সাথে। আমার ডিউটি স্থানে পৌঁছে, চারিপাশে যতদুর দূর চোখ যায় একবার তাকালাম। ফাঁকা, ধূ ধূ মাঠ।মাঝে মাঝে উঁচু মাটির টিলা আর ছড়ানো ছেটানো খেজুর আর তালগাছের সারি। সাপের মতো বাঁকতে বাঁকতে টাটানগরের দিকে যাওয়া রেললাইনটির ওপাশে ইউক্যালিপটাস ও ঘন বাঁশের জঙ্গল। কাছে পিঠে কোনো জনবসতি নেই। প্রায় আট কিলোমিটার দূরে একটা ছোটো গ্রাম দেখা যায়। রেল লাইনের দুপাশে পড়ে থাকা সেই সব ভাঙা বগি গুলোকে দেখে যেন পুরানো স্মৃতি ফিরে এল,মৃত সেইসব মানুষ গুলোর কথা মনে পড়ল। সবথেকে অবাক হলাম, আমাদের থাকার ঘরটা দেখে-দুর্ঘটনাগ্রস্থ একটা ভাঙাচোরা রেলবগির কামরা। মনটা আমার ভেঙে গেল।
আমার সিনিয়র পুলিশ টি, আমাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিলেন— কখনো রাতে একা একা বাইরে বের হবে না, বন্দুক সবসময় সাথেই রাখবে, রাতে এক সাথে দুজন ঘুমানো যাবে না; আরও অনেক কিছু।
প্রথম প্রথম একট কষ্ট হলেও কিছুদিনের মধ্যে বেশ মানিয়ে নিয়েছিলাম। প্রতিদিন সকালে আট কিলোমিটার লাল মাটির রাস্তায় মোটর সাইকেল চালিয়ে গ্রামের ভেতর থেকে স্নান ও খাওয়ার জল এবং রান্নার বাজার করে আনা, তারপর দুজনে মিলে রান্না করা, খাওয়া দাওয়া, গল্প অনেককিছু। বিকালে মাঠের উপর চেয়ার পেতে ফাঁকা মাঠ টিকে দেখতাম, রেল গাড়ির যাতায়াত দেখতাম, দুরের গাঁ থেকে ঘরের বউ, মেয়ে, বাচ্চা রা রেল লাইনে কয়লা কুড়োতে আসত— তাদের সাথে মাঝে মাঝে গল্প করতাম সন্ধ্যা পর্যন্ত।
সত্যি! একটা মনোরম অ্যাডভেঞ্চার পরিবেশ।
কিন্তু বেশি দিন আর এই সুখ টিকলো না। সেই রাতটার কথা মনে পড়লে,আজও আমার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। রাত তখন পৌনে একটা। আমি জেগে বসে আছি। সিনিয়র পুলিশটি পাশেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। হঠাৎ বাইরে থেকে মানুষের ফিসফাস, কথাবার্তা র আওয়াজ পেলাম। আমি একটু নড়ে চড়ে বসলাম।— মাওবাদী র উৎপাত এদিকে খুব বেশী। সে'কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁক করে উঠলো।
কামরার দরজা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়ালাম। আবছায়া চাঁদের আলো পুরো মাঠ জুড়ে।সেই চাঁদের আলোয় দেখতে পেলাম রেল লাইনের উপর কিছু মানুষ বসে আছে।আর কিছুজন ভাঙা রেলবগির পাশে দাঁড়িয়ে। তা প্রায় আট দশ জন হবে। আমি বন্দুক আর টর্চ লাইট নিয়ে বাইরে বেরিয়ে হাঁক দিলাম,— "কে ওখানে?"
টর্চ লাইট মারতেই মানুষ গুলো সরে গেল বগির আড়ালে। ভাবলাম, এ নিশ্চয় চোর— ট্রেনের পাত চুরি করতে এসেছে। কিন্তু না, টর্চের আলো বন্ধ করতেই আবারও দেখি তারা রেল লাইনের উপর বসে আছে। বন্দুক হাতে নিয়ে সেই দিকে এগিয়ে গেলাম।কাউকেও দেখতে পেলাম না। কিন্তু ফিসফাস আওয়াজ আসতে লাগল।
— রাত দুপুরে একি বজ্জাতি!
আমার মাথায় জেদ চেপে গেল। সিনিয়র পুলিশ কেও ডাকতে ভুলে গেলাম। বন্দুক নিয়ে ছুটে গেলাম ভাঙা রেল বগির আড়ালে। না! কাউকেও দেখলাম না। গেল কোথায় লোক গুলো?
এদিন - ওদিক টর্চ মেরে পড়ে থাকা বগি গুলো দেখলাম। কাউকে দেখতে পারলাম না। হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি রেল লাইনেই বসে আছে লোক গুলো। কড়া গলায় হাঁক দিলাম,— " কে তোমরা? রেল লাইনে বসে আছ কেন?"
মনে হল মানুষ গুলো হেসে উঠল। আমি তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই, তারাও উঠে এগিয়ে যায়। মাথা গরম হয়ে গেল আমার। আবার পিছন দিক থেকে হাসির আওয়াজ পেলাম। তাকিয়ে দেখি এদিকেও কয়েকজন রেল লাইনের উপর বসে আছে। আমি হতবম্ভ হয়ে গেলাম।কোন দিকে যাব বুঝতে পারছি না। শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে।
হাতের ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত ১ টা বাজে। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস আসার সময় হয়েছে এই লাইনেই।দূর থেকে ট্রেনে হর্নের আওয়াজ পেলাম। কিন্তু মানুষ গুলো লাইন থেকে উঠছে না কেন? আমি একা দিকভ্রান্তের মতো লাইনের উপর দিয়ে ছুটোছুটি করছি,— একবার ওদিক, একবার এদিক।-"এই লাইনের উপর থেকে সরে যাও। ট্রেন আসছে।"
এক্সপ্রেস এর হেডলাইটের আলো দেখতে পেলাম। বোধ হয় কাছেই এসে পড়েছে। কিন্তু আমার সে খেয়াল নেই। আমি রেল লাইনের উপর বসে থাকা মানুষ গুলোর দিকে ছুটছি এক অদ্ভুত নেশায়।কিন্তু নাগালে পাচ্ছি না তাদের। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে নিজেই বসে পড়লাম ট্রেন লাইনে। ট্রেন থেকে মাত্র দশ-বিশ দূরে বসে আছি। লোক গুলোও লাইনের উপর বসে পড়েছে। আমার আর উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। হঠাৎ পাশেই পড়ে থাকা দুর্ঘটনাগ্রস্থ ভাঙাচোরা রেল বগির ভেতর দিয়ে যেন মানুষের করুন আর্তনাদ ভেসে এল। ট্রেন হর্ন দিচ্ছে ,আমার কোনো শব্দ ই কানে ঢুকছে না। তাদের করুন আর্তনাদে কোনো শব্দই আসছে না আমার কাছে। হঠাৎ একটা ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে গেলাম রেল লাইনের ওপারে। আর কিছু মনে নেই আমার।

ঘুম ভেঙে দেখি সকাল হয়ে গেছে। সিনিয়র পুলিশ টি বসে আছে আমার পাশে চা নিয়ে। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই জিজ্ঞাসা করলেন, — "কাল রাতে ওভাবে রেল লাইনে বসে ছিলে কেন? আরেকটু হলে মারত্মক অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেত।"
আমি সংক্ষেপে তাকে সমস্ত ঘটনা বললাম। তিনি সব শুনে খড়গপুর হেড অফিসে ফোন করে দিলেন। দুপুরে দুজন পুলিশ এসে আমাকে নিয়ে গেল। এরপর কয়েকদিনের মধ্যেই আমার ট্রান্সফার হয়ে গেল হাওড়ার কাছেই।

'নীরব ভালবাসা' গল্পটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.