মেঘ–রৌদ্দুর ~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


(১)

ক্লাস ঘরের জানালার পাশের বেঞ্চটিতে বসে আছে মিতালি। এরকম টিফিন আওয়ারে,সে ঘরে বসে থাকার মেয়ে নয়।তবু আজ বসে আছে। জানালার বাইরে একটা বড় পেয়ারা গাছ, মাথা দোলাচ্ছে। সেটার দিকে তাকিয়ে মুখ গুমরে গুমরে কাঁদছে মিতালি। মা,বাবা বকাবকি করলে অনেকসময় একটা শিশু যেমন করে, ঠিক তেমন।কোনো শব্দ হচ্ছে না।শুধু চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে।মাঝে মাঝে হাত দিয়ে চোখের জল টা মুছে নিচ্ছে।কিন্তু মিতালি তো বাচ্চা নয়! সে এবার ক্লাস নাইনে উঠেছে । যতেষ্ট বড়,তাকে দেখলে কেউ বাচ্চা বলবে না। যেদিন তার মা বলে দিয়েছে,–পাড়ার ছেলে গুলোর সাথে আর মেলামেশা বন্ধ কর,তুই এখন বড় হয়ে গেছিস। সেদিনেই মিতালি বুঝে গেছে,সত্যি সে হয়তো বড় হয়ে গিয়েছে।কিন্তু তার কান্নার কারন কি? টিফিনের আগের পিরিয়ডে শিক্ষকরা কি বকাবকি করেছে?– না সেরকম তো কিছু ঘটেনি।তবে কি প্রেম ঘটিত কেস? না, সেটাও নয়। তবে এই বয়েষে একটা মেয়ে কি কারনে কাঁদতে পারে? টিফিনের সময় তার সব বন্ধুরা একে একে বাইরে চলে গেল,কিন্তু সে না গিয়ে,বেঞ্চে বসে বসে চোখের জল ফেলছে।

স্কুল টা সরল রেখার মতো সবুজ মাঠের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে। দোতলা বিল্ডিং।নীচের তলার, ক্লাস নাইনের ঘরের ঠিক পাশেই টিচার্স রুম। ফাঁকা ক্লাসে বসে একটা মেয়ের এরকম নীরব কান্না,অনুরাধা ম্যাডামের চোখ এড়ালো না। পুরো নাম অনুরাধা চট্টোপাধ্যায়।আমার গল্পের নায়িকা মনে করতে পারেন।পাতলা,চিকন চেহারা। ফর্সা, গোল মুখের,শিশির ভেজা ঘাসের মতো চকচকে ঠোঁটে,একটা ছোট্টো কালো তিল। চোখে একটা নীল ফ্রেমের চশমা।বয়স খুব বেশি হলে সাতাশের কাছাকাছি। হাঁটা–চলা, কথা– বার্তায়, চোখের চাহনিতে শহুরে ভাবধারা স্পষ্ট। মাস খানেক হল,গ্রামের এই স্কুলে বাংলা বিষয়ের শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিয়েছেন। মূলত নবম ও দশম শ্রেনীর বাংলা পড়ান।
বাইরে মাঠে যাওয়ার জন্য,নবম শ্রেনীর ক্লাসের সামনে যেতেই, মিতালির দিকে চোখ পড়ল অনুরাধার।সোজা মিতালির সামনে গিয়ে বললেন," কি রে মিতালি! কাঁদছিস কেন?"
মিতালি থতমত খেয়ে তাকায়। চোখের জল মুছে,একটা মিথ্যে হাসির চেষ্টা করে।– " কই না তো ম্যাডাম।"
-" লুকিয়ে,কিছু লাভ নেই।আমাকে বল কি হয়েছে?"
মুখ টা নীচু করে চুপ করে থাকে মিতালি। অনুরাধা আবার জিজ্ঞাসা করে,-বলবি আমায়?" শত চেষ্টা করেও মিতালি আর চুপ করে থাকতে পারল না। বাঁধ দিয়ে ধরে রাখা জল,হঠাৎ ছেড়ে দিলে যেমন মুক্তির আনন্দে বাইরের মৃত্তিকার উপর আছড়ে পড়ে,তেমনি মিতালির যন্ত্রনা গুলো মনের বাঁধ ভেঙে বাইরে আছড়ে পড়ল।–" ম্যাডাম আমি এখন বিয়ে করতে চাইনা; পড়াশুনা করতে চাই। বাড়ি থেকে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। এ সপ্তাহে  আমার বিয়ে।"
–" কি বলছিস এসব,তোর এখন কতটুকু বয়েস! এখনতো বিয়েরই বয়েস হয়নি।"
অনুরাধা,মিতালির পাশে বসে,মাথায় হাত রাখে। মিতালি ম্যাডামের চোখের দিকে তাকায়।এক অনাশ্রিতা,যেমন করে তার আশ্রয়দাতার দিকে চেয়ে থাকে,ঠিক সেরকম।হাতের তালু দিয়ে চোখ ঘষে।
–" তুই কোনো চিন্তা করিস না।তোর বাবা– মায়ের সাথে আমি নিজে গিয়ে কথা বলব।" অনুরাধা মিতালির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে।
ঢং ঢং ঢং করে টিফিন শেষের ঘন্টা পড়ল। সবাই আবার ক্লাসে ফিরছে। মিতালির মুখ টা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। মনে হল কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে,এক চিলতে রোদ উঁকিঝুঁকি মারছে।


উত্তর চব্বিশ পরগনার একটা ছোট্টো গ্রাম কোড়াকাটি। যেখানে ভোর বেলা মোরগের ডাকে সবার ঘুম ভাঙে,আর সন্ধ্যা বেলা সবাই ঘরে ফেরে উলুধ্বনির শব্দে। যেখানে সোনালী ধানের ক্ষেত,মাতাল হাওয়ায় মাথা দোলায়, সবুজ মাঠে ঘাস ফড়িং এর দল লাফিয়ে বেড়ায়; আর সূর্য টা নব বধূর কপালের সিঁদুরের মতো লাল হয়ে তেপান্তরের ওপারে টুপ করে হারিয়ে যায়।আমার এই গল্পটির পটভূমি এই গ্রাম কে কেন্দ্র করেই। এ গ্রামে বিদ্যুতের আলো অনেক আগে পৌঁছালেও, আধুনিক মানসিকতা, ধ্যান– ধারনার আলো যে এখনোও প্রত্যেক মানুষের মানুষের মনে পৌঁছোতে পারেনি, সেটা বিভিন্ন ঘটনায় পরিষ্কার। আজও কত মেয়েদের অপ্রাপ্তবয়েসেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে,তার খবর বিশেষ কেউ রাখে না। সেরকম একটা মেয়ে মিতালি।যেদিন সে পনেরো বছরে পড়ল,সেদিন তার সারা শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে একটা নতুনত্বের হিল্লোল উঠল।পূর্নিমার জোয়ারের ন্যায় যৌবন তার শরীরের উপকূলে এসে ঢাক্কা মারতে লাগল।আর যেদিন শুনেছিল, তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে গ্রামের প্রধানের ছেলের সাথে, সেদিন মিতালি তার মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে খুব কেঁদেছিল।–"মা আমি এখন বিয়ে করব না। পড়াশুনা করব।"
– " মুখপুড়ি! হতভাগী! এত বড় সম্বন্ধ আর কোনোদিন পাবি?তোর চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্যি! পড়াশুনা কোন পূজোয় লাগবে শুনি?"
মিতালির মা মুখ ঝামটা দিয়েছিল সেদিন।


আজ বিকেলের আকাশ টা পরিষ্কার। সাদা সাদা শিমুল তুলোর মতো মেঘ আকাশ জুড়ে।স্কুলের ছুটির ঘন্টা বেজে গেছে কিছু আগেই। ক্লাস থেকে বেরিয়ে মিতালি বাইরের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। আজ অনুরাধা ম্যাডাম তাদের বাড়িতে যাবে। একটা বড় দোচালা মাটির ঘর। উপরে টিনের ছাউনি।অনুরাধা বাড়ির ভেতর ঢুকতেই, মিতালি তাড়াতাড়ি একটা পুরানো কাঠের চেয়ার বের করে বারান্দায় বসতে দেয়। বাবা,মাকে ভেতর থেকে ডেকে আনে।
-" নমষ্কার! মেসোমশাই,আমি অনুরাধা।মিতালির স্কুলের শিক্ষিকা।" অনুরাধা দাঁড়িয়ে ওঠে।

মিতালির মা–বাবা অবাক হয়ে যায়।তাদের বাড়িতে হঠাৎ স্কুলের শিক্ষিকা!–" কি ব্যাপার বলেন তো?"
অনুরাধা সরাসরি প্রসঙ্গে চলে যায়।–" দেখুন, মিতালির কিন্তু এখন বিয়ের বয়েস হয়নি। ওর শরীর,মন কোনোটিই এখনোও বিয়ের উপযুক্ত নয়। তাই এখন ওর বিয়েটা দেওয়া ঠিক হবে না। আঠেরো বছর টা পার হয়ে যাক,তার পর না হয়....."
অনুরাধার কথা আর শেষ হল না,তার আগেই মিতালির বাবা বলল," আমার মেয়ের বিয়ে আমি ঠিক করব! আপনি ঠিক করার কে?"
–" দেখুন,আপনারা কেন বুঝতে পারছেন না,ও এখন বিয়ের উপযুক্ত হয়নি! আর, তাছাড়া ও নিজেই বিয়ে করতে চাইছে না।ওর মনের অবস্থাটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন!"
–"সেটা আপনারে বলতে হবে না। আমরা বুঝব।"
অনুরাধা এবার মিতালির মায়ের দিকে তাকায়।–" মাসীমা,আপনি তো একটু বোঝার চেষ্টা করুন! আপনি তো একজন মেয়ে। আর তাছাড়া আঠেরো বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া কিন্তু আইনত অপরাধ।"
এবার মিতালির বাবা,অনুরাধার চোখের দিকে চাইলো।–" আপনি কি,আমাদের ভয় দেখাচ্চেন?"
– " না ভয় দেখাচ্ছি না। আপনাদের কে বোঝানোর চেষ্টা করছি–যেটা করছেন সেটা একটা ভুল।এর পরেও যদি জোর করে মিতালি কে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন,তাহলে আমি কিন্তু আইনের সাহয্য নিয়ে বিয়েটা বন্ধ করব!"
অনুরাধা আর দাঁড়াল না।বারান্দা থেকে নেমে, উঠান পেরিয়ে মাটির রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করল। ঘরের ভেতর,দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মিতালির নীরব চোখের জল টপ টপ করে মেঝেতে পড়তে লাগল।

(২)

—" দেখুন ম্যাডাম আপনার কথা সব বুঝতে পারছি,কিন্তু এই ছোটোখাটো ব্যাপারে আমাদের নাক গলাবার সময় নেই। আপনি বরং মেয়ের বাবা–মা কে আরও একবার ভাল করে বোঝান।" মাথা চুলকাতে চুলকাতে থানার বড় বাবু বললেন।
অনুরাধার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।স্পষ্ট ভাষায় জবাব দিল,"আপনাদের এই ব্যাপার টা ছোটো খাটো মনে হচ্ছে? একটা অন্যায় হচ্ছে জেনেও চুপ করে বসে থাকবেন?"
–" দেখুন,সব বুঝতে পারছি। কিন্তু সামনে ভোট, বুঝতেই পারছেন।সবাই খুব ব্যস্ত।এ সপ্তাহে কিছু করতেই পারব না।"
থানায় দাঁড়িয়ে যে অযথা সময় নষ্ট হচ্ছে,সেটা অনুরাধার বুঝতে আর বাকি রইল না।তাই অবশেষে ঠিক করল,বি.ডি.ও অফিসে গিয়ে একবার এটা নিয়ে কথা বলাই শ্রেয়।
থানা থেকে বেশি দুরে নয় বি.ডি.ও. অফিস। থানার বাইরে বেরিয়ে, রাস্তার পাশের এক দোকানি থেকে অফিসের ঠিকানাটি জেনে নিল অনুরাধা। রঙবেরঙের নানা ফুল গাছে সাজানো অফিসের সামনের বাগান টা।হলুদ,সবুজ,খয়েরি রঙের বাহারি ফুল। অনুরাধা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে সোজা বি.ডি.ও র ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একজন সাদা পোষাক পরা লোক দাঁড়িয়ে আছে।
–"অফিসারের সাথে একটু দেখা করা যাবে কি?"
সাদা পোষাক পরিহিত লোকটি অনুরাধার দিকে তাকালো। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল," প্রধানের সার্টিফিকেট এনেছেন?"
– " এরকম কোনো নিয়ম আমার জানা নেই,তাই আনা হয়নি। আপনি ভেতরে গিয়ে বলুন,নইলে আমি জোর করে ঢুকতে বাধ্য হব।"
সাদা পোষাকের লোকটি আর বেশি কথা বলার সাহস দেখালো না। ভেতরে ঢুকে গেল।পরক্ষনে বাইরে এসে বলল–একটু ওয়েট করুন ম্যাডাম। মিনিট সাতেক পর অনুরাধার ডাক পড়ল।
বি.ডি.ও সাহেব টি মন্দ নয়।গ্রামের মানুষ গুলোর কাছে তিনি খুব প্রিয়। গ্রামের প্রতিটি মানুষ যাতে সবাই সমান সুযোগ,সুবিধা পায় সেদিকে নিজেই খেয়াল রাখেন।পুরো নাম রোহন কুমার রায়। লম্বা,চওড়া চেহারা। মাথায় ছোটো ছোটো করে কাটা কালো চুলে ভর্তি। বছর দু'য়েক হল এই গ্রামে এসেছে। হলুদ ফাইল কভারের ভেতরের সাদা কাগজ গুলো সই করতে করতে, মুখ না তুলেই বললেন," আপনাকে কি সাহয্য করতে পারি?"
অনুরাধা কোনো গৌরচন্দ্রিকা টানলো না। চোখের উপর থেকে চুল টা সরিয়ে বলল, -"আপনার এলাকাতে একটা অপ্রাপ্তবয়ষ্ক মেয়ের জোর করে,তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে– যেটা একটা অন্যায়। মেয়ের বাবা–মা কে বুঝিয়ে কোনো লাভ হয়নি,পুলিশের কাছেও ব্যাপার টা গুরুত্বহীন–তাই বাধ্য হয়ে আপনার কাছে আসা।"
–"লোকাল প্রধান কে ব্যাপার টা জানিয়েছেন?"
—"সেটা মনে হয় ঠিক নয়। কারন বিয়েটা প্রধানের ছেলের সাথেই হচ্ছে।"
এবার বি.ডি.ও.সাহেব,অনুরাধার দিকে চোখ রাখলেন।তারপর জিজ্ঞাসা করলেন,"আপনি কি করেন?"
–"কোড়াকাটি হাই স্কুলে শিক্ষকতা করি। আশা করি আপনি স্কুলটা চেনেন। দেখুন,আমার কাজ টা আমি করে গেলাম; এবার আপনার কি করনীয় কর্তব্য সেটা করবেন!" কথা গুলো ঝড়ের মতো বলে,বেরোনোর দরজার দিকে পা বাড়াল অনুরাধা।
–"অনু!" পেছন থেকে বি.ডি.ও সাহেবের এই ডাকটি,অনুরাধা কে এক মুহুর্তের জন্য থামিয়ে দিল।ঘাড় ঘুরিয়ে,চোখে চোখ রেখে স্পর্ষ্ট ভাবেই উত্তর দিল অনুরাধা।–" অনুরাধা চট্টোপাধ্যায় বলবেন।অনু নয়।"দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল সে। সেই আধভেজানো দরজার দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলেন বি.ডি.ও সাহেব।

বাইরের ছায়াময় পিচ ঢালা রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনুরাধার মনে হল তার চোখ দুটো,অজানা কারনে যেন ভিজে উঠেছে।

(৩)

সেদিন কি আকাশ টা, গায়ে হলুদ মেখেছিল? হয়তো না।বৈশাখের অপরাহ্নে কালো কালো মেঘ গুলো আকাশের এক কোনে লুকিয়ে ছিল ওৎ পাতা শিকারির মতো–একটু সুযোগ পেলেই  হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়বে ভূপৃষ্ঠের উপর। খড়– কুটোর মতো শুকনো বাদামি পাতা গুলো,পিচ রাস্তার ধুলো,ছেঁড়া সাদা কাগজ গুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল একটা দমকা হাওয়ায়। শেষ বিকেলের সেই ঝোড়ো হাওয়া,আর টিপ টিপ বৃষ্টি– আস্তে আস্তে আরও ঘন হয়ে এল।জনশূন্য নির্জন রাস্তায় পাশে,একটা টিনের শেডের নীচে কোনোরকমে আশ্রয় নিয়েছিল দুটি প্রানী। চারিদিকটা ঘন বর্ষায় যেন,সবকিছু আরও অস্পষ্ট হয়ে এল কিছুক্ষনের মধ্যে।বৃষ্টির এক এক ঝাপটা শেডের ভেতর ঢুকে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে।ভিজে উঠছে দু'টো শরীর।রোহনের দু'হাতে জড়ানো, অনুরাধারার শরীর টা ঠান্ডায় একটু একটু কাঁপছে। কলেজের শেষে দু'জন কোনোদিন গাড়িতে আসে না।হাঁটতে,হাঁটতে গল্প করতে করতে বড় রাস্তায় উঠে বাস ধরে দুজন। কিন্তু আজকের ঘোর বর্ষা দুজনকে যেন খুব কাছে এনে দিল। সামনের ঝাঁকড়া শিরিষ গাছের ডালের ফাঁকে জল ভেজা দু'টি ঘুঘু পাখি জোড়োসড়ো হয়ে আছে। বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত, অনুরাধা তার ঠোঁট দু'টো ডুবিয়ে রেখেছিল রোহনের ঠোঁটে,– হয়তো একটু উষ্ণতার জন্য। এই প্রথম চুম্বন,রক্তের কনা গুলো যেন গতি বাড়িয়েছিল দুটি শরীরে।তারপর আর কোনোদিন একসাথে কলেজ থেকে ফেরেনি তারা।
বি.ডি.ও অফিস থেকে ঘরে ফেরার পথে,সেই কলেজের দিন টা আজ আবার মনে পড়ল অনুরাধার। রোহনের অহংকার ছিল না,কিন্তু ও স্বার্থপর ছিল কি?তা থাকতেই পারে।
ঝামেলা টা বেঁধেছিল,প্রথম চুম্বনের পরের দিন। কলেজের বড় মেহগনি গাছটির নীচে বসে ছিল দুজন।
–" রোহন,তোর সাধরন,অসহায়, গরীব মানুষদের জন্য কিছু করতে ইচ্ছে করে?.....অন্যায় দেখলে, তার বিরুদ্ধে কিছু করতে ইচ্ছে করে না?"অনুরাধা রোহনের হাতে হাত রাখে।
হো হো হো করে হাসে রোহন।–"আমি কি তোর মতো পাগল যে অন্যায় দেখলেই ছুটে যাব! সব সময় অসহায়,গরীব মানুষ গুলোর কথা ভাববো!–আপনি বাঁচলে বাপের নাম! যেচে বাওয়াল নেওয়ার অভ্যাস আমার নেই।নিজের ভাল থাকাটাই আসল,বুঝলি! বাড়ির পাশে কে কিরকম আছে, সেটা ভেবে কোনো লাভ নেই!"
অজান্তেই রোহনের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়েছিল অনুরাধা।এক বছরের সম্পর্ক তাদের,কিন্তু রোহন যে এরকম মানসিকতার ছেলে–সেটা কোনোদিন বুঝতে পারিনি অনুরাধা।
কি করে এরকম দুটো আলাদা পৃথিবীর মানুষ এক সাথে সারা জীবন কাটাবে?
পড়ন্ত রোদ মুখে মেখে সেদিনই সম্পর্কের ইতি টেনে দিয়েছিল অনুরাধা। না রাখাই ভাল এ সম্পর্ক! এরকম একটা নীচ মনোভাব সম্পন্ন ছেলের সাথে,তার কি করে সম্পর্ক হল,সেটা ভেবে নিজেকেই দুষতে শুরু করল অনুরাধা।
আজ এত দিন পর,আবার সেই স্বার্থপর রোহনের সাথে আরও একবার দেখা হল অনুরাধার।


(৪)

ঘড়িতে বিকেল সাড়ে তিনটে বাজে।দশম শ্রেনীর স্পেশাল ক্লাস টি সেরে টিচার্স রুমে ঢুকতেই চমকে উঠল অনুরাধা। বি.ডি.ও. সাহেব ও দু'জন পুলিস বসে আছে। –রোহন সত্যিই এল!
এত বড় একজন অফিসার নিজে এল!কিছুটা অবাক হল অনুরাধা।
বি.ডি.ও সাহেব ও দু'জন পুলিশ কে সঙ্গে করে নিয়ে পাড়ার মধ্যে ঢুকল অনুরাধা। গ্রামের মানুষ সবাই বেরিয়ে বি.ডি.ও সাহেব কে প্রনাম করতে লাগল।নমস্কার সাহেব,পেন্নাম সাহেব......!
মানুষগুলোর এহেন ব্যবহারে অনুরাধা খুব অবাক হয়ে গেল। দেখল,–রোহন ও যতটা পারছে দুহাত জোড়ো করে নমস্কার করছে।
এরা সবাই রোহন কে চেনে নাকি!– নিজের মনে মনে ভাবল অনুরাধা। মিতালির বাড়িতে ঢুকতেই অনুরাধা বুঝতে পারল,– তারাও রোহন কে চেনে।
—" বাবু, আপনি আমাদের ঘরে!"
চেয়ারে বসে,বেশি ভূমিকা করল না রোহন। –"আপনারা বুঝতে চান না কেন,বলুন তো? আঠেরো বছরের নীচে মেয়ের বিয়ে দেওয়া মানে সেই মেয়েটির ক্ষতি! আপনারা কি নিজের মেয়ের ক্ষতি চান?"
এতক্ষনে মিতালির বাবা বুঝতে পারল,বি.ডি.ও সাহেব আসার কারন। অনতিদূরে দাঁড়ানো অনুরাধার দিকে চোখ তুলে তাকালো।
–" কিন্তু বাবু,আমরা যে গরীব! আর তাছাড়া প্রধান সাহেব নিজে থেকেই....!"
–"সরকার থেকে আজকাল সব সুযোগ–সুবিধা করে দিচ্ছে। বিয়ের জন্য ভাবছেন কেন? আর, এই অপরিনত বয়েসে একটা মেয়ের বিয়ে দিলে কি কি ক্ষতি হতে পারে সেটা ওনার কাছ থেকে পরে জেনে নেবেন! বাবা–মা হয়ে নিশ্চয় মেয়ের ক্ষতি চাইবেন না!"
রোহন, অনুরাধার দিকে হাত দিয়ে দেখায়।–" উনি আপনাদের ভালোর জন্যেই বলছেন।আর প্রধান কে আমি সব বুঝিয়ে দেব।"
মিতালির বাবা, উপর-নীচে মাথা নাড়ায়।–" আপনার জন্যেই তো আজ এই গ্রামের মানুষ আজ সুখে আছে। আপনি যা বলবেন,তাই করব,বাবু।"
রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো মোটর ভ্যানটা কে ডাকল একটা পুলিশ । অনিচ্ছার সত্বেও অনুরাধা চেপে বসল। বার বার রোহনের দিকে তাকাচ্ছে সে। সত্যি সে ভুল দেখছে না তো? এ কি সেই রোহন! একটা,অচেনা,অজানা মানুষ যেন তার সামনে! মৃত মানুষ কে কিছুদিন পর জীবন্ত দেখলে যেরকম হয়,ঠিক সেরকম আশ্চর্য হল অনুরাধা।
প্রধানের বাড়ির সামনে ভ্যানটা এসে থামল। পুলিশ দুজন কে সঙ্গে নিয়ে রোহন বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।প্রধান সোমনাথ মহাশয় বাড়িতেই ছিলেন। হঠাৎ বি.ডি.ও সাহেবের আগমনে তিনি ইতস্তত হয়ে জলখাবারের আয়োজন করতে শুরু করলেন।
-" আরে অত বিচলিত হবেন না,সোমনাথ বাবু! আমি একটা ছোট্টো ব্যাপারে এসেছি।" বারান্দায় উঠে চেয়ারে বসতে বসতে রোহন বলল।
–" কি বলুন তো?" সোমনাথ বাবু ভুরু কোঁচকালো।
–" একটা আঠেরো বছরের নীচের মেয়েকে বৌমা করে আনছেন?"
–" না,মানে ছেলের খুব পছন্দ হল!"
–"বিয়েটা তো তিন বছর পরেই দিতে পারেন! আর তাছাড়া জানেন তো যেটা করতে চলেছেন, সেটা একটা আইনত অপরাধ!"
–" কি বলতে চাইছেন বলুন তো?"
–" বলতে চাইছি,বিয়েটা এখন বন্ধ করতে হবে। আর না করলে বুঝতেই পারছেন,সামনেই ভোট; এই ব্যাপার টা যদি আমার হাতের চিঠি মারফৎ উপর মহলে যায়, তাহলে আপনার ভোটের টিকিট.....!"
সোমনাথ বাবু কে রাজী করাতে, ত্রিশ সেকেন্ড সময় লাগলো না; তবে তার ক্রুর হাসি ও বক্র চাহনি রোহনের চোখ এড়ালো না। এমনিতে এখানে আসার শুরু থেকেই প্রধান  মহাশয়ের সাথে,তার সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়।তার উপর আজকের ঘটনা যে,তিনি ভাল চোখে নেবেন না,সেটা বেশ বুঝতে পারল রোহন।
পুলিশ সহ মোটর ভ্যান টিকে রোহন আগের তিন রাস্তার মোড়ে পাঠিয়ে দিল।অনেকদিন পর আজ আবার পাশাপাশি হাঁটছে দুজন। দু'পাশের গাছ–গাছালি ঘেরা ছায়াঘন রাস্তা।অনুরাধা চুপ করে,মাথা নীচু করে হেঁটে চলেছে।
–" অনু, তুই সেই একইরকম আছিস। একটুও পাল্টাস নি। সেই অন্যায় দেখলে ছুটে যাস!"
অনুরাধা, রোহনের দিকে চোখ তুলে হাসল।– "হ্যাঁ ঠিক বলেছিস। কিন্তু একজন যে এত পালটে গিয়েছে,সেটা কোনোদিন ভাবিনি!"
রোহন একটু হাসার চেষ্টা করল।কত দিন পর আবার তারা এক সাথে হাঁটছে,সেই কলেজের বন্ধুর মতো! মোটর ভ্যানের কাছে এসে পড়েছে দুজন।রোহন হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল," অনু,মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ফল টা এক সপ্তাহ পরে দেখতে পাবি।আজ আসি কেমন!"
থমকে দাঁড়াল অনুরাধা। কি বলতে চাইছে রোহন?
কালো ধোঁয়া উড়িয়ে মোটর ভ্যানটা রাস্তার উপর দিয়ে ছুটলো।অনুরাধা অপলক দৃষ্টিতে সেই কুন্ডলীপাকানো ধোঁয়ার দিকে চেয়ে রইল। –রোহন কি আগের মতো একবার তার দিকে ফিরে তাকাবে না?–কেন তাকাবে?– এ তো আর সেই রোহন নেই! একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল, অনুরাধার ঠোঁটের প্রান্তে।

(৫)

সপ্তাহ কেটে গেল দেখতে দেখতে। আকাশ পরিষ্কার করে সূর্য উঠল,পাখিরা নতুন আনন্দে কলরব শুরু করল,গাছে গাছে নব মুকুল প্রস্ফুটিত হল,আমের ডালে গুন গুন সুরে মৌমাছিরা দল বেঁধে বাসা বাঁধল, মিতালির বিয়েও বন্ধ হয়ে গেল,–আর রোহন তার সমস্ত জিনিষপত্র ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে, সরকারি সাদা চার চাকার গাড়িতে করে অনুরাধার স্কুলের সামনে এসে থামল। আজই তো তার এই গ্রামে শেষ দিন। স্কুলের বারান্দা থেকে, গাড়ির ভেতর বসে থাকা রোহন কে চিনতে পারল অনুরাধা।
দ্রুতো পায়ে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে রোহন বাইরে বের হতেই জিজ্ঞাসা করল,-"কি ব্যাপার রোহন?"
মৃদু হেসে রোহন বলল," এই দেখ,মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ফল! আমার ট্রান্সফার লেটার;পশ্চিম মেদিনীপুর।"
একটা কাগজ এগিয়ে দিল অনুরাধার দিকে। কাগজ টা হাতে নিতেই তার বুকের ভেতর টা যেন কেঁপে উঠল।আজ যে যন্ত্রনাটা অনুরাধা অনুভব করল,–সেটা এর আগে বোধহয় কোনোদিন করেনি।কলেজের মেহগনি গাছের নীচে, যেদিন রোহন কে,নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল সেদিন ও নয়।
অনুরাধার মনের সমুদ্র উত্তাল হল। আর সেই সব মত্ত তরঙ্গায়িত ঢেউ তার হৃদয়ের বেলাভূমিতে আছাড় খেয়ে পড়ল। তার কিছুটা শব্দ হয়তো রোহনের কানের মধ্যে দিয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করল।
একটা সাদা কাগজে,নিজের ফোন নাম্বার টা লিখে অনুরাধার হাতে দিয়ে বলল,-"যদি কোনোদিন মনে পড়ে,তবে ফোন করিস।"
গাড়িতে ওঠার সময় রোহনের এক টুকরো নীরব চাহনি,অনুরাধার চোখের পাতায় চিরদিনের জন্য আটকে গেল।আজ খুব ইচ্ছে হল ছুটে গিয়ে রোহন কে জড়িয়ে ধরতে।বুকে মুখ লুকিয়ে বলতে,–"আমাকে এখানে,একা ফেলে যাস না, রোহন!"
তারপর সাদা গাড়িটা একটু একটু করে চোখের বাইরে হারিয়ে গেল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.