প্রেমিকা ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


প্রেমিকা ~ছোট গল্প 

(১)

এই নিয়ে পাঁচবার রিং হয়ে গেল। তবুও ফোন টা তুললো না।এ মেয়ে টা কে নিয়ে সত্যি পারা যায় না।বিরক্ত হয়ে আরও একবার নাম্বার টা ডায়েল করলাম।সেই ঘ্যান ঘ্যানানি বিরক্তিকর শব্দ হতে হতে ফোনটা কেটে গেল। সাড়ে ন'টা বেজে গেছে অনেক আগেই।এতক্ষন ওর অফিস ও ছুটি হয়ে গেছে।তবুও ফোন টা কেন ধরছে না?
আমি শিওর ও নিশ্চয় ওখানে আছে। আসলে আমি জানি, এই রাতে ও কোথায় থাকতে পারে।ওই একটাই জায়গা ওর এখন ভালো লাগে। কি করি এখন এই রাতে? টেবিলের উপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি,রাত সাড়ে দশটা।জলদি প্যান্ট টা পায়ে,আর জামাটা মাথায় গলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।নীচে সিড়ির কাছে আমার বাইক রাখা আছে।লাইট জ্বালানোর সময় নেই। অন্ধকারে কোনোরকমে সেটা বের করি।তারপর দু'বার কিক মেরে স্টার্ট দিই।

মফস্বল শহর।তবুও কলকাতার কাছাকাছি হওয়ার জন্য,শহুরে প্রভাব টা একটু বেশি। কলকাতার মতো একটা আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে আছে।মেয়েরা বাইরে কাজে যায়, অফিস করে,রাতে বাড়ি ফেরে। পোষাক-পরিচ্ছদে আধুনিকতার ছোঁয়া। রাতের রাস্তায় এই মুহুর্তে খুব একটা লোক চলাচল করছে না।ফাঁকা ফাঁকা রাস্তা।দু'পাশে ল্যাম্পপোস্ট গুলো বোকার মতো মাথা নত করে একাকি দাঁড়িয়ে আছে।হাতে গোনা কয়েকটা খালি বাস, ট্যাক্সি হুস হুস শব্দ করে বেরিয়ে যাচ্ছে।আর সেই সাথে কিছু মাতাল হাই স্পীডে বাইক চালিয়ে, তীব্র হর্ন বাজাতে বাজাতে রোড শো করছে।আমিও প্রায় ঘন্টায় ষাট কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাচ্ছি।
স্টেশনের পাশ দিয়ে পিচ ঢালাই রাস্তা দিয়ে কিছুটা গেলেই রেল গেট পড়ে।এখন হয়তো ট্রেন নেই।তাই গেট খোলা। রেল গেট টা ক্রশ করে, আরও পাঁচ মিনিট বাইক চালাই। তারপর নাইট ক্লাবের সামনে থামি। এই একটাই মাত্র নাইট ক্লাব এই শহরে।বড় ঘরের বাউন্ডুলে ছেলে-মেয়ে গুলো কাজ না পেয়ে, রাত-দুপুর পর্যন্ত এখানে এসে হই হুল্লোড় করে।নাইট ক্লাব টি দোতলা। ভেতরে রঙিন আলোয় সাজানো। নীচের তলায় বার,আর উপরের তলায় ডিস্কো থেক।আমি বাইক টা বাইরে লক করে ভেতরে ঢুকলাম। চারিপাশে একবার ভাল করে তাকালাম।গোল গোল করে টেবিল চেয়ার সাজানো।অনেক ছেলে-মেয়ে রঙিন গ্লাস নিয়ে বসে আছে। একটু করে করে চুমুক দিচ্ছে আর হাসাহাসি করছে।এক জন আরেক জনের গায়ের উপর লুটোপুটি খেয়ে পড়ছে।আমি নিশ্চিত,এরা কেউ এখন আর ইহজগতে নেই। স্বপ্নের জগতে ভাসছে। উপরে ভয়ঙ্কর সুরে ডিজে বাজছে।আর সেই সাথে হয়তো উদ্যাম নৃত্য কলা প্রদর্শিত হচ্ছে।আমি এখানে কখনোও আসি না।তবে মেয়েটির জন্যে বেশ কয়েকবার এখানে আসতে হয়েছে।
ডান দিকে কোনের একটা টেবিলে আমার চোখ গেল।একটা মেয়ে একা,টেবিলের উপর মাথা দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় আছে।হাতের কাছে দু'টো গ্লাস।একটা খালি।আর একটি তে অর্ধেকের কম রঙিন জলে ভর্তি।ধীর পায়ে মেয়েটির কাছে যাই আমি।পরনে জিনস আর টি-শার্ট।এই জিনস আর টি-শার্ট টা আমার খুব পরিচিত।শিয়ালদহ বিগ বাজার থেকে,গত মাসে আমি আর ও গিয়ে কিনে এনেছিলাম।কাঁধের কাছে হাত রেখে ডাকলাম,-"অদিতি! এই অদিতি।"
কোনো শব্দ নেই।আমি আবার ডাকলাম। কাঁধের কাছে হাত দিয়ে কয়েকবার ঝাঁকালাম।-"অদিতি!"
চোখ তুলে তাকালো অদিতি।ঢুলু ঢুলু চোখ দু'টো লাল হয়ে গেছে।নেশার ঘোরে আমার হাত টা ধরে বলল,-"তুই,আবার এসেছিস?বেশ করেছিস।উপরে চল,নাচবো।"
-"অনেক নাচানাচি হয়েছে।এবার ঘরে চল।" অদিতি কে ধরে আমি চেয়ার থেকে ওঠালাম।ও আমার কাঁধের উপর মাথা দিয়ে ঢলে পড়ল।
-"কিছু মনে করিস না।আজ একটু বেশি খেয়ে ফেলেছি।" অদিতি বুকের কাছে মুখ রেখে বলল।
বাইরে রাতের আকাশ টা মায়াময়। আকাশের গায়ে তারা গুলো চুনি বাল্বের মতো ঝিক মিক করছে। অদিতি কে দাঁড় করিয়ে আমি বাইকের কাছে যাই।বাইক স্টার্ট দিই। হালকা গতিতে চালিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াই।-"উঠে বোস।" আমি বলি।
অদিতি আমার দিকে তাকায়। ওর চোখ দু'টো খুব সুন্দর।আমিও তাকিয়ে থাকি।আগের থেকে নেশা অনেকটা কেটে গেছে মনে হয়। টলমল পায়ে আমার পিছনের সিটে উঠে বসে।আমি আস্তে আস্তে বাইক চালাতে থাকি।
-"তুই,কেন এলি?" অদিতি জিজ্ঞেস করে।
আমি চুপ করে থাকি।পাশ দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে বাইক চলে যায়।হো হো করে বাইক আরোহীদের হাসি পাই।
-"তোকে একটু জড়িয়ে ধরে বসবো?"অদিতি হেসে বলে।
-"হ্যাঁ,বোস।" আমি উত্তর দিই।
অদিতি জড়িয়ে ধরে,আমার গলার কাছে মুখ গুঁজে দেয়।মদের তাজা গন্ধ পাই ওর মুখে। কিছুসময় পর আমার বাইক টা হোচট খেয়ে থেমে যায়।
-"কি হল?"
-"বুঝতে পারছি না।"আমি বলি।
-"আমি বুঝতে পেরেছি।তোর তেল শেষ হয়ে গেছে।" অদিতি হি হি করে হাসে।
আদিতির কথাই ঠিক হল।তবে আমার নয়, আমার বাইকের তেল মানে,পেট্রোল শেষ হয়েছে।আমরা দু'জন হাঁটতে থাকি। ল্যাম্পপোস্টের নীচে দিয়ে। আমি বাইক টা ধরে আর অদিতি আমার বাঁ'পাশে আমার হাত ধরে। কত গুলো কুকুর আমাদের পিছু নেয়। মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ করে ডাকে।হঠাৎ একটা বাইক আমাদের পাশে এসে গতি কমায়। তিনটে ছেলে বসে আছে বাইক টি তে।
-"আরে মামনি! আমাদের সাথে এসো,লিফট দেবো।সঙ্গে আরও পাঁচশো টাকা।"ছেলে গুলো হো হো হো করতে করতে আমাদের সামনে দিয়ে চলে যায়।অদিতি চেঁচিয়ে ওঠে,ওই ছেলে গুলোকে লক্ষ্য করে।-"শালা! কুত্তার বাচ্চা, ছোটোলোক...আমার সাথে চল,হাজার টাকা দেবো।"
আমি অদিতি কে চুপ করতে বলি।
-"সব শালা! কুত্তার......।
-"কি বলছিস এসব? তোর মুখের ভাষা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।"
-"বেশ হচ্ছে।আরও বলবো।"
-"না।এসব একদম বলবি না।"
-"বলবো, বেশ করবো।বা*..বা*.।"
-"উফ! তুই একটু থামবি!"
অদিতি ডান হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে।
-"কেন তোর ভালো লাগছে না? জানিস, মেয়েদের মুখে গালাগালি শুনতে, ছেলেদের নাকি ভালো লাগে!" অদিতি হাসে।আমার ও হাসি পায়।

 এই মুহুর্তে অদিতির ঘরের সামনে পৌঁছে গেছি আমরা।একতলা বাড়ি।পাঁচিল ঘেরা। এটা ওর জেঠুর বাড়ি।জেঠুর দুই ছেলেই বাইরে চাকরী করে।তাই কেউ থাকে না এ বাড়িতে।অদিতি একাই থাকে।
-"তোর ঘর এসে গেছে।"আমি বলি।
-"চল,আমার ঘরে।আজ রাত থেকে যা।এটা আমার ঘর,কেউ কিছু বলবে না।"অদিতি হাসে।
চোখে এখনো লালচে ভাব।এখনো হালকা নেশা ধরে আছে।
-"না।তুই যা।"
-"আসবি না তো?তাহলে আমি, আমার অফিসের রীতম কে ফোন করে ডাকছি। এখুনি চলে আসবে। ওটাও তো একটা কুত্তার....! মেয়ে দেখলেই জিভ দিয়ে জল পড়ে।"
অদিতি আমার খুব কাছে আসে।আমি বাইকটা স্ট্যান্ড করি।তারপর অদিতি কে জোর করে ধরে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিই।

(২)

অদিতির সাথে অনেক টা আকস্মিক ভাবে আমার দেখা হয়।একটা বেসরকারী কোম্পানি তে অ্যাকাউন্টের কাজ করে অদিতি। কোম্পানি টা আমার বন্ধুর বাবার। আমি মাঝে মাঝে বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাই। সন্ধ্যা বেলা অফিস থেকে ফেরার পথে আড্ডা মেরে আসি।আমার বন্ধুর নাম অনিরুদ্ধ। মাঝে মাঝে কফি খাওয়ায়। কোনো কোনো দিন কোল্ডড্রিঙ্কস।
সেদিন অফিসে অনিরুদ্ধ ছিল না।জরুরি কাজে বাইরে গিয়েছিল। আমি দোতলার ছাদে উঠি।মেয়েটি কে দেখতে পাই।ফর্সা,চিকন স্মার্ট চেহারা।আজকাল কার শহুরে মেয়েদের মতো। সাড়ে পাঁচ ফুটের মতো উচ্চতা।মাথায় কালো চুল,পিঠের মাঝ বরাবর ছড়ানো। বয়েসখুব বেশি হলে পঁচিশ বা,তার একটু বেশি।ছাদের কার্নিশে বুক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো যেন জলে ভরা। সারা ছাদে তখন বিকেলের শান্ত আলো। আকাশে দু'একটা পাখি উড়ছে। আমি মেয়েটির কাছা কাছি যাই।সে আমায় দেখতে পায় না।
-"আপনি এখানেই কাজ করেন?"
চমকে তাকায় মেয়েটি।চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করে।জল আড়াল হয় না।
-"হ্যাঁ।আপনি?"
-"এটা আমার বন্ধুর বাবার কোম্পানী।বন্ধুই দেখা শোনা করে।তাই মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে আসি।আজ আর তার দেখা পেলাম না।"
-"ওহ!"
মেয়েটির চোখের জল,আমাকে আরও কাছে টানে।বললাম, -"কি নাম আপনার?"
-"অদিতি। আপনার?"
-"দীপু।"
এভাবেই পরিচয় আমাদের।বন্ধুর সাথে আড্ডা দেওয়ার নামে আমি অদিতির কাছে আমি বার বার ছুটে যাই।তার লুকানো চোখের জলের গল্প শোনার জন্যে।সে কিছুতেই বলতে চায় না। আমার ঘর থেকে পাঁচ-ছ'টা বাড়ির পর অদিতি থাকে। সকালে অফিস যাওয়ার পথে এক পলক দেখি।সে কখনো ফুলের টবে জল দেয়। কখনও বা ফুলের পাপড়ি তে হাত বোলায়। অদিতির হাতের ছোঁয়ায় ফুল গুলো যেন হেসে ওঠে। ওরাও অদিতি কে জড়িয়ে ধরতে চায়।আমি একটু খানি দেখে চলে যাই। এসব ঘটনা অনেকদিন আগের। প্রায় মাস ছয়েক কেটে গেছে।এখন আর প্রথমের মতো লুতুপুতু সম্পর্ক নেই আমাদের ভেতর।

আমি বাইক টা সিড়ির নীচে স্ট্যান্ড করে ঘরে ঢুকি।চোখে মুখে জল দিয়ে নিই।ঘাড়ের কাছে জলের ঝাপটা দিই।অনেক টা ঠান্ডা মনে হয়। ফ্যান টা জোরে চালিয়ে দিয়ে চেয়ার টেনে বসি।মাথাটা হেলিয়ে দিই। চোখ দু'টো বন্ধ হয়ে আসে।আমি অদিতি কে দেখতে পাই।
আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হাসে।হাসলে ওর মুখটা সবথেকে সুন্দর লাগে।আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি।সেই হাসি গায়ে মাখার চেষ্টা করি।পারি না। ...জানিস, দীপু আমি কোনোদিন মদ, সিগারেট পছন্দ করতাম না।বমি আসতো আমার।আর এখন সব সময় এই নিয়ে পড়ে থাকি।রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে প্রায় দিন বারে গিয়ে এক প্যাক খেতে হয়। তারপর রাতে ফিরে অনলাইনে পর্ন ভিডিও দেখি।এক মুহুর্তের জন্য আমার ভেতরের সব যন্ত্রনা গুলো মুছে যায়।আমি খুব খারাপ।নোংরা মেয়ে একটা!
-"কেন করিস এসব?তুই আমার কথা কোনোদিন শুনবি না বল?"
অদিতির হাসির শব্দ পাই।-জানিস, সৌরভ কে খুব ভালোবেসে ছিলাম। ওকে একটু খানি দেখার জন্য পাগলের মতো হয়ে যেতাম। সারক্ষন ওর সাথে কথা বলতাম।ওর কাছে ছুটে যেতাম।তবুও আমার সব কিছু কেড়ে নিয়ে চলে গেল শুয়োর টা।আমি আর বাঁচতে চাই না রে দীপু। সত্যি ভালোবাসা বলে কিছুই নেই জগতে।সব মিথ্যে।অভিনয়।তাই আজ নিজেকে শেষ করতে চাই।
অদিতি একটা ছুরি বের করে।চকচক করতে থাকে ছুরি টা।তারপর সজোরে নিজের গলায় চালিয়ে দেয়।ফিনকি দিয়ে লাল রক্ত বের হয়।
-"অদিতি..ই..ই..ই।" আমি চিৎকার করে উঠি।
চেয়ার টা নড়ে উঠে।ঘরের ভেতর সেই একই ভাবে ফ্যান চলছে।আমি এদিক-ওদিক তাকাই।ঘড়িতে রাত দু'টো বেজে গেছে। টেবিলের উপর থেকে জলের বোতল টা নিয়ে কয়েক ঢোক জল খাই।অদিতি কে কিভাবে বোঝাবো,আমি তাকে ভালোবাসি! আমাকে ও কিছুতেই বুঝতে চায় না।আমি ওর অতীতের সব যন্ত্রনা ভুলিয়ে দিতে চাই।ওর ভেতরের শেষ হয়ে যাওয়া ভালোবাসাটাই আমার দরকার। একটা নতুন জীবন দিতে চাই ওর।


(৩)

পরদিন রবিবার।দেরী করে ঘুম থেকে উঠি আমি।টয়লেটে যাই। তারপর ফ্রেশ হয়ে জানালার কাছে দাঁড়াই।বাইরে পাকা সোনার মতো রোদ উঠেছে।মেঘ মুক্ত আকাশ। দু'টো পাখি পাশের বকুল গাছে ঝটপটি করছে। আমি পাখি গুলোর নাম জানি না।জানার চেষ্টাও করিনি কোনোদিন।শুধু পাখি গুলোকে দেখি।অদিতির কথা টা মনে ভাসে।
টেবিলের উপর থেকে ফোন টা হাতে তুলে নিই। নাম্বার টা ডায়েল করি।তিন বার রিং হওয়ার পর ফোন তোলে অদিতি।-"বল,দীপু।"
-"সকাল,দশ টার সময় ঘরে থাকবি?"
-"হ্যাঁ, থাকবো।আজ কোথাও যাওয়ার প্ল্যান নেই।তবে তুই এলে করতে পারি।"
-"আচ্ছা!আমি যাব।"
আরও দু'একটা কথা বলে ফোনটা রেখে দেয় অদিতি।আমি কিছুক্ষন ফোনটা হাতে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি।তারপর ফোনটা আবার টেবিলের উপর রেখে দিই। ঘড়িতে সকাল দশটা বাজে।প্যান্ট- শার্ট টা পরে নিই। একটু পারফিউম লাগাই।পারফিউমের গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।তারপর বের হই। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে,দরজায় হালকা ঢাক্কা দিতেই অদিতি দরজা খুলে দেয়।
-"ভেতরে আয়। বোস।"
আমি ভেতরে ঢুকি।ওর বেড রুম টা সুন্দর ভাবে সাজানো।এই প্রথমবার দেখছি,তা নয়।আগেও দেখেছি। তবে যখনি দেখি,তখন নতুন কিছু খুঁজে পাই।আজ যেমন পাচ্ছি। টি.ভি র পাশে রাখা রজনীগন্ধার ডাল। সারাটা ঘর গন্ধ মেখে আছে।
-"কি খাবি? চা না,কফি?"
-"চা-ই কর।ভালো করে দুধ দিয়ে।"
-"কি দুধ!" অদিতি হাসে।ওর চোখে মুখে দুষ্টমির ছোঁয়া পাই।
আমি আর কথা বাড়াই না।অদিতি বেরিয়ে যায়।দশ মিনিট পর একটা কাপ নিয়ে ফিরে আসে।
-"কি রে,তুই খাবি না?"আমি জিজ্ঞেস করি।
-"না,এই তো একটু আগেই খেলাম।"
আমি চায়ের কাপে চুমুক লাগাই। অদিতি আমার সামনে চেয়ারে বসে। একটা সিগারেট ধরায়।
-"তুই আবার সিগারেট খাচ্ছিস?"আমি চায়ের কাপ টা রেখে ওর পাশে যাই।হাত দিয়ে সিগারেট টা কেড়ে নিই।
-"দীপু, দে বলছি।"
-"না।তুই আর এ সব খাবি না।"
-"তুই কে হে?তুই আমার গার্জেন,যে তোর সব কথা শুনতে হবে?আমি কি করবো কি,না করবো সব ব্যাপারে নাক গলাবি না।"
অদিতি রেগে চেঁচিয়ে ওঠে।আমি অবাক হয়ে যাই।কিছু বলতে পারি না।বুকের ভেতর একটা যন্ত্রনা পিন ফোটায়।চোখের কোন ভিজে ওঠে। আজ এরকম ভাবে বলতে পারলি তুই!
ঘর থেকে বেরিয়ে যাই।কিন্তু পারি না।চেয়ার ছেড়ে উঠে,অদিতি আমার হাত টেনে ধরে।কাছে টেনে নেয়।
-"সরি দীপু! যাস না।"
আমি চুপ করে,অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি। অদিতি বলে,-"আমি জানি,তুই আমাকে খুব ভালোবাসিস।কিন্তু কি করবো বল? এই খাটে আমি সৌরভের সাথে শুয়েছি।একবার নয়।দু'তিন বার। ওকে বিশ্বাস করে,আমার সব কিছু দিয়ে দিয়েছিলাম।আজ আর কিছু বাকি নেই তোর জন্যে....!"
-"কে বললো, বাকি নেই?আমি তো তোর ওই উপরের শরীর টা কে ভালোবাসি না।শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা তোর মন টা কে খুঁজে গেছি সারক্ষন।আর ওটাকেই ভালোবাসি।"
অদিতি আমার চোখের দিকে তাকায়।ওর চোখের ভেতর জলাধার দেখতে পাই।একটু পরেই হয়তো বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসবে। আমাকে বুকে জড়িয়ে নেয় অদিতি। জোরে চেপে ধরে।-"তুই খুব ভালো দীপু।দেখিস,আজ থেকে আর কোনোদিন মদ,সিগারেট খাব না। গালাগালি করবো না।আগের মতো ভালো হয়ে যাব......শুধু তোর জন্যে।"
কত দিনের জমে থাকা যন্ত্রনা আজ বেরিয়ে আসে।আমি অদিতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। ওর চোখের জলে,আমার শার্ট টা ভিজে ওঠে।
সমাপ্ত

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.