নন্দিনী,তোমায় নিয়ে গল্প হোক ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]


[ এই লেখাটির সম্পর্কে কিছু কথা : গল্পটির মূল ঘটনা কাল্পনিক নয়। শুধু লেখার ধরনে ও প্রেক্ষাপটে কল্পনার ছোঁয়া আছে। গল্পটি আমার এক বন্ধু নন্দিনীর জীবনের গল্প। নন্দিনীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ফেসবুকে। তারপর তার মুখেই এই ঘটনা গুলো আমার শোনা। ]


ছেলের কথা শুনে নন্দিনী বলল,-" আর কোনো, প্রশ্ন নয়।আমি কিছু বলবো না।"
আজ ফাদার্স ডে উপলক্ষে স্কুলে একটা অনুষ্ঠান ছিল।অনুষ্টান শেষ হওয়ার পর,পার্কিং এর জায়গা থেকে গাড়ি বের করলো নন্দিনী।তারপর স্টার্ট করে,কালো রঙ ঢালা সোজা পিচ রাস্তা ধরল।সে নিজেই ড্রাইভ করছে।সফট ইংরেজী মিউজিক চলছে গাড়ীর ভিতরে।একদম নীচু স্বরে। পাশের সিটেই বসে আছে ছেলে প্রিন্স। প্রিন্স ক্লাস এইটে পড়ে।শহরের একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। মায়ের কথায় জেদ ধরল প্রিন্স। বলল,-"না,আজ তোমায় বলতে হবে,আমার বাবা কে?"
-"আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি,তোমার মা আমি,বাবা ও আমি।"
-"মোটেও না,বাবা রা আলাদা হয়। তাদের গোঁফ-দাঁড়ি থাকে।"
হেসে ছেলের মাথায় হাত বোলালো নন্দিনী।-"আচ্ছা,তবে কাল থেকে আমি গোঁফ-দাঁড়ি পরে ঘুরবো।"
-"তাহলে,সবাই যেটা বলে সেটা ঠিক।"
চমকে উঠল নন্দিনী।-"কি বলে সবাই!"
-"আমার বাবা নেই।"

এক হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে, অন্য হাতে ছেলে কে বুকের কাছে টেনে নিল নন্দিনী।বলল,-"ওরকম বলতে নেই।আমি তো আছি।"
-"না,আগে বলো আমার বাবা কে?"
চুপ করে গাড়ি  ড্রাইভিং এ মন দিল নন্দিনী.........

(১)
 নন্দিনী মেয়েটিকে আমিও চিনতাম না। হঠাৎ বৃষ্টির মতো,হঠাৎ পরিচয়।নন্দিনীর তখন,তেইশ বছর বয়েস। পাঁচফুট সাত ইঞ্চির মতো লম্বা চেহারা।ধবধবে ফর্সা,মাথায় ঘন কালো চুল, পিটের উপর ধাপে ধাপে সাজানো।ভাসা ভাসা চোখের উপর কালো সুতোর মতো ভুরু।একটু লম্বাটে মুখ,টিকালো নাক।ঠোঁটের কোনে সব সময় একটা মিষ্টি হাসির ছোঁয়া।
নন্দিনীর বাবার কলকাতায় বড় বিজনেস আছে।রাজারহাটের কাছেই তার নিজস্ব অফিস। অল্প বয়েসেই সেই বিজনেস একটা বড় দায়িত্ব নিজের মাথায় তুলে নিয়েছে সে।তেইশ বছর বয়েসে এরকম একটা দায়িত্ব সামলানো অনেক বড় ব্যাপার।সবাই পারে না।নন্দিনীর মতো মেয়েরাই পারে।সকাল ন'টায় অফিস বেরোনো,সন্ধ্য ছ'টায় বাড়ি ফিরে,একটু ফ্রেশ হয়ে আবার অফিসের ফাইল পত্র নিয়ে বসা। এটা প্রতিদিনই কাজ তার।মাঝে মাঝে একটু ফেসবুক,গল্পের বই পড়ে সময় কাটানো। নন্দিনীর বাবা বলে,-" সব সময় এত কাজ নিয়ে পড়ে থাকিস কেন রে?"
-"সব কিছু ভুলে থাকার জন্য।আমার কাজে ডুবে থাকতে ভাল লাগে।"হেসে উত্তর দেয় নন্দিনী।
নন্দিনীর বাবা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বলে,-"নিজের কথাও একটু ভাব।আমি তো এখনো আছি।"
-"তাতে কি হয়েছে।আমি তো আর এখন তোমার সেই ছোট্টো মেয়েটি নই।"খিল খিল করে হাসে নন্দিনী।
বড্ড মিষ্টি হাসি।মেয়ের মুখের হাসি দেখে বাবাও কিছু বলতে পারে না।

(২)
আজ শনিবার।সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা। অফিস থেকে বেরিয়ে ড্রাইভার কে, গাড়িটি কে অন্যদিকে ঘোরাতে বলল নন্দিনী।সারা কলকাতায় আলো জ্বলে উঠেছে।সন্ধে হয়েছে বলে মোটেও মনে হচ্ছে না।পরিষ্কার আকাশ।গাড়ির কাচ নামিয়ে, আকাশের দিকে তাকায় নন্দিনী। অজস্র নক্ষত্রাদি।সারাটা আকাশ আলোয় ঝলমল করছে।আকাশটা কে মনে হচ্ছে একটা বিয়ের প্যান্ডেল আর সেখানে কেউ যেন চুনি বাল্ব জ্বালিয়ে রেখে দিয়েছে।পাশ দিয়ে হুস হাস শব্দে, বাস,লরি,ট্যাক্সি চলে যাচ্ছে।একটা শুকনো গরম হাওয়া মুখে এসে লাগছে।গাড়ির কাচ নামিয়ে দেয় নন্দিনী।তারপর ড্রাইভার কে এ.সি টা বাড়িয়ে দিতে বলে।

নির্দিষ্ট জায়গায় এসে গাড়ি টা কে দাঁড় করাতে বলে নন্দিনী।ড্রাইভার গাড়ি থামায়।সামনেই একটা অনাথ আশ্রম।মাঝে মাঝে এখানে আসে সে।বাচ্চা গুলোর সাথে গল্প করে, খেলা করে। তাদের জন্যে নানারকম গিফট কিনেও আনে। দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামে নন্দিনী।কয়েক পা হেঁটে,গিয়ে গেট ঠেলে অনাথ আশ্রম টির ভেতরে ঢোকে। একজন মধ্য বয়ষ্ক মহিলা এগিয়ে আসে।-"আরে নন্দিনী! এসো এসো।কেমন আছো তুমি।"
-"ভাল।তুমি কেমন আছো,অনু দি?"নন্দিনী উত্তর দেয়।
-"ভালো।এই আমার ছেলে-মেয়ে দের নিয়ে কেটে যাচ্ছে।গত সপ্তাহে তুমি এলে না,ভাবলাম হয়তো কাজে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছো!"
-"না,গো।আসলে শরীর টা ঠিক ছিল না।তাই আসতে পারিনি।"

গল্প করতে করতে ভেতরে ঢোকে দু'জন।ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে গুলো ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে নন্দিনী কে।সবাই চেনে তাকে। নন্দিনী নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, -"আরে, একটু দাঁড়া,আমি বসে নেই।"
একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে সে। তার এক এক করে প্রত্যেক কে একটা করে চকলেট দেয়।-"কেমন আছিস সবাই?" প্রশ্ন করে নন্দিনী।
-"ভালো।"সবাই এক সাথে উত্তর দেয়।

নজরটা হঠাৎ ঘরের এক পাশে চলে যায় নন্দিনীর।একটা বাচ্চা বসে আছে।তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।বছর তিনেকের মতো বয়েস হবে তার।শ্যামলা গায়ের রঙ।সে তার কাছে আসেনি। চুপ করে বসে আছে। বাচ্চাটিকে এই প্রথম দেখছে নন্দিনী। অনুদি কে ডেকে নন্দিনী জিজ্ঞেস করল,-"অনু দি, ওই বাচ্চা টা...!"
চেয়ারে বসতে বসতে অনু দি বলল,-"দু'দিন হল বাচ্চা টি এখানে এসেছে।ওর বাবা-মা দু'জনই একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। বাড়ির কেউ নিতে চাইলো না। তারপর আমরা গিয়ে, এখানে নিয়ে এলাম।"
চেয়ার ছেড়ে উঠে বাচ্চাটির কাছে গেল নন্দিনী।অবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে সে।নন্দিনী কোলে তুলে নিল তাকে।আবার চেয়ারে বসল।কোনো বাধাও দিল না বাচ্চা টি।শুধু নরম হাতটা নন্দিনীর মুখের উপর ঘোরালো।
অনু দি বলল-"তোমাকে এই প্রথম দেখছে তো, তাই ওরকম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।"
বাচ্চাদির হাতে একটা চকলেট ধরিয়ে দিয়ে নন্দিনী বলল,-"অনু দি,আমি এ কে আমার কাছে নিয়ে রাখতে পারি!"
-"কেন?"
নন্দিনীর বাবা বলে,জীবনে কিছুই না করিস, অন্তত একটা অনাথ ছেলে কে নিজের কাছে রাখিস। তাকে মানুষ করিস। অনু দির প্রশ্নের উত্তরে নন্দিনী বলল-"আমি দত্তক নিতে চাই বাচ্চা টি কে।তুমি না করো না।"
-"সে তো ভালো কথা।না করবো কেন?"
-"তাহলে আমি সবরকম ব্যবস্থা করে ফেলছি কয়েক দিনের মধ্যে।আজ তবে উঠি।"
সমস্ত বাচ্চাদের 'টাটা' জানিয়ে উঠে পড়ল নন্দিনী।বাচ্চারাও হাত নেড়ে বিদায় জানালো।

কয়েক দিনের মধ্যে,সমস্ত আইন কানুন মেনে, ছেলে টিকে নিজের কাছে নিয়ে এল নন্দিনী।

(৩)
বাচ্চা টির নতুন নাম,নতুন পরিচয় দিয়েছে নন্দিনী।অফিস থেকে ঘরে ঢুকেই নন্দিনী ডাকে,-"প্রিন্স!"
প্রিন্স ছুটে এসে এসে মাম্মি বলে জড়িয়ে ধরে নন্দিনী কে।প্রিন্স কে কোলে তুলে নেয় সে। কপালে,মুখে, গালে চুমু খায়।তারপর সোজা নিজের ঘরে নিয়ে চলে যায়।ফ্রেশ হয়ে,সারা সন্ধ্যা ছেলের সাথে খেলা করে নন্দিনী।পড়া শুনা শেখায়।গল্প করে।তারপর রাতের খাওয়ার খাইয়ে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।

দশ বছর কেটে গেছে।প্রিন্স এখন যতেষ্টই বড়। ক্লাস এইটে পড়ে।আর তার বড় হওয়ার পর থেকে নন্দিনী কে বার বার একটা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।-"আমার বাবা কে?"
নন্দিনী কিছু বলে না।নানারকম কথা বলে বলে কাটিয়ে দেয়।

সেদিন অফিস থেকে ফিরে নন্দিনী দেখলো, প্রিন্স মুখ গোমড়া করে বসে আছে।আজ আর ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো না সে।কি ব্যাপার! নন্দিনী ভুরু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকালো।তারপর ব্যাগ,ফাইল পত্র গুলো সোফার উপর রাখতে বলল,-"কি হয়েছে বাবু!"
প্রিন্স চুপ করে রইল।কিছুটা অবাক হল নন্দিনী। ছেলের পাশে গিয়ে বসল।মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,-"কি হয়েছে? মন খারাপ?"
নন্দিনীর হাত সরিয়ে দিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দিল প্রিন্স।
-"রাগ করতে নেই,সোনা আমার!"
-"কেন করবো না?কাল ফাদার্স ডে।আর আমি নিজেও জানি না আমার বাবা কে!"
কি উত্তর দেবে নন্দিনী ভেবে পেল না।চুপ করে রইল। প্রিন্স উঠে টেবিলের পাশে গেল। তারপর টেবিলের উপর রাখা একটা ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,-"এই ছেলেটি কি আমার বাবা?"
নন্দিনী,বেড থেকে উঠে ছেলের পাশে গিয়ে বলল,-"না! ও তোমার বাবা নয়।ও হল আকাশ।"
-"তবে তুমি মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকিয়ে থাকো কেন?"
ছেলের প্রশ্ন শুনে হাসি পেল নন্দিনীর।পাগল একটা! আজকাল এসব ও লক্ষ্য করা হচ্ছে!

একটু ভাবনার গভীরে ডুবে গেল নন্দিনী। সেই উত্তর বঙ্গ।পাহাড়ি স্কুল। আকাশ নন্দিনীর বন্ধু ছিল।খুব কাছের বন্ধু।প্রেমিক বন্ধু।এক সাথে পড়া শুনা করতো।ঘুরে বেড়াতো। বৃষ্টি ভিজতো। তারপর একদিন সব শেষ!একদশ শ্রেনীতে পড়ার সময় হঠাৎ একদিন গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল আকাশ।তারপর থেকে আর বৃষ্টি ভিজে নি নন্দিনী।মনের ঘরে দ্বিতীয় কাউকে আর জায়গা দিতে পারেনি।
ছেলের কথার উত্তরে নন্দিনী  বলল,-" ও হল আমার ক্লাস ফ্রেন্ড। তোমার যেমন ক্লাসে বন্ধু থাকে,ঠিক সেই রকম।"
-"ওহ!"
প্রিন্স চুপ করে গেল।নন্দিনী ছেলেকে কোলে টেনে নিল।তারপর বলল,-"কাল তোমাদের স্কুলের অনুষ্ঠানে আমি যাব।কাল আমি অফিস যাব না,আমার প্রিন্সের জন্যে।"
প্রিন্স খুশিতে জড়িয়ে ধরল মা কে।

(৪)
আজ সেই অনুষ্ঠান শেষে স্কুল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে জেদ করে বসল প্রিন্স।হয়তো অনান্য সব ছেলে-মেয়েদের বাবা,মা কে দেখে নিজের মন কে বোঝাতে পারছে না। মায়ের চুপ করে থাকে দেখে প্রিন্স রাগত স্বরে আবার বলল,-"মাম্মি, তুমি বলবে আমার বাবা কে?আজ যদি না বলো,তবে আর কোনোদিন তোমার সাথে কথা বলবো না। তোমার হাতে খাবো না।কিচ্ছু করবো না......।"
নন্দিনী জানে প্রিন্স খুব জেদী। ছোটো বেলায় একবার রাগ করলে, তাকে খায়ানোই মুসকিল হয়ে যেত। আর চুপ থাকতে পারলো না নন্দিনী। আজ সত্যিটা বলতেই হবে। ওর ও জানা উচিত। কিন্তু তার মন টা আজ কাঁদতে চাইছে কেন?কি কারন?
-"আমি নিজেও জানিনা তোমার বাবা কে! আমি তোমার জন্মদাত্রী মা ও নই।শুধু এইটুকু জানি, তোমার বাবা-মা এক গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল।তারপর এক অনাথ আশ্রম থেকে তোমাকে,আমার কাছে নিয়ে এসেছিলাম।"
এক হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং টা ধরে অন্যহাত দিয়ে চোখের জল মুছলো নন্দিনী।

মায়ের কথা শুনে প্রিন্স নির্বাক হয়ে গেল। চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগলো।নন্দিনী ছেলের দিকে তাকালো।প্রিন্স একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তারদিকে।সে বলল,-"কান্না কাটির কি হল আবার! আমি তো আছি।"
-"তোমার বাবা-মা সবাই আছে।তাই তুমি বুঝবে না,কেন কাঁদছি!"
নন্দিনীর চোখের জল বেড়ে গেল। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে বলল।-"আমি বুঝি। আমার ও কেউ নেই, বাবু।আমিও তোমার মতোই অনাথ। তোমার বয়েসে আমার বাবা-মা ও গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল। বাড়ির কেউ নিতে চাই নি আমাকে। তারপর এনারাই আমাকে ও ......।
নন্দিনী আর কিছু বলতে পারলো না।ব্রেক কষলো গাড়িতে।চোখ থেকে জল ছিটকে পড়ল গাড়ির স্টিয়ারিং এর উপর। বাড়ি এসে গেছে। মাকে জড়িয়ে ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো প্রিন্স।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.