রাস্তার ছেলে~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]


নিস্তব্দ রাতের কালো অন্ধকার ভেদ করে একটা চার চাকার গাড়ি এসে থামে বস্তির গলিটার  মুখে। কালো কালো মুখোস পরা পাঁচ ছয় জন  লোক। গাড়ি থেকে নেমে একটা ঝুপড়ি সামনে  গিয়ে দাঁড়ালো।
— "এই বাড়িতেই ছেলেটি থাকে,তো?"
একটা কালো মুখোশের ভেতর থেকে' হ্যাঁ' উত্তর এল। দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল লোকগুলো। ছেলেটি মাকে ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছিল। ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল- "কে ?
.....কে তোমরা?"
অসুস্থ মা কোনোরকমে উঠে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরল।মুখোসধারী লোক গুলো ছেলেটিকে জোর করে, মুখে কাপড় বেঁধে গাড়িতে তুলে বেরিয়ে গেল।



ছেলেটির নাম জানি না, আর জানার ও প্রয়োজন নেই। বয়স এগারো কি বারো।আর পাঁচটি রাস্তার ছেলের মতো সে। হাড়গিলে চেহারা, মাথা ভর্তি উসকো খুসকো লাল চুল; গায়ে একটা ময়লা হাফ হাতা গেঞ্জী। সারাদিন রাস্তায় কাগজ কুড়িয়ে বেড়ায়, সঙ্গে আরও দু চার জন বস্তির ছেলে মেয়ে থাকে। ঘরে অসুস্থ মায়ের জন্যে সারা দিনের কুড়ানো কাগজ বিক্রি করে যে টাকা হয়, তাই দিয়ে ওষুধ ও রাতের খাবার কিনে আনে। ডাক্তার বলেছে ভাল চিকিৎসা করাতে না পারলে তার মাকে,আর বেশি দিন বাঁচানো যাবে না। ছেলেটি কোন কূল-কিনারা খুঁজে পায় না, - কোথায় পাবে অত টাকা? কে করাবে ভাল চিকিৎসা?

জানালা দিয়ে মুখে রোদ পড়তেই ছেলেটির ঘুম ভাঙে। চোখ খুলে দেখে একটা ঘরের মধ্যে সে শুয়ে আছে। চারিপাশে চার পাঁচজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো কাল রাতের মুখোসধারী সেই লোক গুলো। মাঝখানে একটা মোটা চেহারার লোক, কালো চশমা পরে বসে আছে। ছেলেটির চারপাশে নানা ধরনের খাবার।মোটা চেহারার লোকটা এবার মুখ খুলল,-" খা ! ছোকরা খা! , কাল রাত থেকে তো কিছু খাসনি।"
ছেলেটি এত রকমের খাবার কোনোদিন চোখে দেখিনি। পেটের খিদেয় যেন দুহাত দিয়ে খেতে শুরু করে সে।
- "তোর মা খুব অসুস্থ না?"
— "হ্যাঁ বাবু!"
- "ভালো চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে না তোর?"
— "হ্যাঁ! বাবু, একটা কাজ দিন না! আমি সব কাজ করতে পারি।"
লোকটি হাসে। ব্যাগ থেকে এক বান্ডিল একশো টাকার নোট বের করে ছেলেটির দিকে ছুঁড়ে দেয়।
- "বলুন বাবু কি করতে হবে?"
- "না, আজ কিছু করতে হবে না। বাড়ি গিয়ে মার জন্য ভালো ফল, আর ওষুধ কিনে আনবি। আর কালকেও এখানে চলে আসবি। ভালো খেতে পাবি। তবে কাউকে বলবি না।"
-" জি! বাবু।"
লোকটি তার দলের দু'টো ছেলে দের নির্দেশ দেয় ছেলেটিকে বাড়ি পৌছে দেওয়ার জন্য। দিনের আলোয় ছেলেটি এই নতুন বাড়িটির রাস্তা চিনে নেয়।

ঘরে ঢুকতেই ছেলেটির মা কেঁদে উঠে,— "কোথায় ছিলিস বাবু? ওরা কারা? তোকে মারি নি তো.....?"
ছেলেটি হাসতে হাসতে মায়ের কাছে বসে।- "না মা, ওরা খুব ভালো লোক। আমাকে কত কিছু খেতে দিল, আবার তোমার চিকিৎসার জন্যে টাকাও দিল। আরও দেবে বলেছে।"
ছেলেটির মা ভয় পেয়ে ওঠে,- "না, তুই আর যাবি না ওখানে। ওরা খুব খারাপ ।"
— "না, মা ওরা আমাকে কাজ দেবে বলেছে।"
- "তোর কাজ করার দরকার নেই! এই দুবেলা দুমুঠো খেতে পারছি এই অনেক। আমি বা আর কত দিন বাঁচব বল?"
ছেলেটির চোখে জল আসে। দুহাতে চোখ মোছে,— "ওখানে কাজ করে, তোমাকে আরও ভাল চিকিৎসা করাব....কিছু হবে না তোমার।" ছেলেটি একটা ফল কেটে মা কে দেয়।
- "বল, তুই কোনোদিন কারও ক্ষতি করবি না তো?"
ছেলেটি দুই দিকে মাথা নাড়ে।

পরদিন বিকাল বেলা আবার সেই বাড়িতে যায় ছেলেটি। একটি লম্বা করে লোক তাকে ভেতরে নিয়ে বসায়। সেই মোটা চেহারার লোকটি ঘরে ঢোকে।
-" কি, ছোকরা! মায়ের শরীর ভাল তো?"
— "হ্যাঁ বাবু।"
-"এই ওকে কিছু খেতে দে।" তারপর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলে,- "আজ একটা ছোট্টো কাজ করতে হবে"
- "কি কাজ বাবু?"
- "এই যে সাদা প্যাকেট টা দেখতে পাচ্ছিস, এটা নিয়ে শুধু শিয়ালদা বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। একটা কালো চসমা পরা লোক এসে এটা নিয়ে যাবে। ব্যাস! তোর কাজ শেষ।"
তারপর সন্ধ্যায় এসে টাকা নিয়ে যাবি। অনেক টাকা।ছেলেটির মন খুশিতে ভরে ওঠে। এ আর কি এমন কাজ! তাদের দু:খ আর থাকবে না, ভাল ডাক্তারের কাছে এবার মায়ের চিকিৎসা করাবে সে।

প্যাকেট টা পৌছে দিয়ে সন্ধ্যায় এসে ছেলেটি টাকা হাতে পায়। এক সাথে এত টাকা সে কোনো দিন চোখে দেখিনি।
— "কি খুশি তো?"
ছেলেটির মুখ আনন্দে ভরে উঠে।কিছু বলতে পারে না। কিছু টাকায় রাতের খাবার কিনে বাড়ি ঢোকে ছেলেটি। ঘর থেকে অসুস্থ মা বলে,
- "বাবু, এলি? এতক্ষন কোথায় ছিলি?"
- "হ্যাঁ ! মা। এই তো খাবার কিনতে গিয়েছিলাম।"
— "তুই আর ওই বাড়িতে যাস না তো?"
- "না।"
মিথ্যে বলে ছেলেটি। রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে সে । দু'চোখে ঘুম আসে না তার। মনে মনে অনেক কিছু ভাবতে থাকে। কিছুদিন পর আবার ছেলেটির ডাক পড়ে ওই বাড়িতে। ছেলেটি মাকে না জানিয়ে বেরিয়ে যায় বিকাল বেলা। আজ বড় ঘরের ভেতর আট দশ জন লোক। কিছু লোক কে আজ নতুন দেখছে সে।
- "কি হে ছোকরা! মাকে ভাল হসপিটলে নিয়ে যেতে হবে না?"
-" হ্যাঁ, বাবু।"
- "আচ্ছা ঠিক আছে কাল আমার লোকে রা ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু তার আগে একটা ছোট্টো কাজ করে দিতে হবে যে!"
ছেলেটি আর ধৈর্য রাখতে পারে না- "কি কাজ বলেন,বাবু?"
- "কিছুই না! এই যে ব্যাগ টা, আমার লোকেরা যেখানে রেখে আসতে বলবে,সেখানে রেখে আসতে হবে।"
— "হ্যাঁ বাবু! পারব।"
- "সাবাস! ব্যাটা। মায়ের জন্যে চিন্তা করবি না। কাজ টা ঠিক মতো করতে পারলেই, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।"
চার পাঁচ জন লোক ছেলেটিকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে। কলকাতার এদিক টা ছেলেটি চেনে না। অলি গলি রাস্তা পেরিয়ে গঙ্গার ব্রিজের উপর দিয়ে হাওড়া স্টেশনের সামনে এসে থামে গাড়ি টা।
— "এই ছোকরা! ব্যাগটা স্টেশনের ভেতরে কোথাও একটা রেখে দিয়ে চটপট চলে আসবি। ব্যাগের মুখটা খুলবি না একদম!"
ছেলেটি মাথা নেড়ে হাওড়া স্টেশনে সাবওয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। আগে কোনোদিন এদিকে আসেনি। বিকেলের ব্যস্ত স্টেশন। চারিপাশে লোকে লোকারন্য। স্টেশনের ভিতরে একটা অল্প ফাঁকা জায়গা দেখে বসে পড়ে সে। ব্যাগ টা পাশে রাখে। হঠাৎ তার ইচ্ছে হয় ব্যাগ টা খুলে তার ভেতর কি আছে দেখার জন্য। আস্তে আস্তে ব্যাগের মুখটা খুলে ভেতরে চোখ রাখে। হাল্কা লাল আলো ভিতরে, আর গোল গোল বলের মতো জিনিষ। আরও ভাল করে দেখার চেষ্টা করে। চমকে ওঠে সে। হাত-পা থর থর করে কাঁপতে থাকে।
- "বোম!"
রাস্তায় কাগজ কুড়োতে কুড়োতে একবার তার এক বন্ধু বল ভেবে খেলতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। সেই থেকে এই জিনিষটা কে সে চেনে। ব্যাগের মুখ টা বন্ধ করে দেয়। কপালে ঘাম জমতে থাকে ছেলেটির। কি করবে সে? চারিপাশে একবার তাকায়। কত অচেনা মুখ! কেউ তার মতো, কেউ তার মায়ের মতো, কেউ হাসছে, কেউ বসে গল্প করছে। অফিস চলতি মানুষের বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা ,বাড়িতে তাদের প্রিয়জন অপেক্ষায় আছে। অনেকে হয়তো বহুদিন পর বাড়ি ফিরছে, তাদের প্রিয়জন কে দেখার জন্য।অসুস্থ মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছেলেটির। তার মায়ের মতো অসংখ্য মুখ চারিপাশে দেখতে পায় সে।
আজ সবাই মরবে! কেউ বাঁচবে না!
মরবে তো তোর কি? তোর মা তো বাঁচবে! এরা তোর মায়ের চিকিৎসার জন্যে কোনোদিন সাহয্য করেছে?-ছেলেটির ভেতর থেকে শয়তান টা বলে ওঠে।
 ঠিকি তো! এরা মরলে আমার কি? আমি মরলেও তো এদের কিছু যায় আসবে না।বরং আমি অনেক টাকা পাব, মায়ের চিকিৎসা করাতে পারবো।
ছেলেটি ব্যাগ রেখে উঠে পড়ে। চারিপাশে আবার একবার তাকিয়ে নেয়। মানুষ গুলোর হাসি মুখ ছেলেটিকে যেন বার বার আঘাত করতে থাকে। — এত গুলো মানুষ আজ.......মারা যাবে! তার মতো বয়েসের কত মুখ চারিদিকে- ছেলেটি মনে মনে ভাবে।
শুরু হয় ভগবান, আর শয়তানের লড়াই। শেষ পর্যন্ত ভগবানেই জেতে। ছেলেটি ব্যাগটা নিয়ে উঠে। স্টেশনের উলটো দিকে নেমে রেল লাইন ধরে হাঁটতে থাকে। একটা ফাঁকা জনমানুষ শূন্য জায়গাতে ব্যাগ টা রেখে আসবে। মায়ের কথাটা মনে পড়ে ছেলেটির। - "কারও কোনো দিন ক্ষতি করবি না।"
আজ সে সেটাই করছে, মনে মনে ভীষন আনন্দ হচ্ছে তার। ব্যাগটা হাতে নিয়ে হাঁটছে ছেলেটি। সন্ধে হতে আর বাকি নেই। ব্যাগের ভেতর টাইম বোমায় সেট করা সময়ের কাঁটার টিক টিক শব্দ টা কানে আসছে না তার। হাসি মুখে হেঁটেই চলেছে ছেলেটি। টাইম বোমায় সন্ধ্যা ছ’টা সেট করা। আর বেশি বাকি নেই, মাত্র দশ সেকেন্ড। টিক....টিক....টিক.....। কি করে জানবে সে এই সময়ের মৃত্যু কাঁটা!
আর মাত্র তিন সেকেন্ড...টিক...।
ওই তো সামনে একটা ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে। ছেলেটির মন হাসিতে ভরে ওঠে....।সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রচন্ড বিষ্ফোরন। আসে পাশের গাছের পাখি গুলো চিৎকার করে উঠে ডানা ঝাপটায়। সেই প্রচন্ড শব্দ আর ধোঁয়ায় ছেলেটির এক করুন চিৎকার হয়তো কারও কানে পৌঁছোয় না.........।
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.