রেল কোয়ার্টার ~অনুগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন


যারা দেখেছেন,তারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে, রেলের কোয়ার্টার গুলো কেমন হয়! তবে যারা দেখেন নি তাদের জন্য বলি আরেকবার। লম্বা,লম্বা কালো পিচ রাস্তার গলি। আবার কিছু পিচ রাস্তা,লম্বা রাস্তা গুলোর উপর দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে চলে গেলে। ফলত,অনেক অলি গলি রাস্তার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটা গলি প্রায় যেন একই মাপের, দেখতেও একই রকম।তবে সবজায়গায় এরকম দেখতে পাবেন না। বিশেষ বিশেষ রেল শহর গুলোতে এরকম দেখা যায়। আর সেই সব রাস্তা গুলোর পাশে সারিসারি কোয়ার্টার গুলো তৈরী। কোনোটা একতলা, আবার কোনোটা দোতলা।
প্রতিটা ঘরের একটাই রঙ,– সেটা হল খয়রি লাল।কোথাও বা হাল্কা হলুদ রঙআর বর্ডার গুলো খয়রি লাল।তবে এখন অবশ্য কলকাতায় কোয়ার্টার গুলোর রঙ নীল–সাদা করা হচ্ছে। রাস্তার দু'পাশের প্রত্যেকটা কোয়ার্টারের প্যার্টান একই টাইপের অর্থাৎ দেখতে সব একই রকম। আবার কোথাও কোথাও পাশাপাশি দু'টো কোয়ার্টারের ঢোকার গেট একটাই। কোয়ার্টার গুলোর চারপাশে বড় বড় সবুজ গাছ লাগানো, ফাঁকা জায়গা গুলোতে সবুজ লতা–পাতায় পরিপুর্ন। মাঝে মাঝে তো নিজের গলি,নিজের কোয়ার্টার কোনটি, সেটাই বোঝা মুশকিল হয়ে ওঠে।  তবে এসব কোয়ার্টার গুলো সব সাধরন কর্মচারীদের জন্যে। বড় বড় অফিসার দের জন্য সাজানো গোছানো বাংলো তৈরী করা।
বছর খানেক হল রেলে চাকরী পেয়েছি। তবে আমি একজন সাধরন কর্মচারী। মাস চারেক হল,মিতুকে নিয়ে রেল কোয়ার্টারে উঠেছি।প্রথমে অবশ্য মিতু কে এতদুরে নিয়ে আসতে চাইনি। ভেবেছিলাম,একা একা নতুন জায়গায় ও মানিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু মিতু জেদ ধরে বসল! আমাকে ছেড়ে নাকি ওর একদম ভাল লাগছে না। ব্যাপার টা স্বাভাবিক,আর আমার ও একটু একটু মন খারাপ করছিল। তাই মিতু সঙ্গে না এনে পারলাম না।
রেলের এক শ্রেনীর কর্মচারী আছে,যাদের ডিউটির কোনো কুল কিনারা নেই। নিদিষ্ট কোনো সময় নেই।আমিও সেই শ্রেনীর মধ্যে পড়ি। সেদিন একটু রাত হয়ে গেল ডিউটি থেকে ঘরে ফিরতে। কয়েকদিন আগে অমাবস্যা গেছে। তাই আঁধারি রাত।রাস্তার হাল্কা আলোয় হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম দশ টা বেজে গেছে। গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। বাইরের আলোটা নেভানো আছে।এটা মিতুর দোষ নয়, আমিই ওকে বলি বাইরের টিউবলাইট টা অফ করে রাখতে। বারান্দায় পা রাখতেই দেখতে পেলাম দরজা টা হালকা ভেজানো। ভেতর থেকে চাপা হাসা হাসি,কথা–বার্তা আমার কানে এল। বিড়ালের মতো সজাগ হয়ে গেলাম।কান দু'টো খাড়া করে দরজায় পাতলাম।–" তুমি খুব দুষ্টু।
প্লিজ! এবার ছাড়ো। না, না..অনেক আদর হয়েছে,আর না।"
আমার সারা শরীর রাগে জ্বলতে শুরু করল। মাথা গরম জলের মতো যেন টগবগ করে ফুটতে লাগল।অজ্ঞাতসারে হাতের মুষ্টি দৃঢ়বদ্ধ হল। নাসারন্ধ্র স্ফীত হয়ে উঠল।–"ছি! এই ছিল তোর মনে?এত বাজে তুই? স্বামীর অবর্তমানে,অন্য একটা পরপুরুষের সাথে ফষ্টিনষ্টি হচ্ছে...!!"
আর সহ্য করতে পারলাম না।শুধু আমি কেন, এটা কেউই সহ্য করতে পারে না।ঠিক করলাম, দু'টোকেই আজ উচিত শাস্তি দেব। বাইরে একটা লোহার রড পড়ে ছিল।সেটা হাতে নিয়ে ঝড়ের বেগে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলাম। আমার এই রুদ্রমূর্তি দেখে দু'জনই হচকচিয়ে গেল। আলিঙ্গনবদ্ধ অবস্থা থেকে ছিটকে সরে গেল দু'জন।
লজ্জায় আমার চোখ–মুখ লাল হয়ে গেল। হাতের রড ফেলে দিয়ে,কোনোরকমে চোখ মুখ ঢেকে, তাড়াতাড়ি করে ছুটে বাইরে চলে এলাম।
রাতের অন্ধকারে ভুল করে আমার পাশের দাদা–বৌদির কোয়ার্টারে ঢুকে পড়েছি।
স্বদেশ কুমার গায়েন  (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.