কাশফুল ~ ছোটোগল্প ( স্বদেশ কুমার গায়েন )


— "এবার পূজোয় আসবি তো?"
- "কি করব বল! অফিস থেকে একদম ছুটি দিতে চাইছে না।"
— "তুই সব সময় অজুহাত দেখাস।"
- "বিশ্বাস কর,আমি অফিসার কে অনেক রিকোয়েস্ট করলাম কিন্তু আমাকে সাতটা কথা শুনিয়ে দিল।"
—" ভাল লাগে না আমার! কত ভাবি পূজোর সময় তোর হাত ধরে সারা কলকাতা টা ঘুরবো, তোর পাশে বসে অষ্টমীর অঞ্জলি দেব.....।"
- "আমার ও খুব ইচ্ছে করে, পূজোটা তোর সাথে কাটাতে।"
ফোনের ওপার টা এক মহুর্তের জন্য নিস্তব্দ হয়ে গেল। বললাম—"কি ,রে রাগ করেছিস?"
— "না! তোর চাকরীটাই খারাপ। আমি চাকরী টা পেয়ে গেলে তোকে আর ও কাজ করতে দেব না।"
- "তাহলে আমার পরিবার, কে দেখবে ?"
— "আমি দেখব।"
-' আর তোর পরিবার?"
- "সেটাও আমি।"
— "এত দায়িত্ব নিতে পারবি?"
— "তুই আমার কাছে থাকলে, আমি সব পারব।"
- "পাগলি একটা!"
- "প্লিজ ! আয় না এবার পূজোতে!"
- "দেখি একবার শেষ চেষ্টা করে!"
—"থাক তোর আসতে হবে না। ভাল থাকিস। বাই.....!"
- "হ্যালো!.... এই শোন....হ্যালো!.......।"
অভিমান করে জয়িতা ফোনটা কেটে দেয়। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলি আমি। যার মুখ টা না দেখে আমার একটা দিনও কাটত না,আজ তাকে ছেড়ে দিনের পর দিন কাটাতে হচ্ছে। আমার বাড়ির পাশের বাড়িতে ওরা যেদিন ভাড়ায় উঠেছিল, সেদিনই ওর প্রেমে পড়ে গিয়ে ছিলাম। পিঠ পর্যন্ত ছড়ানো সোনালী রঙের চুল, আর গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটো আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তারপর পরিচয়, বন্ধুত্ব থেকে একে বারে ভাল বাসা। ওদের ঘরে গিয়ে, ওর সঙ্গে যখন গল্প করতাম, তখন নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে সুখি মানুষ মনে হত। আমাদের সম্পর্ক টার আঁচ হয়তো বাড়ির সবাই পেত, কিন্তু কারও তরপ থেকে কোনো আপত্তি ছিল না। গত পূজোতেও ওর সঙ্গে থাকতে পারিনি। নতুন চাকরীতে জয়েন করেছিলাম সে'বার,তাই ছুটি মঞ্জুর হয়নি।

পুরুলিয়া জেলার আদ্রা তে রেলের চাকরী করি আমি । মালগাড়ীর অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলট। এ সব চাকরী আর সেনাবাহিনী তে চাকরী করা,একটা ব্যাপারে অনেকটাই একই রকম। কিছুতেই ছুটি মিলতেই চায় না । যেদিন কলকাতা ছেড়ে চাকরীর জন্য এই পাত্থুরে লালমাটির দেশে চলে এলাম, সেদিন ছিল বর্ষার শেষের এক বিকেল । নীল আকাশে সাদা সাদা মেঘ গুলো যেন বক পাখির মতো ডানা মেলে ভাসছিল। বিদায় নেওয়ার আগে জয়িতা আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, ওদের ছাদে। ওর বুকে মুখ ডুবিয়ে সেদিন আমার সমস্ত যন্ত্রনা, কষ্ট, দু:খ ,বেদনা, আনন্দ ওর কাছে রেখে এসেছিলাম। ও আমার ঠোঁট টা জোরে কামড়ে ধরে একটা ভালবাসার দাগ এঁকে দিয়েছিল। সন্ধ্যায় হাওড়া থেকে যখন এক্সপ্রেসে উঠলাম, — আমার দু চোখে তখন ও শ্রাবন মাস। সাঁতরাগাছি ছেড়ে ট্রেন টা বেরিয়ে গেল, তবুও আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ভালবাসার মানুষের থেকে দুরে চলে যওয়া যে কত কষ্টের,সেদিনি বুঝতে পেরেছিলাম।ট্রেনের লোক গুলো সব আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।

রেলে চাকরী করি , তাই চাকরী সুত্রে অনেক জায়গা ঘুরতে হয়। কলকাতার দু'তলা, চার তলা,বড় বড় বাড়ি, বিশ পঁচিশ তালা ফ্লাট দেখে দেখে চোখ টা যেন একঘেয়ে হয়ে গিয়েছিল। এখানে এসে যখন ট্রেনের দু পাশে উচু নিচু ধূ ধূ মাঠের মাঝে এক মানুষ সমান খেজুর, তাল গাছের সারি; মাঝে মাঝে বিস্তৃর্ন এলাকা জুড়ে শাল গাছের বন, আঁকা বাঁকা লাল মাটির রাস্তা দেখলাম চোখ দুটো যেন পরম শান্তিতে জুড়িয়ে গেল। বার বার মনে হতো জয়িতা কে এখানে এনে লাল মাটির রাস্তায় ছুটে বেড়াই। শালের জঙ্গলে ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকি।
কিন্তু আজ সকাল বেলা ওর ফোনটা সব এলোমেলো করে দিল। ডিউটি যেতে ইচ্ছে করল না। মনে হল এখুনি পুরুলিয়া থেকে ওর কাছে ছুটে চলে যাই। ওকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলি, এই দেখ আমি এসেছি।
কিন্তু কি করব! সরকারের চাকর আমি। উপর মহল থেকে ছুটি মঞ্জুর না হলে, বাড়ি যাওয়ার উপায় নেই। আজ বিকালে আমাদের মালগাড়ি টা পশ্চিম মেদনীপুরের একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যে লাল সিগন্যালে দাঁড়ালো। ড্রাইভার কেবিন থেকে ফাঁকা মাঠ টি তে চোখ রাখতেই দেখতে পেলাম, সারা মাঠের মধ্যে কারা যেন সাদা পেঁজা তুলো ছড়িয়ে রেখেছে অথবা, তুলো যদি না হয়, তবে সাদা সাদা বকের পাল ডানা মেলে বসে আছে,আর বাতাশের দোলায় মাথা নাড়াচ্ছে। আমার বিহারী ড্রাইভার কে ও গুলো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,- "করন ভাইয়া, ইয়ে সফেদ সফেদ কেয়া হ্যায়?"
উনি বাংলা আর হিন্দি এক সাথে মিশিয়ে বললেন, - "তুম ভি তো বাঙ্গালি আছো! নেহি জানতি হো? বাঙ্গালা মে তো কাশফুল বোলে সোবাই। তুমাদের পুজা কে সময় ইয়ে ফুল খিল তি হ্যায়! "
আমি কাশফুল স্বচক্ষে কোনোদিন দেখিনি। আর কলকাতার দিকেও বা কোথায় দেখা যায়? কিন্তু শরৎ কালে এদিকে রেল লাইনে দুপাশে মাঠ গুলোর সবুজের মাঝে হঠাৎ সাদা কাশফুলের বন। আমার মনটা যেন এক মহুর্তের জন্য আনন্দে ভরে উঠল। শরতে পেঁজা তুলো মেঘ, কাশফুলের বনে বাতাশের দোলা, ঢাকে কাঠি মানে দুর্গাপূজার আগমন। সিগন্যাল হতে মনে হয় একটু দেরী আছে। ড্রাইভার কে,- এক মিনিট আসছি বলে আমি কেবিনের দরজা খুলে ছুটে গেলাম সেই কাশফুলের বনে। মনে হল আজ আমি পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর জিনিষ দেখছি। হাত বোলালাম ওর উপর। কোনো গন্ধ নেই, অথচ অপূর্ব তার রূপ!
দূর থেকে দেখলে যেন মনটা জুড়িয়ে যায়। প্রতিটা ফুলের মধ্যে যেন জয়িতার মুখ দেখতে পেলাম। আর একদিন পরই ষষ্ঠী। একটা পূজোর আবহাওয়া যেন সারা আকাশ বাতাশ কে সামিয়ানার মতো ঢেকে রেখেছে। না! আমাকে পূজোতে জয়িতার কাছে যেতেই হবে। কারোও কোনো কথাও আমি শুনব না। ট্রেন হর্ন দিয়েছে,মানে সিগন্যাল হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি কাশফুলের চার পাঁচটা শিশ ভেঙে নিয়ে ট্রেনে উঠে আমার ব্যাগের মধ্যে রেখে দিলাম। সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে একটা ছুটির অ্যাপলিকেশন লিখে আমাদের হেড অফিসারের ঘরে গেলাম। ভদ্রলোকের বাড়ি অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেগু ভাষার মানুষ। তবে হিন্দিটা ভালই বলতে পারেন। কয়েকটি শব্দ ছাড়া তেলেগু ভাষা শেখার চেষ্টা কোনোদিনই আমি করিনি। আর চেষ্টা করলে হয়তো এতদিন আমার দু' দশ টা দাঁত ভেঙে যেত অথবা জিভ টা বেঁকে যেত।
অ্যাপলিকেশন টা নিয়ে ওনার সামনে রেখে বললাম,- "হামকো পূজা মে ছুটি চাহিয়ে, স্যার!" আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন,— "তুমকো তো পহেলেই বোলা, ছুটি নেহি মিলেগা।"
মাথাটা গরম হয়ে গেল। তবু নিজেকে সংযত করলাম,- "কিউ, নেহি মিলেগা? তিন মাহিনা হো গেয়া, ঘর নেহি গেয়া হম।"
এবার আমার দিকে চোখ তুলে তাকালেন। পাশে জমে থাকা কাগজের দিকে তাকিয়ে বললেন,- "দেখো! কিতনে সারে অ্যাপলিকেসন জমা হুয়া হ্যায়।"
- "মেরা অ্যাপলিকেসন ভি লিজিয়ে। ছুটি মিলে অউর না মিলে, ম্যায় সপ্তমী কে দিন ঘর চলা জায়ুঙ্গা।"
- "তুমকো অ্যাবসেন্ট কর দেঙ্গে।"
- "আপ, অ্যাবসেন্ট, সাসপেন্ড, ট্রান্সফার কুছ ভি করিয়ে, লেকিন ইসস বার পূজা মে হামকো ঘর জানা হ্যায়।"
পাশ থেকে এক সিনিয়র ড্রাইভার বললেন,— "উসকো ছোড় দিজিয়ে স্যার! আপটার অল বাঙ্গালি আছে না!"
ছুটির মঞ্জুর করে অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে মনে হচ্ছিল ফুটবল বিশ্বকাপ জয় করে বেরিয়েছি। জয়িতা কে একটা ফোন করবো?
না!,পাগলিটার জন্যে সারপ্রাইজ টা তোলা থাক। সারারাত ঘুম হল না,এক একবার বাইরে গিয়ে দেখছি কখন ভোর হবে।

সাকাল ছ'টা কুড়িতে পুরুলিয়া হাওড়া সুপার ফার্স্ট এক্সপ্রেস আদ্রা স্টেশনে এসে পৌঁছাবে। আদ্রা থেকে হাওড়া যেতে প্রায় ঘন্টা পাঁচেক লাগবে, তারপর আরও ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা। জয়িতার উপহার দেওয়া নীল শার্ট টা পরে ট্রেনে উঠে বসলাম। মনের ভিতরে যেন কেমন একটা হচ্ছে, বুকটা দুরু দুরু কাঁপছে। ছুটন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে মাঠের ধবধবে সাদা কাশফুল গুলোকে দেখছি। আমার মতো ওরাও যেন আজ খুব খুশি; বাতাশের তালে তালে জোরে জোরে মাথা দুলিয়ে নাচ করছে। সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না। কখন জয়িতার মুখটা দেখব, কখন ওকে বুকে জড়িয়ে নেব......!
হাওড়া থেকে বাসে যেতে অনেকদিন পর কলকাতার রূপ দেখছিলাম। সারা কলকাতা বাতাশে পূজোর গান বেজে চলেছে। আমার বাড়ির ঢোকার গলির মুখেই একটা পূজো হয়। খুব বড় করে প্যান্ডেল না হলেও মোটামুটি বড়ই। ব্যাগটা পিঠে ঝুলিয়ে দুর্গা মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালাম। চারিদিকে নতুন যৌবনের ভিড়, প্রজাপতির মতো উড়ছে। দুর্গা মায়ের মুখটা দেখলেই মনের ভেতর যেন কেমন একটা অনুভূতি তৈরী হয়। হঠাৎ কে যেন ছুটে এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল,দুহাতে জোরে খামচে ধরল আমার পিঠের জামাটা। চমকে উঠে বললাম,
— "কে? কে তুমি?'
শরীরের গন্ধ টা নাকে আসতেই বুঝতে পারলাম জয়িতা জড়িয়ে ধরেছে আমাকে।— "এই কি করছিস! ছাড় আমাকে। সবাই দেখছে!"
দু'হাতে আমার কাঁধের কাছ টা জড়িয়ে ধরে, মুখের দিকে চোখ তুলে চাইল,— "আমি জানতাম! তুই ঠিক আসবি...।"
ওর দু চোখের জলে আমার জামা টা ভিজে উঠেছে। — "পাগলি! এবার ছাড়,সবাই দেখছো তো! দেখ তোর জন্য একটা গিফট এনেছি!"
আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,- "কি? কই দেখি!"
আমি পিঠের ব্যাগ টা নামিয়ে ভেতর থেকে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া পাঁচটি কাশফুলের শিশ ওর হাতে দিলাম।
— "কি এগুলো?"
— "কাশ ফুল।"
— "সত্যি! আগে দেখি নি তো!"
- "তোর জন্যই তো মাঠ থেকে তুলে আনলাম। "
কাশফুল গুলো ও নিজের বুকে চেপে ধরেছে। ওর বুকের স্পর্শে ফুল গুলো যেন সতেজ হয়ে উঠতে চাইছে। হঠাৎ ই জয়িতা আমার গালে একটা কিস করে ছুটে চলে গেল।
— "এই দাঁড়া! আমিও তো যাব।"
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.