কৃপণ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


—"আজ বাড়ি ফেরার সময় বাজার থেকে ইলিশ মাছ আনবে, বাবু খেতে চেয়েছে। আর শোনো , সেন দের দোকান থেকে আমার জন্যে দুটো শাড়ি,আর বাবুর জন্যে দু সেট জামা প্যান্ট মার্কেটিং করে আনবে।"
সকালবেলা উঠে গিন্নির মুখ ঝামটা আর ফর্দ শুনে বিমলবাবুর কপালে ভাঁজ পড়ল। খবরের কাগজটা বন্ধ করে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। চা টা যেন কেমন বিস্বাদ লাগল। বিরক্ত হয়ে বললেন,— "চা য়ে একটু বেশি করে চিনি দিতে পার না?"
রান্নাঘর থেকে গিন্নির গলার আওয়াজ উঠল,
— "চিনি থাকলে ঠিক দিতুম। আড়াইশো চিনি এনে পনেরো দিন চালাতে বলবে,তো কি করে চলবে, শুনি?"
গিন্নির মেজাজ এখন খুব গরম আছে,তাই চুপ করে যাওয়াই মনস্থির করলেন। যদিও প্রতিদিন ই এরকম মুুখ ঝামটা শুনতে হয়, অন্য দিন হলে মাসের শেষ বলে কাটিয়ে দিতেন কিন্তু আজ তো মাসের প্রথম; বেতন তোলার দিন। চায়ের কাপে দ্বিতীয় চুমুক না দিয়ে, আবার খবরের কাগজ টা খুললেন বিমলবাবু।
রান্না ঘর থেকে চিনির কৌটা টা এনে বিমল বাবুর সামনে রাখলেন গিন্নি।— "সব নেবে না। বাবুর দুুধে ও একটু দিতে হবে ।"

গিন্নির এই একটা জিনিষ তার খুব ভাল লাগে। যতই মুখ ঝামটা , কথা শোনাক না কেন, ভালবাসা টা কিন্তু পুরোনো হয়নি। তাই দশ বছর এক সঙ্গে, এক ঘরে কাটিয়ে দিতে পেরেছেন।


দক্ষিন চব্বিশ পরগনার মফস্বল শহরের ছা পোষা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক বিমল বাবু। লম্বা গড়ন, মোটাসোটা চেহারা; চোখে একটা হাই পাওয়ারের,মোটা ফ্রেমের চশমা। গোল মাথার হাল্কা চুল গুলো সবে দু একটা করে সাদা হতে শুরু করেছে। মাসে মাসে দু টো এল.আই.সি আর হাউসলোনের টাকা দিতে দিতে বেতনের অর্ধেক চলে যায়। তার উপর নিত্য প্রয়োজনের বাজারে আগুন......।
বিমল বাবু হাত দিয়ে কপালের ঘাম মোছেন। দোতালা বাড়িটি তিনি করতে চাননি, কিন্তু গিন্নির আবদার যে রাখতেই হবে। গিন্নির ছোটো বেলার শখ,নিজের বাড়ির ছাদে টবে ফুলের গাছ লাগাবেন, বিকালের দখিন হাওয়ায় একটু ছাদে চেয়ার পেতে বসবেন; আর তাছাড়া জামা কাপড় রোদে দেওয়ার ও অসুবিধে হয় । তাই ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে ,গিন্নির শখের দোতালা পাকা বাড়িটি বানিয়েছেন এই বছর খানেক হল।
— "আজ কিন্তু কোনো অজুহাত শুনবো না! ইলিশ মাছ কিনে তবেই ঘরে ঢুকবে ,নইলে রাতে খাবার বন্ধ।"— চায়ে এক চামচ চিনি মেশাতে মেশাতে গিন্নি বলল।
বিমল বাবুর মুখটা শুকনো হয়ে গেল। শুকনো মুখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,—" ইলিশ মাছের কত দাম জান? পাঁচশ টাকা কেজি। পেঁয়াজের দাম টাও বেড়েছে, সংসার খরচ তো আর তোমাকে চালাতে হয় না......!"
বিমল বাবুর কথা আর শেষ হল না, সাপের মতো ফণা তুলল গিন্নী,— "তোমার মতো কিপটে মানুষ জীবনে কখনো দেখি নি কো! পাশের বাড়ির জয়ন্ত বাবু কে দেখ; তোমার মতো তো মাস্টার গিরি করে। তবুও বউ নিয়ে প্রতি রবিবার,কলকাতায় বেড়াতে যায়; বিগ বাজার থেকে শপিং করে আনে..... আর তুমি! বাড়িতে টি.ভি তে ডিসকভারি চ্যানেল চালিয়ে বলবে,— ঐ দেখ, আইস ল্যান্ডে বরফ ভাঙছে, পেঙ্গুইন পাখি, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, উওর আমেরিকার ঘন জঙ্গল, রাক্ষুসে পিরানহা মাছ.....।"
গিন্নীর কথা শুনে বিমল বাবু উঠে গিয়ে টি.ভি তে নিউজ চ্যানেলটা অন করেন। এই একটাই ওষুধ, নিউজ চ্যানেল টা চালালেই, গিন্নি আর তার পাশে থাকেন না।

স্কুলে যাওয়ার পথে বিমল বাবু মনে মনে সারাদিনের কাজ টা সাজিয়ে নেন। প্রথমে স্কুল, তারপর টিফিন আওয়ারে বেরিয়ে ব্যাঙ্ক, ব্যাঙ্ক থেকে সোজা ইলিশ মাছ, ইলিশ মাছ থেকে সেন দের দোকানে মার্কেটিং। আজ ইলিশ মাছ না কিনলে গিন্নির সামনে আর মুখ দেখানো যাবে না। কিপটেমির অপবাদ তার ঘোচাতেই হবে।
একটা খুব বড় নিশ্বাস ফেলে বিমল বাবু। টিফিন আওয়ারে স্কুল থেকে বেরিয়ে ব্যাঙ্কে ঢোকেন, হাজার সাতেক টাকা উঠিয়ে ধীরে ধীরে বাজারের দিকে রওনা দেন। মাছ বাজারে ঢোকার মুখেই একটা কামারের দোকানে চোখ আটকে যায় তার। — দীপক না!

দীপক মন্ডল, ছোটো বেলার গ্রামের স্কুলের সবথেকে কাছের বন্ধু ছিল বিমল বাবুর। এক সাথে দশ ক্লাস পর্যন্ত পড়াশুনা করে ছিল। খুব মেধাবী ছাত্র ছিল দীপক, প্রতি বছর ক্লাসে প্রথম হত। মাধ্যমিকেও স্কুলের সেরা রেজাল্ট করে। তারপর মাধ্যমিক পাশ করে এই শহরে চলে আসে বিমল বাবুর পরিবার, গ্রামে কোনো আত্মীয় ছিল না তাই ওদিকে কোনোদিন আর যাওয়া হয় নি।
— কিন্তু দীপক এই কামারের দোকানে কি কাজ করছে!
মাছের বাজারে না ঢুকে বিমল বাবু ঐ কামারের দোকান টার দিকে এগিয়ে যায়। ভালো করে দেখে লোকটিকে,হাড়গিলে চেহারা, কালো, গায়ে একটা ময়লা জামা। হ্যাঁ,দীপকই তো! একটা ডাক দেয় বিমল বাবু, — "এই দীপক!"
লোকটি গামছা দিয়ে ঘাম মুছে বাইরে আসে।
— "চিনতে পারছিস না আমায়! আমি বিমল। সেই ছোটোবেলার গ্রামের স্কুল... .."
লোকটি স্কুল শব্দটাই হয়তো ভুলে গেছে। তবুও মনে করার চেষ্টা করে,—" তুমি বিমল!, কি মোটা হয়ে গেছ তুমি! চিনতেই পারিনি।"
— "তুমি বলছিস, কি রে! তুই করে বল।"
দীপক মাথা নিচু করে। ছোটোবেলার বিমল, আর এখনকার বিমল অনেক পার্থক্য। তার পাশে দাঁড়াতেই কেমন যেন অস্বস্তি হয় দীপকের। বিমল বাবু দীপকের হাতটা ধরে সামনের একটা মিষ্টির দোকানের দিকে নিয়ে যায়,— "চল, অনেক দিন পর একটু গল্প করা যাবে।"
অনিচ্ছার সত্বেও দীপক যায়। মিষ্টি র দোকানের একটা ফাঁকা টেবিলে দু'জন বসে। বিমলবাবু অর্ডার দেয়।
— "তো বল! কেমন আসিছ?" জিজ্ঞেস করে বিমল বাবু।
— "এই চলে যাচ্ছে।" দীপক উত্তর করে।
— "কামারের দোকানে কি করছিস?"
— "নতুন কাজ পেয়েছি।"
—" মানে? পড়াশুনা!"
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে দীপক।— "মাধ্যমিকের পর আর পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারিনি। সংসার দেখা শোনার দায়িত্ব এসে পড়ে।"
বিমল বাবু অবাক হয়ে দীপকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। পুরোনো স্মৃতি তে ভেসে যায়...।
— "তোর মনে পড়ে দীপক, সেই মাস্টার মশাইয়ের বাড়ি পড়তে গিয়ে রাতে আম চুরির কথা। বর্ষায় জল কাদার মধ্যে ফুটবল খেলার কথা। মেয়েদের দেখানোর জন্য তুই সবসময়, মাঠের পাশে সাইট ব্যাকে খেলতিস!"
একটা ক্ষীন হাসি হাসার চেষ্টা করে দীপক। আজ বিমল বাবুর মন টা খুশিতে ডগ মগ। ছোটোবেলায় কত বার দীপকদের বাড়িতে ভাত খেয়েছে , ওর মায়ের হাতের তালের বড়া..... এক এক করে সব যেন বিমল বাবুর চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
— "এই, কাকু, কাকিমা কেমন আছে রে?"
দীপকের মনটা যেন ভারী হয়ে ওঠে।— "বাবার শরীর টা ভাল নেই রে। হার্টে একটা অপারেশন করাতে হবে। অনেক খরচ, খেটে খুটে হাজার পঁচিশ টাকা জোগাড় করেছি,এখনো পাঁচ হাজার টাকা লাগবে বলছে; তাই সারাদিন এখানে কাজ করি।"
বিমল বাবুর চোখে জল চলে আসে। ছোটোবেলায় দীপকের বাবা, ওদের দুজন কে কত মজার মজার রূপকথার গল্প শোনাত। আর আজ সেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। একটু ভাবে বিমল বাবু। তারপর পকেট থেকে ব্যাঙ্ক থেকে তোলা,সাত হাজার টাকা বের করে দীপকের হাতে দেয়।— "এটা, রাখ। কাজে লাগবে।"
দীপক অস্বস্তিতে পড়ে। টাকা গুলো নিতে চায় না, — "না রে, ভাই তোর ও তো সংসার আছে। আমি ঠিক জোগাড় করে নেব।"
বিমল বাবু কোনো কথা শোনে না। জোর করে দীপকের হাতে টাকাটা গুঁজে দেয়।— "কাকুকে ভাল করে চিকিৎসা করাস।"
আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না দীপক। কাঁদতে কাঁদতে তার ছোটোবেলার বন্ধু কে জড়িয়ে ধরে।

মিষ্টির দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটা ধরে বিমল বাবু। আজ মনের ভিতর যেন এক অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে। গেট দিয়ে বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে গিন্নির ইলিশ মাছের কথা মনে পড়ে। ধীরে ধীরে খালি হাতে ঘরে প্রবেশ করে। রান্না ঘর থেকে গিন্নির গলার আওয়াজ পায়,— "কি গো! ইলিশ এনেছো তো?"
কোনো কথা বলতে পারে না বিমলবাবু। গিন্নী সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।— "আমি, জানতাম তুমি আনবে না। তোমার মতো কিপটে মানুষ এ পৃথিবীতে দু টো নেই।"
বিমল বাবু চুপ করে শোবার ঘরে ঢুকে যায়। অনেকদিন পর জানালা দিয়ে বিকেলের নীল আকাশটিকে দেখতে থাকে।

স্বদেশ কুমার গায়েন  ( ২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.