একটি ছেলের সন্তান প্রসব ~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


— "আরে ও কামাল! তোমাদের সাকিবুল নাকি সন্তান প্রসব করেছে ?"
— "খুড়ো! আমিও তো তাই শুনে আশ্চর্য গিয়েছি। সকাল বেলা রিক্সা নিয়ে স্ট্যান্ডে এসে দেখি,- আজ কেউ আসেনি। পরে শুনলাম সব হাসপাতালে গেছে, সাকিবুল কে দেখতে।"
- "আরে আমিও তো সেরকম শুনলাম; ব্যাপার টা কি জানার জন্যেই তো বেরুলাম। ও তো তোমাদের এখানেই রিক্সা চালাত; তোমরাই জানবে সব।"
— "আরে খুড়ো! পুরুষ মানুষ পোলাপান প্রসব করবে কি ভাবে ?"
— "কি জানি বাবা! আজ কাল বিজ্ঞানের যুগে কি সব টেস্ট টিউব – ফেস্ট টিউব বেবি হয় নাকি! তবুও মেয়ের সন্তান, মায়ের গর্ভে শুনেছি কিন্তু এরকম ছেলের সন্তান প্রসব কোনোদিন শুনি নি কো! তবে বিজ্ঞান যে ভাবে এগোচ্ছে, তাতে আর কোনো কিছু অসম্ভব না।"
— "কি জানি খুড়ো! ও সব বিজ্ঞেন-টিজ্ঞেন আমি জানি নে। তবে কথাটা কিন্তু সত্যি।সারা গ্রামের মুখে মুখে।"
- "তা চলো না কামাল, একটু ঘুরে আসি। তোমার একটা ভাড়া ও হবে।"
ছেলেটির নাম সাকিবুল ইসলাম। বষয় খুব বেশী হলে, সতেরো, কি আঠেরো হবে।মুখটা মোটামুটি ফর্সা ,খুব বেশী লম্বা ও না, মাঝারি মানের উচ্চতা । চুল গুলো মিলিটারি দের মতো ছোটো ছোটো করে ছাঁটা। পরনে সব সময় ফুল হাতা জামা, আর জিনস।
— "আচ্ছা! কামাল, ওর কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নাকি?"
— "তুমিও খুড়ো! যদিও বা থাকে তবে,কিছু হলে ওই মেয়েটির হবে,সাকিবুলের কেন হবে?"
- "মাথায় ঢুকছে না কিছু আমার!"

সাকিবুল,প্রথমে আমার কাছেই এসে বলেছিল, "- কামাল ভাই, তোমাদের এখানে একটু রিক্সা চালাতে দেবে?"
আমিই ইউনিয়ন কে বলে ওকে এখানে রিক্সা চালানোর পারমিট করে দিয়েছিলাম। বাচ্চা ছেলে, বিয়ে থা করিনি, তাই সারা দিন এই রিক্সা স্ট্যান্ডে পড়ে থাকত পয়সার জন্যেই। মাঝে মাঝে নিজের কথা আমার সাথেই বলত। সাত কুলে সাকিবুলের কেউ নেই। ওর মুখেই শুনেছিলাম, ওর বাবা যখন মারা যায়,তখন ওর বয়ষ সাত। আধপেটা খেতে খেতে ওর মা একদিন, একটা লোকের সঙ্গে পালিয়ে যায়; ওকে একলা রেখে। তখন ওর বয়েষ দশ। আর কোনোদিন খুঁজে পায়নি মা কে। দিনের পর দিন না খেয়ে এক দিদার বাড়ি থাকার জায়গা জোটে। সারাদিন হাড় খাটুনির পর সন্ধ্যায় একটু ভাত জুটতো।
— "বুঝলে, খুড়ো! তবে ছেলেটির স্বভাব কিন্তু ভাল মনে হয়! এরকম ছেলেরা হয় চোর, না হলে গুন্ডা, বদমাস দলে ভিড়ে যায়। কিন্তু ও তা করিনি, একটা ভ্যান জোগাড় করে দিনরাত খাটছে।"
— "হ্যাঁ! কিন্তু এই ঘটনাটা খুব আশ্চর্যজনক।" খুড়োর উত্তর।
রাস্তার পাশ দিয়ে একদল মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মনে হয় এরা হাসপাতাল থেকে ফিরছে। আমাকে রিক্সা চালাতে দেখে মেয়ে গুলো হেঁকে বলল,- "আরে ও কামাল ভাই! তুমার দোস্তের মাইয়া হইছে।ডাক্তার দিদিরা বইল্য ফুটফুটে এক মাইয়া।"
কথা গুলো বলে মেয়ে গুলো মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল। আমি ভ্যান টা থামিয়ে জিজ্ঞাসা, করলাম,— "ঘটনাটা কি সত্যি? তোমরা নিজে চোখে দেখেছ?"
- "হাসপাতালে, ঘরে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না! দুর থেকে একটু দেখা যাইছে।"
আমরা দুজনেই অবাক হয়ে গেলাম। রিক্সার প্যাডেলে গতি তুললাম। সাকিবুল আমার সঙ্গে একটু কথা বলত বেশি। অন্যরা সবাই বসে তাস খেললেও, কখনো ওদের ধারে যেত না। আমার কাছেই বসে থাকত। আমাকে ভাইয়া বলে ডাকত। ওর মুখের ভাইয়া ডাক শুনতে আমার খুব ভাল লাগত, নিজের তো কোনো ভাই ছিল না।অল্প বয়েষে ওর এই দিন রাত পরিশ্রম দেখে, আমার ও কষ্ট হত খুব। বেশ কিছুদিন দেখছিলাম রিক্সা চালাতে চালাতে সাকিবুল হাপিয়ে উঠত খুব। বুঝতে পারতাম এই বয়েষে ওর খুব কষ্ট হয়। তারপর হঠাৎ তিনমাস ধরে ও কোথায় উধাও হয়ে গেল। অনেক খুজলাম পায়নি কোথাও।তারপর আজ হঠাৎ শুনলাম এই ঘটনা।

হাসপাতালের সামনে রিক্সা টা থামাতেই দেখলাম প্রচুর ভিড়। সত্যি তো! এরকম একটা ঘটনা শুনলে মানুষ তো ছুটে আসবেই। কাউকে ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। ভিড় ঠেলা ঠেলি করে খুড়ো আর আমি হাসপাতালে ভিতর ঢোকার দরজায় দাঁড়ালাম। দেখলাম,- আমাদের গ্রামের ক্লাবের বদমাস ছোঁড়া মমিনুল,আর তার দলবলকে বেদম পেটাতে পেটাতে বাইরে নিয়ে আসছে পুলিস। মমিনুল পুলিস টার পা জড়িয়ে ধরছে, তবুও রুলের সপাৎ সপাৎ বাড়ির শব্দ হচ্ছে। মমিনুলের দলবল কে পেটাতে পেটাতে পুলিস,তাদের গাড়িতে তুলে বেরিয়ে গেল।
এক ডাক্তার দিদি কে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, — "দিদি, সাকিবুল কেমন আছে? আমি ওর ভাইজান আছি।"
আমার কথা শুনে তিনি যেন বিস্মৃত হলেন, — "সাকিবুল! সাকিবুল কে?"
খুড়ো অবাক হয়ে বলল,— "ওই যে আজ যে এখানে বাচ্চা প্রসব করাতে এসেছে।"
পাশ থেকে একটা নার্স ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে গেল,— "আপনারা যাকে খুঁজছেন সে মনে হয় পাঁচ নাম্বার রুমে আছে।"

অবশেষে ঘর টা খুজে পেলাম। ভিতরে ভিতরে কেমন একটা উত্তেজনা হতে লাগল। দুজনই ঘরের ভিতর ঢুকে গেলাম। হাসপাতালের বেডের উপর ওরা দুজন শুয়ে আছে। সাকিবুলের গায়ে হাসপাতালের ড্রেস, বালিশে মুখ গুজে আছে ও। কিন্তু চুলের ছাঁট দেখে সাকিবুল কে চিনতে পারলাম। পাশে একটা ফুটফুটে চাঁদের মতো মেয়ে। দুজনে পরষ্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। এ কি করে সম্ভব?
— "এই সাকিবুল!" আস্তে করে ডাক দিলাম। আমার দিকে পাশ ফিরে তাকাল ও।
হ্যাঁ! সাকিবুলিই তো! কিন্তু ওর বুকের দিকে চোখ যেতেই আমার সারা শরীর টা কেঁপে উঠল। দুটো স্ত্যন মেয়েদের মতোই। ঢিলা ঢালা ফুল হাতা জামা পরত বলে কোনোদিন বোঝা যায়নি। শুধু ওর হাত দুটো দেখতে পেতাম, রিক্সার হাতল ধরে ধরে কালো কড়া পড়ে গেছে, কিন্তু তার উপরের অংশ এত নরম ও ফর্সা কোনোদিন টের পায়নি।
— "সাকিবুল তুই মেয়ে?" জিজ্ঞেস করলাম আমি
ভাইজান বলে কেঁদে পড়ল সাকিবুল।
- "তুই কে তাহলে ?"
- "সাকিরা খাতুন!"
আমাদের দুজনের বিস্ময়ের ঘোর এখনো কাটেনি। তারপর শুনলাম সাকিরার বিস্ময়কর কাহিনি,— চোখে জল এসে গেল দুজনের। মা, অন্য একটা লোকের সাথে চলে যাওয়ার পর দিদার বাড়ি যায়গা হয় সাকিরার। দিদার ভালবাসা কোনোদিন সে পায়নি,বরং জুটেছে মারন যন্ত্রনা। একটু একটু করে বড় হতে থাকে সে। পনেরো বছর বয়েষে সে নিজের শারীরিক পরিবর্তনের অনুভূতি পায়। বুক টা যেন বড় হতে থাকে, পাড়ার ছেলে গুলো কেমন ভাবে তাকায়; সারাক্ষন বাড়ির পাশ দিয়ে ঘুর ঘুর করে। বাড়ির বাইরে বেরোলেই যেন খেয়ে ফেলবে! কিন্তু কাজের জন্যে তো বাড়ির বাইরে বেরোতেই হবে। ওদের হাত থেকে বাঁচার রাস্তা খোঁজে সাকিরা। একদিন হঠাৎ দিদার বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। সবার চোখের আড়াল হতে ছেলেদের ছদ্মবেশ ধরে সাকিরা। ছোটো ছোটো করে মিলিটারিদের মতো চুল ছাঁটে । মুখটা অনেকটা ছেলেদের মতো দেখতে, তাই সন্দেহের জায়গা থাকেনি। কথা বলা, হাঁটা চলার ভঙ্গিমা সবকিছু ছেলেদের মতো আয়ত্ত করে নিয়েছিল সে। তারপর একটা রিক্সা জোগাড় করে এই রিক্সা স্ট্যান্ডে আসে। দুবেলা দুমোটো খাওয়ার জ্বালায়, দিন রাত এই স্ট্যান্ডে পড়ে থাকে। কিন্তু শকুনের চোখ থেকে বাঁচবে কি করে ও? শকুন গুলো অনের দুর থেকেও টের পায় কোন প্রানী টি জীবিত আর কোনটি মৃত। সাকিরাকে ও ওরা চিনতে পারে। রাতের পর রাত মমিনুল আর তার দলবলের কাছে গন ধর্ষিতা হয় সাকিরা। ওদের দেখানো মৃত্যু ভয়ে কাউকেও বলতে পারে না। দিনের পর দিন সয়ে যায় এই যন্ত্রনা।আজ তাই ও হাসপাতালে। একটা মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। কুমারী মা আমাদের।খুড়ো আর আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। এ ভাবেও মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে?
এগিয়ে গিয়ে স্নেহের হাতটা ওর মাথায় রাখি। এক বিন্দু হাসির কণা ফুটে ওঠে আমার ঠোঁটের কোনে,— আমাদের সাকিবুল সন্তান প্রসব করেছে।
পুনশ্চ: গল্পটি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা অবলম্বনে লেখা। নাম পরিবর্তিত ও গল্পের প্রয়োজনে কিছু ঘটনার পরিবর্তন করা হয়েছে।
স্বদেশ কুমার গায়েন(২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.