উপহার~ অনুগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]


মাসের শেষ। তাই আজ বেতন তোলার দিন। স্কুল থেকে ফেরার পথে এটিএম থেকে হাজার সাতেক টাকা তুলতে হবে। সারা মাসে অনেক ধার দেনা পড়ে গেছে। ব্যাপার টা স্বাভাবিক। সব প্রাইমারী স্কুলের মাস্টার মশাইদের এই চাপ টা পড়ে। বছর খানেক হল প্রাইমারী স্কুলে চাকরী পেয়েছি। সুতারং ধার– দেনার চাপ তো থাকবেই। তবে আমার এই টাকা তোলার অন্য একটা বিশেষ কারন ও আছে। প্রতিমাসেই আমি এটা করি।
"উপহার!"
মাসের শেষে বেতন তুলে,রিশিতার জন্যে কিছু কেনা কাটা করে না নিয়ে গেলে আমার বদহজম হয়। রিশিতা আমার স্ত্রী। তাই এগুলো কে আমি, উপহারই মনে করি। যদিও পাগলামো টা আমার, আজকের নয়। সেই চাকরী পাওয়ার আগে থেকে। তখন টিউসন পড়ানোর টাকায়,প্রতিমাসে ছোটো খাটো গিফট দিতাম। রিশিতা তখন এসব পছন্দ করত না,আজও করেনা। ফাঁকা ঘরে, আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলত," এখন এত টাকা খরচ করে এসব কেন কেনার দরকার? বিয়ের পর যত খুশি পারিস দিস!"
একবছর হল রিশিতাকে বিয়ে করেছি। মাস গেলেই নতুন, নতুই উপহার কিনে নিয়ে যাই ওর জন্যে। কিন্তু ও আজও এসব পছন্দ করে না। আমার ওর জন্যে কিছু কিনতে খুব ভাল লাগে। মনের মধ্যে যেন কিরকম একটা অনুভুতি হয়। আপনারাই বলুন তো,ভালবাসার মানুষের জন্য কোনোকিছু কিনতে সত্যিই ভালো লাগে,না?
জানি! আপনাদের ও ভাল লাগে। আর সেই ভাললাগার অনুভুতিটা কেমন,সেটা নিশ্চই বুঝতে পারছেন!
বাজারের সব থেকে বড় দোকানটিতে ঢুকে আমার মাথা গুলিয়ে যায়। কি কিনব বুঝে উঠতে পারি না! প্রথমে একটা শাড়ি পছন্দ করি। আকাশী নীল রঙের। ওর খুব নাকি প্রিয়, এই রঙ। আর সেই জন্যে বোধ হয়,বিকালে ছাদে চেয়ারে বসে একদৃষ্টে নীলরঙা আকাশটির দিকে চেয়ে থাকে। অনেকক্ষন বেছে বেছে আবার একটা সালোয়ার কামিজ পছন্দ করলাম। বিল মিটিয়ে উঠতে যাব,ঠিক তখনি কথাটা মনে পড়ল। 'কথা' ঠিক নয়, একটা ছবি টা মনে পড়ল। রিশিতার কুড়ি বছরের ছবি। হাঁটু পর্যন্ত জিনসের প্যান্ট আর গায়ে একটা গেঞ্জি পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেত। পিঠের মাঝ বরাবর ঝরঝরে সোনালি রঙের চুল গুলো হাওয়ায় সর সর করে উড়তো। আমি ওকে আড়ালে ডেকে বলতাম," এত বড় হয়েছিস,এখন এসব পরতে ভাল লাগে? সবাই তোর দিকে কেমন হাঁ করে তাকায়!"
ও হেসে বলতো,"এটা আমার খুব পছন্দের ড্রেস" এখন রিশিতার পঁচিশ বছর বয়েষ। চেহারায় খুব একটা পরিবর্তন হয়নি,বরং আগের থেকে হাল্কা হয়ে গেছে। তাই আবার ওই ড্রেসের জন্য বসে পড়লাম। অনেক ঘাঁটাঘাঁটির পর একটা পছন্দ হল। দোকানদার কে প্যাক করে দিতে বললাম। সন্ধ্যায় ঘরে পৌঁছালাম।আমার হাতে এত জিনিষপত্র দেখে চমকে উঠল রিশিতা। বলল," তুই, আবার এত কিছু কিনে এনেছিস? কি দরকার এসবের?"
আমি ওর কথায় কোনো কান দেই না। প্যাকেট গুলো সব খুলে ফেলি।
— "দেখ! তোর পছন্দের সেই জিনস প্যান্ট আর গেঞ্জী " রিশিতা কিছুই দেখে না। সটানে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। দুচোখে জল।
" কেন করছিস এসব? দিন পনেরোর মধ্যে হয়তো আমি মারা যাব; আমাকে এসব পরা এখন মানায় না" রিশিতা আমার গলার কাছে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
আমার বুকের ভেতর যেন তপ্ত লোহা গলে গলে পড়ছে। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে আমার,কিন্তু পারছি না। একটা যন্ত্রনা যেন উইপোকার মতো কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। যে যন্ত্রনার শুরু হয়েছিল মাস তিনেক আগে,– যখন ওর ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে।
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.