নীরব ভালোবাসা ~ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]



( ১)

কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে চোখ টা সরিয়ে ঘড়ির দিকে চাইতেই দেখি একটা বেজে গেছে।দুপুর একটা মানের অফিসের লাঞ্চ ব্রেক।আমার সামনের টেবিলে বসে থাকা বনি হাত দু'টো উপরে তুলে একসাথে বেঁধে,কোমর টা একবার ডান দিক, একবার বাঁদিক করে একটা ঘুম জড়ানো গলার মতো আওয়াজ করে বলল,-"চ,জয়,খুব খিদে পেয়েছে।লাঞ্চ টা সেরে আসি।"

বনির ভালো নাম বনিতা চক্রবর্তী। পাঁচ ফুট ছ'ইঞ্চির স্লিম চেহারা। ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ।লম্বাটে মুখের গড়ন,টিকালো নাক,ভাসা ভাসা চোখের উপর সরু সুতোর মতো ভুরু।মাথা ভরা কুচকুচে কালো চুল,ঘাড় পর্যন্ত ছড়ানো। হালকা গোলাপি ঠোঁটে হার্টবিট বাড়িয়ে দেওয়ার মতো মিষ্টি হাসি।

বনির কথা শুনে আমি আবার চোখ রাখলাম কম্পিউটারের স্ক্রিনে। পয়েন্টার টা ঘোরাতে ঘোরাতে বললাম,-"একটু ওয়েট কর। আর একটু খানি কাজ বাকি আছে।"
চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো বনি। আলতো করে আমার পিঠের উপর বাঁহাত টা রাখলো। তারপর আমার হাত থেকে মাউস টা কেড়ে নিয়ে কানের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল ,-"দু'দিন এসেই কাজের ভাতার হয়ে গেলি নাকি!"
কম্পিউটার টা সাট ডাউন করে দিল বনি।আমি আর কিছু বললাম না। এরপর কিছু বলা মানেই,আরও অনেক কথা শুনতে হতে পারে। চোখ থেকে চশমা টা খুলে,দুহাতের চেটো দিয়ে চোখ দুটো রগড়ে নিলাম। তারপর দেরি না করে পাশ থেকে ব্যাগ টা নিয়ে উঠে পড়লাম।
দোতলার একেবারে শেষ প্রান্তে আমাদের অফিসের ক্যান্টিন।সিড়ি দিয়ে উঠলাম দু'জন। ফাঁকা ফাঁকা ক্যান্টিন।এখনো সবাই আসেনি। তাই ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।জানালার পাশের একটা চেয়ারে ব্যাগটা রেখে, ক্যান্টিন ম্যানেজার সুমন দা কে বলল,-"আজ মেনু তে কি আছে,
সুমন দা?"
-"সব পাবে।নিরামিষ থেকে শুরু করে আমিষ দিয়ে চাটনি তে গিয়ে শেষ।"
-"কি মাছ আছে আজ?"
-"বাটা মাছ।বড় বড়।"
ডিম-মাছ-মাংস-নিরামিষ এই ভাবে রোলিং চলে আমার।কালই ডাবল ডিম খেলাম।তাই আজ মাছ ভাত।
দ্বিতীয়বার আর কিছু না ভেবে একটা মাছ ভাতের অর্ডার করে দিলাম।পিছন দিক থেকে বনি হাঁকলো,-"জয়! মাছ নিস না।আমি এনেছি। অন্যকিছু অর্ডার কর।"
উফ!এ মেয়েটা বিরক্তই করতে জানে শুধু।সুমন দা কে আবার হেঁকে বললাম,-"সুমন দা,তোমার বাটা মাছ ক্যানসিল করো।চিকেন দাও।"
ভাতের থালাটা টেবিলে এনে বসতেই বনি বলল,-"আমি যেদিন যেটা আনবো,সেদিন সেটা তুই অর্ডার করবি না।"
-"কেন?আমার একটা সিস্টেমেটিক রুল চলছে।"
-"ভাড় মে যাক তোর রুল।যেটা বলছি সেটা করবি।
-"করতে পারি,তবে তোকেও আমার খাবার শেয়ার করতে হবে।নইলে প্রতিদিন তোর থেকে খাবার খেতে পারবো না।"
-"কত বার বলবো তোকে! আমার বাইরের খাবার খাওয়া ডাক্তার বারন করে দিয়েছে। পেটের প্রবলেম আছে তাই।মা জানতে পারলে বকবে।"
-"তাহলে বাদ দে।"আমি ভাতে ডাল মাখিয়ে একটু ভাজা তুলে নিলাম।
-"আচ্ছা,বাবা! নেব।তবে একটু খানি কিন্তু।"বনি হাসল।
আমিও হাসলাম।আসলে ওর হাসি মুখ টা দেখলে,আমার ও হাসি পেয়ে ওঠে।কেন পায়, কিভাবে পায়,তার কারন বের করতে গেলে, বিজ্ঞানীদের ঘাম ছুটে যাবে।
ব্যাগ থেকে টিফিন কৌটা টা বের করে বনি বলল,-"থালা টা এগিয়ে দে।"
থালা এগিয়ে দিলাম আমি।টিফিন কৌটার ঢাকনা টা খুলতেই একটা সুগন্ধ নাকে এসে প্রবেশ করল।
একটা মাছের পিস তুলে বনি বলল,-"এই নে,বড় পিস টা আজ তোর জন্যে।"
আমি বাঁ হাত দিয়ে খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেললাম।-"একদম না। আমাকে ছোটো টা দিবি।"
-"হাত টা ছাড়।বেশি কথা বললে, দু'টো মাছই দিয়ে দেব।"বনি চোখ মোটা করল।
আমি ওর হাত ছেড়ে দিলাম।একটা মাছ,আর একটু মাছের ঝোল থালায় দিয়ে বলল,-"দে,এবার তোর টা।বাট, এক পিস মাংস দিবি
প্লীজ!"
আমি হেসে মাংসের বাটি টা বনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম,-"তুই নিয়ে নে।"
ইতিমধ্যে ক্যান্টিনের মধ্যে অনেকই চলে এসেছে। অনেকেই ক্যান্টিনে খায়।শুধু ব্যাচেলর রা নয়,বিবাহিত রাও।আমার মনে হয়,যে সব বিবাহিত রা ক্যান্টিনে খায়,তারা বউ কে খুব ভালোবাসে।কষ্ট দিতে চায় না।মাছের ঝোল দিয়ে খেতে খতে বনি কে বললাম,-"আজ,তুই রান্না করে আনলি না,মাসীমা বানিয়ে দিল?"
-"আজ,আমি করেছি।কেন,ভাল লাগেনি?"
-"শুধু ভাল নয়।দারুন।সামনের বছর তোর বিয়েতে ও কিন্তু তুই নিজেই রান্না করতে
পারিস।"হাসলাম আমি।
বনিও হো হো হো করে হেসে ওঠে।
বাটি থেকে একটা মাংসের পিস তুলে নিয়ে বলল,-"ধুর! ওই আধপাগলা টাকে বিয়ে করতে কোনো ইচ্ছে করে না।মাল টা প্রেমের ব্যাপারে কিছুই বোঝে না!"
-" না, না।তুই শুধু শধু ভুল ভাবছিস।"
আমাদের কথার মাঝখানে দীপক দা এসে তাল কাটলো। দীপক দা আমাদের সিনিয়র।আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পিঠে হালকা চাপড় মেরে বলল,-"কি রে, আজ মাছ -মাংস দু'টোই চলছে যে!" তারপর আমাদের উত্তরের অপেক্ষা না কে দু'টো টেবিল পেরিয়ে তার পরের টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল।
কথা হারিয়ে গেল আমাদের।খেতে থাকলাম দু'জন।চুপচাপ।কিছুসময় পর বনি আমাকে ডাকলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,-" এই,আজ কাল তুই বাচ্চাদের মতো আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকিস কেন?"
হঠাৎ এরকম সিলেবাস বর্হিভুত প্রশ্নে হোঁচট খেলাম।হাত সমেত খাবার টা মুখের কাছেই থেমে গেল। এবার আমি বনির দিকে ভালো করে তাকালাম।কালো প্যান্টের উপর সাদা জামা।ইন করা।গলায় অফিসের আইডেন্টিটি কার্ডটা বুকের উপর ঝোলানো। আমি ভুরু কুঁচকে বললাম,"তাকিয়ে থাকি মানে!তুই আমার সামনেই বসিস,তো কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে চোখ তুললেই তো,তোকে দেখতে পাব প্রথম।
-"ও তাই বুঝি! আমি ভাবলাম,আমি বোধহয় খুব সুন্দরী,তাই তাকিয়ে থাকিস।" সাদা সাদা দাঁত গুলো বের করে হেসে উঠল বনি।
এতক্ষন চাপে ছিলাম।চাপ কমল।
হেসে বললাম,-"তুই এমন সব ইর্য়াকি মারিস না...........এমনিতেই তুই খুব সুন্দরী।"
খাওয়া শেষ হল আমাদের।উঠে পড়লাম। আমাদের ডিউটি ছ'টা পর্যন্ত।ছ'টার পর যখন অফিস ছেড়ে বেরোলাম তখন বাইরের ইলেক্ট্রিক আলো গুলো সব জ্বলে উঠেছে। আকাশের দিকে তাকালাম।একটা লাল,সবুজ আলো দপ দপ করতে করতে ছুটে চলেছে। এরোপ্লেন জাতীয় কিছু হবে।অফিস থেকে বেরিয়ে পাঁচ মিনিট হেঁটে যাওয়ার পর বাসস্টপ।আমি আর বনি বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়ালাম।ওর বাস আগে চলে এল।বাসে উঠে হাত নাড়লো বনি।হেঁকে বলল,"বাই রে। রাতে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হবে।"
বনির বাস চলে গেল।আমার বাড়ি সাউথ কলকাতার দিকে।মিনিট পাঁচেক পর আমার শিয়ালগামী বাস আসতেই উঠে পড়লাম।

(২)
কোনো প্রচেষ্টাই বাদ রাখিনি।সব ধরনের প্রচেষ্টা বিফলে যেতে যেতে অবশেষে ভাগ্যে শিকে ছিড়ল।তাও আবার বেসরকারি একটা সংস্থায়। যাই হোক কিছু তো একটা পেলাম!
আমার অফিস নর্থ কলকাতায়।আর অফিসে ঢুকেই যে মেয়েটার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হল,সে এই বনি।আমি এমনিতেই মেয়েদের ভয় পাই।তাই একটু এড়িয়ে চলি।কিন্তু মেয়েটি প্রথম থেকেই আমার সাথে বন্ধুর মতো মিশে গেল।আমার সামনের টেবিলেই ও বসে। আর তাছাড়া একবছর হল,এই সংস্থায় কাজ করছে।তাই অফিসের সমস্ত কিছু ইনফরমেশন বনির থেকে পেয়ে গেলাম।কিছুদিন পর বুঝতে পারলাম,মেয়েটি খুব বক বক করতে পারে। সারক্ষন পায়রার মতো বকম বকম করতেই থাকে।অবশ্য চাপা স্বরে।

রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ।রাত এগারো টা বেজে পঁইত্রিশ মিনিট। ঘরের লাইট টা নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম।পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে অন হলাম।বনির পাত্তা নেই। সন্ধ্যা বেলা বলে দিয়েই খালাস! হোয়াটসঅ্যাপে আমার তেমন কেউ নেই কথা বলার মতো।
দু'এক জন ছাড়া।কিন্তু সবাই সবার কাজে ব্যস্ত।মিনিট সাতেক পর বনি কে অনলাইন দেখালো।আর অন হয়েই দাঁত বের করা একটা স্মাইলি সেন্ড করলো।
-"কি করছিস?" আমি টাইপ করলাম।
-"এই জাস্ট খেয়ে শুয়ে পড়লাম।
তুই?"বনির মেসেজ পেলাম।
-"আমি সাত মিনিট আগে শুয়ে পড়েছি।"
-"এই,আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লেখ।তোর কবিতা গুলো জাস্ট ফাটাফাটি।"
আমি হেসে লিখলাম,-"তাই নাকি? পড়তে গিয়ে ফেটে যাস না তো!
আর তাছাড়া তোকে নিয়ে কবিতা লেখার জন্য,তোর বয়ফ্রেন্ড আছে তো।
-"ধুর! ও যদি কবিতার ক জানতো, তবে অনেক কিছু হতো।প্রেমের কিছু জানে না।কিভাবে যে ওর প্রেমে পড়ে গেলাম....!"
-"কি বলিস যে তুই! পরের বছর তোদের বিয়ে,আর এখন এসব কথা!"
বনি একটানা একটা লম্বা মেসেজ টাইপ করলো।-"জানিস জয়, আমি একদম ভালো নেই রে।আমার ও কে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে নেই। অনেক বার বলেছি,এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে কিন্তু ওই আমাকে ছাড়তে চায় না। সারাদিন শুধু ব্যস্ত আর ব্যস্ত।আমার সাথে তার কথা বলারই টাইম হয় না।......ওর মতো কিপটে মাল আমি কখনো দেখিনি।কিছু কিনে দেয় না,কোথাও ঘুরতেও নিয়ে যায় না।"
আমার হাসি পায়।বালিশের এপাশ থেকে ওপাশ ফিরে টাইপ করি,-"ধুর! পাগলি।তবে ওরকম ছেলের সাথে প্রেম করতে গেলি কেন?"
-"তখন ছোটো ছিলাম কিছু বুঝতে পারিনি।কিন্তু আজ যখন বুঝতে পারলাম প্রেম কি,তখন সব শেষ। ওর সাথে থাকলে আমি প্রতিটা মুহুর্ত বোরিং হয়ে যাই। আমাকে একটু হাসি-খুশি ও রাখতে জানে না।"
বনির প্রতিটা মেসেজ সিরিয়াস ভাবে আসতে লাগলো আমার কাছে।আমিও সিরিয়াস হয়ে,একটা মেসেজ টাইপ করলাম,-"এরকম ভাবে বিয়ে করলে তো,বিয়ের পরেও সমস্যায় পড়বি।"
-"সে তো পড়বই।বাট,বিয়ের পর দেখিস,মাল টা কে আচ্ছা করে টাইট দিয়ে দেব।"
আমার হাসি পেল।একটা স্মাইলি সেন্ড করলাম।-"হুম!তাই দিস। সেটাই ভালো হবে।"
কিছুক্ষন চুপ করে রইলাম দু'জন।
তারপর নীরবতা ভেঙে মেসেজ এল।-"আচ্ছা,জয় তোর কেমন ধরনের মেয়ে পছন্দ হয়,বল!"
-"তোর মতো।" লিখলাম আমি।
-"মানে!"
-"মানে হল,যে সব মেয়ে সারক্ষন রেডিও জকিদের মতো বক বক করতে পারবে,হাসি মুখে থাকবে,আমাকে বকবে,মারবে....
সেরকম।"
-"হা হা হা...পাগল একটা।আমি তোকে সব করেছি,শুধু পেটায় নি। তবে কাল থেকে আমি তোকে পেটাবো।"
-"হুম।পেটাবি।"
ফোনের কীপ্যাডে শুধু খস খস শব্দ। আর মেসেজ আসার টিক-টক। ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি।
একবার ফোনের টাইমের দিকে তাকালাম। রাত দু'টো বাজে।চোখে ঘুম নেই।
-"ঘুম আসছে না তোর?" বনি কে
মেসেজ পাঠালাম।
উত্তর এল,-"না,রে ঘুম আসছে না। আরেকটু কথা বল আমার সাথে।"
আমি হেসে লিখলাম,-"কাল অফিস যেতে হবে।আর রাত জাগা ঠিক নয়।এবার ঘুমিয়ে পড়।"
শুভরাত্রি মেসেজ টা যখন পাঠালাম তখন, আড়াইটে বেজে গেছে।ফোন টা অফ করে চোখ বন্ধ করলাম।


(৩)
পরদিন সন্ধ্যা ছ'টায় অফিস থেকে বেরোতেই, আমার হাত ধরল বনি।
ওর চোখের দিকে তাকালাম আমি। বনি চোখে চোখ রেখে বলল,-" আজ তোকে আমার সাথে সিনেমা দেখতে যেতে হবে।"
-"এখন! আমি...তোর সাথে!"কথা জড়িয়ে গেল আমার।
-"আজ তোর কোনো কথা শুনবো না।অনেকদিন থেকে ইগনোর করে যাচ্ছিস।"
-"কিন্তু!....."
আর কোনোপ্রকার কিন্তু শুনলো না বনি।হাত ধরে টেনে গাড়িতে তুললো।কাছাকাছি একটা ভালো সিনেমা হলে নিয়ে গেল।বাংলা সিনেমা। প্রাক্তন।বাড়িতে ফোন করে আমি জানিয়ে দিলাম যে,ফিরতে রাত হবে আমার।তারপর বনির দিকে চেয়ে বললাম,-"রাতে শিয়ালদহ যাওয়ার বাস তো পেয়ে যাব,কিন্তু যদি লাস্ট ট্রেন মিস হয়ে গেলে প্লার্টফর্মেই রাত কাটাতে হবে।"
এখনো আমার হাত ধরে আছে বনি।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,-"আমার জন্যে না হয়, একদিন প্লার্টফর্মেই রাত কাটালি।"
তারপর কিছুক্ষন চুপ থাকার পর আবার বলতে শুরু করলো,"জানিস জয়,কালপ্রিট টাকে সকালে ফোন করে কত করে বললাম,চল আজ সিনেমা দেখে আসি একটা।কিন্তু
কি বলল জানিস?"
-"কি বলল?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
কালপ্রিট টা বলল,-"অত সিনেমা দেখার টাইম আমার হাতে নেই।আর সবসময় সিনেমা দেখার কি,আছে! বাড়িতে টি.ভি তে দেখে হয় না!"
এই মুহুর্তে বনির চোখ টা না ভিজলে ও মন টা যে ভিজে উঠেছে সেটা আমি বেশ বুঝতে পারলাম।
সেদিন আমার লাস্ট ট্রেন মিস হয়নি।আর বনি যে আমাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে গিয়ে,খুব খুশি হয়েছিল সেটা মনে মনে অনুভব করেছিলাম শুধু।


(৪)
আজ শুক্রবার।অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে টি.ভি নিয়ে বসলাম। ফুটবলের মরসুম এখন।ইউরো কাপের খেলা চলছে।দশটা বাজতেই মা খেতে ডাকলো।খাওয়া সেরে আবার টি.ভি নিয়ে বসলাম।এখনো খেলা চলছে।শুধু গোলের দেখা নেই।হঠাৎ টেবিলের উপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল।বনির ফোন।
টি.ভির সাউন্ড টা মিউট করে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে কান্নার আওয়াজ পেলাম।
হঠাৎ কি হল আবার!
অফিস থেকে ফেরার সময় তো সব ঠিকই ছিল।আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,-"কাঁদছিস কেন! কি হয়েছে?"
কোনো উত্তর এল না।শুধু কান্নার আওয়াজ এল।
-"কি মুসকিল! কি হয়েছে সেটা বলবি তো?"আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।
কান্না জড়ানো গলায় বনি বলল,-"
আজ ওর সিরিয়াস ঝগড়া হয়ে গেছে।শালা একটা কুত্তা,পাগলা.....
........।"আরও পাঁচ-দশটা কাঁচা খিস্তি দিল বনি।


বয়ফ্রেন্ডের সাথে আমাকে একদিন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বনি।ওর বয়ফ্রেন্ডের নাম অভিরুপ।আমার খারাপ মনে হয়নি।বেশ ভালো ছেলে।চোখে মুখে একটা সরলতার ছাপ আছে।কিন্তু সবকিছু বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না।
আমি খিস্তি গুলো হজম করে বললাম,-"কিন্তু কেন?"
বনি কাঁদতে কাঁদতে বলল,-" রবিবার একটু ঘুরতে নিয়ে যেতে বললাম তো,বলে কিনা ঘোরার অত সময় নেই তার।রবিবারেও তার অফিসের স্পেশাল কাজ আছে।শালা,তুই তোর তোর কাজ নিয়ে পড়ে থাক!"
-"রাগ করছিস কেন?অভিরুপ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার,কত কাজ থাকে বলতো!" বললাম আমি।
-"আমি কথা বলতে পারছি না। হোয়াটসঅ্যাপে আয়।"বনি আমাকে বলল।
-"পাঁচ মিনিট ওয়েট কর।"
টি.ভি টা বন্ধ করে,শোবার যায়গাটা ঠিক করে নিলাম।তারপর আলোটা অফ করে,ফোনটা নিয়ে শুয়ে পড়লাম।হোয়াটসঅ্যাপে অন হলাম।
-"অন আছিস?" টাইপ করলাম আমি।
-"হুম।আছি,বল।"
-"কি বলবো?"
-"ভাল লাগছে না কোনো কিছু।যা খুশি বল।"
আমি হেসে মেসেজ টাইপ করলাম,-"যা খুশি মানে টা কি!
অনেক কিছু বোঝায় কিন্তু!" সাথে একটা দুষ্ট স্মাইলি পাঠিয়ে দিলাম।
-"হুম।সেই অনেক কিছুই বল।"
-"না,থাক।মন টা হালকা হয়েছে তো তোর?"
-"না।...আজ সারারাত আমার সাথে কথা বলবি,জয়।" বনির মেসেজ পেলাম।
মনের একটা লুকানো সত্যি কথা বলে ফেললাম।-"আমার ও খুব ইচ্ছে হয় তোর সাথে সরারাত গল্প করি।"
-"ইচ্ছে হয়, তো করিস না কেন?"
আমি হেসে লিখলাম,-"আমরা প্রতিদিন এত রাত পর্যন্ত গল্প করি, সেটা তোর বয়ফ্রেন্ড জানতে পারলে আমাকে ক্যালাবে।"
-"জানলে আমার বয়ে গেল।আমি আমার মতো।ওর কথায় উঠতে বসতে পারবো না।ও কত বার খোঁজ নেয় আমার?একবার ও নেয় না। আর ও জানে আমি তোর সাথে গল্প করি।"
-"ওহ!"
কিছুক্ষন চুপ থাকার পর বনির মেসেজ এল,-"জানিস,ঝগড়া করার পর আজ ড্রিঙ্ক করেছি।"
-"আবার খেয়েছিস! তোর সাথে আর কথাই বলবো না।তুই কথা দিয়ে কথা রাখিস না।" রাগ হল আমার।
-"সরি...সরি! ভুল হয়ে গেছে।এবার সত্যি বলছি,আর কোনোদিন খাব না।প্রমিস জয়।"
আমার মনে মনে হাসি পেল।রাত চারটে বাজলো গল্প করতে করতে।
আমি মেসেজ টাইপ করলাম,-"বনি, একবার ঘড়ির দিকে তাকা।সকাল হতে গেল।এবার ঘুমো।
ডাক্তার এমনি তোর রাত জাগতে বারন করেছে।কাল অফিসে ও যেতে হবে।"
-"তুই ও ঘুমিয়ে পড়।"
-"তোর,মন টা এখন হালকা হয়েছে তো?"
-"হুম।একদম হালকা হয়ে গেছে। ভালো লাগছে খুব।"তিনটে স্মাইলি পাঠালো বনি।
গুড নাইট জানিয়ে শুয়ে পড়লাম।

(৫)

সকাল দশটায় অফিস ঢুকতেই বনির সেই পরিচিত হাসি মুখ টা দেখতে পেলাম।সাদা সাদা দাঁত বের করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।কোনো ভূমিকা করলাম না।আমি ব্যাগটা রেখে বললাম,-"অভিরুপের নাম্বার টা দে তো!"
-"কেন?"
-"আমার একটু দরকার আছে।ওই সফটওয়্যারের ব্যাপারে।"
অভিরুপের নাম্বার টা ফোন থেকে বের করে দিল বনি।আমি সেভ করে নিলাম।
রাতে বাড়ি ফিরে অভিরুপ কে ফোন লাগালাম।রিং হয়ে গেল।দুবার রিং হওয়ার পর ফোনটা রিসিভ করলো।-"হ্যালো কে!"
-"জয়।বনির বন্ধু বলছি।"
-"ও আচ্ছা! বলো বলো।কেমন আছো?"
-"আমি ভালো।কিন্তু বনি ভালো নেই।খুব লজ্জা পাচ্ছে,সেদিনের ব্যবহারে।তোমাকে ফোন করতে পারছে না।আমাকে বার বার বলছে যে,ওভাবে রিঅ্যাক্ট করা ঠিক হয়নি।"
হাসির শব্দ পেলাম ফোনের ওপারে।
-"মোটেও না।বনি ওরকম বলার
মেয়ে নয়।"
আমি বললাম,-"বিশ্বাস না হলে, ও কে ফোন করতে পার।আর বলল
রবিবার নন্দনে সিনেমা দেখতে যাবে।তোমাকে যেতে বলেছে।আর দু'টো টিকিট কেটে রাখতেও বলেছে।"
অভিরুপের গলায় বিস্ময়-"সত্যি!"
আমি বললাম,-"হুম।সেই জন্যেই তো আমি তোমার নাম্বার নিয়ে ফোন করলাম।"
-"আচ্ছা,আমি কাজ শেষ করে,বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাব।"
ফোন রেখে দিল অভিরুপ।

রবিবার সকালে একটু দেরি তে ঘুম ভাঙলো আমার।জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে ঘরের ভেতর।বাইরে টা শান্ত। দু'টো কাক পাশের আম গাছের ডালে বসে মুখ ঠোকরাচ্ছে।ফোন টা হাতে নিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ালাম।বনির নাম্বার টা বের করে ডায়েল করলাম। ফোন রিসিভ হল।-"এত সকালে ফোন করেছিস! আমি এখনো কোলবালিশ জড়িয়ে পড়ে আছি। জরুরি খবর আছে নাকি?"বনির
গলার আওয়াজ পেলাম।
আমি হেসে বললাম,-"অভিরুপ তোর জন্যে সত্যিই পাগল।"
-"কেন?"
-"কাল সন্ধ্যা বেলা সফটওয়্যারের ব্যাপারে যখন কথা হল,তখন কিছু বলল না। রাত দু'টোর সময় ফোন করে আমার ঘুম ভাঙিয়ে বলছে,বনি কেমন আছে?কি করছে?...আমার খুব ভয় করছে ও কে ফোন করতে।ও যা রাগী! সেদিন ওই ভাবে সিরিয়াস ঝগড়া করা উচিত হয়নি আমার। প্লীজ ও কে বলো,রবিবার বিকালে নন্দনে আসতে। সিনেমা দেখাবো।"
বনি হাসলো।বলল,-"ঢপ মারছিস! ওই কিপটে মাল,আমাকে নন্দনে সিনেমা দেখাবে! বিশ্বাস হয় না আমার।"
আমি সিরিয়াস ভাবে বললাম,-"বিশ্বাস না হলে,ফোন করে নে।ও খুব দু:খের সাথে কথা বলছিল রে।"
-"আচ্ছা যাব।তবে তোকেও আমার সাথে যেতে হবে।" বলল বনি।
-"এ আবার কেমন কথা! তোদের মাঝে আমি কাবাব মে হাড্ডি হতে যাব! তবে হ্যাঁ,আমাকে একটু পি.জি হসপিটলে যেতে হবে আজ,এক রিলেটিভ ভর্তি আছে।তাই যাওয়ার সময় শিয়ালদহ থেকে তোকে সঙ্গে করে নিয়ে নন্দনে ছেড়ে দিতে পারি।"
বনি সেটাতেই রাজী হল।সাড়ে তিনটের সময় শিয়ালদহ স্টেশনে আসতে বলে,ফোন টা কেটে দিলাম আমি।
বাস থেকে নেমে নন্দনের গেট দিয়ে ঢুকে এদিক-ওদিক তাকালাম।অভিরুপ কি এখনো আসেনি!
কেলো করে দেবে না তো! কিছুসময় পর অভিরুপ কে দেখতে পেলাম। টিকিট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বনি কে ডেকে,অভিরুপের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম,-" ওই দেখ,যথা সময়ে হাজির। বিশ্বাস হল তো এবার।"
বনি হাসল।এগিয়ে গেলাম আমারা।কাছে যেতেই অভিরুপ আমাদের দেখতে পেল।আমি ওর দিকে একটা চোখের ইশারা করে দিলাম।
সো টাইম প্রায় শুরুর পথে।আমি বনি কে বললাম,-"তোরা যা,আমি পি.জি থেকে একটু ঘুরে আসি।"
বনির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে অভিরুপ।নন্দনের গেট দিয়ে বাইরে বেরোনোর আগে,একবার পিছন ঘুরে তাকালাম।আমার দিকে তাকিয়ে আছে বনি।মুখে সেই পরিচিত হাসিটা নেই।
বাইরে বেরিয়ে এলাম আমি।এক্সাইড মোড়ের আকাশ টা পরিষ্কার,হাসি-খুশি যেন। সাদা সাদা মেঘ ভেসে আছে, নৌকার মতো।
হঠাৎ সবকিছু ঝাপসা লাগলো। চোখ থেকে চশমাটা খুলতেই,কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল আমার জামার উপর।পি.জি নয় আবার শিয়ালদহগামী বাসে উঠে পড়লাম।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.