রকস্টার ভূত ~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]




আজ তিন দিন ধরে বুবাই এর চোখে ঘুম নেই।  স্কুলে গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় সে নাম  লিখিয়েছে। তাই ঠিক করেছে একটা ভূতের গল্প  লিখবে।কিন্তু কিছুতেই গল্প মাথায় আসে না।গত তিন দিন ধরে কত না ভূতের গল্প পড়েছে অথচ, লিখতে বসলেই কলম চলে না,গল্প তো দূরের কথা গল্পের শিরোনামেই কলম আটকে যায়।এই তো সেদিন তার থেকে দু'ক্লাস নীচে সিক্সে পড়া বিলু একটা গল্প লিখে টিচারের কাছে জমা দিল।
তাই আজ রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে বুবাই ঘরের দরজা বন্ধ করে পড়ার টেবিলে এসে বসে। গল্প তার লিখতেই হবে! রাত একটা বেজে গেছে। টিক টিক আওয়াজ হচ্ছে দেওয়াল ঘড়ির। বুবাই এর চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু করতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ গেল জানালা দিয়ে বাইরে। পুকুরের ওপারের তাদের বাঁশ বাগানে কি যেন আলো জ্বলছে। দরজা খুলে আস্তে আস্তে পুকুর ঘাটে এসে দাঁড়াল বুবাই। বেশ উজ্বল আলো।  পুকুর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাঁশবাগান, তারপর বাঁশ বাগান পেরিয়ে যখন তাদের ছোটো জমি টার কাছে পৌছাল তখন সে রীতিমতো অবাক। একটা প্যান্ডেল বানানো। আর তার মধ্যে যেন কিছু একটা অনুষ্ঠান চলছে। না! বিকেলে তো এদিকে সে কোনো লোকজনই দেখেনি; তবে এত তাড়াতাড়ি কারা এসব আয়োজন করল? ব্যাপারটা ভালকরে দেখার জন্য একটা ভাঙা টিনের ফাঁক দিয়ে ভেতরে চোখ রাখতেই তার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সারি সারি চেয়ার পাতা,আর প্রত্যেকটিতে একটা করে কঙ্কাল বসে আছে।একদিকে একটা স্টেজ,আর তার উপর চার পাঁচ টা কঙ্কাল গীটার,প্যাড, ড্রাম বাজিয়ে গান করছে।
ভূতের জলসা! সে তো 'ভূতের ভবিষৎ' সিনেমাতে দেখেছিল। বুবাই ভাল করে কান রাখল গান গুলোতে।-'এঁতটা পঁথ পেঁরিয়ে, এঁসেছি তঁবু দুঁজনে' গানটা শুনতেই বুবাই চমকে উঠল,– এ তো রূপম ইসলামের গান।এরা জানল কি করে?এর পর নীঁল রঁঙ ছিঁল ভীঁষন প্রিঁয়'...। বুবাই এর খুব ভাল লাগল।ভূতটা গীটার হাতে একের পর এক গান করে চলেছে। ফসিলস...ছেড়ে ক্যাকটাস...তারপর চন্দ্রবিন্দু...।
সত্যি! এত ট্যালেন্টেড ভূত সে কখনও কোনো গল্পে পড়িনি। সময়ের দিকে বুবাই এর খেয়াল নেই। হঠাৎ তার চমক ভাঙল ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা নিশ্বাস লাগতেই।।চকিতে পেছন ফিরতেই তার বুকটা ধড়াস করে উঠল– সামনে তিনটে কঙ্কাল দাঁড়িয়ে।
-"তোমরা কে?" ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল বুবাই।
-"আঁমরা ভঁনেন্টিয়ার। তুঁমি বিঁনা টিঁকিটে আঁমাদের অঁনুষ্ঠান দেঁখছ কেঁন?"
ভূতেরা কথা বলছে! একটু সাহস পেল বুবাই। বলল— "আমার বাড়ির উপর বিনা  অনুমতিতে অনুষ্ঠান করছ,আবার আমার কাছেই টিকিট চাইছ? দাঁড়াও! বাবাকে ডেকে নিয়ে আসছি।"
বুবাই এর কথা শুনে ভূত তিনটি ভয় পেয়ে গেল। কাঁচু মাঁচু করতে লাগল তার সামনে।ভূতেদের এরকম অবস্থা দেখে না হেসে থাকা যায় না। বুবাই এর হাসি পেল। হঠাৎ একটা হই হট্টোগোল শুরু হল।ভূত তিনটি বলল,— "এঁই চঁল জঁলসা শেঁষ হঁয়ে গেঁছে।"
বুবাই দেখল,পুবের আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে অর্থাৎ ভূতেদের অনুষ্ঠান শেষ।

মায়ের ডাকাডাকি তে ঘুমটা ভেঙে গেল বুবাই এর । ধড়ফড় করে উঠে দেখল সে পড়ার টেবিলেই বসে আছে। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আগে ছুটে গেল পুকুর ঘাটে,ঘাট পেরিয়ে বাঁশ বাগান; বাগান পেরিয়ে তাদের ছোটো জমির উপর এসে দাঁড়াল। না! কাল রাতের অনুষ্ঠানের কোনো চিহ্ন মাত্র নেই। হতাশ হয়ে ঘরে ফিরে এল বুবাই। খাতা, কলম টা টেনে নিয়ে লিখে ফেলল তার গল্পের শিরোনাম,– "রকস্টার ভূত।"

স্বদেশ কুমার গায়েন [২০১২ ]

1 comment:

Powered by Blogger.