ফুটবল ও চোরের গল্প ~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


ভারতীয় সময় বারো'টা বেজে পনেরো মিনিট। সালটা ২০১৪। তারিখ টা মনে রাখার চেষ্টা করিনি, কিন্তু ঘটনাটা ভুলবার নয়। বিশেষ করে ব্রাজিলিয়ান রা তো প্রজন্মের প্রজন্ম মনে রাখবে তাদের লজ্জার ইতিহাস। ভারতীয় ব্রাজিলীয় ফ্যান রা বোধ হয় সে রাতে চোখের জলে ঘরের ভেতর একটা আস্ত সুইমিংপুল বানিয়ে ফেলেছিল।
আমি ফুটবল খেলা যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি, সেদিন থেকে ব্রাজিলের ফ্যান।তাই ওই রাতে আমার ও চোখ টা ভিজে উঠেছিল। এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কোন ঘটনার কথা বলছি। ২০১৪ ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল।

অনেক বক বক করলাম,এবার আবার আসল ঘটনায় আসি। ঘটনাটি ঘটেছিল আমার পাশের বাড়ি সুধীর বাবুর বাড়িতে। উনি সদ্য অবসর প্রাপ্ত ব্যাঙ্কের অফিসার। স্ত্রী ও ছেলে, বৌমা নিয়ে ছোটো সংসার। ছেলে সরকারি চাকুরে।ছোটো বেলা থেকেই সুধীর বাবু ফুটবলের ভক্ত। যুবক বয়েসে একসময় নাকি রাতে পাশে ফুটবল নিয়ে ঘুমোতেন। তার পূজোর ঘরে একটা ফুটবল ও রাখা আছে। বিয়েও করেছিলেন একটা ফুটবল প্রিয় মেয়ে দেখে। দুজনের যখন প্রিয় খেলা ফুটবল,তখন ছেলেও অন্যদিকে যায় কেন! আশা ছিল ছেলেকে ফুটবলার বানাবেন,কিন্তু সেটা হল না। তবে ছেলের বিয়েও দিয়েছেন, ফুটবল খেলা পছন্দের মেয়ে দেখে। কিন্তু বাপ বেটার মধ্যে একটা সমস্যা আছে। দুজনের প্রিয় খেলা ফুটবল হলে কি হবে,বাবা বাজারে গেলে চিংড়ি মাছ কিনে আনে আবার ছেলে বাজারে গেলে ইলিশ মাছ।
বুঝলেন না তো? মানে'টা হল,কলকাতা ফুটবলে বাপ মোহনবাগান,ছেলে ইস্টবেঙ্গল।  আর বিশ্ব ফুটবলে বাপ ব্রাজিল, তো ছেলে জার্মানি। আর যাবে কোথায়! আজ সকাল থেকে তো তর্কাতর্কি চলতেই আছে। ছেলের ঘরের সামনে জার্মানির পতাকা,আর বাবার ঘরের সামনে ব্রাজিলের পতাকা ভোর বেলা থেকেই উড়ছে। সুধীর বাবুর বয়েস হলে কি হবে, ফুটবল নিয়ে তার ছেলেমানুষি টা এখনো সেই যুবক বয়েসের মতো আছে।
রাত দশটা বাজতেই সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে টিভির সামনে বসে পড়েছে । যথাসময়ে সময়ে খেলাও শুরু হয়েছে। সবাই চুপচাপ।কারও মুখে কোনো কথা নেই।শুধু টিভিতে খেলার ধারাবিবরণী টা শোনা যাচ্ছে। শুরু থেকেই একটা টান টান উত্তেজনা। এর মধ্যে হঠাৎ কখন যে বাড়ির ভেতর চোর প্রবেশ করেছে,তা কেউ বুঝতে পারি নি। সবার চোখ মুখ কান টিভির পর্দায়।
—" উ: কি অন্ধকার রে বাবা! যেন একটা ভূতের বাড়ি প্রবেশ করেছি । বারান্দার নাইট ল্যাম্প গুলোও জ্বালায় নি। সবাই ঘরের ভেতর বসে মজা করে টিভি দেখছে, আর আমি বাইরে অন্ধকারে মরছি।"- চোর টি নিজের মনে মনে কথা গুলো বলতে লাগল।
অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে চোরটি সুধীর বাবুর টিভির ঘরে উঁকি মারল। দরজা টা হাল্কা করে ভেজানো ছিল। তাই কোনো অসুবিধা হল না।চোরটি ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল, দেখল টিভিতে ফুটবল খেলা হচ্ছে। হঠাৎ তার  মনে পড়ল,- আজ ব্রাজিলের সেমিফাইনাল খেলা, চায়ের দোকানে সকালে চা খেতে খেতে সে শুনেছিল। পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে সুধীর বাবুর পেছনে চোরটি বসে পড়ল।ঘরের ভেতর যে,এক কান্ড ঘটে যাচ্ছে,সেটা কেউ জানতে পারল না,সবার চোখ তখন বত্রিশ ইঞ্চি এল.ই.ডির পর্দায়।
এগারো মিনিটের মাথায়, জার্মানির মুলার হঠাৎ ব্রাজিলের জালে বল ঢুকিয়ে দিলেন।
- গোওওওওওওওল বলে,সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল সুধীর বাবুর ছেলে। সুধীর মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল,- "অত লাফিয়ে, লাভ নেই! এখুনি শোধ হয়ে যাবে।"
কিন্তু তা আর হল না তেইশ মিনিটের মাথায়, ক্লোজে তার শেষ বিশ্বকাপের গোলটা করলেন। সুধীর বাবু তার টাক মাথায় হাত বোলালেন একবার।
- "শালা! হিটলার বাহিনী দু' টো গোল করেই কি লাফানো হচ্ছে! গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।"
বলেই, সঙ্গে সঙ্গে একটা গুলির আওয়াজ। ভাগ্যিস! হাতের নিশানা টা ঠিক ছিল না,গুলি গিয়ে লাগল পাশের আয়নাতে। নইলে সাধের এল.ই.ডি টা এতক্ষনে চৌচির হয়ে যেত।
গুলির আওয়াজ শুনে সুধীর বাবু, তার ছেলে, বৌমা, স্ত্রী একসাথে পেছনে ফিরে তাকাল। বন্দুক হাতে এক উদ্ধত যুবক চেয়ারে বসে আছে।- "চুপ চাপ বসে খেলা দেখুন। কোনো কথা বলবেন না, কথা বললেই গুলি করে দেব।"- চোরটি কঠোর গলায় বলল।
সুধীর বাবুর হাত পা কাঁপতে শুরু করছে। বুঝে গেলেন,এই অবস্থায় কথা বলা ঠিক হবে না।তাই চুপচাপ সবাই আবার টি.ভি র পর্দায় চোখ রাখলেন। তেইশ থেকে উনত্রিশ মিনিটের মধ্যে একটা বড় ধরনের সাইক্লোন উঠল ব্রাজিলের ডিপ বক্সে। আর সেই ঝড়ের ম্যাচ থেকে উড়ে গেল ব্রাজিল। ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই পাঁচ গোলে পিছিয়ে গেল ব্রাজিল।
সুধীর বাবু বুঝে গেলেন, এবারের মতো বিদায়। আসছে বছর আবার হবে! ছেলে তো বন্দুকধারীর ভয়ে আনন্দ করতে পারছে না। না! দ্বিতীয়ার্ধে মিরাকল কিছুই ঘটল না। বরং আরও দু'গোল বেড়ে গেল ফলাফল দাঁড়াল জার্মানি ৭ ও ব্রাজিল ১।
খেলার শেষ বাঁশি বাজলো। খেলা শেষ হতেই হঠাৎ ই চোর টার কি কান্না! মেঝেয় পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। চোরটির অবস্থা দেখে সুধীর বাবুর মনে কিছুটা সাহস এল। -" আরে আরে! কি হল আপনার? শান্ত হয়ে চেয়ারে বসুন।"
স্ত্রী কে এক গ্লাস জল আনতে বলল। জল খেতে খেতে চোরটি বলল,-"আমি একটা চোর। আপনাদের বাড়িতে চুরি করতে ঢুকেছিলাম। কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখি আপনারা খেলা দেখছেন। ফুটবল আমার খুব প্রিয় খেলা,আর ব্রাজিল আমার প্রিয় টিম। কিন্তু এভাবে ব্রাজিল লজ্জার হার হারবে.......!!"
চোরটি আবার জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করল। সুধীর বাবুর মন টা কেমন হয়ে গেল,- "আরে! একবার হেরেছে তো কি হয়েছে! পরের বার নিশ্চয় জিতবে।"
তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,- "আরে খাওয়ার কিছু আনো। আমার টিমের সাপোর্টার ।"
অবাক হয়ে গেল চোরটি। সুধীর বাবুর ছেলে ওপার থেকে চিৎকার করে উঠল,- "শালা! একে ব্রাজিলের ফ্যান,তার উপর আবার চোর, এ বাড়িতে ওর খাওয়া হবে না। আমি এখুনি পুলিশে ফোন করছি!"
- "পুলিশে ফোন করবি না,তপু ! ও আমার টিমের লোক। সাত গোল দিয়ে খুব গলাবাজি হচ্ছে?"
— "তুমি আর ব্রাজিলের নাম নিও না! খেলার জন্ম এখন জার্মানি তে।"
— "আচ্ছা দেখা যাবে কত বড় টিম! পাঁচ বার ওয়ার্ল্ডকাপ নিয়ে দেখা?"
- "ঠিক আছে! দেখিয়ে দেব একদিন। আর কালই আমার ঘর আমি পুরো সাদা রঙ করব।"
-" এটা বাড়ি আমার! পুরো বাড়িটাই হলুদ সবুজ রঙে মুড়ে দেব।"
আবার শুরু হয়ে গেল বাবা আর ছেলের মধ্যে ফুটবল নিয়ে তর্কের বিশ্বযুদ্ধ। চোরটি একবার সুধীর বাবুর মুখের দিকেই তাকায়, একবার তার ছেলের মুখের দিকে তাকায়। সুধীর বাবুর স্ত্রী একটা প্যাকেটে করে কিছু খাবার এনে চোরটির হাতে দিয়ে বলল,- "তুমি যে পথে এসেছো, সে পথ দিয়ে বেরিয়ে যাও। এ তর্ক যুদ্ধ এখন থামবে না।...আর শোনো, কোনোদিন এভাবে বাড়ির ভেতর ঢুকবে না।"
চোরটি দেওয়ালের পাইপ বেয়ে নীচে নেমে পাঁচিল টপকে বেরিয়ে যায়। তখনোও ঘরের ভেতর দুজনের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে.....।
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.