অভ্যাস~অনুগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


সকালে একটু দেরীতে ঘুম ভাঙল রুনুর।এটা রুনুর অভ্যাস নয়।প্রতিদিন সে খুব সকালেই উঠে পড়ে।কিন্তু এটা কাল রাতে দেরী করে ঘুমোতে যাওয়ার ফল।খাট থেকে হাত বাড়িয়ে উত্তরের জানালাটা খুলতেই একরাশ কুয়াশা এসে মুখে ঝাপটা মারল।একটা ঠান্ডা প্রবাহ নেমে গেলে শরীর বেয়ে।জানালার বাইরের বুড়ো আম গাছটিকে, কুয়াশা চাদড়ের মতো জড়িয়ে ধরেছে ।লম্বা সবুজ পাতার কিনারা থেকে টুপ টুপ করে হিম পড়ছে।
টেবিল ক্লকের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল রুনু।সাড়ে সাতটা বেজে গেছে।শীত কালে ঘড়ি কি দ্রুতো চলে? হবে হয়তো।শুভর তো এখন ঘুম থেকে ওঠার সময়।ও কি ঘুম থেকে উঠেছে? যা ঘুম কাতুরে! ওর তো অফিসে যেতে হবে!
রুনু বালিশের পাশ থেকে ফোনটা হাতে তোলে। শুভর নাম টা খুঁজে খুঁজে ডায়াল করে। বাপের বাড়ি এলে,রুনু এটা করবেই।আগেও প্রত্যেকবার করেছে।সব সময় শুভর খোঁজ খবর না নিয়ে থাকতে পারে না। একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছে।
ওই তো রিং হচ্ছে! শুভ ফোন টা রিসিভ করেছে বোধ হয়!

– "হ্যালো! হ্যালো!...তুমি ঘুম থেকে উঠেছো? সাড়ে সাতটা বেজে গেছে কিন্তু!" রুনুর গলায় অভিমানের সুর।
– "জল টা হিটারে গরম করে নিও।একদম ঠান্ডা জলে স্নান করবে না; তোমার এমনিতেই তাড়াতাড়ি ঠান্ডা ধরে যায়।দুপুরের টিফিন টা কাজের মাসীকে তৈরী করে রাখতে বলো।মনে করে ব্যাগে ভরে নেবে।বাইরের খাবার একদম খাবে না।ইস্ত্রি করা সাদা জামাটা পরে অফিসে যাবে।আর টাই টা ঠিক করে বাঁধবে।" রুনু ঝড়ের গতিতে কানে ফোন ধরে বলতে থাকে।
ফোনের ওপারে শুভ কথা বলারই সুযোগ পায় না।
—" রাস্তায় সাবধানে বাইক চালাবে। একদম ওভার টেক করতে যাবে না!" রুনুর থামার কোনো লক্ষন নেই।
ওপার তবুও নিস্তব্দ।শুধু রুনুই কথা বলে চলে।কিছুক্ষন পর ফোনের উপর থেকে শুভর আওয়াজ আসে,-"রাবিস! যত সব।" ফোনটা কেটে দেয় শুভ।রুনু বুঝতে পারে,শুভ বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দিয়েছে।
ফোন টা কেটে দিল! কিছুটা অবাক হয় রুনু।
কান থেকে ফোন টা নামিয়ে বাইরের দিকে তাকায় ।এক ফালি সোনালি রোদ কুয়াশা ভেদ করে ঘরে ঢুকছে।বুড়ো আমগাছ টি ও আস্তে আস্তে স্পর্ষ্ট হচ্ছে।দুটো ঘুঘু পাখি জোড়োসড়ো হয়ে বসে আছে আম গাছের ডালের ফাঁকে।

এতক্ষনে রুনুর মনে পড়ল।একদম মনেই ছিল না কথাটা।একরাতের মধ্যেই বেমালুম ভুলে গেছে কথাটা।সত্যি! খুব ভুল করে ফেলেছে সে । এখন কি অধিকার আছে তার, শুভকে এইসব কথা বলার?

গতকাল বিকেলেই তো চোখের জল মুছতে মুছতে ডিভোর্স পেপারে সই করে এসেছে সে।
স্বদেশ কুমার গায়েন  (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.