উইকেন্ড~ ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]




— এই উঠবি! না, জল ঢালবো?
ঘুম জড়ানো চোখেই উওর দিই ,
— তোর আজ রোববার না? আরেকটু থাক না পাশে!
— আমার ইচ্ছে নেই! তুই পড়ে থাক ঘাটের মড়ার মতো।
শ্রী চলে যায় রাগে গট গট করে। ভাল নাম শ্রীতমা, আদর করে শ্রী বলেই ডাকি আমি। ও বেরিয়ে যেতেই আবার উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ি, চোখ থেকে যে ঘুমটা ছাড়ছে না যে!
কিছুক্ষন পর আধবোজা চোখে পাশের বালিশে হাত রাখি। ফাঁকা,
- না! সত্যি সত্যি মেয়েটা আসেনি! প্রতিদিন এত সকাল সকাল উঠতে ভাল লাগে!
পাশ ফিরে টেবিল ক্লক টির দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠি,
— ন' টা বেজে গেছে! কখন?
তাড়াতাড়ি উঠে দরজা দিয়ে বাইরে উঁকি মারি। শ্রী,সোফাতে বসে একটা বই দেখছে। ধীরে ধীরে ভয়ে সোফার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। কি বলি, কি বলি.....!
—সকাল ন' টা বেজে গেল, এখনো খবরের কাগজ দিয়ে যাইনি?
আমার দিকে চোখ তুলে তাকায় শ্রী,
- "তুই কি সারা জীবন এরকম উজবুক হয়ে থাকবি ?"
- "কেন?"
-" ঘড়িতে টাইম দেখলি, অথচ ঘড়িটা চলছে কিনা সেটা দেখলি না! কাল রাত ন' টা থেকে বন্ধ।"সোফার উপর রাখা ওর ফোনের স্ক্রিনের উপর চোখ
রাখি,
- "সবে পৌনে সাতটা!"
ঘুমেরা দল বেঁধে যেন আবার আমার চোখে চলে আসে। আস্তে আস্তে ওর দু হাতের নীচে দিয়ে মাথা গলিয়ে, কোলে মাথা রেখে সোফার উপর সটান হয়ে শুয়ে পড়ি।
- "উফ! তুই আবার শুয়ে পড়লি।"
এক হাতে আমার কানটা টেনে বলে,
— "এই ওঠ বলছি!"
— "আ! কানটা ছাড় ; লাগছে যে! সেই ছোটো বেলায় মা টানতো,এখন আবার তুই টানছিস!"
হো হো হো করে হেসে ওঠে শ্রী,
— "দেখছিস না! একটা বই পড়ছি!"
—"তুই তোর মতো বই পড় না!" বলে ওর
ফর্সা চিকন পেটে আমার ঠোঁট দুটো রেখে দুহাতে
আলতো করে কোমর টা জড়িয়ে ধরি।
- "ছাড় রোহন! কি হচ্ছে , এসব!"
— "কি হবে আবার? আমার বাড়িতে আমার বউ কে জড়িয়ে ধরব, না তো পাশের বাড়ির বউ কে জড়িয়ে ধরব!"
- "ও! তার মানে তোর পাশের বাড়িতেও ইচ্ছে আছে?"
- "না রে! তবে পেছনের দোতালা বাড়ির নতুন বউ টার যা......"
মুখের কথা আর শেষ হল না,— হাতের বই টা ফেলে ,শ্রী আমার গলার টুঁটি চেপে ধরল,
— "আমি ছাড়া আর অন্যকোনো মেয়ের দিকে তাকালে না তোকে খুন করে দেব!"
- "মা কালীর দিব্যি! আমার মায়ের দিকেও আর তাকাবো না, শুধু আমার গলাটা ছেড়ে দে পাগলি!"

গলা থেকে হাত দুটো সরিয়ে নিয়ে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে। বারান্দায় খবরের কাগজ উড়ে এসে পড়ার শব্দ পাই।
-" কাগজ টা এনে দেখতে থাক, আমি কফি করে আনছি!"
কাপে করে দু’কাপ কফি করে এনে পাশে বসে শ্রী।- "এই! কাগজ টা এদিকে দে?"
চাওয়া তো না, যেন অর্ডার করছে,
— "ওই! বেশি মাস্টার মাস্টার ভাব নিয়ে কথা বলবি না তো! তোর ওই মাস্টারি বিদ্যানিকেতন না শিক্ষানিকেতন সেখানে গিয়ে দেখাবি!"
—"তবু তো মাস্টারি করি! তোর মতো তো আর উড়নচণ্ডী না, সারাদিন ঘরে বসে থাকা, ঘুরে বেড়ানো, আর বউ এর টাকায় খাওয়া!"
-" ওই আমি উড়নচন্ডী? তোর টাকায় খাই? তাহলে বিয়ে করলি কেন?"
— "ছোটাবেলা থেকে তোকে নিতান্ত ভালবেসে এসেছি তাই। নাহলে তোর মতো হাঁদারাম কে বিয়ে করত!"
- "ও! এখন আমি হাঁদারাম! তবুতো আমার মতো তোকে কেউ ভালবাসে না; তোর মা, বাবা ও না।"
— "ওরে আমার ভালবাসা রে! ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে গেলে যার সারা শরীর কাঁপে তার আবার ভালবাসা।"
- "দেখ! এরকম বলবি না!"
- "বলব! বেশ করব।"
- "আচ্ছা, এটা না হয় মেনে নিলাম; কিন্তু তোর টাকায় খাই বললি কেন?"
- "তাই তো! আমার টাকায় খাস!"
- "তোর থেকে ভাল স্টুডেন্ট ছিলাম, এতদিন পরীক্ষা দিলে চাকরী পেয়ে যেতাম!"
— "তো পাস নি কেন?"
হাতের খবরের কাগজ টা বন্ধ করে কফিতে একটু চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিলাম,
- "কি মিথ্যেবাদী রে তুই! চাকরীটা তো পেয়েছিলাম। তুই করতে দিলি না।তখন বললি, - না, আমার বর কে কাজ করতে দেব না, ওত
দুরে যেতে দেব না! তারপর আর কোনো পরীক্ষাও পর্যন্ত দিতে দিসনি! এখন আবার উলটো বলছিস?"
হঠাৎ শ্রী, আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে সোফার উপর,
- "বলেছি, বেশ করেছি! তুই শুধু আমার কাছেই থাকবি, আমার সামনে থাকবি।"
হাসি পায় আমার। এই জন্যেই ওকে আমার এত ভাল লাগে। এই একটু আগে ঝগড়া করছিল, আবার এখন গলে জল। খুব ভাল ও। আপনারা ভাবছেন, আমি ঘরে থাকি বলে, ঘরের সব কাজ আমাকে করতে হয়।
না! ওই সব কিছু করে, আমাকে হাত লাগাতেই দেয় না। খুব ভালবাসে আমাকে।
— "এই শ্রী! চল না, আজকে বিকেলে একটু বেড়িয়ে আসি!"
- "না, আজকের দিন তুই শুধু,আমার কাছে থাকবি!"
আলতো করে আমাকে জড়িয়ে ধরে শ্রী। কিছু বলতে পারি না।


বিকেল তিনটে। টিভি তে ভারত শ্রীলঙ্কার টেস্ট ম্যাচ দেখছি। কোথা থেকে ছুটে এসে হাত থেকে রিমোট টা কেড়ে নিয়ে সোফার অন্য প্রান্তে বসে পড়ে।
- "এই, খেলায় দিবি?"
— "না, সিনেমা!"
— "না, খেলা!"
- "বললাম না, সিনেমা!"
- "উফ! এ বাড়িতে তোর সাথে থাকাই অসম্ভব।"
— "কে থাকতে বলেছে? চলে যা না!"
-"ওই! এটা আমার বাড়ি!"
— "টিভি টা আমার।"
টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একের পর এক উত্তর দিয়ে যায় শ্রী।
-"তোর সাথে এক ঘরে থাকাই তো মুসকিল? আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দে!"
এবার আমার দিকে তাকায় শ্রী। মুচকি হাসে,
—"আমার কাছে আয়, ডিভোর্স দিচ্ছি।"
ওর এই কথাটা শুনলে না, আমার বুকের খাঁচাটা কেঁপে ওঠে। বিয়ের আগে ওর জোর করে সেই চুমু খাওয়ার কথা
টা মনে পড়ে যায়.....
— "না, থাক ডিভোর্স দিতে হবে না। কিন্তু এখনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব আমি।"
- "যাবি যা! কিন্তু ঠিক সময়ে চলে আসবি!"
সোফা থেকে উঠে গেঞ্জী টা গায়ে গলিয়ে নিই,
— "না! আজ আর আসব না!"
— তুই আসবি, তোর বাপ আসবে।" জিভ কাটে শ্রী।-"না! শুধু তুই আসবি।"
— "আমি সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছি কিন্তু?"
- "তো যা! কে বারন করেছে!"
রাগে আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। একবারও যেতে বারন করছে না মেয়েটা। রাগে,— "তুই খুব খারাপ" বলে বেরিয়ে যাই। ঝগড়া করতে করতে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে টের পায়নি।বাড়ির পাশের ফাঁকা মাঠ টা তে গিয়ে বসি। আকাশে তারাদের ঝিক মিক দেখি। তবুও যেন মনটা ভাল লাগে না। শ্রী র ওপর না একদম রাগ করতে পারি না, ওকে ছেড়ে থাকতেও ভয় হয়। প্রতি উইকেন্ডে আমার সাথে ঝগড়া না করে ও থাকতে পারে না। ঝগড়ার মধ্যেই ও যেন ভালবাসা খুঁজে পায়। আমার ও যে মন্দ লাগে তা নয়। আর বসে থাকতে পারি না,অনেক সময় কেটে গেছে।

রাত ন’টার সময় ঘরে ঢুকি। টিভি তে সিরিয়াল দেখছে শ্রী।আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসে।
- "হেসে লাভ নেই! বাড়ি এলে কি হবে, আজ তোর সাথে শুতে যাচ্ছি না!"
- "তুই ওই রেকর্ড টা আর বাজাস না তো! অনেক বার শুনেছি, সেই তো আমার আগেই বেডে গিয়ে উঠবি।"
- "আচ্ছা দেখা যাবে।"
রাতের খাবার শেষ করে শ্রী বেডরুমে ঢুকে যায়। আজ মুখরক্ষার ব্যাপার! তাই ঘরের আলো বন্ধ করে সোফাতে শুয়ে পড়ি। প্রায় মিনিট তিরিশ পর অন্ধকারে একটা হাতের স্পর্শ পাই। বুঝতে পারি শ্রীর হাত।
- "এই রোহন, যাবি না, আমার পাশে?"
- "না, যাব না!"
- "আমি তোর পাশে না থাকলে, তোর ঘুম হবে?"
— "হ্যাঁ ! অনেক ভাল হবে।"
—"কিন্তু, তুই আমার পাশে না থাকলে তো, সারারাত আমার ঘুম হবে না!"

চুপ করে থাকি। শ্রী র দু টো হাত যেন আমার খুব কাছে আসতে থাকে । আস্তে আস্তে সোফার উপর শুয়ে পড়ে শ্রী,- আমাকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরে। আমার ঠোঁটের কাছে মুখ এনে বলে,
— "আজ এটাই আমাদের বেডরুম।"
স্বদেশ ক(২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.