স্পার্ম ডোনার~ ছোটগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


আজ সকাল সকাল উঠে সারা বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছি, কাল রাতে সব ঠিক ঠাক সাজানো হয়েছে কিনা! — আপনারা হয়তো ভাবছেন, আজ আমার মনের মানুষ প্রথম আমার বাড়িতে আসছে, তাই এত কিছুর আয়োজন। জানালা, দরজা গুলোতে একদম নতুন পর্দা লাগিয়েছি; এখনো তার গন্ধ ভুর ভুর করে বেরোচ্ছে। ঘরের মধ্যে একটুকু ও মাকড়শার জাল নেই, সব আমি নিজে হাতেই পরিষ্কার করেছি। আমার বেডরুমের পাশের টেবিলের ফুলদানিতে একগোছা রজনীগন্ধা ; শুধু বেডরুম নয় সারা বাড়িতে রজনীগন্ধা সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছি। রাতে ফুলের কুঁড়ি গুলো আধফোঁটা অবস্থায় ছিল, কিন্তু এখন দেখছি পাপড়ি গুলো ডানা মেলে দিয়েছে। ড্রয়িংরুমের পাশে রাখা একটা রজনীগন্ধার ডালে হাত রেখে, নাক টা পাপড়ির কাছে নিয়ে গেলাম,-আ! প্রান টা যেন জুড়িয়ে যায়...।
আর হঠাৎ তখনি ফোনের রিং টা বেজে উঠল...।

— "হ্যালো!"
— "নীলিমা, সেন বলছেন!"
- "উফ! আবার সেই রং নাম্বার থেকে ফোন এসেছে।"
 রাগ করে ফোন টা কেটে দিলাম। গত এক সপ্তাহ ধরে এই নাম্বার টা এক নাগাড়ে জ্বালিয়ে যাচ্ছে। পুরুষ মানুষ গুলো মেয়েদের নাম্বার পেলে না, কি না কি ভাবে!
— "মামনি!"ছেলে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
— "আজ তুমি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলোনি কেন?"
দুহাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে, গালে একটা ছোট্টো চুমু দিলাম।- "বাবু সোনা, আজ তো তোমার স্কুল ছুটি তাই! যাও টয়লেট থেকে ফ্রেস হয়ে এসো।"
ছেলে চলে গেলে আমি আবার ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখতে লাগলাম। শুধু মাত্র বেলুন গুলো লাগানো বাকি আছে। কাজের মাসীকে বলেছিলাম, সকালে আসার সময় বেলুন কিনে আনতে; খুব শীঘ্র এসে পড়বে। কেক টা অর্ডার দিয়ে রেখেছি, এগারোটার সময় দিয়ে যাওয়ার কথা। এবার আপনারা বুঝতে পারছেন তো, আজ কিসের আয়োজন?
না, আমার কোনো মনের মানুষ আসছে না। আমার একমাত্র ছেলে বুবাই এর জন্মদিন আজ। হ্যাঁ! ও শুধু আমার ছেলে। না! ওর বাবা ও মারা যায়নি, বা অন্য কোনো মেয়েকে নিয়ে পালাই নি! আর অল্প বয়েসের প্রেমের কোনো পরিনতি ও না। ও আমারই গর্ভজাত। আমিই ওর পরিচিতি। স্পার্ম ব্যাঙ্ক থেকে স্পার্ম সংগ্রহ করে আমার গর্ভে ধারন করেছি ওকে। তবে স্পার্ম টি কার সেটা জানার আমার কোনো প্রয়োজন পড়িনি। কি দরকার ওর বাবার? ওর বাবা তো ওকে বুকের স্তন দিয়ে বড় করতে পারবে না! সে তো আমাকেই দিতে হবে! তবে বাবার কি দরকার? নাম, পরিচয়, সামাজিক স্বীকৃতির জন্য বাবার প্রয়োজন? কেন? দশ মাস যন্ত্রনা, কষ্ট সহ্য করব আমি আর, সন্তানের সব কৃতিত্ব নেবে বাবারা!
ও আমার পরিচয়ে বড় হবে। সমাজ মানুক বা না মানুক আমার তাতে কিছু যায় আসে না। সবাই যেন এটা বলে, - তোর মায়ের নাম কী? অবাক লাগে জানেন! কোনো অচেনা লোক যখন একটা বাচ্চা কে জিজ্ঞাসা করে,— এই খোকা, তোর বাবার নাম কি?....কেউ সেই ছেলেটির মায়ের খোঁজ করে না.......?
হ্যাঁ, এই সব কথা শুনে আপনারা আমাকে উগ্র নারীবাদী বলতেই পারেন; বলতে পারেন আমি পুরুষদের সন্মান করি না। যারা, নারীদের সন্মান করতে জানে না তাদের কি করে সন্মান করি বলুন তো! সোজা কথা, আমি এ যুগের মেয়ে। যেটা আমার বিচারে ভাল, আমার নিজের জন্যে ভাল আমি সেটাই করতে চাই। আমি প্রেম করতে পারি,বয়ফ্রেন্ড সাথে বিয়ের আগে এক খাটে শুতে পারি, লিভ টুগেদার করতে পারি........আবার প্রয়োজনে কেউ ধোঁকা দিলে তাকে খুন ও করতে পারি। — ভয় পেলেন তো!
না, আপনারা ভয় পাননি জানি! কারন মেয়েরা তো দুর্বল হয়। তবে মনে রাখবেন সব মেয়ে কিন্তু সমান হয় না। এবার, আপনারা আমাকে খারাপ, নষ্টা , চরিত্রহীন,ডাকাবুকো মেয়ে ভাবছেন তাই তো? ভাবতেই পারেন। কারন এ সমাজে চরিত্র তো শুধু মেয়েদেরই নষ্ট হয়........। একটু ভুল বললাম, যুগ যুগ ধরে তো সতীত্বের পরীক্ষা মেয়েদেরই দিয়ে আসতে হচ্ছে। আর সেই নিয়ম আজও চলছে.....হয়তো চলবে অনন্তকাল ধরে।
— "মামনি!" ছেলের ধাক্কায়, আমার যেন স্বপ্ন ভঙ্গ হল। বললাম,- "বাবু সোনা, তোমার জন্যে নতুন জামা প্যান্ট বের করে রেখেছি। পরে নাও তাড়াতাড়ি।"

কিচেন রুমে ঢুকে আমার তো মাথায় হাত! অনেক কিছু রান্নার বাকি আছে।মাসীটা এলে সব চটপট সেরে ফেলতে হবে। এত বড় করে ছেলের জন্মদিন আগে পালন করিনি, এই প্রথম। কিন্তু প্রানী বলতে আমরা তিন জন,- আমি, বাবু আর কাজের মাসীটা। বাবা, মা মারা গেছেন অনেক আগে। সেই থেকে আমি একা। কলেজে পড়তে পড়তে একটা ছেলেকে ভাল লেগেছিল,- কিন্তু ওই পর্যন্তই; আর এগোতে পারিনি। সে সব এখন অনেক অতীত।একা থাকতে যে একটা মেয়ের যে কত সমস্যা হয়, সেটা শুধু আমিই বুঝি। আসেপাশের বাড়ির কত চোখ যে আমার জামা ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে তা আমি জানি। বেশ চলছিল।এরপর একদিন হঠাৎ খুব মা হতে ইচ্ছে হল, বিয়ে না করেই। তাই অন্যের থেকে স্পার্ম ধার নিয়ে নিজের ছেলের জন্ম দিলাম। এই সাতটা বছর আমি নিজের হাতের পরশে পরশে,একটু একটু করে বুবাই কে বড় করে তুলেছি। তবে একটা মজার জিনিষ কি জানেন?
বুবাই কিন্তু আমার মতো দেখতে হয়নি। আরও ভাল দেখতে হয়েছে। হয়তো,সেই অচেনা স্পার্ম ডোনারের মতো। লেখাপড়ায় ও খুব ব্রিলিয়ান্ট! আমি কিন্তু পড়াশুনায় এত ভাল ছিলাম না। কিন্তু কোনোদিন জানার চেষ্টাও করিনি সেই অচেনা ডোনার টিকে। তবে বুবাই, আমাকে খুব ভালবাসে। আমাকে ছাড়া থাকতেই পারে না।
- "দিদিমনি,গালে হাত দিয়ে কি ভাবছেন?" কাজের মাসীর প্রশ্নে যেন ঘুম ভাঙল, বেলুন হাতে দাড়িয়ে আছে সে। মাসীর থেকে বেলুন গুলো নিয়ে ফ্যানে সিলিং এ কিছুটা বাধলাম। কিছুটা জানালাতে ঝুলিয়ে দিলাম। হঠাৎ আবার ফোনটা বেজে উঠল। অনিচ্ছার সত্বেও ফোনটা উঠালাম,
- "হ্যালো!"
- "নীলিমা সেন! দয়াকরে ফোনটা কেটে দেবেন না। "
- "কত বার, বলব আপনার সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছে নেই।"
- "প্লিজ! রাগ করবেন না । অফিসের ব্যাপারে আপনার সাথে একটু কথা ছিল।"
অফিসের কথা শুনে গলার সুরটা একটু নরম করলাম।  বললাম,-"কিন্তু,আজ তো আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি।"
-"জানি! আপনি ব্যাস্ত । তবুও আপনার বাড়িতে গিয়ে একটু কথা বললে ভাল হয়।"
এই যন্ত্রনা আর সহ্য হচ্ছিল না, তাই মনে দ্বিধা দ্বন্দ্ব না রেখে, লোকটিকে বাড়ির ঠিকানা বলে দিয়ে আসতে বললাম।
হ্যাঁ, আগে বলা হয়নি, আমি একটা বড় বেসরকারি কোম্পানি তে অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাজ করি। এবার আমরা ভাবছেন, চাকরী করি বলে এত বড় বড় কথা! কিন্তু চাকরীটা তো আমি আর শরীর দেখিয়ে পায়নি, নিজের যোগ্যতা ছিল তাই পেয়েছি । আর নিজের টাকা পয়সা থাকলে সে সবাই বড় কথাই বলে। তবে চাকরীটা অন্য যে কাউকেও দিতে পারত।কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকেই সিলেক্ট করল ওরা। আর চাকরীটা আমার দরকার ও ছিল। ভেবেছিলাম, পরে কোম্পানির বস কে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে আসব, কিন্তু আজ পর্যন্ত সেটা হয়ে ওঠেনি। ধন্যবাদ তো দুরের কথা, তার মুখটা পর্যন্ত দেখিনি। তিনি নাকি সব সময় বিদেশে থাকেন। তবে অফিসের পার্টির ছবিতে তাকে একবার দেখেছিলাম।
অতটাও খেয়াল করেনি।

কিচেন রুম থেকে পায়েসের মিষ্টি গন্ধ আসতে লাগল। কেক যথাসময়ে এসে গেছে। টেবিলের উপর কেক টা রেখে, সাত বাতি চারিপাসে সাজিয়ে রাখলাম। নতুন পোষাকে বুবাই কে আজ কি দারুন লাগছে! যেন রাজপুত্র!

হঠাৎ কলিং বেল টা বেজে উঠল।জানালা দিয়ে কাজের মাসী, উঁকি মেরে জিজ্ঞাসা করল,—" কে?"
- "নীলিমা সেন আছেন? ঐ যে কিছুক্ষন আগে ফোন করেছিলাম।"
-" দিদিমনি, এক ভদ্রলোক আপনাকে খুঁজছেন।" কাজের মাসী হেঁকে বলল।
বুজতে পারলাম, সেই লোকটা। মাসীকে বললাম,- "ওনাকে ভিতরে নিয়ে এস।"

ঘরের মধ্যে একটা মন ভোলানো সুগন্ধ।ফ্যানটা একদম স্লো চালিয়ে দিলাম।বেলুন গুলো হালকা জোরে ঘুরছে। আর সেই সঙ্গে লাল নীল কাগজের কুচি গুলো উড়ে পড়ছে। সোফায় বসে আছি। লোকটা ঘরে ঢুকতেই, উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকালাম। আর এক সঙ্গে দুটো ধাক্কা খেলাম বুকের মধ্যে। আমার সারা হাত পা কাঁপতে লাগল। লোকটির বয়েস আমারই মতো হবে, আঠাশ কি উনত্রিশ । লম্বা, চওড়া ফর্সা চেহারা, দেখতেও দারুন। এনার ছবিই তো দেখেছিলাম আমাদের কোম্পানির অফিসের পার্টির ছবিতে। তার মানে, ইনি আমাদের অফিসের বস!
প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠলেও দ্বিতীয় টার জন্যে আমি একদম প্রস্তুত ছিলাম না।কল্পনায় ও কোনোদিন ভাবিনি। বুবাই এর মুখের দিকে চাইলাম। অবিকল লোকটিও একই রকম দেখতে! এতটাই মিল যে আমি ওদের দুজনের মুখের চেহারায় কোনো পার্থক্য খুঁজে পেলাম। বাবা, আর ছেলে ছাড়া এত মিল কি করে সম্ভব? তবে ইনিই কি সেই অচেনা স্পার্ম ডোনার?
মাথাটা বন বন করে ঘুরতে লাগল।
-"আপনি ই তাহলে আমার অফিসে কাজ করেন?"
কোনো রকমে হ্যাঁ বললাম।
- "আমি জানি, ছেলের জন্মদিনের জন্যে অফিসে ছুটি নিয়েছেন, তাই গিফট টা নিয়ে এলাম।"
তারপর,বুবাই কে কাছে ডেকে কোলে, বসিয়ে গিফট টা দিয়ে কপালে একটা চুমু খেল।
আমার শরীর এখনো কাঁপছে। এও কি সম্ভব! ও কি জানতে পেরেছে,আমি ওর স্পার্ম ই নিয়েছি? না জানাটাও অসম্ভব কিছু নয়।

লোকটি উঠে দাঁড়াল।আমার চোখে চোখ রাখল। তারপর একটু মুচকি হেসে বলল, - "ভয়ের কিছু নেই! আমি শুধু দেখতে এসেছিলাম, আপনার ছেলে কত বড় হয়েছে?"
একটা মিষ্টি হেসে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল লোকটি । কথা বলার ক্ষমতা নেই আমার। আর কিঝুক্ষন বসতেও বলতে পারলাম না ওনাকে। বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তার চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলাম।
~~~~~~
ডাউনলোড করে নিন 'গল্পপড়ুয়া' অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ। আর ব্লগের সব গল্পপড়ুন আপনার হাতের মুঠোয়। ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.