|| সেদিন সন্ধ্যায় তাকে....ভালবেসে ছিলাম || ছোট গল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন।



[ গল্পটি সম্পর্কে: শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'স্বামী' গল্প থেকে অনুপ্রানিত হয়ে এই গল্পটি লেখা হয়েছে।]

(১)

স্কুলে নিজের টেবিলে কম্পিউটারের সামনে বসে মাস্টারদের স্যালারী শিট্ তৈরী করছে শুভময়। এক তারিখে মাস্টাররোল ক্লোজ করতে হবে তাই খুব ব্যস্ত।অবশ্য সারা বছরই শুভময় ব্যস্ত থাকে। একে স্কুলের হেড ক্লার্ক,তার উপর আবার একা। হাজার স্টুডেন্ট কে সামলানো কি চট্টি খানি ব্যাপার! একটা ছেলেকে মাস খানেক বেসরকারি ভাবে নেওয়া হয়েছিল।কিন্তু কাজের বহর,আর মাইনে দেখে,সেও কেটে পড়েছে। হেড মাস্টার কে বলেও কোনো আজ পর্যন্ত কোনো সুরহা করা যাইনি।
সকাল দশটা থেকে মাথার উপরে ফ্যানটা মৃদু গতিতে ঘুরছে। অনেকটা রেলস্টেশনের সিলিং ফ্যালগুলোর মতো। হাওয়া যেন আর নীচে পৌঁছোতে চায় না।হঠাৎ শুভময়ের পকেটের ভেতরে দপ দপ শব্দে আলো জ্বলে উঠল। মোবাইল ফোনটা পকেটে ভাইব্রেট মোডে রাখা ছিল। স্কুলে ঢুকলে সে ফোনটা ভাইব্রেট মোডে রেখে দেয়। না হলে তার ফোনের রিংটোন শুনে স্কুলের ম্যাডাম গুলো বিরক্ত হয়ে পড়ে।

-"এখন আবার কে ফোন করল?" বিরক্ত হয়ে ফোনটা পকেট থেকে বের করে দেখল,একটা অচেনা নাম্বার। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই, প্রায় উলটে চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল শুভময়। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিল।
-" আপনি কেমন ছেলে মশাই? দেখা নেই, শোনা নেই একটা মেয়েকে বিয়ের মত দিয়ে দিলেন। আমার বয়ফ্রেন্ড ছিল,সেটা আপনি জানেন? আমি আপনাকে কোনোদিনই বর বলে মেনে নিতে পারব না। এ বিয়ে আপনাকে বন্ধ করতে হবে।" একটা সাইক্লোন বয়ে গেল যেন ফোনের ওপারে।
শুভময় ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। কিছুদিন আগে তার বিয়ের পাকা দেখা হয়ে গেছে। মেয়ের বাড়ি দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলায়।মামা রাই দেখে শুনে ঠিক করেছে। মেয়ে এবছর,জিওগ্রাফি নিয়ে এম.এ কমপ্লিট করেছে কলকাতা ইউনিভারসিটি থেকে।এরপর নাকি আবার কি নিয়ে রিসার্চ করবে শুনেছে।শুভময় প্রথমে সম্বন্ধটা না করে দিয়ে ছিল। কারন, ওতদুর পড়াশুনা করা মেয়ে, তার মতো প্লেন বি.এ. পাস ছেলেকে বিয়ে করতে যাবে কেন?
তবুও মেয়ের বাবা জেদ করে বসল।ছেলে সরকারি চাকরী করে। এই বাজারে একটা সরকারি চাকুরে জামাই পাওয়া নাকি,ভগবানের দেখা পাওয়ার সমান। তাই মেয়ের বাবা নিজে থেকেই উদ্যোগী হয়ে বিয়ের ডেট ফাইনাল করে ফেলেছে। শুভময় এত কিছু জানার সত্বেও টেনসনে ভুল করে বলে ফেলল,-" আপনি কে বলছেন?"
-" সকাল বেলা নেকুপনা হচ্ছে? বিয়ে ঠিক করে এখন বলছেন,আমি কে?" ফোনের ওপারে যেন একটা ডিনামাইট ফাটার আওয়াজ পেল শুভময়।
-" না, মানে বিয়ের কার্ড,নিমন্ত্রন পাঠ সব কমপ্লিট হয়ে গেছে। একটু আগে থেকে ফোন করে যদি বলতেন!.....আচ্ছা আপনি আপনার বাবাকে বুঝিয়ে বলুন একবার।"
আর কোনো আওয়াজ এল না।টিক টিক টিক আওয়াজ করতে করতে ফোনটা কেটে গেল। সম্ভবত ওপার থেকেই বিরক্ত হয়ে লাইনটা কেটে দেওয়া হয়েছে। ফোনের স্ক্রিন টা অফ করে আবার পকেটে ঢোকায় শুভময়। কম্পিউটারের মাউস পয়েন্ট টা কে এলোমেলো ভাবে কিছুক্ষন ঘুরিয়ে,আবার নিজের কাজে কাজে মন দেয়।

(২)

খাটের কানায় বসে রাগে,বিরক্তি তে পা দোলাচ্ছি আমি। বাইরে রোদের তেজ টা ধীরে ধীরে যত বাড়ছে,আমার মাথার ভেতর রাগের পোকা গুলোও তত কিলবিল করে উঠছে। হাতের ফোনটা বালিশের উপর ছুড়ে ফেলে দিলাম।-" এ ছেলেকে ফোন করে কোনো লাভই হল না। ছেলে যদি রাজী থাকে,তবে এ বিয়ে উপরওয়ালা ও আটকাতে পারবে না।বিয়ে আমাকে করতেই হচ্ছে।"
যেদিন শুনলাম,আমার বর নাকি হাইস্কুলের ক্লার্ক,সেদিনই মন টা আমার ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গিয়েছিল। আর যাওয়াই উচিত। আমার বান্ধবীদের বর,বয়ফ্রেন্ড গুলো বড় বড় চাকুরীজীবি। এই তো,সেদিন নিধির বিয়ে হয়ে গেল এক সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়রের সাথে। পৌলমীর বর এম.বি.বি.এস(লন.)। রিম্পার বয়ফ্রেন্ড তো কলেজের প্রোফেসর।আর আমার?
সুজয়ের কথা মনে পড়ে গেল খুব আমার। লম্বাটে গড়ন,মাথায় কালো চুলে ভর্তি।মুখ ভর্তি হালকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি।ইঞ্জিনিয়ারিং লাস্ট ইয়ার। শুনেছিলাম বেঙ্গালুরুর এক সংস্থায় চাকরী পেয়ে যাবে। খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম ওকে।বিকেলে ঘুরতে গিয়ে নির্জন মাঠে বসে থাকা, সন্ধ্যার কফিশফের মৃদু আলোয়,কত স্মৃতি জড়িয়ে ছিল এই দু'বছরের। শরীরে শরীরে কিছু না দিলেও, মনে মনে যা দেওয়ার সব দিয়ে দিয়েছিলাম।মা ও প্রায় রাজী করে ফেলেছিল বাবা কে। কিন্তু সুজয়ই সব গোলমাল পাকিয়ে দিল। বার বার বলতাম,তুই মদ খাওয়া ছেড়ে দে। কিন্তু আমার কোনো কথাই শুনলো না। একদিন বিকেলে মদ কিনতে গিয়ে বাবার সামনেই পড়ে গেল। ব্যাস্ যেখানে বাঘের ভয়,সেখানে সন্ধ্যা হয়। সন্ধায় বাবা ঘরে ফিরতেই,সারা বাড়ি জুড়েই পাঁচমিনিট পর পর বোমারু হামলা শুরু হয়ে গেল। কখনো বেডরুম,কখনো কিচেন রুমে,কখনো ড্রয়িং রুমে।
-" মাতালের সঙ্গে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেব না। দরকার হয় একটা বেকার ছেলেকে দেব।"
কি চিৎকার চেঁচামেচি বাবার। তারপর আস্তে আস্তে সোফার উপর ঢলে পড়ল। হাই ব্লাড প্রেসারের রোগী,তাই অতিরিক্ত উত্তেজনা একদম সহ্য করতে পারিনি। ডাক্তারের অনেক চেষ্টায় বাবা কে সেদিন ফিরে পেয়েছিলাম। তারপর আর কোনোদিন সুজয়ের কথা বাবার সামনে বলার সাহস হয়নি।

সূর্য টা মাথার উপরে উঠে গেছে। জানালার বাইরে রোদ ঝলমলে পরিবেশ। রাস্তার উপর পাশের বাড়ির বল্টুদের কুকুরের বাচ্চা দু'টো গড়াগড়ি খাচ্ছে।মাধবীলতা ঘেরা পাঁচিলের পাশের বাবলা গাছটিতে একটা দাঁড়কাক বসে অনবরত ডেকে চলেছে।মুখপোড়া কাক! দু:খের সময় আরও বিপদের সংকেত দিচ্ছে।খাট থেকে উঠে,জানালার রড টা ধরে দাঁড়ালাম। একটা গরম হাওয়া মুখে এসে লাগল। সুজয়ের জন্যে চোখের কোনে এক ফোঁটা জল আসতে চাইছে। ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল,-"ওরে হতভাগা শ্রীময়ী,কোনো কিছু পাওয়ার থেকে ত্যাগ অনেক বড় জিনিষ! সবাই সেটা পারে না।"
হ্যাঁ। সেই জন্যেই তো নিজের মনের কষ্ট চেপে রেখে,অন্যের মুখে হাসি ফোটাচ্ছি।


(৩)

যথাসময়ে ধুম ধাম করে আমার বিয়ে হয়ে গেল। শুভ দৃষ্টির সময়,আমার চোখ তুলে তাকানোর কোনো প্রকার ইচ্ছে হল। এমনকি সারক্ষন মাথা নীচু করে রইলাম। পাশ থেকে অনেকেই বলতে লাগল, এ মেয়ে ভারী লাজুক। লাজুক,না ছাই!
রাগে আমার কারও দিকে তাকাতে ইচ্ছে করল না। মিথ্যা বলব না, সুজয়ের কথা টা মনে পড়ছিল বার বার।
শ্বশুর বাড়ি গিয়ে দেখলাম, আমি যেমন টা ভেবেছিলাম ঠিক তেমন নয়। সাজানো গোছানো পাঁচিল ঘেরা দোতলা বাড়ি।আর ফ্যামেলি বেশী বড় নয়। শ্বশুর মশাই মারা গেছেন বছর তিনেক হল। শাশুড়ি মা আছেন,আর বরের এক ভাই ও বোন আছে।
ফুলসজ্জার রাতে মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। মনের ভেতর একটা কষ্ট যেন খোঁচা দিতে লাগল।বরকে বলে দিলাম,-" আমি তোমার সাথে এক খাটে শুতে পারব না।"
আমার কথা শুনে সে অবাক হল না।বরং স্মিত হেসে বলল,-"কোথায় থাকবে?এ ঘরে তো দু'টো খাট রাখার যায়গা নেই।"
-" সেটা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। আমি সোফার উপর জায়গা করে নেব।"
বেশ কিছুদিনের মধ্যে আমার শাশুড়ি মা বুঝে গেলেন,যে আমার দ্বারা এ সংসার কত খানি হবে! আমার হাবে ভাবে তার কিছুটা প্রকাশ পেল। আমিও আমার শাশুড়ি মাকে মনে মনে মেপে নিলাম।তিনি কেমন মনের মানুষ?তাই সংসারে যত টা কাজের দরকার ততটাই করতে লাগলাম। কিন্তু যেটা বুঝতে পেরে একটু অবাক হলাম,সেটা হল– আমার বর টা খুব ভাল মনের মানুষ।একটু নরম স্বভাবের,এবং কথাও বলে কম।সারক্ষন ঠোঁটে একটা হাসি লেগেই আছে। যে যখন যেটা চাইছে,তাকে সেটা এনে দিচ্ছে। স্কুলের কাজের প্রতিও তার দায়বদ্ধতা অনেক। মাঝে মাঝে সোফায় শুয়ে দেখতে পাই, গভীর রাত পর্যন্ত কম্পিউটারের সামনে বসে স্কুলের কাজ করে চলেছে। কিন্তু আমার এ পোড়া মনে, তার জন্যে একটু সহানুভুতি তৈরি হয়নি।
একদিন আমার তিন বান্ধবীকে সন্ধ্যায় নিমন্ত্রন করলাম। বিকালে বর কে ফোন করে বলে দিলাম,-" আমার বান্ধবীরা আসবে,স্পেশাল কিছু বাজার করে আনবে।" সাথে একটা লম্বা লিস্ট ও ধরিয়ে দিলাম।
অনেকদিন পর চার জন বসে আড্ডা মারছি। আমার বর ও পাশে বসে আছে। মাঝে মাঝে সবার সাথে অল্প অল্প কথা বলছে। পৌলমী বড় মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,-" আমার বর এমাসেই একটা এল.ই.ডি টি.ভি কিনে এনেছে। সত্তর হাজার টাকা নিয়েছে। তা তোদের টি.ভি র প্রায় তিনখানা সমান বড় হবে। দেখতে দেখতে মাঝে মাঝে মনে হয় সিনেমা হলে বসে আছি।"
নিধি,আমার বরের দিকে তাকিয়ে বলল,-" শুভ দা,এবার একটা চার চাকার গাড়ি নিয়ে নাও। আমরা সেদিন একটা নতুন নিলাম।"
স্কুল ক্লার্কের চাকরী করে যে চার চাকার গাড়ি কেনা কতটা কঠিন সেটা জানার সত্বেও নিধি টা এরকম বলল। আমি বরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম,তার মুখে সেই চিরপরিচিত হাসি লেগে আছে। ভেবেছিলাম,আমার বর অপমানিত হলে, আমি খুব খুশি হব। কিন্তু ব্যাপার টা ঘটল ঠিক তার উঠল। আমার খুব রাগ হতে লাগল,মনে হল তার অপমান মানে আমারই অপমান। কেন এমন মনে হল আজ?এর উওর আমারও জানা ছিল না।
বেশ কিছু দিন ধরে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছিলাম। আমার বর বাড়ির সবাইকে যতই ভালবাসুক না কেন,আমার মতো বাড়ির সবারই যেন বরের প্রতি উদাসীন মনোভাব। ছোটো ছেলেরই প্রতি মায়ের প্রীতি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল। বাজার থেকে মাছ আনলে,বড় বড় মাছের পিস গুলো শাশুড়ি মা আগে,ভাগেই তার ছোটো ছেলে,ও মেয়ের থালায় তুলে দিতেন। আর আমার বরের থালায় পড়ত ছোটো পিস টি। সে দিতেই পারেন। ছোটোদের প্রতি মায়ের একটু ভালবাসা বেশি থাকে। কিন্তু রোজ রোজ তো আর ব্যাপার টা মেনে নেওয়া যায় না। একদিন রাতে খাওয়ার সময় আমি নিজে থেকেই আগে ভাগে বড় মাছ টা তুলে বরের থালায় দিয়ে দিলাম। সবাই আমার দিকে কেমন ট্যারা চোখে তাকাল। আমার বর ও অবাক হয়ে গেল। শাশুড়ি মা বুঝতে পারলেন,তার ছোটো ছেলে ও মেয়ের প্রতি প্রীতি টা আমি বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করেছি। কিন্তু কেন যে এই কাজটা আমি হঠাৎ করে বসলাম?তখন মনে হয়েছিল রোজ রোজ এরকম একটা অন্যায় মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু শুধু কি তাই? বোধ হয় না। বার বার আমার মনে হচ্ছিল,আমার বর টিও তো একটা দিন বড় মাছ খেতে পারে।
কেন আমার এমন মনে হল সেদিন?যাকে কোনোদিন ভালবাসিনি,তার জন্যে আমার মনে এরকম অনুভুতি কেন জাগলো?
সত্যি! মেয়েদের মন বড়ই বিচিত্র।


(৪)

প্রতিদিন আমার বরের স্নান করার আগে আমি স্নান সেরে নিই।তারপর একটু শাশুড়ি মার সাথে রান্নার জোগাড় করে দিই। আজ পর্যন্ত তিনি জোর গলায় আমাকে কিছু করতে বলেন নি। তিনি হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন যে জোর করে আমাকে দিয়ে কিছু করানো যাবে না। তাই নিজে থেকেই তাকে রান্নার কাজে সাহয্য করতাম।
সেদিন সকাল থেকেই মনটা অজানা কারনে খারাপ হয়ে ছিল।অজানা ঠিক বলব না,– সুজয়ের কথাটা যেন কি করে মনে চলে এল। স্নানের জন্য বাথরুমে ঢুকতেই পা পিছলে ধপাস! মাথাটা জোরে ঘুরে এল। মনে হল অজ্ঞান হয়ে যাব এবার। চোখ দুটো অজান্তেই বন্ধ হয়ে এল। আমার আছাড় খেয়ে পড়ার শব্দ শুনে বোধ হয়,আমার বর ঘর থেকে ছুটে চলে এল। চোখ মেলে দেখার ক্ষমতা টুকু হারিয়েছি। শুধু একটাস্পর্শ অনুভব করলাম, এই প্রথমবার।কেউ যেন একটা হাত আমার দুই হাঁটুর ভাঁজের নীচে আর অন্যটি আমার মাথার নীচে ঢুকিয়ে দিয়ে তার বুকের কাছে উঠিয়ে নিল। তারপর,ঘরে এনে খাটের উপর শুইয়ে দিল। আমি বাঁধা দিতে পারলাম না।সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছি একটু একটু করে। চোখে বার কয়েক জলের ঝাপটা মারতেই,আমি চোখ খুলে দেখতে পেলাম আমার বরের সেই অমলিন হাসি মুখটা। স্কুল থেকে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেই,বরকে আমার কিছুদিন ধরে মনের জমানো একটা কথা,জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারলাম না।
-" একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
পিঠ থেকে ব্যাগ টা নামিয়ে সে বলল,-" হ্যাঁ, করো!"
-" আচ্ছা,তুমি বাড়ির সবাইকে এত ভালবাসো,কিন্তু সবাই তোমার সাথে এমন একটা ভাব করে,যেন তুমি এ বাড়ির কেউ না,একজন পর।"
আমি জানতাম,বরের সেই চিরপরিচিত হাসি টি দেখতে পাব। জামাটা খুলতে খুলতে বলল,-" জানো শ্রীময়ী, আমার নিজের আর কেউ নেই। জন্মের সময় মা মারা গিয়েছিল,বাবা ও মারা গেল বছর তিনেক হল। এই নতুন মায়ের কাছেই ছোটো থেকেই মানুষ।"
গলাটা যেন ধরে এল তার।কানের কাছে বাজ পড়লে মনে হয় এত জোরে চমকে উঠতাম না।মনের ভেতর যেন একটা কষ্ট দপ করে জ্বলে উঠল। মনে হল চোখের গভীরে জলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে,একটু পরেই হয়তো বাইরে বেরিয়ে পড়বে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না,সব কিছু ভুলে গেলাম। এক ছুটে গিয়ে বরকে বুকে জড়িয়ে নিলাম। খুব ভালবাসতে,খুব আদর করতে ইচ্ছে করল আজ। এরকম একটা মানুষকে কেন আগে ভালবাসিনি আমি?– যে নিজের সব কষ্ট চেপে রেখেও অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে যায়।
বাইরে বকুল গাছের মাথায় সন্ধ্যা নেমেছে। ঘরে ফেরা পাখিদের কিচি মিচি ডাক। বড় পূর্নিমার চাঁদ উঠেছে আকাশে।কতক্ষন বর কে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলাম জানিনা।মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই দেখি সেই পরিচিত হাসি। আমারও যেন আজ খুব হাসতে ইচ্ছে করল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.