|| আমি ও মেয়েটি || ছোট গল্প || ~স্বদেশ কুমার গায়েন।


–"কি হল বলতো তোমার?এত চুপচাপ থাকো কেন তুমি?"
সায়ন্তনী আমার হাতটা ধরে টানলো।পশ্চিমের আকাশ টা লাল হয়ে এসেছে। মনমরা আকাশ। কিছুক্ষন আগে পর্যন্ত হলুদ রঙা হয়ে ছিল।সাদা সাদা মেঘ গুলো ভেসে বেড়াচ্ছে,– যেন আকাশ সমুদ্রে পালতোলা নৌকা।
_"তুমি এরকম কেন বলতো?ছেলেরা এত চুপ চাপ হয় নাকি?"
সায়ন্তনী আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল আবার প্রশ্ন করলো।আমি যেমন ছিলাম, তেমনই আছি।নিশ্চুপ,বাক্যহীন। আমি ছোটোবেলা থেকে এরকম,–খুব কম কথা বলি।সারা দিনে কত গুলো কথা বলি,সেটা হাতে গুনে বলে দেওয়া যায়। ছোটোবেলায় মা রাগ করে বলত,–"তুই বোবাদের মতো হয়ে থাকিস কেন রে?"
আমি বোকার মতো হাসতাম।কিছু বলতে পারতাম না। আজও সায়ন্তনীর কথার,উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।ও খুব কথা বলতে পারে,– রেডিও জকি দের মতো। আমি ওর সাথে কথা বলে,পেরে উঠিনা। শুধু হাঁ করে ওর কথা খাই। খুব ভাল লাগে আমার ওর বক বক শুনতে। এখন শুধু ওর পাশে হাঁটছি।লাল মাটির নির্জন রাস্তা।দু'পাশে বড় বড় ইউক্যালিপটাস গাছ যেন আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তারপর ধূ ধূ মাঠ। মাঝে মাঝে সবুজের ছোঁয়া লেগে আছে।কিছু গরু,ভেড়ার পাল চরে বেড়াচ্ছে।মানুষ জনের বসতি একটু কম এদিকে।লাল রাস্তা টা সাপের মতো আঁকতে বাঁকতে দূরের গ্রামের মধ্যে ঢুকে গেছে।কয়েকজন আদিবাসী মহিলা,মাথার করে শুকনো ডাল–পালা বেঁধে নিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে হেঁটে চলেছে।

 রাস্তার পাশে এক টুকরো সবুজ ঘাসের উপর বসলাম দুজন। সায়ন্তনী একদম আমার গা ঘেঁষে হাত টা ধরে আছে।সামনের মাঠে কিছুটা দূরে শালের বন।তার ফাঁক দিয়ে লাল সূর্যটা দেখা যাচ্ছে।সূর্যটা এখনো আকাশ সমুদ্রে ডুব দেয়নি। কিছুটা ভেসে আছে।ভাবনার সমুদ্রে ডুবে গেলাম আমি.........

সেবার শিয়ালদহ স্টেশনে যখন পৌঁছোলাম তখন ন'টা বেজে পনেরো মিনিট।বাড়ি ফিরছি, পুরুলিয়া থেকে।বাড়ি ফিরছি বলা টা ভুল হবে, আসলে আমি সোনারপুরে একটা বন্ধুর মেসে যাচ্ছি–যেটা অনেক টা বাড়ির মতো।শিয়ালদহ স্টেশনে এসে শুনলাম,ট্রেন বন্ধ।যাদবপুর না গড়িয়ার কাছে ডাউন লাইনের ইলেক্ট্রিক তার নাকি ছিঁড়ে গেছে। সে যেতেই পারে! ইলেক্ট্রিক জিনিষ খারাপ হবে না,তার কোনো গ্যারেন্টি কেউ দিতে পারে?
তবে ব্যাপার বুঝতে আমার আর বাকি রইল না। আবার যে কত লেট হবে,সেটা আমি জানি! সারা প্লার্টফর্মটিতে লোকে গিজ গিজ করছে।শুধু কালো কালো মাথা দেখা যাচ্ছে।অনেক কষ্টে একটা বসার জায়গা পেলাম।ব্যাগ থেকে জলের বোতল টা বের করে ঢক ঢক করে কয়েক ঢোক খেয়ে নিলাম।
এবার চোখে পড়ল!
এতক্ষন লক্ষ করিনি যে আমার পাশে একটা মেয়ে বসে আছে। আমি এরকমই।রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আশে পাশে তাকাই না। ট্রেনে বা বাসে আমার পাশের সিটে কে বসে আছে,তার মুখের দিকেও ভাল ভাবে দেখিনা।মেয়েটি ফোন টা বের করে কানে লাগালো,–"মা,আমার আসতে লেট হবে।ট্রেন বন্ধ।চিন্তা করো না।"
ফোন টা কেটে ব্যাগে রেখে দিল মেয়ে টি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,–" আপনি কোথায় যাবেন?"
আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। বোকার মতো বলে বসলাম,–"বাড়ি যাব।"
হো হো হো হেসে উঠল মেয়ে টি।
–"আপনি তো দারুন মজা করতে পারেন?"
কি মজা করলাম,সেটা আমি নিজেই বুঝতে পারলাম না।
–"বাড়ি তো যাবেন জানি, কিন্তু কোন স্টেশনে নামবেন?" মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল। এবার মেয়েটির হাসির কারন বুঝতে পারলাম।
–"সোনারপুর"
একরম মিশুকে মেয়ে আমি কখনো দেখিনি। আসলে মেয়েদের কে আমি ভাল ভাবে কোনোদিন দেখিনি। কোনো মেয়েও এরকম ভাবে কথা বলেনি আমার সাথে। সেই জন্যে আমিও অবাক হয়ে যাচ্ছি।একটা অচেনা ছেলের সাথে,কিরকম হেসে কথা বলছে!
–"তাই! আমিও তো সোনারপুর যাব।বাই দ্য ওয়ে ,আমি সায়ন্তনী। আপনি?"
–"সুজয়।"
–"বাহ! দারুন নাম তো আপনার! নামের মধ্যেই কেমন একটা জয় করা গন্ধ আছে।"
আমার এবার বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল।একি শুরু হল? মেয়েটা এরকম বলছে কেন? আমার হাসি পেল না।সায়ন্তনী ব্যাগ টা নিজের বুকের কাছে চেপে ধরে বলল,–"ভালই হলো! এক সাথে যাওয়া যাবে।কখন যে ট্রেন ছাড়বে তার কোনো ঠিক নেই !রেলের কর্মচারী গুলো সব ফাঁকিবাজ। কাজের তো কিছু করেই না,শুধু বসে বসে মাইনে নেয়।"
তারপর কপালের উপর থেকে চুল গুলো সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,–"আপনিই বলুন, নইলে এরকম ভাবে তার ছিঁড়ে যায়?"
আমার ভয় করল।গতবছর আমি পুরুলিয়া স্টেশনে রেলে চাকরী পেয়েছি।তাই ফলাও করে আর বললাম না যে,আমিও রেলে চাকরী করি।
–"হবে হয়তো।"আমার গলা দিয়ে স্বর বেরুলো না।
ইতিমধ্যে লোকজন আর ট্রেনের অপেক্ষা না করে বাসে যাওয়া শুরু করেছে।সে কি ভিড়! বাসে ভেতর পা রাখার জায়গা নেই।সব বাদুড় ঝোলা হয়ে যাচ্ছে।তাই দেখে আবার দু'জন ফিরে এসে প্লাটফর্মে বসলাম।হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি এগারোটা বাজতে আর মিনিট পনেরো বাকি আছে।
আবার ফোন বেজে উঠল। আমার নয়। সায়ন্তনীর ফোন।ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে কানে ধরল।
–"না মা, এখনো ট্রেন ছাড়েনি নি।তুমি চিন্তা করো না।আমার সাথে একটা বন্ধু আছে।"
ফোনে কথা বলতে বলতেই, সায়ন্তনী আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।আমি মুহুর্তে মুহুর্তে অবাক হচ্ছি।মেয়েটা পাগল–টাগল নয়তো?এই রাত–দুপুরে পাগলের পাল্লায় পড়লে সর্বনাশ!
কান থেকে ফোনটা নামিয়ে আবার ব্যাগে ঢোকালো সায়ন্তনী।তারপর বলল,–"কি বন্ধু তো?আচ্ছা, এতটুকু সময়ে আমার এতগুলো ফোন এল বাড়ি থেকে,আপনার তো একটিও ফোন এল না!"
কি বলবো ভেবে পেলাম না। আমি মেয়েটির বন্ধু! চুপ করে সায়ন্তনীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।হঠাৎ করে যেন খুব ভাল লাগছে আমার।কেন মনে হচ্ছে, মেয়েটি আমার খুব পরিচিত। বললাম,–"আমাকে আপনি করে বলবেন না! খুব অস্বস্তি হয় আমার।"
সায়ন্তনী আবার হাসল।ওর ফর্সা গালের টোল দু'টো স্পর্ষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
–"আচ্ছা বাবা! তুমি করে বলবো।তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না?"
–"ফোনে চার্জ নেই।"
আমি মিথ্যে কথা বললাম।
অবশেষে এগারো টা বেজে পনেরো মিনিটে ট্রেন ছাড়ল। ট্রেনে উঠে বসলাম দু'জন।

এর পর সায়ন্তনী সঙ্গে আর দেখা হয়নি।হঠাৎ তৈরী হওয়া বন্ধুত্ব,মনে হয় এভাবেই হঠাৎই চলে যায়।কয়েক মাস কেটে গেল।ভুলে গেলাম সব। একাকি জীবন।ছোটো বেলা থেকে একা থাকতে খুব ভাল লাগতো।কিন্তু আজ যে এরকম একা হয়ে যাব,কোনোদিন ভাবিনি।'একা থাকা',আর 'একা হয়ে যাওয়া'–জিনিষ দু'টো যে এক নয় সেটা আজ ভালই বুঝতে পারি। সকাল বেলা উঠে স্নান সেরে অফিসে বেরোই,আর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরি।চার দেওয়ালের ভেতরই আমার জীবন।লাইট,ফ্যান ,সুইচ, দেওয়ালের টিকটিকি, মাকড়শা,– এরাই আমার বন্ধু।এরাই আমার পরিচিত।এর বাইরে আর কিছু দেখিনি আমি। একাকিত্বে যখন ডুবে থাকি,তখন টিকটিকি টা ঠিক ঠিক করে ডেকে উঠে আমাকে জাগিয়ে দেয়।খোলা নীল আকাশ আমি দেখিনা,– যেখানে সাদা বকের দল ডানা মেলে।সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখিদের কলতান আমাকে বিরক্ত করে।চুপ করে চার দেওয়ালের ভেতর শুয়ে থাকি।
বেশ কয়েকমাস পর আবার সোনারপুরে বন্ধুর মেসে গেলাম। কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করলাম। পুরুলিয়া রওনা দেওয়ার দিন সকাল দশটায় সোনার পুর স্টেশনে বসে আছি।শিয়ালদহ যাব। হঠাৎ কানে একটা আওয়াজ এল,–"আরে সুজয় তুমি!"
সায়ন্তনী কে দেখে চিনতে পারলাম। সে আমার পাশে বসে পড়ল।ঈশ্বর চাইলে মনে হয়,এরকম অকল্পনীয় ভাবে দু'জন অচেনা মানুষের দু'বার দেখাও হয়ে যায়। আমাদের ও তাই হল।
–"কোথায় যাবে?আজ নিশ্চয় বাড়ি যাবে না!" সায়ন্তনী হাসল।
আমার ও হাসি পেল।সেদিনের সেই বোকা ভাবে, 'বাড়ি যাব' কথাটা ও ভুলিনি।বললাম,
–"পুরুলিয়া যাব।"
–"কেন?"
–"আমি চাকরী করি ওখানে।"
–"ওয়াও! তুমি চাকরী কর!তোমাকে দেখে মনে হয় না একদম।এই,আমাকেও পুরুলিয়াতে যেতে হবে,কিছুদিন পর।তোমার কনট্যাক্ট নাম্বার টা দেবে, যদি তোমার কোনো অসুবিধা না থাকে।"
–"কেন,পুরুলিয়াতে যাবে কেন?" আমি অবাক হলাম।
–"তোমাকে পরে বলবো। সারপ্রাইজ থাকলো এটা।"
শিয়ালদহ যাওয়ার একটা ট্রেন এসে থামল এক নাম্বার প্লাটফর্মে। মোবাইল নাম্বার টা দিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম।ট্রেন ছেড়ে দিল।প্লার্টফর্মে দাঁড়িয়ে সায়ন্তনীর সেই অপলক দৃষ্টিতে,আমার দিকে তাকিয়ে থাকা–আমি আজও ভুলিনি।

এই মাস তিনেক হয়ে গেল পুরুলিয়ার একটা স্কুলে শিক্ষিকা পদে জয়েন করেছে সায়ন্তনী। এটাই ছিল সারপ্রাইজ।ফোন করে সে কথা জানিয়েছিল।ওর এই গ্রাম্য পরিবেশ খুব ভাল লাগে।লাল পাথুরে মাটির রাস্তা,দু'পাশে উঁচু–নীচু ঢেউ খেলানো জমি।এক মানুষ সমান খেজুর, তাল গাছের সারি।ও হারিয়ে যায় এই প্রকৃতির মধ্যে।আমাকেও আর চার দেওয়ালের মধ্যে থাকতে দেয় না।প্রতি রবিবার বিকালে, জোর করে আমাকে টেনে নিয়ে যায়,আমার হাত ধরে হাঁটে লাল ধুলো মাখা রাস্তায়। এ অচেনা প্রকৃতি, এই হলুদ আকাশ, এই রুক্ষ মাঠ–প্রান্তর,মাঠের ওপারে সূর্য অস্ত যাওয়া,–আমি দেখিনি কোনোদিন।পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ শুনিনি কোনোদিন। সায়ন্তনী আমাকে সব দেখিয়েছে। আমিও দেখি,তবে শুধু প্রকৃতি নয়–ওর হাসি,ওর কথা বলা,ওর হাঁটা–চলা।খুব ভালবাসি।

আজও আমরা ঘুরতে বেরিয়েছি। এই মুহুর্তে সায়ন্তনী বসে আমার গা ঘেঁষে।সূর্যটা দূরের শালবনের আড়ালে।এক ঝাঁক ঘরে ফেরা পাখি মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।
–"ঐ দেখো সুজয় ,পাখি গুলো কি সুন্দর!" সায়ন্তনী আকাশের দিকে হাত উঁচু করে চেঁচালো। আমি উপরের দিকে তাকালাম। সায়ন্তনী আমার কাঁধে মাথা রেখে বলল–"সুজয়! আকাশের রঙ টা কেমন পরিবর্তন হচ্ছে দেখো। সূর্য টা ডুবে যাচ্ছে মাঠের ওপারে। কি সুন্দর দৃশ্য তাই না? তোমার এসব ভাল লাগে না?"
আমি কিছুক্ষন চুপ করে রইলাম।তারপর আস্তে করে বললাম,– "না।এসব ভালো লাগে না।"
–"কেন?তবে কি,ভালো লাগে তোমার?"
আমি ওর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, –"শুধু তোমাকে দেখতে।তোমার মধ্যে আমি সব খুঁজে পাই,–পাঁখির ঝাঁক,সূর্যের লাল,শালবন, মেঠোপথ,সবুজ মাঠ,বরফের দেশ, পাহাড়ি ঝরনা,নীল সমুদ্র.......সব।"
সূর্যটা ডুবে গেছে।চারিপাশ এখন একটু কালো, আবছায়া অন্ধকার। সায়ন্তনীর ঠোঁট দু'টো, আমার মুখের আরও খুব কাছে সরে এল।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.