|| ভালোবাসা বাসি || ছোটোগল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন।


(১)

আমার সামনেই বসে আছে স্বর্নাভ। পরনে নেভি ব্লু জিনস আর ফর্মাল টি-শার্ট।যাকে বলে, নরম্যাল ড্রেস। তবে বেশ মানানসই। কফিশফ টির ভেতরে হালকা হলুদ আলোর বিচ্ছুরন। কোনার দিকে একটা ছোট্ট টেবিলের এপার ওপার দু'টো চেয়ার পাতা।আমার ঠিক সামনের চেয়ার টি তে বসে আছে ও।একটু একটু করে কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর সরু গোল চোখ গুলো দিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে।
একটু হাসার চেষ্টা করলাম আমি। স্বর্নাভ ও হাসলো।ওর হাসিটাও বেশ মিষ্টি।আমার বেশ ভালো লাগলো।অনেক সময় ধরে আমার বুকের ভেতর টিও কিরকম একটা অদ্ভুত আচরন করতে শুরু করে দিয়েছে। আমি কি
তবে নার্ভাস ফিল করছি?
এরকম তো হয় না।একবারই মাত্র সেটা অনুভব করতে পেরেছিলাম-চার বছর আগে ঋষি কে প্রথম দেখার পর। না,স্বর্নাভ,মোটেই ঋষির মতো দেখতে নয়।কেউ কারও মতো দেখতে খুব কমই হয়।ওর উচ্চতা মাঝারি,পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির কাছাকাছি।রোগা-পাতলা চেহারা। মাথায় হালকা কালো চুল।মুখ ভর্তি আগোছালো গোঁফ দাড়ি।কিন্তু ওর দু'টো চোখ,কথা বলার ধরনের মধ্যে আমি যেন প্রতিটা মুহর্তে ঋষি কে খুঁজে পাই।ওর কথা বলার মধ্যে একধরনের আবেগ থাকে যেটা আমাকে পাগলের মতো টানে।আর এই একমাসেই সেই টান আমাদের কাছে এনে ফেলেছে।

সন্ধ্যার কফি শফ টা আজ শান্ত।আশে পাশে কিছু আমাদের মতো তরুন-তরুনী ব্যক্তিগত মুহুর্ত শেয়ার করছে।অস্বস্তিকর পরিবেশ এড়াতে আমিই প্রথম কথা বলি,-"তোমার আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো,স্বর্নাভ?"
-"না।" শান্ত গলায় উত্তর দেয় সে।
স্বর্নাভ ও কি নার্ভাস আছে? ওর কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম সেরকম কিছু একটা বলে দিচ্ছে। আমার বেশ ভালো লাগছে ও কে দেখে।কিরকম একটা লাজুক লাজুক ভাব ওর মধ্যে।মনে হয়,এর আগে কোনোদিন কোনো মেয়ের সামনে বসে নি। রহস্যময় চোখ দু'টো দিয়ে এমন ভাবে তাকায়,মনে হয় ওই চোখের পাতায় কত মায়া জড়ানো! কিন্তু আমি কি ঠিক করছি এটা?না, আমার ভুল হচ্ছে।আমি স্বর্নাভ কে ভালোবাসি না।ওর মধ্যে আমি আমার ঋষি কে খুঁজে পাই। তাই তো পাগলের মতো ওর সাথে কথা বলে যাই সারক্ষন।ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।কাছে বসিয়ে গল্প করতে ইচ্ছে করে।আমি বুঝতে পারি, আমার এটা করা উচিত হচ্ছে না।এটা ঠকানো ছাড়া আর কিছু নয়।কিন্তু ও কি কিছু বুঝতেও পারে না? না,বুঝতে পেরেও আমার সাথে সারক্ষন পাগলামো করে যায়।আমার একটু শরীর খারাপ করলেই দিনে একশ বার ফোন। ফোনে না পেলে, সারাদিন ফেসবুকে স্বর্নাভর একটাই মেসেজ,-"উর্মি,তুমি ঠিক আছো তো? শরীর ঠিক আছে?ওষুধ খেয়েছো?"
পাগল ছেলে একটা! আমি আর চাই না,স্বর্নাভ এই পাগলামো টা করুক।তাই কঠিন সত্যি কথাটাই বলতে আজ স্বর্নাভ কে ডাকা।যদিও একবার দেখতেও ইচ্ছে করছিল খুব।

আমাদের কফি প্রায় শেষের পথে। শুধু কফি খাওয়াই হল,কিন্তু কথা কিছুই হল না।আসলে কোথা দিয়ে শুরু করবো সেটাই বুঝতে পারছি না।অথচ,দিন ভোর ফোনে, ফেসবুকে কতই না কথা হয়। কিন্তু যখন দেখা হল,সবাই চুপচাপ! এ ছেলে কথা বলবে না,সেটা আমি বুঝে গেছি। অস্বস্তি এড়াতে আবার প্রশ্ন করি,-"তোমার ভয় করছে নাকি,স্বর্নাভ?"
স্বর্নাভ আমার চোখের দিকে তাকায়।-"ভয়!কই না তো!"
-"কেন,তুমি যে বলো,মেয়েদের খুব ভয় পাও! সামনে গেলে তোমার হাত পা কাঁপে?" হেসে বলি আমি।
স্বর্নাভ হাসে।-"একটু একটু পাচ্ছি।"
-"একটু একটু না,বেশি বেশি?"আমি শাসনের সুরে বলি।
-"একটু একটু।" ওর মুখটা দেখে হাসি পায় আমার।
হাসি চেপে রাখি।স্বর্নাভ আমার থেকে এক বছরের ছোটো।তাই ওর উপর একটু-আধটু আদুরে শাসন করি।

(২)

মাস খানেক আগের কথা। কলকাতার একটা ছোট্ট ফ্লাটে থাকি আমি।ফ্লাট টা ভালোই,বিশেষ করে আমার জন্যে।একটা শোবার ঘর। সাথে কিচেন আর বাথরুম অ্যাটাচ। দক্ষিন দিকের জানালা দিয়ে খোলা আকাশের অনেক দুর পর্যন্ত দেখা যায়।ফুর ফুর বাতাশ এসে চোখে- মুখে লাগে।আমি মাঝে মাঝে চুপ করে ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি।
বাইরের সারি সারি বাতির মতো জ্বলতে থাকা আলোরর দিকে তাকিয়ে থাকি অনেক রাত পর্যন্ত। আমার ঘরের ভেতর আসবাব পত্র বলতে তেমন কিছু নেই। দরজা দিয়ে ঢুকতেই বাঁপাশে শোবার খাট,ডান দিকের কোনায় একটা আলমারি। তার পাশে একটা টেবিল।টেবিলের উপর আমার পড়াশুনার কিছু বই, ল্যাপটপ আর রজনীগন্ধা রাখা। রজনীগন্ধার ঠিক পাশেই ঋষির একটা ফোটো। আমি কলকাতার একটা হসপিটলের ডাক্তার।সবে মাত্র পড়াশুনা শেষ করে কাজে জয়েন করেছি।হসপিটল থেকে ডিউটি সেরে ফিরে এই ছোট্ট ঘরটিতে একাকিত্ব আমায় অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরে।
ব্রেন ক্যানসারে ঋষি মারা যাওয়ার পর থেকে, ঘরে ফিরে খুব একা লাগে।তাই বেশিরভাগ সময় হসপিটলে ডিউটি করে কাটিয়ে দিই। আজ পর্যন্ত কোনো ছেলেকে আর নিজের মনের ঘরে বসাতে পারিনি। কিন্তু একবছর পর হঠাৎ কি হল আমার?
সেদিন আমার ছুটি ছিল।অনেক দিন পর ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুক টা অন করলাম। ফেসবুকে ঘুরতে ঘুরতে ছেলেটির খোঁজ পেলাম। স্বর্নাভ পাত্র।প্রোফাইল পিকচারে ওর চোখের দিকে তাকাতেই চমকে উঠি আমি। কি অদ্ভুত মায়া জড়ানো চোখ।টাইম লাইনে ওর কয়েকটা লেখা পড়েই আমার পরিচয় করতে ইচ্ছে হয়।ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাই। সন্ধ্যার সময় স্বর্নাভ আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে। আমি মেসেজ টাইপ করি,
-"হাই!"
-"হ্যালো!"ওপার থেকে উত্তর আসে।
-"তোমার টাইমলাইনের লেখা গুলো খুব ভাল। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।"
স্বর্নাভ রিপ্লাই করে,-"সত্যিইইই! থ্যাঙ্ক ইউ! থ্যাঙ্ক ইউ।"
-"ওয়েল কাম" আমি লিখি,সাথে একটা স্মাইলি পাঠিয়ে দিই।
-"এই,তুমি কোথায় থাকো?"
-"কলকাতা। তুমি?"
কিছুসময় পর স্বর্নাভর মেসেজ আসে।-"দক্ষিন চব্বিশ পরগনা।"
-"ওহ! এবার থেকে তোমার লেখায় আমাকে ট্যাগ করবে।আমি পড়তে চাই।"
-"হে হে হে।করবো।" ওর হাসি মুখ টা যেন আমি দেখতে পাই।অনুভব করতে পারি।
বেশিরভাগ দিন রাতে ঘুম আসে না।তাই প্রায় নাইট শিফটে ডিউটি করি আমি।আজও নাইট ডিউটি আছে আমার।রাতে ইমার্জেন্সী না হলে তেমন কাজ থাকে না। ওয়ার্ডে একবার পাক মেরে নির্জনে একটা চেয়ারে বসে পড়ি।দু'জন ডাক্তার আর কয়েকজন নার্স রুমে বসে গল্প করছে।ফোন টা বের করে ফেসবুকে অন হই। কিসের টানে আমি আবার ফেসবুকে অন হচ্ছি?
কিছুসময় পর স্বর্নাভ কে অনলাইনে পাই।আমি সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ টাইপ করি।-"কি করছো?"
-"এই বসে আছি।তুমি?"
-"আমিও বসে আছি।এই তুমি আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছো না তো?"
-"না...না। বিরক্ত হতে আমার ভালোই লাগে।"
আমার মনে হয়,স্বর্নাভ কথাটা বলে হাসে।
চমকে উঠি আমি।এ কি করে সম্ভব হতে পারে! আমার মনে হল,কথাটা স্বর্নাভ নয়,ঋষি বলল।
আমি টাইপ করি।-"তোমার মতো আরেকজনকে আমি সারক্ষন জ্বালাতাম।"
-"কে? তোমার বয়ফ্রেন্ড নিশ্চয়!"
-"হুম।"
-"তবে এখন,আর করো না কেন ?"
আমি কিছুক্ষন চুপ থেকে,টাইপ করি,-"ও আর নেই।"
তারপর ঋষির আর আমার গল্প করি ওর সাথে। অনেক রাত ধরে।আমার কষ্ট হয় না।আমার জীবনের গল্প স্বর্নাভ কে করতে খুব ইচ্ছে করে।
স্বর্নাভ লেখে,-"মন খারাপ করো না,উর্মি।ওটা তোমার ভাগ্যে ছিল।"
-"না,মন খারাপ করি না। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে কারও সাথে আর কথা বলি না। অনেকদিন পর তোমার সাথে এত গল্প করলাম।"
-"তাই নাকি! বেশ করেছো।আজ থেকে আর মন খারাপ করে থাকবে না।গল্প করবে।কি,মনে থাকবে,তো?"
আমার মজা করে 'না' লিখতে ইচ্ছে করে।কিন্তু পারি না। রাত দু'টোর সময় আমাদের গল্প শেষ হয়। আমার খুব ভালো লাগছে।স্বর্নাভর এনে দেওয়া ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে,যেন এত দিনের মরে যাওয়া গাছে নতুন কচি কচি পাতা জন্মাতে শুরু করছে।

পরদিন সকাল হয়।নতুন সকাল। কারখানার চিমনি দিয়ে বেরোনো ধোঁয়ার মতো সাদা সাদা মেঘ আকাশে।জানালা দিয়ে সেটা দেখতে পাই আমি। স্বর্নাভর কথা মনে পড়ে। সারাদিন ফেসবুক খুলে অপেক্ষা করি।ও আসে না। আমার মন খারাপ লাগে।কেন লাগছে আমার মন খারাপ?
সন্ধ্যার দিকে স্বর্নাভ কে পাই।আমার মনের ভেতর খুশির ঝিলিক উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ টাইপ করি।-"কোথায় ছিলে তুমি?
আমি সারাদিন তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।"
স্বর্নাভ হাসে।-"তাই! আমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে তোমার?"
আমার লিখতে ইচ্ছে করে,তোমার সাথে কথা বলতে খুব খুব ইচ্ছে করে।কিন্তু ইচ্ছে করে লিখি না। একটা স্মাইলি পাঠিয়ে দিই।স্বর্নাভ কি বুঝতে পেরেছে,যে আমার ও কে ভাল লেগেছে। আমি জানি,ও পেরেছে।
-"তুমি কেমন আছ?মন খারাপ নেই তো?" স্বর্নাভর মেসেজ পাই।
-"ভাল।না মন খারাপ নেই।তুমি কেমন আছো?"
-"আমার চলে যাচ্ছে।আচ্ছা,তুমি কি করো?"
-"আমি ডাক্তার।কলকাতার এক হসপিটলে কাজ করি।"
-"ও বাব্বা! তাই নাকি? তাহলে আমি পেসেন্ট। চিকিৎসা করবে তো? তবে তোমার ফী দিতে পারবো না কিন্তু।"
আমার খুব হাসি পায়।স্বর্নাভ আমাকে প্রতি কথায় হাসায়।ঠিক ঋষির মতো।এক বছর পর যেন আবার ঋষি কে ফিরে পেয়েছি নতুন করে।

বেশ কিছু দিন কেটে যায়।স্বর্নাভ র থেকে ফোন নাম্বার নিই।প্রায় ফোনে কথা বলি আমরা।ও ফোনে কথা বলতে পারে বেশি। স্বর্নাভ বলে,-"ওর মনের কথা মুখের থেকে হাতের টাইপের মাধ্যমে বেশি বের হয়।"
আমার হাসি পায়।বলি,-"তুমি, একটা পাগল।এই জন্যে তোমার লেখা ভাল।"
স্বর্নাভ শুধু হাসে।বাচ্চাদের মতো। কিছু বলে না।
একদিন ডিউটি থেকে ফিরে স্বর্নাভ কে ফোন করি।ও ফোন রিসিভ করে।-"হ্যালো! উর্মি, কি করছো?"
ওর মুখে আমার নামটা শুনতে খুব ভালো লাগে।মনে হয় যেন,এক বছর আগের ঋষি ডাকছে আমাকে। -"আরেক বার বলবে,আমার নামটা?"
-"এ বাব্বা! কেন?
-"তোমার মুখে শুনতে ভালো লাগছে তাই।" কথাটা আমি বলেই ফেললাম।
-"পাগলি মেয়ে একটা! কি করছো বলো?"
-"এই ফিরলাম ডিউটি থেকে।"
-"আর এসেই আমাকে ফোন! একটু রেস্ট নাও।"
-"তোমার সাথে কথা বলাটাই আমার রেস্ট।"
-"না,কষ্ট করে এসেছো।এখন নয়, পরে কথা হবে।"
আমি হাসি।কিরকম বাচ্চা বাচ্চা কথা বলে স্বর্নাভ।
-"এই,শোনো না, এক সপ্তাহ কথা হবে না আমাদের। কয়েকটা পরীক্ষা আছে আমার।"
-"কেন? না,এরকম করো না। প্লীজ! প্লীজ।একটু খানি করে কথা বলবে।" স্বর্নাভ জোর করে।
আমি শাসনের সুরে বলি,"-প্লীজ! জোর করো না।"
-"না আমি শুনবো না।তোমাকে কথা বলতেই হবে।প্লীজ! উর্মি।" স্বর্নাভ গোঁ ধরে বসে।
পাগল ছেলেদের আবদার ফেলা যায় না।আমিও ফেলতে পারি না। না,ওর আবদার আমার ফেলতে ইচ্ছে হয় না?জানিনা কিছু আমি।
একটু হেসে বলি,-"আচ্ছা একটু খানি করে বলবো স্বর্নাভ বাবু।এবার খুশি তো?"
-"হুম।খুব খুশি।"
ওর খুশিতে যেন আমার মন তৃপ্তি হয়।মনে মনে হাসি। একমাস কেটে যায়।ফুলের সৌরভে যেমন ভ্রমর ছুটে আসে,তেমনি আমিও স্বর্নাভর কথার টানে ছুটে ছুটে যাই। কিন্তু এটা আমি কি করছি? না,এটা ঠিক নয়।আমি প্রতিটা মুহর্তে ঋষি কে খুঁজে পাই স্বর্নাভর মধ্যে।ওর পাগলামো, বাচ্চাদের মতো করা আবদার সব কিছু যেন ঋষির মতো। ঋষির মতোই সব সময় আমার খেয়াল রাখে।ওর সাথে একটু খানি কথা বললে, আমার মন টা ভালো হয়ে যায়।....ঋষি আবার ফিরে এসেছে আমার কাছে।আমি আবার
প্রেমে পড়ি।
স্বর্নাভর মধ্যে খুঁজে পাওয়া ঋষি কে ভালো বেসে ফেলি। সেদিন বৃষ্টি নামে।আমার বৃষ্টি ভিজতে ইচ্ছে করে। জানালা দিয়ে হাত টা বাইরে বাড়িয়ে দিই।অনেক দিন পর আমার সারা শরীরে শিহরন জাগে।প্রমের শিহরন। ফোনটা তুলে নিয়ে স্বর্নাভর নাম্বার ডায়েল করি। স্বর্নাভ ফোন তোলে।পাগলের মতো বলেও দিই,-"স্বর্নাভ, আই লাভ ইউ।"
আমার কথা শুনে স্বর্নাভ হাসে।আমি আবার বলি,-"হেসো না, সিরিয়াসলি,আই লাভ ইউ।"
স্বর্নাভ তবুও হাসে।কিছু বলে না। আমি বুঝতে পারি,স্বর্নাভ ও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে। শুধু বলতে,লজ্জা পাচ্ছে।এটা আমার বেশ ভালো লাগে। কিন্তু আমি কি সত্যিই স্বর্নাভ কে ভালোবাসি?
এর উত্তর, না।আমি স্বর্নাভ কে ভালোবাসি না। কিন্তু যেদিন এটা ও জানতে পারবে,সেদিন খুব কষ্ট পাবে।আমাকে আর ভালোবাসবে না। আমার সাথে কথা বলবে না। তবুও সত্যি টা ও কে বলতেই হবে। তাই,একদিন স্বর্নাভ কে ফোন করে দেখা করার কথা বলি।আর আজ সেই দিন।


(৩)

স্বর্নাভ আমার সামনে সেই একই ভাবে বসে আছে।কফি শপের ভেতরে এবার ভিড় বাড়ছে ধীরে ধীরে।আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলি,"এখানে আর ভালো লাগছে না,চলো আমার ফ্লাটে যাই।তোমাকে কিছু কথা জানানোর ছিল।"
বিল মিটিয়ে দিয়ে আমরা দু'জন রাস্তায় বের হই। সন্ধ্যার ব্যস্ত রাস্তা। ল্যামপোস্টের ঝিমোনো আলোয় ফুটপাত ধরে হাঁটি আমরা।তারপর একটা ট্যাক্সি ধরি।পনেরো মিনিট পর আমার ফ্লাটের সামনে গিয়ে থামে ট্যাক্সি।আমি ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে, ওর হাত ধরি।স্বর্নাভ আমার চোখের দিকে তাকায়।কুড়ি তলা বিল্ডিং টার ফিফথ ফ্লোরে আমার ঘর।লিফটে করে উপরে উঠি।আমার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াই।ব্যাগ থেকে চাবিটা বের দরজা খুলি।স্বর্নাভ আমার ঘরে ঢোকে।ঋষি চলে যাওয়ার পর আজ প্রথম কোনো ছেলে আমার ঘরে ঢুকেছে।ঘরে ঢুকেই আলো ফ্যান লাইট জ্বলে দিই।দক্ষিনের দিকের জানালাটা খুলে দিই।একটা ঠান্ডা দমকা হাওয়া এসে আমার মুখে লাগে। আমি স্বর্নাভ কে সোফায় বসিয়ে বাথরুমে গিয়ে ঢুকি। ফ্রেশ হয়ে নিই।
পাঁচ মিনিট পর ওর কাছে এসে বলি,-"আরেকটু কফি করে আনবো?"
স্বর্নাভ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে।তার মানে ও রাজী।দশ মিনিট পর দু'টো কফি মগ নিয়ে ফিরে এসে দেখি,ও ঋষির ফোটোর দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে।আমার আগমনে, সেদিক থেকে চোখ ফেরায়।কফি মগ দু'টো নিয়ে ওর পাশে সোফায় বসে পড়ি।কি ভাবে যে বলবো কথাটা! কফিতে একটা চুমুক মেরে স্বর্নাভ কথা শুরু করো,-"তুমি কি বলবে, বলছিলে উর্মি!"
সরাসরি প্রসঙ্গে ঢুকে যাই।-"আমি তোমাকে ভালবাসি নি স্বর্নাভ।তোমার মধ্যে আমি প্রতিটা মুহর্তে ঋষি কে খুঁজে পাই।তাই....।"
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই স্বর্নাভ হেসে ওঠে।-"ও এই কথা! কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি উর্মি।"
আমি অবাক হই।-"কিভাবে স্বর্নাভ? আমি কোনোদিন ঋষি কে ভুলতে পারবো না।যেখানেই থাকি না কেন, ওর ছবি আমার সাথে থাকবে। ঋষির সাথে আমার চারবছরের সম্পর্ক। শারিরীক সম্পর্ক ও হয়েছিল।আর কোনো ছেলেই চায় না,তার প্রেমিকার আগের থেকে শারিরীক সম্পর্ক থাকুক,আর পুরানো প্রেমিকের ছবি কাছে নিয়ে রাখুক।"
আমার চোখে জল আসে।আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, সত্যি কথা গুলো বলতে।স্বর্নাভ আমার হাত ধরে। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,-"বোকা মেয়ে একটা! আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি উর্মি।আমি শুধু তোমার কাছে থাকতে চাই।একটু হেসে কথা বলবে আমার সাথে,বিরক্ত করবে, তাহলে আর কিছু চাইবো না।....কি হল,একটু থাকতে দেবে না?"
আমার খুব রাগ হয়।মনে হয়,স্বর্নাভ কে চড়,কিল মারি।এরকম পাগলের মতো কেউ বলতে পারে! সতিই ও একটা পাগল।ভালোবাসার পাগল। কাছে টেনে নিয়ে আমার বুকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরি ও কে।-"তুমি এত ভালো কেন, স্বর্নাভ?এত ভালো কেন?আমার এবার তোমাকেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে খুব।"
স্বর্নাভ ওর একটা হাত আমার পিঠের উপর রাখে।আমার চোখ দিয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছে ওর জামার উপর। দু'জনই নিশ্চুপ।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.