হাসি~ ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]



(১)

আমি মেয়েটির পিছু নিলাম। সেই প্লার্টফর্ম থেকে। স্টেশন থেকে নেমে,বড় রাস্তা ছেড়ে,এখন একটা ফাঁকা গলি দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটি।মেয়েটির বাড়ি কোথায় আমি জানি না।পরনে একটা জিনস,আর উপরি ভাগে গাঢ় নীল রঙের টি-শার্ট। বুকের কাছে,নীল শার্টের উপর একটা সাদা রঙের ছোটো ড্রেস।এ ড্রেসের নাম আমার জানা নেই। মেয়েটি হালকা গতিতে হেঁটে যাচ্ছে। ভারী সুন্দর লাগছে আমার।তার থেকে হাত পনেরো দুরে আমি হেঁটে চলেছি।হাতের ঘড়ির দিকে তাকাই। পৌনে দশটা বাজে।গলির দু'পাশের বাড়ি গুলো থেকে টি.ভি.র আওয়াজ আসছে।কয়েকটা কুকুর ছাড়া আর কেউ নেই গলির মধ্যে।
কিছুক্ষন আগে মেয়েটি প্লার্টফর্মে ছিল।একটি ছেলের সঙ্গে বেশ,ঘনিষ্ট হয়ে কথা বলছিল।হেসে গড়িয়ে পড়ছিল ছেলেটির উপর। ছেলেটি, সম্ভবত মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড হবে। আমি ওদের পাশেই দাঁড়িয়ে, মেয়েটির হাসি দেখছিলাম।বার বার আমার চোখ চলে যাচ্ছিল মেয়েটির মুখের দিকে।কি মিষ্টি হাসি! এমনিতেই মেয়েদের মুখের হাসি, আমার সব থেকে ভালো লাগে।মনে হয়, এর মতো সুন্দর জিনিষ আর পৃথিবীতে নেই। সারাদিন তাকিয়ে থাকি মেয়েদের মুখের দিকে। তারপর ট্রেন আসতেই,ছেলেটি ট্রেনে উঠে যায়। মেয়েটি হেসে হাত নাড়তে থাকে,যতক্ষন না ছেলেটি চোখের সামনে থেকে আড়াল হয়।

তারপর সে স্টেশন থেকে নেমে,বড় রাস্তা ছেড়ে, গলির ভেতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করে।আর আমিও সাথে সাথে মেয়েটির পিছু নিলাম।
এই মুহুর্তে মেয়েটি ডান দিকের গলি ধরেছে।এ গলি টা আরও নির্জন। একটা কুকুর পর্যন্ত নেই। আমি হাঁটার গতি বাড়ালাম।মেয়েটির হাসি বার বার মনে পড়ছে আমার।একটা অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরী হচ্ছে আমার মধ্যে।আর সেই সাথে একটা অসহ্য যন্ত্রনা যেন,সাপের ফণার মতো মাথা তুলে ধরেছে আমার মাথার ভেতর। এত ভাললাগা আমার সহ্য হয় না।উফ! অসহ্য! আর সহ্য করতে পারছি না।অস্বস্তি শুরু হয়েছে সারা শরীরে।খুব সন্তর্পণে হাঁটছি আমি।মেয়েটি কিছুই টের পাচ্ছে না।আমি মেয়েটির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। প্রায় ঘাড়ের কাছে গিয়ে বলি,-"এই যে,একটু শুনবেন!"
মেয়েটি চমকে উঠে ঘাড় ঘোরায়। ভূত দেখার মতো,আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
-"বলুন!" মেয়েটি ভয়ে ভয়ে বলে।
-"আপনার হাসি টা খুব সুন্দর!"
মেয়েটি অবাক হয়ে যায়।ভয়ার্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার ভেতরে একটা যুদ্ধ শুরু হয়েছে।ভালোলাগা আর যন্ত্রনা মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।আর দেরী না করাই ভালো। পকেট থেকে আমার স্প্রিং ছুরি টা বের করলাম। হাতের কাছে সুইচ টা টিপতেই, ছিটকে বেরুলো ছুরির চকচকে ফলা টা।এক মুহুর্তে ঝাঁপিয়ে পড়লাম মেয়েটির উপর।চিৎকার করার আগেই ছুরি দিয়ে একটান মারলাম গলার উপর। নলি কেটে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়। লাল রক্ত।মেয়েটি গলির রাস্তায় উপর পড়ে,কিছুক্ষন ছটফট করে।তারপর নিস্তেজ হয়ে যায়। কি বীভৎস দৃশ্য! আমি তাকিয়ে থাকতে পারছি না।ছুরি টা মুড়ে,পকেটে ঢুকিয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকি আমার বাড়ির দিকে।

(২)
গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকি।আমার বাড়ি টি পাঁচিল ঘেরা। সাদা রঙের একতলা বিল্ডিং।সামনে এক ফালি জায়গার উপর ফুলের বাগান আছে। নিজের হাতেই তৈরী করা।এ বাড়িতে কেউ ঢোকে না। আমিও বাড়ির বাইরে খুব একটা বেরোই না। বিকেল হলে ছাদের উপর একটু বসি।আর মাঝে মাঝে সন্ধ্যাবেলা ঘুরতে ইচ্ছে হলে তবে বের হই। চাবি দিয়ে দরজার তালা খুলি। অন্ধকারে আলোর সুইচ হাতড়াই। পেয়ে যাই।সারা ঘরে আলো জ্বলে ওঠে।বাথরুমে ঢুকে পকেট থেকে রক্তমাখা ছুরি টা বের করি।জল দিয়ে ধুতে থাকি রক্ত।বেসিনের ভেতর জল লাল হয়ে যায়।চকচকে ছুরির উপরে আস্তে করে হাত বোলাই।যখনই আমি বাড়ির বাইরে যাই,ছুরিটা আমার পকেটে থাকে। কাছ ছাড়া করি না। আমার খুন করার ধরনটাই আলাদা।
আমি ছুরি দিয়ে একটাই টান মারি গলায়। ধারালো ছুরির আঘাতে নলি কেটে যায়। তারপর গলগল করে রক্ত বের হয়। আমাকে কি দেখে,আপনাদের প্রথম খুন করলাম বলে মনে হচ্ছে? এর আগেও আমি দু'টো মেয়েকে খুন করেছি একই ভাবে।
......সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার মোড়ের দোকানের কাছে দাঁড়াই।এক প্যাকেট সিগারেট কিনি। লাইটার জ্বালিয়ে একটা সিগারেট বের করে ধরাই। রিং এর মতো করে ধোঁয়া ছাড়ি। তারপর মেয়ে দু'টো কে দেখি। ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।মেয়ে দু'টো কে আমি আগেও দেখেছি।আমাদের পাড়ায় থাকে।
হো হো হো করে হাসির আওয়াজ আসছে আমার কানে। রাতের নিয়ন আলোয়,ওদের মুখ দু'টো মোমের মনে হচ্ছে।যেন দু'জন মোমের পুতুল।একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি আমি। মেয়েদের, হাসলে এত সুন্দর দেখায় কেন?
কিছুসময় পর মেয়ে দু'টি পরষ্পর হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে।হেসে হেসে গল্প করে। এক অদ্ভুত ভালোলাগায় আমিও তাদের পিছু নিই।নির্জন রাস্তা। শশ্মানপুরীর মতো নিস্তব্দ। রাস্তার মাঝে এক জায়গায় মেয়ে দু'টি এসে থামে। পরষ্পর কে জড়িয়ে ধরে।ঠোঁটের, ভেতর ঠোঁট দেয়।এক মিনিট পর আমি তাদের পাশে এসে দাঁড়াই।
মেয়ে দু'টি ছিটকে সরে দাঁড়ায়। আমাকে অবাক হয়ে দেখে।
-"একটু হাসবে তোমরা?"আমি বলি।
ওরা হাসে না।চুপ করে থাকে।
ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে ওদের হাসি মুখ টা বার বার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অসহ্য ভালোলাগা!আর সহ্য করতে পারছি না। চকিতে পকেট থেকে ছুরি বের করে মেয়ে দু'টির গলায় চালিয়ে দিই।কাঁপতে কাঁপতে শরীর দু'টো লুটিয়ে পড়ে রাস্তার উপর।কালো পিচ রাস্তা রক্তে ভিজে যায়।আমি ঝুঁকে পড়ি মেয়ে দু'টির বুকের উপর।বুক টা এখনো ধক ধক করছে।হাত দিয়ে থুতনি টা ধরে নাড়ি।একটু একটু করে নিস্তেজ হয়ে আসে শরীর দু'টো। এটাই হল আমার প্রথম খুন।

(৩)
বেশ কয়েকদিন ঘর থেকে বের হই নি।রাস্তা দিয়ে সবজিওয়লা, মাছওয়ালা ভ্যান নিয়ে যায়। হাঁক দিয়ে ডাকে।আমি তাদের থেকে কিছু একটা কিনে নেই। তারপর নিজে নিজে রান্না করি।
আজ শরীর টা বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে।বিকেল বেলা ঘুরতে বেরোই। হসপিটল মোড়ের কাছে একটা বন্ধুর বাড়ি যাই।আমার বন্ধু চা খাওয়ায়। সঙ্গে বিস্কুট।সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে গল্প করি।মন টা হালকা হয়।তারপর বন্ধুর বাড়ি থেকে বের হই। সোজা রাস্তা ধরে স্টেশন পর্যন্ত হাঁটি। কিছুক্ষন স্টেশন চত্বরে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াই।
রাত পৌনে দশটা বাজে।হোটেল থেকে চারটে রুটি আর চানা মশলা প্যাকেট করে নিয়ে বাড়ির পথ ধরি। আকাশে কুমড়ো ফালির মতো চাঁদ। হাঁটতে থাকি একা একা।পাশ দিয়ে কয়েকটা মোটর বাইক হুস হুস শব্দে চলে যায়।একটা কুকুর পিছু নেয় আমার।প্যাকেট খুলে একটা রুটি ছুড়ে দিই কুকুরটির দিকে।কুঁই,কুঁই শব্দে কুকুরটি খেতে থাকে।আমি দাঁড়িয়ে না থেকে চলতে শুরু করি।
গেটের কাছে এসে গাড়িটিকে দেখতে পাই।এই গাড়িটিকে আমি চিনি।আমার পাশের বাড়ির অনিতা বৌদির অফিসের বসের গাড়ি। অনিতা বৌদি সুন্দরী।তার হাসি টিও আরও সুন্দর।ভরাট শরীরে,পুর্ন যৌবন পোষাকের উপর দিয়েও চোখে পড়ে।একটা অ্যাক্সিডেন্টর পর সুমন দার প্যারালাইসিস হয়।তারপর থেকে অফিসের কাজ বৌদিই সামলায়।শুনেছি,অফিসের বসের সাথে তার ফষ্টিনষ্টি আছে।ছুটির দিনে বিকালে ছাদে উঠে,যখন ফোনে হেসে হেসে কথা বলে, তখন আমি মুগ্ধ হয়ে বৌদির দিকে তাকিয়ে থাকি।আহা! মন টা জুড়িয়ে যায় আমার।আজও বৌদিকে গাড়ির ভেতর দেখতে পাই।আমি গেট না খুলে,দাঁড়িয়ে দেখি।গাড়ির ভেতর থেকে বৌদির হাসি মুখ টা চোখে পড়ছে।কিছু কথা কানে আসে। হাসতে হাসতে বৌদি বলছে,-"কি দুষ্ট তুমি!"
তারপর দু'জনে চুমু খায়।গাড়ির দরজা খুলে বৌদি বাইরে বের হয়। দরজা ভেজিয়ে দেয়। বৌদি হেসে হাত নাড়ায়।গাড়ি টি হুস করে চলে যায় আমার সামনে দিয়ে।অদ্ভুত একটা ভালোলাগা তৈরী হচ্ছে আমার মধ্যে।মাথাটা গুলিয়ে উঠছে।
-"একটু শুনবেন!" আমি বৌদির দিকে তাকিয়ে বলি।
এতক্ষনে বৌদি আমাকে দেখতে পায়।কয়েক পা এগিয়ে আমার কাছে আসে।
-"কি?"
-"আপনার হাসিটা খুব সুন্দর।"
বৌদি আবার হাসে।-"তাই বুঝি! সবাই তাই বলে।"
আমি আর সহ্য করতে পারি না।পকেট ছুরিটা বের করেই খ্যাঁচ।আ! করে একটা শব্দ করার চেষ্টা করে।কিন্তু সম্পূর্ন মুখ দিয়ে বের হয় না। রাস্তার উপর লুটিয়ে পড়ে ভারন্ত শরীর টি।
 গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকি আমি। সুইচ টিপে আলো জ্বালাই।সোজা বাথরুমে গিয়ে ঢুকি। কিছুক্ষন নিজেকে আয়নায় দেখি।বিন্দু বিন্দু ঘাম কপালে।তারপর চোখে মুখে জল দিয়ে, আমার বেড রুমে আসি। আমার বেডরুম টা এলোমেলো, অগোছালো।মাঝখানে একটা বড় শোবার খাট।তার উপর এলিয়ে পড়ি।শরীর অবসন্ন,ক্লান্তি নামে দু'চোখে।
.....হি হি হি হি হি
-"তুই,এমন করে হাসবি না, আমার কিরকম একটা হয়।"
-"কি হয়! "
-"বুঝতে পারি না।তবে খুব ভালো লাগে।মনে হয়, সারক্ষন তোকে সামনে বসিয়ে তোর হাসি মুখ দেখি।"
-"ধুর!"
-"হাসলে,তোকে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর লাগে।এই গাড়িতে বসে দুপাশের দার্জিলিং এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য,বরফের আস্তরন,মেঘের দেশ,তোর হাসির কাছেও ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে....।"
-"বাজে বকবি না একদম।"
পাহাড়ি রাস্তায় গাড়িটা বাঁদিকে মোড় ঘুরতেই, সামনে আরেকটা গাড়ি এসে পড়ে।ড্রাইভার নিয়ন্ত্রন হারিয়ে পাশের বড় পাথরের গায়ে ধাক্কা মারে।গাড়িটা রাস্তার উপর দু'বার পাল্টি খায়। আমি গাড়ি থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাই রাস্তার উপরে। মাথা ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। পাশেই গভীর খাত।এক মুহুর্তের মধ্যে গাড়িটা হারিয়ে যায় অতল খাতে।-"নন্দিনী..ই..ই..ই..ই!"

লাফিয়ে উঠে বসি খাটের উপরে।কপালে ঘাম জমেছে।চোখে ঝাপসা দেখি।হাত দিয়ে চোখের কোনে জলের আস্তরন পাই।আমার হাত -পা কাঁপছে।বড় বড় করে নিশ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে। ঘরের ভেতর টিউব লাইটের আলো ছড়িয়ে আছে। ঘড়ির দিকে তাকাই।কখন যেন,রাত এক'টা বেজে গেছে।টেবিলের উপর থেকে জলের বোতল টা নিয়ে কয়েক ঢোক জল খাই। আবার ঘুমিয়ে পড়ি।
(৪)
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই আমি থানায় যাই। পুলিশ কে ডেকে নিয়ে আসি।বাড়ির সামনে গেটের কাছে এসে লোকজনের ভিড় দেখতে পাই। লোকাল ওর্য়াড কাউন্সিলার ও এসে হাজির হয়েছে।সেই সাথে তার চ্যালা-চামুণ্ডা।
এই লম্বা পুলিশ টি কে আমি চিনি। থানার ইন্সপেক্টর। রামমোহন পল্লীর তৃতীয় নম্বর দোতলা বাড়িটি ওনার। চোখের চশমা খুলে আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করেন,-"কাল রাতে কোনো আওয়াজ বা চিৎকার পান নি?"
-" না।আসলে কাল রাতে একটু ড্রিঙ্ক করে তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।ঘুম টিও ভাল হল রাতে।" আমি শান্তভাবে জবাই দিই।
-"ওহ! আপনার বাড়ির গেটের সামনে,এরকম একটা ঘটনা ঘটে গেল,আর আপনি টের পেলেন না!"
-"টের পাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না।নইলে অবশ্যই টের পেতাম।" আমি মুচকি হাসি।
চোখে চশমা লাগিয়ে পুলিশ টি বলে, -"ও.কে.। লাশ সম্বন্ধিত কোনো কিছু পেলে আমাকে জানাবেন।"
আমি মাথা উপর-নীচ করি।লোকাল কাউন্সিলার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে।-"কি করছেন আপনারা?গত পনেরো দিনে চার চারটে খুন হয়ে গেল।আর আপনারা তার কোনো কুল- কিনারা পাচ্ছেন না!"
-"আমারা সাধ্য মত চেষ্টা করছি।" পুলিশ টি বলে।
তারপর একটা মোটা মত পুলিশ এগিয়ে আসে।চশমা পরা পুলিশ টি কে বলে,-"একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছেন স্যার,যে চারজন খুন হয়েছে,তারা কিন্তু সব মেয়ে।আর প্রত্যেকের গলার নলি কেটে একই ভাবে খুন করা হয়েছে। আমার মনে হয়,খুনি একজনই।"
চশমা পরা পুলিশ টি লাশের দিকে তাকায়।-"স্ট্রেঞ্জ! ঠিক বলেছো।"
তারপর লাশ টি কে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায় থানার দিকে।আমিও ঘরে এসে ঢুকি।

বিকেল বেলা গেট দিয়ে বেরোতে গিয়ে চোখ পড়ে পাশে ছোটো ঝোপের আড়ালে।একটা ব্যাগ দেখতে পাই। গতকাল রাতেই ব্যাগটি অনিতা বৌদির কাঁধে ছিল। হয়তো খুনের সময় ছিটকে এসে এখানে পড়েছে।আমি চেন টেনে ব্যাগটা খুলি।কিছু কাগজপত্র,সাজগোজের জিনিষ দেখতে পাই।আর একটা ছোটো চেনের ভেতর একটা ম্যানফোর্সের প্যাকেট ও পাঁচ'শ টাকার নোট।
ব্যাগের চেন গুলো বন্ধ করে পুলিশ ইন্সপেক্টর টির বাড়ি যাই।বিকালে থানায় ওনাকে পাব না, তাই বাড়িতে যাওয়া ঠিক মনে করি। গেটের সামনে গিয়ে সিকিউরিটি কে বলি,ইন্সপেক্টর কে ডেকে দেওয়ার জন্য।সিকিউরিটি ভেতরে চলে যায়। আবার সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে।বলে,-"ভেতরে এসে একটু দাঁড়ান।উনি আসছেন।"
পাঁচ মিনিট পর পুলিশ টি আসে। আমাকে দেখে চিনতে পারে।-"কি ব্যাপার! কিছু পেলেন?"
আমি ব্যাগটা ওনার হাতে দিই।বলি,-"ঝোপের আড়ালে পড়ে ছিল।"
ব্যাগটা ভালো করে নেড়ে চেড়ে দেখে পুলিশ টি। হঠাৎ একটা মহিলা এসে পাশে দাঁড়ায়।মহিলার বয়েস বেশি নয়।সদ্য যুবতী।তাই মেয়ে বলাই ভালো।মাথায় সিঁদুর। সম্ভবত ইন্সপেক্টরের বউ হবে।-"এই আজ কিন্তু এই ড্রেস টি পরে বেরোবো।"
মেয়েটি টি পুলিশ কে লক্ষ্য করে বলে।হাসতে থাকে। সাদা সাদা দাঁত গুলো দেখা যায়।
-"আচ্ছা! ঠিক আছে। তুমি ভেতরে গিয়ে রেডি হয়ে নাও।" পুলিশ টি ব্যাগ দেখতে দেখতে বলে।
মেয়েটি,পুলিশটির হাত ধরে টানে-"এই শোনো না,আজ সন্ধ্যায় যেন তোমার কোনো কাজ না থাকে!" মেয়েটি এবার মুখ বন্ধ করে হাসে।
আমি মেয়েটির থেকে চার হাত দুরে। কি সুন্দর দেখাচ্ছে মুখ টা! পুলিশ টি তখন ব্যাগের ভেতরে মগ্ন।আমি এক ভাবে তাকিয়ে মেয়েটির দিকে।
অপুর্ব সে হাসি! আমার মধ্যে আবার একটা ভালো লাগা তৈরী হচ্ছে।আর সেই সাথে এক অসহ্য যন্ত্রনা, সাপের মতো ফণা তুলছে। সারা শরীরে একটা অস্বস্তি।আমি আর সহ্য করতে পারছি না।পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ছুরি টি বের করে আনি।সুইচ টিপি।ছিটকে বের হয় চকচকে ফলাটা।এগিয়ে যায় মেয়েটির দিকে।সে আমার দিকে তাকায়।
-"আপনার হাসি টা খুব সুন্দর!" আমি বলি।
তারপর চোখের নিমেষে চকচকে ছুরি দিয়ে মেয়েটির গলায় এক টান দিই।রক্ত ছিটকে এসে আমার মুখে লাগে। উফ! কি বীভৎস দৃশ্য! পুলিশ টি ব্যাগ ফেলে ঝাপটে ধরে মেয়েটি কে। আমি পালাবার চেষ্টা করি না।হাতের ছুরি টা ফেলে দিই। সিকিউরিটি ছুটে আসে।দু'হাতে জড়িয়ে ধরে আমাকে মাটিতে ফেলে।মাথা টা জোরে চেপে ধরে মাটির সাথে।কোনো বাঁধা দিই না। নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টাও করিনা।
আমাকে ধরা দিতেই হবে।আমার মাথা ঘুরে আসে। চোখের সামনে সবকিছু বনবন করে ঘুরতে থাকে। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলি আমি।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

তিস্তা রায়ের ছোটোগল্প 'মন তার খেয়ালিনী' পড়তে লেখাটির উপর ক্লিক করুন

No comments

Powered by Blogger.