|| চশমা || ছোটগল্প ||~ স্বদেশ কুমার গায়েন

                  

(১)

সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরেই দরজা টা আস্তে,আস্তে বন্ধ করে দিল আবির। মন টা যেন আনান্দে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।দু'হাত দিয়ে প্রথমে আলতো করে চেপে ধরল।ঝটপট বার কয়েক চুমু খেল।মুখের লালায় ভিজে উঠেছে।তারপর বুকের উপর চেপে ধরে রাখলো কিছুক্ষন। অপর পক্ষ নির্বাক হয়ে আছে........।


–"তোর মুখটা খুব সুন্দর।" আবির আদুরে মুখ করে বলল।
সামনে লাল–হলুদ মাখা আকাশ। আর সেই লাল–হলুদের মাঝে মাঝে কেউ যেন সাদা রঙের তুলি টেনে দিয়েছে।দূরে মাঠের মাঝে একটা শিরিষ গাছ বোকার মতো একলা দাঁড়িয়ে আছে।তার ঠিক মাথার উপর পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্য টার গোমড়া মুখো ভাব। মনমরা। পিছনের ধুলো মাখা পিচ রাস্তার উপর দিয়ে ব্যাস্ত গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। আবিরের কথায়,সেই মনমরা সূর্যের দিক থেকে চোখ সরালো সুমি। ভালো নাম সুমিতা।কেমন পুরানো মডেলের নাম।তাই বন্ধু–বান্ধব সবাই সুমি বলে ডাকে। পাতলা, হালকা ফর্সা চেহারা।মাঝারি উচ্চতা, টানা টানা চোখ গুলোর উপর সরু সুতোর মতো ভুরু।কালো ঘন চুল গুলো পিটের মাঝ বরাবর ঢেউ খেলেছে।চোখের উপর থেকে বট গাছের ঝুরি পাকানোর মতো চুল গুলো সরিয়ে বলল, –"ধ্যাৎ! তুই একটু থামবি।এক কথা দিনে কত বার করে বলতে হয়?তোকে আমি ভালবাসি। তাই আমার মন রাখতে এত প্রসংশা করতে হবে না।আর আমি ওতটা ভাল দেখতেও নই।"

আবির,সুমির কথা গায়ে না মেখেই বলল, –"সত্যি বলছি রে।তুই হয়তো খুব ফর্সা না,তবে তোর মুখের একটা মায়াবী ভাব আছে।আর সেই মায়ায় আমি একটু একটু করে হারিয়ে যাই।"
সুমি খিল খিল করে হেসে উঠল। ওর চুল গুলো হাওয়ায় উড়ছে।দাঁত গুলো ঝকঝক করছে।এই হাসির কাছে কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য কিছুই না।দার্জিলিং এর সবুজ ঢাকা পাহাড়,চা বাগানও রঙ হারিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে পড়ে। চোখের উপর থেকে এলোমেলো চুল গুলো কানের পাশে তুলে, সুমি বলল,–"অনেক হয়েছে।এবার একটু কাব্যি করাটা বন্ধ কর।"
–" সত্যি বলছি রে!আর চশমা টা পরলে আরও সুন্দর হয়ে ওঠে তোর মুখ টা।বর্ষায় যেমন,ময়ূর পেখম মেললে সুন্দর লাগে,ঠিক তেমন।"
–"তুই আবার,আমার চশমা নিয়ে পড়েছিস!" সুমি চোখ গুলো বড় বড় করে আবিরের দিকে তাকালো।
–"তোর চশমা টার উপর আমার খুব লোভ হয়।"
–"এ মা! কেন?" সুমি ভুরু কুঁচকে হাসলো।
–"মনে হয়,ওটা তোর চোখ থেকে খুলে নিয়ে আমার কাছে যত্ম করে রেখে দিই।"
–"কেন...ন...ন? সুমির চোখে–মুখে বিস্ময় ।
আবির মাঠ থেকে সবুজ ঘাস ছিঁড়ে মুখের কাছে এনে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে বলল–"ওটা আমার কাছে থাকলে, তোর স্পর্শ,তোর চোখ,মুখ,ঠোঁট সব খুঁজে পাই।মনে হয় তুই সব সময় আমার কাছে আছিস।"
–"তুই শুধু পাগল নোস,একে বারে বদ্ধ পাগল। চশমা টা নিয়ে নিলে আমি কি পরবো তবে?" সুমি হেসে,ঠোঁট ফোলালো।
–"আমি একটা ওরকম চশমা কিনে দেব।তুই সেটা পরবি।"
সুমি হাসলো।দখিন হাওয়ার মতো শান্ত হাসি। কিছু সময় পর হাসি থামিয়ে,দাঁড়িয়ে উঠল। আবিরের হাত ধরে টেনে বলল,–"চল,সন্ধ্যা হয়ে এল;চশমা কিনে লাভ নেই। আর আমি তোকে ওটা দেব ও না।"
সন্ধ্যা নেমেছে সবুজ ঘাসে।মাঠের মাঝে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকা শিরিষ গাছ টা কালো হয়ে এসেছে। হাত ধরে দুজন হাঁটতে লাগলো, ঘরের পথে।

খুব বেশি দিন নয়।বছর দু'য়েক আগের কথা। সুমির সাথে প্রথম দেখা, টিউসন পড়ে সমীরন দা'র ঘর থেকে বেরোনোর সময়।থার্ড ইয়ারের পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ফার্স্ট ইয়ার ব্যাচের ছেলে–মেয়েরা চলে আসতো। সপ্তাহে শুধু শনিবার দিনই করে এমন টা হত।সেই সময় ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই এক পলক দেখতে পেত সুমি কে। কয়েকবার চার চোখ একটা বিন্দুতে মিলিতও হয়েছিল। তারপর প্রথম পরিচয় হল ইচ্ছামতীর পাড়ে।কুল কুল শব্দে জলের ঢেউ, ঠান্ডা নোনা বাতাশ,দু'টো পাখির কিচির মিচির ডাক আর দু'জনের অন্তহীন দৃষ্টি নদীর বুকে। আবিরের থার্ড ইয়ার প্রায় শেষের পথে।সমীরন দা তার সমস্ত ছাত্র–ছাত্রীদের নিয়ে একটা বড় পিকনিক এর ব্যবস্থা করে ছিল উত্তর চব্বিশ পরগনার টাকি তে।টাকি তে ঘুরে দেখার যায়গা বেশি কিছু না থাকলেও,পিকনিক স্পট হিসাবে জায়গাটা দারুন। ইচ্ছামতীর পাড়,বাগান বাড়ি, তিনশো বছরের পুরানো শিব মন্দির এরকম বেশ কিছু জায়গা আছে, যেগুলো ঘুরে দেখা যায়।সেদিন ও পিকনিক থেকে পালিয়ে আবির ও সুমি ঘুরে বেড়িয়েছিল,দলছুট প্রানীর মতো। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন দু'জন কে আলাদা ভাবে খুঁজে পাওয়া গেল ইচ্ছামতীর পাড়ে, তখন খাওয়া–দাওয়া প্রায় শেষের পথে। পাশাপাশি বসে আসে দু'জন।
মিতু মেয়েটা চটপটে,ঠোঁট কাটা টাইপের। চোখে–মুখে সব সময় দুষ্টমির ছাপ।সুমির খুব কাছের বন্ধু। এক সাথে মেসে থাকে দু'জন।একই ক্লাসে পড়ে।দু'জনের কাছে গিয়ে কোনো ভূমিকা না করেই বলল,–" চল,চল অনেক প্রেম হয়েছে। এবার নিশ্চয় খিদে পেয়েছে?না,আবার অন্য কিছু খেয়ে,খিদে মরে গেছে?"
সুমি সেদিন খুব লজ্জা পেয়েছিল। তারপর দুবছর কেটে গেছে।সুমি এখন কলেজে থার্ড ইয়ার। বছর খানেক হল,আবির ছোটো খাটো একটা চাকরী করে।আজ সে সব কথা মনে পড়লে,সুমির আর লজ্জা পায় না,খুব হাসি পায়।একা একা হাসে।খুব জোরে।তারপর ফোনের ভেতর লুকিয়ে রাখা আবিরের ফোটো টা বের করে চুমু খায়।


(২)


অফিস থেকে ঘরে ফিরেই সন্ধ্যায় টি.ভি টা নিয়ে বসল আবির।টি.ভি দেখতে তার খুব ভাল লাগে, একথা তার বাড়ির কারো অজানা নয়। ভারত আর অস্ট্রেলিয়ার একদিনের ম্যাচ।পঁচিশ তম ওভারের শেষ বলটায় এসে,টেবিলের উপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল।রিং এর টিউন টা শুনতেই বুঝতে পারল,সুমি ফোন করেছে।রিসিভ করে ফোনটা কানে লাগিয়ে আবির বলল,–" হঠাৎ এখন ফোন করলি?"
–" কেন করতে পারি না? আমার ইচ্ছে হল তাই করলাম।"সুমির গলায় অভিমানী সুর।
–"আচ্ছা বাবা! ভুল হয়ে গেছে।বল এবার?"
–"মনে আছে তো?কাল তোকে অবশ্যই যেতে হবে কিন্তু আমার সাথে।"
–"হ্যাঁ রে মা! আমি ভুলিনি।কাল তোর সাথে যাব।এখন ফোন টা রেখে একটু পড়াশুনা কর।"
সুমি ফোনটা রেখে দিল।কিছুদিন আগে সুমির একটা চাকরীর পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড এসেছে। বড়িশা জনকল্যাণ বিদ্যাপীঠ ফর গার্লস,–স্কুলের টার নাম।আবির বলেছিল বেহালার কাছেই স্কুল টা। এই প্রথম চাকরীর পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে সুমি।তাই ভয় ও করছে। আর সেই ভয় কাটাতেই আবির কে দরকার। ছোটো বেলায় সবাই ভয় পেলে মা–বাবার হাত ধরে,কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই জায়গা টা এসে অন্যকেউ পূরন করে দেয়। বালিগঞ্জ থেকে,ট্রেনে মাঝেরহাট স্টেশনে নামতেই আবিরের পকেটের ফোনটা বেজে উঠল। অফিসের ফোন।
–"হ্যালো! বলুন স্যার।"
–"একটা জরুরি কাজ ছিল। আজ একটু অফিসে এসো।"
ছুটির দিনে স্পেশাল কাজের কথা শুনলে সবারই রাগ হয়।আবিরের ও হল।তবু ঠান্ডা গলায় বলল, –"শরীর টা একদম ভাল নেই।খুব ঠান্ডা লেগে গেছে।একদম উঠতে পারছি না।"
–"ওহ! ঠিক আছে।"
ফোন টা কেটে দিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে, সুমির দিকে তাকালো আবির। সুমি,হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।–"এই ভাবে,অফিসে ঢপ মেরে দিলি!"
–"হু! এসব মিথ্যে বলার মধ্যে আলাদা আনন্দ আছে,বুঝলি।অফিসে তো প্রতিদিনই কাজ।কিন্তু আজ যে এই তোর সাথে ঘুরছি,এদিন টা কোনোদিন পেতাম?"
সুমি চুপ করে রইল।একটু হাসল।খুব ভাল লাগছে তার।বয়ফ্রেন্ড এরকম বললে,সবারই ভাল লাগে। পরীক্ষা শেষে হল থেকে বেরোতেই, আবির ছুটে গেল।সুমির হাত থেকে ব্যাগ টা নিয়ে হেসে বলল,–"মুখ দেখে মনে হচ্ছে,খুব ক্লান্ত হয়ে গেছিস?
–"ধুর! জলের বোতল টা দে।"
চশমা টা খুলে চোখে,বেশ কয়েকবার জলের ঝাপটা দিল সুমি। তারপর কি মনে হল,চশমা টা আর চোখে না পরে ছোটো একটা ব্যাগের মধ্যে ঢুকালো।আবিরের কাছ থেকে পিট ব্যাগ টা নিয়ে,ছোটো ব্যাগ টা তার ভেতর যত্নে রাখল।
–"চশমা টা পরলি না?" আবির জিজ্ঞাসা করল।
–"না! এই ভিড়ে,ঠেলা–ঠেলিতে, একবার চোখ থেকে নীচে পড়ে গেলে আর খুঁজে পাব না।"
সত্যিই! বাস গুলোতে,সকালের সাউথ লাইনের ট্রেন গুলোর মতো উপচে পড়া ভিড়।পা রাখার জায়গা নেই।কোনোরকমে মাঝের হাট গিয়ে নেমে হাঁফ ছাড়ল দু'জন।

ট্রেন থেকে চম্পাহাটি স্টেশনে যখন নামল,তখন বিকেল হয়ে গেছে। পাঁচটা বাজে।দু'জনই চম্পাহাটি তেই থাকে।রেল গেট টা ক্রশ করে মেন রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পিট থেকে ব্যাগটা নামিয়ে, চেন খুললো সুমি। চেন টা খুলেই,মাথা ঘুরে গেল। পাগলের মতো হাতড়াতে লাগল।
–"আমার ছোটো ব্যাগটা কোথায় গেল?আমার চশমা টা ওর ভেতর ছিল!"
–"কি বলছিস?" আবির বিস্মিত হয়ে ব্যাগের ভেতর চোখ রাখল।সব চেন গুলো খুলে দেখল। কোথাও নেই।
–"তখনি বলেছিলাম,তুই চশমা টা চোখে পরে থাক! আমার কথা শুনলি না।"
সুমির কাঁদো কাঁদো অবস্থা।হতবম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার মাঝে। চোখের পলক ফেললেই,জল গড়িয়ে পড়বে।আবির এগিয়ে এসে, সুমির কাঁধে হাত রাখলো।বলল,–"একদম কাঁদবি না।চল,তোকে নতুন চশমা আর ব্যাগ কিনে দেব।"
–"না রে,আমি চশমা হারানোর জন্য কাঁদছি না।আমার কষ্ট হচ্ছে। তুই ওটা চেয়েছিলিস, আমি দেইনি। আজ সেটা চোরের পেটে গেল!"
–"ছাড় ও সব কথা।আমার সাথে চল,একদম না বলবি না।এই সুযোগে তো,তোকে একটা গিফ্ট তো দিতে পারবো!" আবির হাসলো।
–"না,আজ থাক।ভালো লাগছে না কিছু।"অনেক টা জোর করেই সুমি কে ধরে নিয়ে গেল আবির।
মেন রোড থেকে,একটা সরু গলি ঢুকে গেছে বাজারের ভেতর।একটা বড় চশমার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো দুজন।বিভিন্ন ফ্রেমের, সাদা,রঙিন গ্লাসের চশমা সাজানো।
–"তোর যেটা পছন্দ হবে,সেটা নিবি।" আবির স্পর্ষ্ট ভাবে বলল।
–"না!তোর যেটা ভাল লাগবে,সেটাই নেব।" সুমি একটু হাসল।
তেরোশো পঞ্চাশ টাকা দামের একটা চশমা পছন্দ করলো আবির।সুমি প্রথম না বলল।এত দামের জিনিষ সে নেবে না।কিন্তু আবির ও ছাড়বার পাত্র নয়।অনেক জোর– জবরদস্তি শেষে নিতে রাজী হল।

অবশেষে চশমা,আর ব্যাগ কিনে, সুমি কে মেসে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল আবিরের। নিজের ঘরে ঢুকে আস্তে করে দরজা টা বন্ধ করে দিল।পিট থেকে ব্যাগ টা নামিয়ে একটা চেন খুলল।ভেতরে ছোটো একটা ব্যাগ।সেই ব্যাগের চেন টা খুলে চশমাটা বের করলো। বাসে ভিড়ের মধ্যে সুমির ব্যাগের ভেতর থেকে বের করতে একদম তার সমস্যা হয়নি।চশমা টা নিয়ে খাটের উপর লাফিয়ে পড়ল আবির। মন টা যেনআনান্দে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।দুহাত দিয়ে প্রথমে আলতো করে চেপে ধরল।ঝটপট বার কয়েক চুমু খেল চশমার গ্লাসের উপর।সুমির চোখ দু'টো ভেসে উঠেছে।মুখের লালায় ভিজে উঠেছে সাদা কাচটি। তারপর চশমা টি কে বুকের উপর চেপে ধরে রাখলো কিছুক্ষন। এক অদ্ভুত ভালোলাগা যেন কলসপত্রী গাছের মতো বন্দি করে ফেলছে আবির কে।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.