সুনীড়া দাসের ছোটগল্প পড়ুন 'অসম্পূর্ন'


               
আজ থেকে কলেজ শুরু আমার।নতুন জীবন শুরু।মন ভীষন খারাপ,সকলেইঅচেনা।পুরোনো বন্ধুদের থেকে আলাদা হয়ে গেছি।কি যে হবে নতুনফ্রেন্ড পাব কি না,পেলেও কেমন হবে কে জানে! এত টেনশনে নিজের নাম বলতে ভুলে গেছি,আমি গোধূলি।কেমিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হয়েছি। সকাল থেকে মা এর হাজারো উপদেশ দেওয়া শুরু হয়েছে,মন দিয়ে পড়বি,প্রফেসারদের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলবি ইত্যাদি।ঠাকুর ও মাকে প্রনাম করে কলেজ যাচ্ছি এখন,অটোও পাচ্ছিনা ধূর,দেরি হয়ে যাচ্ছে।প্রথমদিন দেরী করতে চাইনা তাই হাটচ্ছি।ঘেমে নেয়ে ডিপারমেন্টে এলাম।একি!আমরা মাত্র পাঁচ জন! ২জন মেয়ে ৩জন ছেলে।মেয়েটি কেমন হাঁদু পড়াকু গোছের।কি নাম তোমার?মেয়েটি ইতস্তত ভাবে তাকিয়ে বলে আমি সুপ্রীতি,আমি টিয়া,কেমন মার্কস ছিলো কেমিস্ট্রিতে?বললো ৮৮,আমার থেকে ৩ বেশি।
 প্রফেসার এসে গেছে।সবার ইন্ট্রো নিল, তারাতারি ছুটি হয়ে গেল আজ। টানা পনেরো দিন কলেজ করেছি, কয়দিন যায়নি,৩দিন পর কলেজে এসেছি আজ, সুপ্রীতির বললো কি রে এলিনা কেন কয়দিন?বললাম,এমনি।
টিউশান নিবি না? ও বললো প্রফেসার বানার্জীকে নিয়েছি,একদিন পড়তেও গিয়েছি। ওহো আমাকে তাহলে আজই দেখা করতে হবে একবার প্রফেসার এর সঙ্গে।তুই যাবি সুপ্রীতি আমার সাথে?হ্যাঁ যাবোরে গোধূলি তুই আমার বাড়ি চলে আসিস,পূর্বায়ন ক্লাবের কাছেই বাড়ি।বিকেলে চলে যাবো।

 বাড়ি ফিরতেই মায়ের পাঁচালি শুরু হয়ে গেলো,একটু রেস্ট করে সুপ্রীতির বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম,বেল এর পর বেল বাজিয়ে যাচ্ছি কেউ দরজা খুলছে না,বেশ কিছুক্ষন পর সুপ্রীতি দরজাখুলে নিয়ে গেলো ওর রুমে, বেশ সাজানো গুছানো, গোধূলি আজ বাড়ি নেই প্রফেসার, কাল বরং কলেজে কথা বলে নিস।আচ্ছা তোর মা বাবা কই রে প্রীতি?গলা ভারী করে বললো কয়েকমাস আগে আমিমামাবাড়ি গিয়েছিলাম মামাতো বুনুর সাথে মা বাবা দাদা আমকে আনতে যচ্ছিল,উল্টোদিক থেকে এক ব্রেকফেল করা লরি এসেধাক্কা দেয় মা বাবা ও ড্রাইভারকদা সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়, দাদাও গুরুতর জখম হয়েছিল।পাশের হসপিটাল এ নিয়ে যায় ওইখানের স্থানীয়রা, আমি আর দাদা আছি শুধু বলেই কেঁদে ফেলেসুপ্রীতি। জিন্স পরিহিত বছর ২১-২২ এর একটি সুদৃশ্য যুবক প্রীতিকে বুনু বলে ডেকে উঠলো।টিকালো নাক, ভরাট ললাট,নীলাভ দুটি চোখ,ফর্সা রঙ,লাল টিশার্টি ফুটে উঠেছে, এইতাহলে প্রীতির দাদা।বাড়ি চলে এসেছি,বার বার প্রীতির দাদার মুখটি চোখের সামনে আসছে,কি করে কি নাম কিছুইতো জানা হলোনা,না ঘুমিয়ে যাই কাল আবার কলেজ যেতে হবে।সকালে ওঠে মুখে খাবার গুজে কলেজ এসে গেছি।এক এর পর এক ক্লাস হয়ে যাচ্ছে,আজ মন বসছেনা কিছুতে,শুধু চোখদুটি মনে পরছে বার বার।বাড়িতেও মন বসছেনা,কিসের তাড়া আমার এতো! সকালে প্রীতির বাড়ি এলাম,সুপ্রীতি নেই বাইরে গেছে বললো সে,নাম কি তোমার?আমি মুখ নিচু করে বললাম গোধূলি,কি নাম আপনার বললাম তাকে?সুপ্রভাত আমি,প্রীতি বলে কি রে তুই? মা নেই তাই তোর সাথে থাকবো আজ সারাদিন বলেছিলাম মনে নেই তোর?হ্যাঁ মনে পড়ছে।চল আমার রুমে চল,কথা বলেই যাচ্ছে প্রীতি,সুপ্রভাতে মন আটকে গেছে আমার,অদ্ভূত সব ভাবনা উঁকি ঝুকি দিচ্ছে।প্রীতির ধাক্কাতে ঘোর কাটল,চল খেতে চল,খেয়ে এসেই প্রীতি ঘুমিয়ে পড়ল, নিশ্বব্দে সুপ্রভাতের রুমের দিকে পা বাড়ালাম,পর্দার পাশ দিয়ে দেখলাম ল্যাপটপ নিয়ে বসে কি যেন করছে,কতক্ষন দাঁড়িয়ে আছি জানিনা,প্রীতিরহাসির শব্দে ঘুরে তাকালাম, প্রীতির হাসির শব্দে সুপ্রভাত ঘর ছেড়ে বাইরে এলো আর বলে উঠল হাসছিস কেন তুই!প্রীতি বলে উঠলো তোকে লুকিয়ে গোধূলিরানী দেখছিল,কিছু না ভেবে ছুটে ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম,কোন ভাবনা এলোনা আর পালিয়ে যাওয়াই একমাত্র সমাধান মনে হল।এসে থেকে শুধু কেঁদে যচ্ছি,কি জন্য কাঁদছি জানিনা,শুধু মনে হচ্ছে কি ভাবছে ও আমার সম্পকে?বাজে অভদ্র মনে করছে আমাকে হয়তো,খেতেও ইচ্ছে করলোনা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পরলাম।সকালে উঠে কেমন যেন লাগছে,লজ্জা নাকি ভয়?কলেজ যেতেও ইচ্ছে করছেনা।তবুও মায়ের জোরে কলেজ যেতে হচ্ছে।আজ প্রীতি আসেনি,যাক বেঁচে গেলাম।বাড়ি ফিরে চুপ করে বসে আছি,হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো,কে এল এই সময়?প্রীতি এসেছে,গোধূলি তুই তোর ফোন আমাদের বাড়ি রেখে এসেছিলি এই নে,আর আজ চলিরে পড়তে যেতে হবে,আমি হাত বারিয়ে ফোনতি নিলাম।যে ফোনকে আমি চোখে হারাতাম সেই ফোন ছেড়ে এসেছি তা বুঝতেও পারিনি,কি হচ্ছে আমার সাথে,ফোন হাতে নিলাম,কভারেরভেতরে সাদা কাগজ মতো কি ওটি?চিঠি কে দিলো আমায় চিঠি!কাল কলেজ শেষে নদীর পাশে এসো একবার,অপেক্ষা করবোসুপ্রভাতসারাদিন কলেজে বসে ভেবে যাচ্ছি যাবো কি না,ঘন্টার শব্দে ঘোর কাটল,আনমনাভাবে হেঁটে চলি। কখন এসে গেছি বুজতেও পারিনি।ফাঁকা নদীর পাড়,রোদ পড়েছে নদীর জলে হীরের ন্যায় উজ্জল দেখাছে,হন্তদন্ত ভাবে সুপ্রভাত ছুটে এসে বলল দেরি করে ফেলেছি অনেক তাইনা,কিছু কথা আছে তাই এইভাবে ডাকতে হল তোমায়,আমি একদৃষ্টে চেয়ে আছি,ও বলতে শুরু করল,আমি পার্টির সাথে যুক্ত,বাঙলা নিয়ে কোনমতে B.A পাশ করেছি,চাকরী খুঁজছি এখন,পাব কি না জানিনা,জেলেও গিয়েছি একবার তাই মুশকিল হচ্ছে চাকরীতে,নাম্বারটি দেবে তোমার?এইসব শোনার পর কি বলি বুঝতে পারছিনা,নাম্বার দিয়ে বাড়ি এলাম,ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,রাত হয়েছে অনেক ১২টা বাজে,ফোনে ম্যাসেজ এল যে কার এত রাতে,সুপ্রভাত গুড নাইট ম্যাসেজ করেছে,আমি রিপ্লেই করে শুয়ে পড়লাম আবার,আজ সুপ্রভাতের সংগে দেখা করতে যাচ্ছি,ও আজ কি বলবে ভেবে ভেবে সারা রাস্তা কাটালাম,আজ ও আগে থেকেই অপেক্ষা করছে,এগিয়ে এসে বলল কিছু ভেবেছ?এইভাবে বলবে ভবিনি,উত্তর কি দেবো বুঝতে পারছিনা,কি হল কিছুতো বল গোধূলি?চাকুরী পেলে তুমি?দেখছি পায়নি এখন,আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে চলেএলাম,এতো সাহস নেই আমার যে নিজের মনের কথা বলব,কায়দিন কেটে গেল সুপ্রভাত কোনরকম কথা বলেনি আমার সাথে,প্রীতিও বেশ কয়দিন কলেজে আসেনি,অনেক ভেবে প্রীতির বাড়ি গেলাম,আমকে দেখেই প্রীতি জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করল,কি হয়েছে তোর,প্রীতি বলতে শুরু করল দাদার কয়দিন আগে জ্বর হয়েছিল সারছিলনা ব্লাড টেস্ট করে জানা গেল দাদা HIV POSETIVE বলেই অঝরে কাঁদতে শুরু করল,ছি! এইরকম নোংরা ছেলেকে ভালবাসি আমি, নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলাম,সুপ্রভাতের ঘরে গেলাম,সবকিছুর সংগে নিজের আসল নোংরাগুলিকে ভালই ঢেকে রেখেছিলে বেশ,তোমার মুখ দেখতেও চাইনা আর কোনদিন,এই কথাগুলি বলে কোন কথা না শুনে বাড়ি চলে এলাম,রাস্তায় কান্না অনেক কষ্টে আঁটকে রেখেছিলাম,যা আর বাঁধ মানলনা,মাও নেই আজ,কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়লাম,সকালে উঠে দেখলাম চোখ ফুলে আছে,প্যাকটিকাল আছে তাইএকপ্রকার বাধ্য হয়ে কলেজ গেলাম,আজও প্রীতি আসেনি,ক্লাস শেষে বেরছি,দেখি দূরে প্রীতি দারিয়ে,আমাকে দেখে এগিয়ে এল,একসাথে হাঁটছি,গোধূলি দাদা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে,লিখে গেছে আমার সুন্দর ভাবিষ্যতের অন্তরায় হতে চায়না এই কথা,তোকে এই চিঠিটি দিতে বলেছে এই নে,চিঠিটি হাতে ধরিয়ে চলি বলে চলে গেল,বাড়ি এসে চিঠি খুলে পড়তে শুরু করলাম,

গোধূলি,
 
 নদীর দুটি পাড়ে দেখা কখনও হয়না
নদীর বেগ কোন বাঁধা সয়না
গোধূলি আর সুপ্রভাতে অনেক অন্তর                  
  তবুও তোমায় ভালোবাসি নিরন্তর

জানিনা কি ভাবে এই রোগ বাসা বেধেঁছে আমার শরীরে,শেষ কথা জানিয়ে গন্তব্যহীন যাত্রা শুরু করলাম।
                                   
                                        ইতি

সুপ্রভাত ভালোবাসি তোমায় সুপ্রভাত ফিরে এসো, একটি ভুলের ক্ষমা কি পাবোনা আমি?

লিখেছেন সুনীড়া দাস

No comments

Powered by Blogger.