প্রিয়ঙ্কন চ্যাটার্জীর ছোটগল্প পড়ুন 'বিচার@নিহত গোলাপ'




-"আর পাঁচ মিনিট। খাতা রেডি করে ফেলো সবাই।"- কানে ভেসে এলো বিজিতবাবুর গলা। এদিকে চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে, বার্ষিক অঙ্ক পরীক্ষার খাতা, যার পুরোটাই প্রায় ফাঁকা। কানের মধ্যে ভেসে আসছে, মায়ের গলা, "এবার যদি আশি শতাংশের এর কম মার্কস পেয়ে বাড়ি আসিস, বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেবো। সমাজে আমার স্ট্যাটাস বলে কিছু একটা তো আছে। সেটা এভাবে তোর বাউণ্ডুলেপনার জন্য আমি নষ্ট হতে দেবোনা।"- আর সেই সাথে আতঙ্কিত ভাবে দেখছিল ওর অঙ্ক পরীক্ষার খাতার দিকে আর ভাবছিল, এর পর কি হতে পারে।
ভাবনায় ছেদ ফেললো পরীক্ষার ফাইনাল বেল। বিজিতবাবু যখন খাতাটা জমা নিলেন, তখনো অভীক খাতার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। সবকটা আজ চেনা প্রশ্ন ছিলো। উপপাদ্য গুলো কাল রাতেও প্র্যাকটিস করার পরেও আজ কিছুতেই একটাও নামাতে পারলোনা। যেটুকু পিছনের বেঞ্চ থেকে সাম্য হেল্প করলো, সেটাই সম্বল। আর নিজে ত্রিকোনমিতির কিছু পেরেছে কিন্তু এই সব মিলিয়ে খুব বেশী হলে ৫০-৫৫ হবে। কিন্তু মা যে বলেছে আশির কম হলে....
নাহ আর ভাবতে পারেনা সে।

অভীক যে পড়ায় খুব বাজে তা নয়। সে দারুন আঁকতে পারে। বাংলাতেও সে খুব ভালো। খুব ভালো কবিতা লেখে। স্কুলের সব অনুষ্ঠানে সে দ্বায়িত্ব নিয়ে সামলায়। ইতিহাসেও সে পারদর্শী। কিন্তু অঙ্ক আর বিজ্ঞান তার ভালো লাগেনা।
এদিকে, বিখ্যাত ডাক্তার অভিরাজ রায়ের ছেলে, হয়ে সাহিত্য পছন্দ হবার কোন অধিকার অভিকের থাকা উচিত নয় বলেই অভিমত তার বাবা-মার। ওসব গল্প-কবিতা লেখা, আঁকা সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। ওসব দিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়না আর স্ট্যাটাসও বজায় রাখা যায়না।
মা এর সেই ভয়ংকর রাগ আর বাবার মারের কথা ভাবতে ভাবতে সে অন্যমনস্ক হয়ে বাড়ী ফিরছিলো। মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছিলো, আজ পরীক্ষা শেষ বলে সব বন্ধুরা মজা করছে, আর সে... ভাবতে ভাবতে চোখের কোলে জল এসে গেলো।
একসময় এসে ওদের বিরাট বড়ো কমপ্লেক্সের সামনে দাড়ালো। আর এক মিনিটের মধ্যে ওদের ফ্ল্যাট। আর দরজা খুললেই....

"কি রে?? কেমন হলো পরীক্ষা? ৮০% হবে তো? এটা ক্লাস নাইনের ফাইনাল। মনে রাখ, সুমিত্রার ছেলে, কিন্তু একশ'ই ঠিক করেছে। ওর থেকে বেশী পেতে হবে।"- প্রচন্ড ক্লান্ত লাগলো, অভীকের। সুমিত্রা আন্টির ছেলে রোহিত, ওর ছোটবেলার বন্ধু। ওরা একসাথে খেলে। ও অঙ্কে খুব ভালো। ওর বাবাও ডাক্তার। তাই হয়তো এই বাবা-মাদের মধ্যে অলিখিত  ঠান্ডা যুদ্ধ চলে, যে খেলার বোড়ে ওরা।
অভীক আর টেনশন নিতে না পেরে বলে ফেললো, "হ্যাঁ মা। সব জানা প্রশ্ন ছিলো। সব করেছি।"- জীবনের প্রথম মিথ্যে বলা মাকে।

কাজও দিলো। মা এর হিটলার মার্কা  মুখটা বদলে গিয়ে হাসি দেখা দিলো। "ভেরি গুড। চল আজ ডমিনোজে তোর ফেভারিট পিজ্জা খাওয়াবো। "
এই প্রথম বোধহয় অভীক পিজ্জার নামেও খুশি হলোনা।"না মা। আজ আর ভালো লাগছেনা। খুব টায়ার্ড। পরে একদিন যাবো।"

দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেললো সে। চোখের সামনে শুধু ভাসছিলো আজকের পরীক্ষার খাতার পাতাগুলো।ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে হিসাব করে দেখলো, আর মাত্র সাতাশ দিন। তারপরেই এই মাসের আঠাশ তারিখ রেজাল্ট।
চিন্তায়, আশঙ্কায় দিন কাটাতে লাগলো। মনের মধ্যে টেনশন আর মুখে ভালো থাকার অভিনয় করতে করতে সে হাঁপিয়ে উঠতে লাগলো।
সেদিনও বাবা বাড়িতে বলেছে, এই বছর মাধ্যমিক। তাই অঙ্কের একজন বাড়তি টিউটর দেওয়া হবে, আর এই বছর কোন রকম লিটল ম্যাগাজিনের জন্য লেখা চলবেনা। ধীরে ধীরে অভীককে খাদের কিনারার দিকে ঠেলে দিতে শুরু করলো জীবন।
এভাবেই চলে এলো বহু প্রতীক্ষিত আঠাশ তারিখ। রেজাল্ট বেরোল। অভীক বাংলাতে সর্বোচ্চ পেয়েছে। কিন্তু অঙ্কে মাত্র ৫২। সব মিলিয়ে চৌষট্টি শতাংশ । আর রোহিত অঙ্কে একশ পেয়ে ফার্স্ট হয়েছে। এসবের মধ্যেও মনে পড়লো, থ্রি ইডিয়টস মুভিটার সেই ডায়ালগ, পরীক্ষায় বন্ধু ফেল করার থেকে বেশী দুঃখ হয়, বন্ধু ফার্স্ট হয়ে গেলে। এরই মধ্যে, অভীকের নাম ঘোষণা করা হলো, এই বছর বাংলায় সবচেয়ে বেশী পাওয়ার জন্য, ওকে পুরস্কৃত করা হবে। সবাই আনন্দে হাততালি দিলেও অভীকের চোখে জল, কারণ, বাড়ীতেতো এর কোন মূল্যই নেই।
ছলছল চোখে ও বাড়ী ফিরলো। বাবা আজ চেম্বার যায়নি। বাড়ী ঢুকতেই মা, রেজাল্ট চেয়ে হাত বাড়ালো। কাঁপা কাঁপা হাতে রেজাল্টটা বার করে মায়ের হাতে তুলে দিতেই বিপর্যয়। সজোরে একটা চড় নেমে এলো।
"আবার এরকম রেজাল্ট? এই নিয়ে আমি কাকে কি বলবো? বংশের মুখে চুন কালি দিচ্ছিস! লজ্জা করেনা?"-মায়ের কথায় অভীক মৃদু স্বরে কান্না চেপে বললো, "আমি তো বাংলায় হায়েস্ট পেয়েছি। ইতিহাস এও একাশি! তাহলে..."
কথাটা শেষ হবার আগেই অভিকের গালে দ্বিতীয় চড়টা পড়ল! এবারে বাবা! -"জানোয়ার ছেলে! ডাক্তার অভিরাজ রায়ের ছেলে হয়ে বাংলা, ইতিহাস নিয়ে মাতামাতি করতে লজ্জা করেনা? আর অঙ্কের এই রেজাল্ট? আজ থেকে ওইসব গল্প কবিতা সব বন্ধ।" সামনে ছিলো ওর গল্প লেখার খাতা। একটানে ছিঁড়ে ফেললো।
অভীকের চোখের সামনেটা কেমন ঝাপসা হয়ে এলো। কানে এলো মায়ের হাহাকার,"... সুমিত্রার সাথে আজ সন্ধ্যেতে বেরোনোর কথা, কি বলবো ওকে?..." -আরো অনেক কিছু বলছিলো মা। কথাগুলো আর কানে ঢুকছিলো না অভীকের। সে একছুটে বাড়ীর বাইরে ছুটে বেরিয়ে এলো। বেরোতে গিয়ে শুনলো বাবার কথা, "অনেক অভিশাপের ফল এরকম সন্তানের বাবা হওয়া।"
চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে এলো। সম্মোহিতের মতো, ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে সে ছাদে উঠে গেলো। গিয়ে দাঁড়ালো ছাদের একদম ধারে। তাকালো নিচের দিকে। দশ তলার বিল্ডিং। দূরে সূর্যাস্ত হচ্ছে। নিজের জীবনের সাথে খুব মিল পাচ্ছে বিকেলটার। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। খুব মনে পড়ছে রোহিতের সাথে খেলার সময়গুলোর কথা, মনে পড়ছে ওদের কমপ্লেক্স এর কুকুরছানাটার কথা, যাকে  ও রোজ খেতে দিতো। শেষবারের মতো, আরেকবার মিস করলো স্কুলের টিফিন পিরিয়ডের খেলা আর ফুচকা কাকুর কাছ থেকে ফুচকা খাওয়া। চোখটা খুব জ্বালা করে উঠলো। চোখদুটো বন্ধ করে নিলো, নিজেকে ভাসিয়ে দিলো শূন্যে। অবাধে পতনশীল বস্তুর মতো কিছুক্ষণ নিজেকে হাল্কা অনুভব করলো। তারপর একটা জোর ধাক্কা। মুখের কাছে ক্ষণিকের জন্য নোনতা স্বাদ অনুভব করলো। তারপরে চোখ বুজলো সে।

জোরে একটা আওয়াজ পেয়ে কমপ্লেক্স এর সিকিউরিটিরা ছুটে এসে বুঝলো কি হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানটায় কমপ্লেক্স এর সবাই জড়ো হয়ে গেলো। তার মধ্যে একটু আগে অভীকের মতো সন্তানের বাবা-মা হবার জন্য লজ্জিত হওয়া "মানুষ" দুজন ও উপস্থিত। তাদের আর্তনাদ তখন সন্ধ্যার আকাশ ছেয়ে ফেলেছে।
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলবে, ছাদ থেকে ঝাপানোয়, হৃদগতি স্তব্ধ হয়েছে, মাল্টিপল ফ্র্যাকচার, এরকম কিছু শব্দ। কিন্তু তার আগেই যে তার সব অনুভুতিগুলো স্তব্ধ করা হয়ে গেছিলো, সেটা জানতে পারার মতো উন্নত নয় বিজ্ঞান।
কিন্তু ডাক্তারের ছেলে হয়ে সাহিত্য প্রেমী হওয়া অপরাধ নাকি একজন কিশোরকে জোর করে তার ভালোবাসার কাজ থেলে দূরে এনে কোন মতামত চাপিয়ে, তার অনুভুতি হত্যা করা বেশী অপরাধ? অভীক তো তার অপরাধের  শাস্তিটা পেলো! কিন্তু তার বাবা-মা? তাদের এই শাস্তি কি যথেষ্ট?
নিজেরাই ভেবে দেখুন।

গল্পটি লিখেছেন  প্রিয়ঙ্কন চ্যাটার্জী
       

No comments

Powered by Blogger.