একটি প্রেমের গল্প ( ছোট গল্প) ~ স্বদেশ কুমার গায়েন



(১)

বাথরুমের দরজায় খট করে একটা আওয়াজ হল।নুপুর স্নান সেরে বেরুলো।ভিজে ভিজে শরীর। কোমোরে একটা গোলাপি রঙের টাওয়েল জড়ানো।টেপ টা কোথায় রাখলাম আবার?-"মা,আমার প্যান্টি টা কোথায়?"-হাঁক
ছাড়লো নুপুর।
-"উফ! আমি জানবো কি করে?আমি কি পরি?মেয়ে একটা হয়েছে আমার!স্নানে ঢোকার আগে কোনো কিছুই ঠিক করে রাখবে না।" কিচেন
থেকে বিরক্ত মুখে জবাব দিলেন নূপুরের মা।
-"পেয়েছি।"..
ঠিক তখনি,অরিজিৎ সিং এর গলা আওয়াজ।না! রিয়েল নয়,'বদলাপুর' থেকে।
বেডের উপর রাখা সাত ইঞ্চির ফোন টা বেজে উঠল।-" চাদরিয়া জিনি রে জিনি...।"বিরক্ত হল নূপুর।শিওর
বেআক্কেলে রিজুর ফোন।নইলে এরকম বেটাইমে একমাত্র ওই ছাড়া আর কেউ ফোন করে না।যখন সে,আয়নার সামনে ড্রেস চেঞ্জ করবে,কখনো টয়লেটে ঢুকবে, অথবা টয়লেট করে বেরোবে,ঠিক তখনি ওর ফোনটা আসবে।এর আগে এরকম ঘটনা অনেক বার ঘটেছে।আর ফোনটা রিসিভ করলেই,আগে জিজ্ঞেস করবে,-"কি করছিস?"
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে বলি যে,আমি ড্রেস খুলছি।নিতান্ত ছোটো বেলার বন্ধু তাই কিছু বলতে পারি না।বিরক্তিকর হলেও তবু ছেলেটি ভাল।একটা বাচ্চা বাচ্চা ভাব আছে। যেটা নূপুরের ও ভাল লাগে।
আজও নূপুর বিরক্ত হল।চটজলদি প্যান্টি টা পরে,টেবিলের পাশে গিয়ে দেখল,সত্যিই বেআক্কেলে টার ফোন।ফোন টা রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিল।ওপারে রিজুর গলা।
-"কি রে,কি করছিস?আজ কলেজ আসছিস তো?"
যা ভেবেছিল ঠিক তাই।সেই একই প্রশ্ন।গত রাতে অন্তত পনেরো বার বলেছিলাম,কাল অবশ্যই কলেজ যাব।তবুও এখন ফোন করতে হল!
নপুর টেপ টা পরতে পরতে রাগত স্বরে বলল,-"হ্যাঁ রে গাধা যাব। এখন ফোন টা রাখ,ব্যস্ত আছি।"
-"কেন? কি করছিস?"
উফ! নূপুরের মাথা বিরক্তে চিড়বিড় করে উঠল।
-"ধাৎ তেরি! তুই ফোনটা রাখবি?"
-"বি.কে.দের নোটস গুলো মনে করে আনিস কিন্তু!"
-"আনবো....এবার ফোনটা রাখ।"
ফোন কেটে দিল রিজু।টেবিলের উপর রাখা,নূপুরের জন্মদিনে দেওয়া রিজুর টেবিল ক্লকে দশটা বেজে দশ মিনিট।এগারোটায় বি.কে.দের ক্লাস টা আজ মিস করলে হবে না।পরীক্ষার আগে শেষ মুহুর্তের সাজেসন গুলো বহুত দরকারি।তাড়াতাড়ি ড্রেস টা পরে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো নূপুর।ঘুরে ফিরে একবার দেখল। দু'হাতে,মুখে সানস্কিন ক্রীম লাগিয়ে নিল।হালকা লিপস্টিক লাগালো ঠোঁটে।তারপর পিঠে ব্যাগ টা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
-"মা! আসছি।"
-"সাবধানে যাস।"
(২)
নূপুরদের বাড়ি থেকে তার কলেজে যেতে বাসে পঁয়ত্রিশ মিনিট মতো লাগে।ভিড় বাস হলে তখন একটু কম সময় লাগে।কিন্তু বাস ফাঁকা থাকলে,তখন ড্রাইভার ধীমে তালে চালায়-প্যাসেঞ্জার তোলার জন্যে। আর ট্রাফিক জ্যামে পড়লে,কোনো কথা নেই বস! ঝাড়া পঞ্চাশ মিনিট। বাসের প্যাচপেচে গরমে বসে সেদ্ধ হও।
বাস থেকে নেমে,কলেজের গেটের সামনে ক্যাবলাকান্ত টাকে দেখতে পেল নূপুর।চোখে একটা সানগ্লাস লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।নূপুর কে দেখেই এগিয়ে গেল রিজু।
-"এত দেরী হল?আমি সেই কখন থেকে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।"
-"আমি তোকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছিলাম?"নূপুর জবাব দিল।
-"না....মানে...হচ্ছে....!"
-"না..মানে... টা কী?"নূপুর ঝাঁঝিয়ে
উঠল।
কথা ঘোরালো রিজু।সেই ক্লাস ফাইভ থেকে তাদের বন্ধুত্বের শুরু। তখন থেকে একদিন ও নূপুরের সাথে কথায় পেরে ওঠেনি সে।প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল,-"নোটস গুলো এসেছিস তো?"
-"না! আনেনি।"
-"কেন? তোকে যে ফোন করে বলে দিলাম...।"
-"তুই ফোন করে বললেই আনতে হবে?আমার নোটস আমি যা পারি করবো।......সারাবছর ক্লাস করবে না,আর পরীক্ষার সময় এলেই, এই নোটস গুলো একটু দে না রে!
যেন মামার বাড়ির আবদার!"
নূপুর মুখ বাঁকালো।ক্লাসের দিকে হাঁটতে থাকলো,কোনোদিকে না তাকিয়ে।
-"এরকম করে বলতে পারলি?"
রিজু আর বেশী কিছু বলতে পারল না।মুখটা শুকিয়ে যাওয়া আমসত্বের মতো হয়ে গেছে তার।নূপুরের পেছন পেছন ক্লাসে গিয়ে ঢুকলো।
প্রথম বর্ষের পরীক্ষার আর বেশী দেরি নেই।তাই ক্লাসরুম ফাঁকা ফাঁকা।বি.কে.দে স্যার এখনো ক্লাসে ঢোকেনি।নূপুর একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসল।পাশে রিজু।
-"রাগ করেছিস?"রিজু ভয়ে ভয়ে নীচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
-"কেন? " শুকনো মুখে বলল নূপুর।
-"না,এই যে তোকে সব কিছুতেই বিরক্ত করি।"
নূপুর হাসল।প্রাঞ্জলতায় ভরপুর হাসি।ছেলেটা সত্যিই ভীতু! এখনো সেই ছোটোবেলার মতো রয়ে গেল। লুতুপুতু মার্কা!
-"না।রাগ করেনি।"- নূপুর
ব্যাগ থেকে বি.কে.দের নোটস গুলো বের করে রিজুর হাতে দিল।-এই নে বাবা, আমাকে উদ্ধার কর।কিন্তু কালকের মধ্যে ফেরত চাই।"
-"জি! ম্যাডাম।আপনি যেটা বলবেন সেটাই হবে।"রিজু দাঁত বের করে হাসলো।
যেখানে সেখানে খ্যাঁক খ্যাঁক করে দাঁত বের করা স্বভাব টা গেলো না। ইচ্ছে করে দাঁতে নিমের পাঁচন ঘষে দিই।কেলানে একটা!নূপুর মনে মনে বলল।
(৩)
বারোটা পঁয়তাল্লিশে ক্লাস শেষ হতেই সবার ঘর থেকে বের হয়ে গেল। নূপুর আজকের নোটস গুলোকে ওয়ান বাই ওয়ান সাজাতে লাগলো।
শালা! একটা প্রশ্নের চার-পাঁচ পাতা উত্তর।গিলতে গিলতে আবার সব উগরে উঠছে।কেন যে মরতে ইংরাজীতে অনার্স করতে গেলাম!
ফার্স্ট ইয়ারেই যদি ডুবে যাই,তাহলে পরের দু'বছরেও মাথা তুলতে পারবো না।একটা বড় করে নিশ্বাস ফেলে,পাশে বসা রিজুর দিকে তাকালো।বাবু,ফোন নিয়ে মাসকা মারছে।
-"কি রে,আজ বসে আছিস?"নূপুর,
বলল।
-"ভাল,লাগছে না রে! ভাবলাম তোর সাথে বসে একটু গল্প করি।"
নূপুর চোখ তুলে তাকালো।ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভাল করে দেখল রিজুর মুখমন্ডল টা।
-"কি হয়েছে?"ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল নূপুর।
-"কিছু না।এমনি,মনে হয় অনার্স টা আর টিকবে না।"রিজু ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল।
-"ঢপ মারছিস? তোদের কে চেনা আছে।পরীক্ষা এলেই এমন ভাব করবি,মনে হয় সব গেল গেল।অথচ রেজাল্ট টা ঠিক ঠাক আসবে!"
-"ধুর!পড়াশুনা একদম হচ্ছে না।সব কেমন গন্ডগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মাথার ভেতর।আর কি হবে ভাল রেজাল্ট করে!"
রিজুর কথায় অস্বাভাবিক ভাব লক্ষ্য করল নূপুর।মুখটা কেমন যেন, গোমড়া মুখো হয়ে গেছে।উদাস ভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। রহস্য আছে! নূপুর নোটস গুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে,রিজুর দিকে ফিরে বসল।বেঞ্চের উপর পা তুলে।
-"তো কোন মেয়েটা,তোর মাথায় গন্ডগোল পাকালো,এই পরীক্ষার সময়?"
-"কি যে বলিস! তুই না, যা তা একটা।আচ্ছা,তোর প্রিপারেশান কেমন হচ্ছে?
-"উঁহু! গাড়ির চাকা উলটো দিকে ঘোরাস না।ও সব বুঝি বুঝি।ওই,বল বল...কে মেয়েটা?আমাদের ক্লাসের কেউ? ঝিমলি?"
-"ধুস।"
-"নেকু! তুই তো মাঝে মাঝে আড় চোখে তাকাস ঝিমলির দিকে।"
-"ভাট বকবি না।ওর দিকে তাকাই না,
ওর ঘাড়ের কাছে ট্যাটু টার দিকে চোখ চলে যায়।"
-"ওহ!তোর তাহলে পছন্দ আছে?"
-"ছি!বাদ দে! আরও কোথায় কোথায় ট্যাটু করে রেখেছে,তার ঠিক নেই।"
রিজু নাক সিঁটকালো।
নুপুর হাসল।হি হি করে।-"তবে কে মেয়েটা?"
রিজু নিশ্চুপ।
-"আচ্ছা,কেমন দেখতে সেটা বল?"
-"তোর মতো।"মুখ ফসকে বলে ফেলল রিজু।
-"মানে?"
-"...ইয়ে.....মানে তোর মতোই
সুন্দরী।"
-"মেয়েটা পছন্দ করে তোকে?"
-"করে।কিন্তু ওইসব হিসেবে পছন্দ করে কিনা জানি না।"
নূপুর ভুরু কোঁচকালো।-"তুই, প্যেয়ার কা মৌসমের পূর্বাভাস আগে থেকে কিছু দিসনি?"
-"মাঝে মাঝে দেওয়ার চেষ্টা করি,কিন্তু মনে হয় বোঝে না।ও হয়তো, ওরকম কিছু ভাবে না।"
-"অত লুতুপুতু খাচ্ছিস কেন? ডাইরেক্ট গিয়ে একবার বলে দে।যা আছে কপালে।"
-"ভয় করে।যদি খারাপ ভাবে,রাগ করে আর কথা না বলে।আর যদি আমাকে রিজেক্ট করে দেয়,তাহলে আমার এবারের পরীক্ষা টা যাবে!"
-"কেন?তুই কি খারাপ ছেলে নাকি, যে তোকে রিজেক্ট করবে।পড়াশুনায় ভাল,মদ, বিড়ি,গাঁজা,সিগা রেট কিছুই খাস না....।"
রিজুর মুখটা ভোম্বলের মতো দেখাচ্ছে।বন্ধুর অবস্থা দেখে,নূপুরের হাসি পেল।কলাকার ছেলে মাইরি!
ভালবাসতে পারে,আবার ভালোবাসার কথা জানাতে ভয় ও পায়।যদিও এসব বিষয়ে,একটু ভয়, একটু লজ্জা থাকা ভাল।
কিছুক্ষন চুপ থাকার পর রিজু বলল,-"না,তা ঠিক নয়।আচ্ছা নূপুর,ধর,তোকে তোর ছোটোবেলার কোনো বন্ধু ভালবেসে ফেলল।সে ক্ষেত্রে কি করবি তুই?"
নূপুর একটু অবাক হল।
-"এর ভেতর আবার আমাকে টানছিস কেন?"
-"না,মানে...মেয়েটির জায়গায় জাস্ট তোকে বসিয়ে দেখছি।"
-"ওহ।আমি....ছেলেটি কে যদি ভাল মনে হয়,আমার ও পছন্দ হয়,তাহলে আর প্রবলেম কি?বগলদাবা করে রাখবো।"হি হি হি করে হাসল নূপুর।
রিজু,নূপুরের দিকে চোখ তুলে তাকালো।চোখ-মুখে একটা উজ্বলতা,খুশি খুশি ভাব।-"সত্যি বলছিস?
 অধৈর্য গলায় নূপুর বলল,-"মিথ্যে বলার কি আছে?কেন আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?"
রিজু নুপুরের হাতে হাত রাখল।--"তোকে অনেক ধন্যবাদ রে।
এবার মনে হয়,পরীক্ষা টা বেশ ভালোই হবে।" কথাটা বলেই ঝড়ের মতো ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
(৪)
রিজু বেরিয়ে যেতেই দরজার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল নূপুর। মনে মনে হাসলো।তারপর ফোনের ভেতর হাইড করে রাখা,রিজুর ছবিটা বের করল।ছবিটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
ভেবলাকান্ত একটা! কেউ যেন কিছু বোঝে না।আমারই কাছে,আমাকেই প্রপোজ করার প্রসেস জানতে এসেছে।বাবুর আগে থেকে কনফার্ম হওয়া চাই! ফোনের স্ক্রিনে, রিজুর ছবির উপর ঠোঁট ছোঁয়ালো নূপুর।-"তোর আগে থেকেই, তোকে আমি ভালবাসি রে বুদ্ধু!"
ফাঁকা ক্লাস।নূপুর নিজের মনে মনে কিছুক্ষন হাসল।যতই বোকা বোকা ভাব করো না কেন,হেব্বি চালাক তুমি বস! ঠিক সময়ে এসে,
পরীক্ষার টনিক টা নিয়ে চলে গেলে!

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.