|| অমানব || ছোটো গল্প || ~স্বদেশ কুমার গায়েন


(১)

আকাশে চাঁদ উঠেছে। ফুটবলের মতো গোলাকার চাঁদ, বড় মায়াময়, স্নিগ্ধ, অপূর্ব তার রুপ–লাবন্য। শুক্লা চতুর্দশীর রাত। চারিদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা,নির্জনতায় ছেয়ে আছে। চাঁদের সেই মায়াবী আলোয় বড় বড় নারকেল, বট,আম গাছ গুলোকে আরও রহস্যময় মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সব যেন এক একটা প্রেত, কালো কাপড় মুড়ি দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই হয়তো লম্বা লম্বা হাত–পা গুলো কে ডাল–পালার মতো ছড়িয়ে দেবে। ছাদের উপর চেয়ার পেতে বসে,সেই প্রাকৃতিক মায়াময় রূপ– লাবন্য আহরন করছি। এত বড় চাঁদ,এত লাবন্যতা আগে কখনও দেখিনি। অবশ্য, আমি এমন রাতে আগে কখনও ছাদে উঠিনি।চাঁদ ও দেখিনা, নক্ষত্রপুঞ্জের মিটি মিটি চাহনি ও দেখি না,–হয়তো আমি তোমাদের মত অতটা রোমান্টিক নই। নির্জনতা মাখা, মায়াময় পরিবেশে, একলা ছাদে বসে জোছনা ভেজা রাতের যে এত মাদকতা আছে,সেটা আজ প্রথম বুঝলাম।

আমার আজ ছাদে ওঠার কারন হল শর্মি,আমার বিবাহিতা স্ত্রী।শর্মি আজ বাড়িতে নেই।দু'দিনের জন্য তার মায়ের কাছে গেছে।ওর মায়ের শরীর টা বেশ কয়েকদিন ভাল যাচ্ছে না,তাই একটু দেখতে গিয়েছে। শর্মি কে ছাড়া,আমার চার দেওয়ালের ঘর টা বড্ড নির্জন,বড্ড আগোছালো, রঙচটা মনে হয়।তাই রাতের খাওয়া–দাওয়া সেরে আজ এই প্রথম চন্দ্রালোকিত ছাদে বসে আছি। ছাদের কার্নিসের পাশের নারকেলের ডাল গুলো মাথা নাড়াচ্ছে। তারি ফাঁক দিয়ে চাঁদের সেই মায়াবী আলো, আমার শরীরে ঢেউ খেলে যাচ্ছে।চারিপাশের বড় বড় বাড়ি গুলোতে এক শশ্মানপুরীর নিস্তব্দতা, –মনে হয় কোনো ডাইনি তার, অলৌলিক মন্ত্রবলে সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।
হাতের ঘড়িতে রাত বারোটা বাজে। কি অদ্ভুত! কখন যে এত সময় কেটে গেল,বুঝতে পারেনি। অপলক দৃষ্টিতে আকাশে চাঁদের গভীরে ডুবে আছি। হঠাৎ নিজের হাতের দিকে তাকালাম। একি! আমার হাতের আঙুল গুলো লম্বা হয়ে গেছে,অগ্রভাগে সূঁচালো নখ;সারা গায়ে বড় বড় কালো কালো লোমে ঢেকে যাচ্ছে। পায়ের আঙুলের নখ গুলোয় ছুরির মতো তীক্ষ্ণ,সূঁচালো হয়ে গেছে। একি হল আমার!
মুখে হাত দিলাম। মুখটা সরু হয়ে গেছে,বড় বড় দু'টো ধারালো দাঁত বেরিয়েছে গালের পাশ দিয়ে। আকাশের চাঁদ টি আরও বড় হয়ে উঠেছে।উঠতে গিয়েই,উলটে পড়ে গেলাম চেয়ার থেকে। কি করে সম্ভব! – আমি চার পায়ে হাঁটছি। পিছনের পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম,–সেটাও সম্ভব হল। চাঁদের আলোতে,নিজের অস্পর্ষ্ট কালো ছায়া দেখলাম ছাদের মেঝেতে।
ভয়ে কঁকিয়ে উঠালাম,– আঁঅঅ...।
মানুষের মতো স্বর বেরুলো না গলা দিয়ে। অস্পর্ষ্ট, বীভৎস গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে লাগলাম। অমানব! টোয়াইলাইট মুভির 'নেকড়ে মানব' এর কথা মনে পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে চার পায়ে নামছি। কোথায় যাচ্ছি আমি?
দরজা খোলাই ছিল। বাড়ির গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে,ডান পাশের গলির দ্বিতীয় বাড়ির সামনে উপস্থিত হলাম। শুনশান, নিস্তব্দ রাস্তা।রাস্তায় একটা কুকুর টি পর্যন্ত নেই। এক অশরীরীর মতো চলেছি। পাইপ বেয়ে দোতলায় বারান্দায় উঠে, দরজার সামনে দাঁড়ালাম। সামনের কালো কালো,লোমশ হাত দিয়ে দরজা ধাক্কাতেই, কিছুক্ষন পর কেউ দরজা খুলে দিল। আবছায়া ঘর।হালকা চাঁদের আলো জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকেছে। ঝাঁপিয়ে পড়লাম তার বুকের উপর।মাটিতে ছিটকে ফেলে,আমার ধারালো দাঁত দু'টো তার গলার কাছে বসিয়ে দিলাম। চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল। ফিনকি দিয়ে লাল রক্ত ছিটকে পড়ল মেঝেতে। মুখ দিয়ে একটা শব্দ করার চেষ্টা করল,নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল।কিন্তু আমার বজ্রআঁটুনির কাছে সব চেষ্টা যে বৃথা,– সেটা বুঝতে পারল সে। আমার অফিসের বন্ধু এবং সব থেকে বড় শত্রুর বুকের উপর চড়ে,তার গলায় দাঁত বসিয়ে বসে আছি।

বাইরে চাঁদ টা এখন দেবদারু গাছের আড়ালে। একটু পরেই হয়তো ডুবে যাবে।সেদিকে তাকিয়ে, আমার মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোতে থাকল। তারপর একটু একটু করে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম।

(২)

সকালবেলা জানালা দিয়ে সূর্যের আলো চোখে পড়তেই,ধড়ফড় করে উঠে বসলাম খাটের উপর। দীপকদের বাড়ি থেকে কান্না–কাটির আওয়াজ আসতে লাগল। দীপক আমার বন্ধু। এক সাথে যেমন অফিস যাই,তেমনি আবার একই সাথে ফিরি। কি হল আবার?
জামাটা মাথা দিয়ে গলিয়ে ছুটে গেলাম দীপকদের বাড়িতে। চারিদিকে লোকজনের ভিড়। পুলিশের গাড়ি বাড়ির সামনে। ও মা আমাকে দেখে,ছুটে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ল। –"আমার এ কি সর্বনাস হল!"
ইস! কি বিভৎস! কেউ যেন দীপকের গলার কাছে,এলোপাথাড়ি সূঁচালো ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। বা, কোনো হিংস্র জন্তু তার ভয়ানক দাঁত দুটো দিয়ে ফালা ফালা করেছে।ভয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে আছি। এতবড় ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।ওর মা–বাবা,ভাই কে যতেষ্ট স্বান্তনা দিয়ে ঘরে চলে এলাম। দুদিন পর শর্মি ফিরে এল।আবার আমার বেড রুমের,চার দেওয়ালের নি:সঙ্গতা কেটে গেল।

আমার বাড়ির সামনের একতলা বাড়ি টা সমীর দার। সরল সাধাসিধে ভালো মানুষ তিনি,কম কথা বলেন সবসময়।কিন্তু সমীর দার বৌ যে, একটু গায়ে পড়া স্বভাবের–সে কথা এপাড়ার কারও অজানা নয়। একদম সহ্য হয় না মহিলাটি কে। একটা অসহ্য,বিরক্তিকর যন্ত্রনা! সব সময় যেন,আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময়ী হাসি হাসে –সে হাসিতে একটা অদ্ভুত নেশা,যেন একটা কামুক টানের গন্ধ পাই। আমার এই কথা শুনে শর্মি খুব হাসে।লুটোপুটি খায় খাটের উপর। তার পর বুকে টেনে নিয়ে আদর করে। ঠোঁটে কামড়ে দেয়।


(৩)

মাস খানেক পর।আবার এক পূর্নিমার রাত!
শান্ত,মায়াময়, স্নিগ্ধ, চন্দ্রালোক। মেঘের ঘাটে ঘাটে জোছনা যেন তরী বেয়ে চলেছে। রাতের খাওয়া সেরে, শর্মি, দরজা,জানালা,লাইট বন্ধ করে দিয়ে আমার কাছে এসে শুয়ে পড়ে। বাইরের চাঁদ টিকে আর দেখা যাচ্ছে না।ঝুপ করে কালো অন্ধকার নেমে গেল আমার ঘরে। এক অদ্ভুত গন্ধ পাই ওর শরীরে। সারা দিনের অফিসের কাজের পর, এ গন্ধ একটু শান্তি দেয় আমায়। যেটাকে জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ি।
শর্মির ডাকা ডাকি তে সকালের ঘুমটা ভেঙে গেল।-" ওই, বাবান! ওই, ওঠ...না!"
সমীর দার বাড়ি থেকে একটা গোলমালের আওয়াজ শুনতে পেলাম।বারান্দায় বেরিয়ে দেখলাম,লোকজনের ভিড়।দু'চার জন পুলিশ ও ঘোরা ফেরা করছে। সিড়ি দিয়ে নেমে ছুটে গেলাম। শর্মি ও আমার পেছন পেছন ছুটলো। সমীর দার বৌ নীচের বারান্দার টয়লেটের কাছে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। আমার সারাটা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
উফ! কি ভয়ানক দৃশ্য!
দীপকের মতো,তার ও গলার কাছে কেউ যেন খুবলে মাংস তুলে নিয়েছে।এলোপাথাড়ি ছুরি চালালে, যেমন মাংস খসে খসে পড়ে,ঠিক তেমন।সারাটা শরীর রক্ত শূন্য,সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মনে হল কেউ যেন,তার শরীর থেকে সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে। কিন্তু এ তো ছুরি চালানো নয়! কোনো ভয়ঙ্কর দানব ছাড়া,একাজ কেউ করতে পারে না। চারিদিকে মানুষের মধ্যে একটা গুঞ্জন।দু'মাসের মাসের মধ্যে,এরকম দু'টো অপমৃত্যু!
পুলিশ লাস টিকে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করল।
–" এই দুটি হত্যা একই হত্যাকারীর দ্বারা হয়েছে।" পুলিশ তার বক্তব্য পেশ করল।আমার বুকের ভেতর টা দপ দপ করতে লাগল! কি করে সম্ভব?
পুলিশ লাসটি কে একটা ভ্যানে তুলে পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে চলে গেল। তারপর বেশ কয়েক মাস পার হয়ে গেল।শর্মির মুখের দিকে চেয়ে সব ভুলে গেলাম। এত লাবন্য,এত মায়া কেন ওর মুখে?–আমি সব কিছু ভুলে যাই, ওর দিকে তাকালে।



(৪)


প্রায় মাস চারেক পরের কৃষ্ণা চতুর্দশী। শান্ত শিশুর মতো চাঁদটিও যেন বসে আছে আকাশের কোলে। বড় উজ্বল সে চন্দ্রালোক!
স্বচ্ছ,হালকা, অমলিন,শান্ত! বড়ই নি:সঙ্গ।
চারিদিকের প্রকৃতি,গাছ–গাছালি, বাড়িঘর, জোছনা বৃষ্টিতে যেন স্নান করে নিচ্ছে।
–" ওই বাবান,চল ছাদে যাই। আজকের চাঁদ টা দেখ কত বড়–কি সুন্দর লাগছে!"
শর্মির কথায় চমকে উঠি। কি বলবো? গলা কাঁপতে থাকে আমার।
–" না, না আমি ছাদে যাব না।"
–"কেন তোর আকাশের চাঁদ ভালো লাগে না?"
–" না! আমার অসহ্য লাগে।"
–" আমার খুব ভাল লাগে। চল না,একটু ছাদে!"
শর্মি আমার হাত ধরে টেনে টেনে সিড়ি উঠতে থাকে।আমার খুব ভয় করতে লাগল। সারাটা শরীর থর থর করে কাঁপতে শুরু করেছে।
বারোটা বাজতে আর মিনিট কুড়ি বাকি।ছাদে উঠে দেখতে পেলাম,আগে থেকে দু'টো চেয়ার পাতা পাশাপাশি।চাঁদ টি আরও বড় হয়ে উঠছে। দুজন পাশাপাশি বসে আছি। কি সুন্দর, অভূতপূর্ব সে দৃশ্যলোক!
প্রিয়জনের পাশে বসে,সে দৃশ্য আরও সৌন্দর্যময় লাগছে। চারিপাশের পরিবেশটা, সেদিনের মতো নির্জন।রাস্তা–ঘাট, মাঠ, ঘর–বাড়ি, গাছ–পালা সব যেন চির ঘুমে আচ্ছন্ন। শর্মি,আমার মাথাটা ওর কাছে টেনে নেয়।নিজের ঠোঁট দুটি ডুবিয়ে দেয় আমার মুখে। চোখ দুটো আমার বন্ধ হয়ে আসে। কেন জানিনা, চুমু খাওয়ার সময় আমি চোখ দুটো খুলে রাখতে পারি না। এক মিনিট, দু' মিনিট.....পাঁচ মিনিট কেটে গেল চুম্বনরত অবস্থায়।
হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ কানে এল,– কেউ যেন মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ....গোঁ আওয়াজ করছে।চমকে উঠে চোখ খুলতেই,আমার সারা শরীরে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। মনে হচ্ছে হৃদপিন্ড টা বেরিয়ে আসবে এবার। শর্মির সারা শরীর কালো লোমে ঢেকে গেছে। হাতের আঙুল গুলো লম্বা লম্বা হয়ে গেছে,আর তার অগ্রভাগে খুরের মতো ধারালো লম্বা লম্বা নখ। মুখটা টা সরু হয়ে গেছে, আর গালের পাশ দিয়ে দুটো বীভৎস সাদা সাদা সূঁচালো দাঁত বেরিয়ে এসেছে। কালো লোমস দু'টো হাত আমার মাথাটা ধরে রেখেছে।আমার ঠোঁট দুটো,এখনো সেই বীভৎস মুখে লেগে আছে। নেকড়ে মানবী!
এবার বুঝতে পারলাম,–সমীর দার বৌ এর হত্যাকারী কে? ঘড়িতে হয়তো বারোটা বেজে গেছে। আকাশের চাঁদ টা যেন বড় থেকে আরও বড় গোলাকার হয়ে যাচ্ছে। অমানবীর ঠোঁট থেকে মুখটা সরিয়ে নিয়ে,চিৎকার করতে যাব কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরুলো না।
একটা অস্পর্ষ্ট আওয়াজ বের হল আমার মুখ দিয়ে,মানুষের মতো নয়–নেকড়ের মতো আওয়াজ। আমার সারা শরীরে,চাঁদের আলো চিক চিক করছে। একটু একটু করে পরিবর্তিত হচ্ছে,আমার শরীরের আকারও।হাত–পায়ের লম্বা লম্বা আঙুল গুলোতে ধারালো নখ বেরিয়েছে,সারা শরীরে বড় বড় কালো লোম। পাশে বসা শর্মির সেই বীভৎস মুখমন্ডলে,গোল গোল চোখ গুলো মিটি মিটি করে আমার দিকে চাইছে।হয়তো আমার মতো,সেও অবাক । নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদ টা উঁকিঝুঁকি মারছে। এক আলো–আঁধারি পরিবেশ! চেয়ার থেকে নেমে,পাশাপাশি চার পায়ে দাঁড়িয়ে আছি দুজন। গলা দু'টো উঁচু করে বাড়িয়ে রেখেছি জোছনা সমুদ্রে। পাশে ঝাঁকড়া বকুল গাছ টি তে একটা বাদুড় মনে হয় ডানা ঝটপটিয়ে শান্ত হয়ে গেল।আর শর্মি তার কালো লোমস হাত টা দিয়ে,আমার এক হাত ধরল।এক গাঢ় নিস্তব্দতা ঘিরে আছে চারিদিকে। আবার ও এক অপেক্ষা। নতুন সকালের। নতুন এক দিনের। কখন চাঁদ টা ডুবে গিয়ে পুবের আকাশ টা লাল হবে!


স্বদেশ কুমার গায়েন  (২০১৫)

সুনীড়া দাসের অনুগল্প 'প্রশ্ন' পড়তে ক্লিক করুন

No comments

Powered by Blogger.