|| যতীন || অনুগল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন




প্লাটফর্মের মাইকে সুমিষ্ট মেয়েলি কন্ঠে শিয়ালদহ লোকালের নাম ঘোষনা হতেই উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল যতীন। হাতের কাগজ টা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। সামনে দিয়ে কয়েকটি ছেলে হন্তদন্ত হয়ে 'শিয়াল আসছে, শিয়াল আসছে' বলে ছুটে গেল।

ঘড়িতে আট টা বেজে পঁই ত্রিশ মিনিট। প্রতিদিন এই ট্রেনে বারুইপুর থেকে কলকাতায় কাজে যায় যতীন। কাজ বলতে কলেজ স্কোয়ারে একটা বই প্রকাশনীর অফিসে কাজ করে সে। খুব বড় পদ না হলেও তার কাজের দায়িত্ব একে বারে অস্বীকার করা যায়। আসলে সবার কাজ মেটানোই এখন তার কাজ। কোনো কিছুর প্রয়োজন পড়লেই অফিসের সবাই আগে যতীন দার খোঁজ করে। কম দিন তো হল না! তা প্রায় ছ' সাত বছর হতে গেল এই অফিসে। অনেক ঝামেলা, মতান্তরের পরেও এই অফিস ছাড়েনি যতীন। তার মূল কারন হল বই এর প্রতি ভালোবাসা।
যতীনের বয়েস এখন চল্লিশের কাছাকাছি। একটু একটু করে মাথার চুল, দাঁড়ি সাদা হতে শুরু করেছে।বেঁটে-খাটো চেহারা। বেশ মোটা সোটা।চোখের চশমার পাওয়ার দেখে বোঝা যায়,  হয়তো একটু কমই দেখে চোখে।

তীব্র জোরে হর্ন বাজিয়ে প্লাটফর্মে এসে থামলো ট্রেন। এসময় ট্রেন অবশ্য ফাঁকা থাকে না। তাই সিট পাওয়ার কোনো আশা রাখে না যতীন। কতটুকু বা, আর সময় লাগবে শিয়ালদহ যেতে। বেশিরভাগ দিনই দাঁড়িয়ে চলে যায়। প্রতিদিনের অভ্যেস। হাতের সাইড ব্যাগ টা কাঁধে ঝুলিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লো যতীন। ঠেলাঠেলি, গুঁতোগুঁতি করে একপাশে গিয়ে দাঁড়ালো। একটু দম নিল। তারপর সেই ভিড়ের মধ্যে কোনঠাসা অবস্থায় ব্যাগ থেকে একটা গল্পের বই বের করে চোখের সামনে ধরলো। এটা তার আজকের অভ্যাস নয়। যেদিন থেকে এই ট্রেনে চেপে কলকাতায় কাজে যাওয়ার শুরু, সেদিন থেকেই অভ্যেস টা করে ফেলেছে। অন্যদিকে তার কোনো খেয়াল থাকে না আর। মাঝে মাঝে শিয়ালদহ এসে গেলেও বুঝতে পারে না যতীন। পাশের চেনা পরিচিত নিত্য যাত্রীদের মধ্যে কেউ গায়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলে,-" দাদা, শিয়ালদা এসে গেল। এবার তো বইটা বন্ধ করুন।"
যতীন হকচকিয়ে একবার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। তারপর হেসে বলে,-" হ্যাঁ, হ্যাঁ চলুন দাদা।"
এই ট্রেনে বসেই কত বড় বড় উপন্যাস শেষ করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।


ট্রেনের গতি কমে এসেছে। পাশের একজন জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি মেরে বলল,-" দাদা শিয়ালদা ঢুকছে। রেডি হন।"
বইটা বন্ধ করে ব্যাগে ঢোকালো যতীন। আস্তে আস্তে ট্রেন এসে শিয়ালদা দশ নম্বর প্লাটফর্মে এসে থামলো। প্রথমে হুড়োহুড়ি, তারপর দৌড়াদৌড়ি। যতীন এই গতি, ব্যস্ততার সাথে পেরে ওঠে না। তাই হাতে সময় নিয়েই বাড়ি থেকে বের হয়। ট্রেন থেকে নেমে একপাশে সাইড হয়ে দাঁড়ায় যতীন। তারপর ধীরে ধীরে লোকজনের ভিড়ের মধ্য দিয়ে সামনে এগিয়ে চলে।
প্লাটফর্ম থেকে নেমে ওভার নীচে দিয়ে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের দিকে এগিয়ে যায়। ছয়- সাত বছর ধরে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছে সে। হাতের তালুর মতো সব অলি গলি চেনা তার। বড় পিচের রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে যতীন। রাস্তার উপর সারি সারি হাওড়া যাওয়ার বাস। কন্ডাক্টর জোরে জোরে হাঁকছে,-" হাওড়া,.... হাওড়া!.. এম.জি.রোড..!"
রাস্তার একপাশে অটোর লম্বা লাইন। কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে রুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। এসব দৃশ্য রোজ দেখে যতীন। তবুও যেন বার বার দেখতে ভালো লাগে। যতীন বাসে চড়ে না, বা অটোয় চাপে না। শিয়ালদা থেকে কলেজ স্কোয়ার পর্যন্ত হেঁটে চলে যায়। পয়সা বাঁচানোর জন্যে নয়, তার এই রাস্তা ধরে হাঁটতে ভালো লাগে যেন। চারিপাশের রঙিন কাচের দোকান, ব্যাস্ত গাড়ি রাস্তা, মানুষজন,লাল-সবুজ-হলুদ ট্রাফিক দেখতে দেখতে কখন কলেজ স্কোয়ার পৌঁছে যায় -তা যতীন নিজেই বুঝতে পারে না।


প্রতিদিনের মতো আজও যতীন হাঁটে। রাস্তায় একপাশ ধরে হেঁটে চলে। মিত্র ইনস্টিটিউসন স্কুলের পাশের ক্রসিং এ দাঁড়িয়ে পড়ে সে। সামনে লাল সিগন্যাল। এদিক ওদিক আনমনা ভাবে কিছুক্ষন তাকায়। তারপর সিগন্যাল সবুজ হতেই রাস্তা ক্রশ করে এগিয়ে যায়। মিনিট খানেক হাঁটার পর একটা হাতে টানা রিকসা যতীনের পাশে এসে দাঁড়ায়।
-" কোথায় যাবেন, বাবু?"
যতীন দাঁড়িয়ে পড়ে। রিকসা চালকের দিকে তাকায়। রোগা, হাড়গিলে চেহারা লোকটির। তামাটে গায়ের রঙ।বয়েস তার মতোই বা, তার থেকে বেশি হতে পারে।
-"কোথায় যাবেন বাবু?" আবার প্রশ্ন করে লোকটি।
-" এই তো সামনে, কলেজ স্কোয়ার।" হেসে উত্তর দেয় যতীন।
-" আমার রিকসায় উঠুন।"
-"না, মানে আমি হেঁটে যেতেই পারবো। আর রোজ ই হেঁটেই যাই আমি। আর তাছাড়া, আমি রিকসাতে উঠি না। " সামনের দিকে এগিয়ে যায় যতীন।

কলকাতার এই হাতে টানা রিকসা দেখলে যতীনের মন খারাপ হয়ে যায়। রিকসা চালকদের দেখলে কষ্ট হয় তার। সকালের কুয়াশায়, দুপুরের কড়া রোদে, বিকেলের ভ্যাবসা গরমে একজন মানুষ কে কিভাবে হাতের উপর বয়ে নিয়ে চলে তারা....! কোনোদিন তার মন, এই হাতে টানা রিকসায় উঠতে বলে না। দরকার হয় সে, কষ্ট করে আরও হেঁটে যাবে,তবুও এই রিকসা তে কোনোদিন উঠবে না।

রিকসা চালক যতীনের পিছু ছাড়ে না। তার পাশেই এগিয়ে যায়। -"বাবু, উঠুন। সকাল থেকে এক জন ও পায় নি। আপনি না হয় কম ভাড়া দেবেন। তবুও তো কিছু পাবো। "
-" না, দেখুন.. মানে বুঝতে পারছি সব। কিন্তু আমি রিকসায় চড়ি না।" ইতস্তত করে যতীন।
-" না বলবেন না বাবু।"

বড়ই অস্বস্তিতে পড়ে যতীন। রিকসা চালকের করুন মুখের দিকে একবার তাকায়। তারপর বলে,-" কলেজ স্কোয়ার পর্যন্ত তোমার ভাড়া কত?"
-"দশ টাকা। আপনি, পাঁচ টাকা দেবেন না হয়।" বলে রিকসা চালক।

পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে যতীন। তারপর রিকসা চালকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে হেসে বলে,-" এই নাও তোমার ভাড়া। আমার এই রাস্তাটা হেঁটে যেতে খুব ভালো লাগে।"

আর দাঁড়ায় না যতীন। টাকা টা হাতে ধরিয়ে  হনহনিয়ে সামনের দিকে হেঁটে চলে। রিকসা চালক ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে যতীনের হেঁটে যাওয়ার দিকে। হাঁটতে হাঁটতে যতীন ভাবে,এই ব্যস্ততা,গতিময়তার সময়ে, এরা এখনো এই রিকসা নিয়ে পড়ে আছে কেন? ট্রাম গাড়ীর মতো, এরাও কি কলকাতার ঐতিহ্যের পাতায় নিজেদের নাম লিখাতে চাইছে....!

স্বদেশ কুমার গায়েন ( ফ্রেব্রুয়ারী, ২০১৭)

No comments

Powered by Blogger.