|| মেস বাড়ির গল্প || ছোট গল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন



দুষ্টুমি

সকাল সাড়ে ন'টা বাজলেই, আমাদের পাশাপাশি দু'টো ঘরের পশ্চিমের জানালায় একটা জটলা তৈরী হতো। ঠেলা ঠেলি,গুঁতো গুঁতি চলতো। সবাই এসে একটু জানালা দিয়ে উঁকি ঝুঁকি মারার চেষ্টা করত। রবিন এসে আমাকে জানালার পাশ থেকে হটিয়ে দিয়ে, বায়োলজি বইয়ের সব থেকে ইন্টারেস্টিং চ্যাপটার খুলে বসতো। রিতম সিনেমার টিকিটের অফার করত,শুধু প্রতিদিন জানালার পাশের সিট টা বুক করার জন্য। কারন,আমার খাটের পাশেই জানালাটা ছিল।পাশের ঘরের জানালায় ও একই অবস্থা।ফিজিক্সের মোটা বই, আর চার পাঁচ টা নোট খুলে অর্ঘ টা শুয়ে পড়তো জানালার পাশে। আর ঠিক তার পিঠের উপর বসত বাবাই। সত্যিই তো! উঁকি ঝুঁকি মারারই বয়েস আমাদের। এবার কারন টা বলি। সাড়ে ন'টা মানেই স্কুলের যাওয়ার প্রস্তুতি। আমাদের মতো চ্যাংড়া ছেলেদের আট দশটা চোখ, পেছনের বাড়িটার কল তলায় ঘুরে বেড়াতো। বীজগনিতের সূত্রের মতো আমাদের মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল,রবিবার বাদে প্রতিদিন মেয়ে গুলো এই সময় স্নান করতে আসে। সত্যি বলছি! মুখটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যেত না। কারন, টিউবওয়েল টাকে ইটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল। তবে মেয়েগুলো যখন স্নান সেরে,ভিজে শরীরে বাইরে এসে দাঁড়াতো, জলভেজা শরীরের প্রতিটা চড়াই উৎরাই স্পর্ষ্ট হয়ে উঠত, তখন আমাদের চোখ গুলো দশ টাকার রসগোল্লার মতো বড় হয়ে যেত।

আমিও তাকিয়ে থাকতাম, তবে অন্য কারনে। আমার দু'টো চোখ অন্য দু'টো চোখ কে খুঁজে বেড়াতো।মেয়েটির নাম বুলবুল।সবাই বুলু বলে ডাকতো। আমার মতোনই লম্বা।তাই বোধ হয় আমার খুব মনে ধরেছিল। পাতলা চেহারা,তবে রোগা নয়। ছোটো ছোটো করে কাটা ঘাড় পর্যন্ত চুল। টানা টানা চোখ, আর শিশির ভেজা ঘাসের মতো চকচকে, মোলায়েম ঠোঁটের খুনে হাসি আমার বুকে যেন ঘুর্নিঝড়ের সৃষ্টি করত। আমার চোখের অবস্থা টাও হয়েছিল, সেই আইভান প্যাভলভের প্রতিবর্ত ক্রিয়ার পরীক্ষার মতো। রবিবারেও সাড়ে ন'টা বাজলে,প্রতিদিনের অভ্যাস বশত চোখটা কল তলায় চলে যেত, –বুলুকে একবার দেখার জন্যে।
তবে এসব আমার কাছে ছিল কল্পনার মতো,শুধু স্বপ্নেই ভালবাসতাম ওকে। আর বাস্তবে সেটা ছিল,ফুটবল বিশ্বকাপে ভারতের কোয়ালিফাই করার মতো কঠিন ব্যাপার। কারন ওই বাড়ির মেয়েগুলো, আমাদের মেসের ছেলেগুলো কে একদম সহ্য করতে পারত না। মনে করত, আমরা সব এক একটা বিছুটি পাতার ঝাড়।শুধু মেয়েগুলো নয় আশেপাশের বাড়ির লোক গুলোও আমাদের জ্বালায় কম অতিষ্ট হতো না।

পাগলামো

প্রত্যেকের জীবনের কিছু অধ্যায় মনে রাখার মতো হয়। যেমন কারও স্কুল জীবন, কারও কলেজ জীবন। আবার কারও হোস্টেল জীবন, তো কারও কাছে মেসে কাটানো কয়েকটা বছর। 'মেস' শব্দটা শহরাঞ্চলে বেশ পরিচিত শব্দ। যারা একটু গ্রাম থেকে,শহরে পড়াশুনার জন্য আসে,তাদের এক মাত্র গন্তব্য স্থান হয় এই 'মেস বাড়ি'। এই প্রথম যেন মুক্ত বাতাশের স্বাদ পায় সবাই।
আমাদের মেসবাড়ি টা উত্তর থেকে দক্ষিনে লম্বা লম্বি। পাশা পাশি তিনটে ঘর। সামনে পুব দিকে লম্বা বারান্দা।লোহার গ্রিল দিয়ে পুরো বারান্দা টা ঘেরা। তার কিছুটা সামনেই মালিকের দোতলা হলদে রঙের বাড়ি। আর প্রতিটা ঘরের পশ্চিম দিকে,একটা করে বড় জানালা। জানালার নীচে একটা চারকোনা জমিতে বাগান তৈরী করা। ঋতু অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হতো। বাগানটা পেরিয়ে কোমর সমান ইটের পাঁচিল,আর পাঁচিলের পরেই বাগানের মালিক হরিপদ বাবুর দোতলা ঘর। আর সৌভাগ্যক্রমে মেয়েগুলি এই হরিপদ বাবুর বাড়িতেই ভাড়া থাকত। আমাদের মেসের মালিক ছিলেন, অমায়িক মানুষ। নিজেই,নিজের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। মেসের কিছু ছেলে, মাঝে মাঝে সাহয্য করত। তাই আমাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল মধুর। তবে বেশী বাঁদরামো একদম পছন্দ করতেন না।
একদিন একটা ঘটনা ঘটল। যদিও এরকম ঘটনা আগেও ঘটেছে। বিশেষ বিশেষ দিন এলে এটা ঘটবেই। নিজের ঘরে বসে এগারো ক্লাসের কেমেস্ট্রির ক্যাচাল গুলো উলটে পালটে দেখছিলাম। হঠাৎ পাশের ঘর থেকে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ এল। পড়িমড়ি করে উঠে পাশের ঘরে গেলাম। রবিন তো রীতিমতো রেগে ফায়ার। অর্ঘের মুখের সামনে তার আঙুল লাট্টুর ঘুরছে। মুখে শুধু একটাই কথা,–" দেখে নিস আজ! ফাটিয়ে দেব! চটিয়ে দেব! সব লোপাট করে দেব"
অর্ঘ আর বাবাই মিলে পাল্টা দিচ্ছে,-" আরে যা যা! আজ বিকেলে আসবি, তারপর কার কত ফাটে বুঝতে পারবি?"
আমরা দু' তিনজন মিলে কোনোরকমে রবিন কে থামাই। আসলে কেস টা কিছুই না! আমাদের মেসে একটা টি.ভি. ছিল। যেদিন মোহনবাগান, আর ইস্টবেঙ্গলে ফুটবল ম্যাচ থাকে সেদিন আমাদের মেসটা যুবভারতী মাঠের বাইরের মতো রনক্ষেত্র চেহারা নেয়। পুরো মেসবাড়ি সহ মালিকের বাড়ি দুটো দলে ভাগ হয়ে যায়। সারা দিনটা তর্ক যুদ্ধ চলে। রবিন হল আমাদের মেসের ইস্টবেঙ্গল,ব্রাজিল,ও বার্সালোনা টিমের লিডার। আমি,রিতম,টুপাই তার সদস্য। আর অর্ঘ,মোহনবাগান,আর্জেন্টিনা ও রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবের অন্ধভক্ত। বাবাই,টিঙ্কু,বিশ্ব রা ছিল অর্ঘের দলে।এইসব দিনগুলোতে সকাল থেকেই মেসের পরিবেশ থমথমে হয়ে থাকত। মনে হয় থানা থেকে একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে দিয়েছে। শুধু মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বলে নয়, ব্রাজিল– আর্জেন্টিনা ম্যাচ, রাত এক টায় বার্সালোনা– রিয়াল মাদ্রিদ ম্যাচ নিয়েও তুমুল উত্তেজনা। ফুটবল, ক্রিকেট বিশ্বকাপের মাস গুলোতে আমাদের উত্তেজনা আরও চরমে পৌঁছাতো।রাত দুপুরে আমাদের তুমুল চিৎকার আর চেঁচামেচিতে আশে পাশের বাড়ি গুলোর দাদা– বৌদি,কাকু– কাকিমাদের ঘুমের যে তেরোটা বাজতো, সেটা আমরা ভালই বুঝতে পারতাম। তবে সব থেকে বিরক্ত হতো মনে হয় হরিপদ কাকুর বাড়ির মেয়ে গুলো।
আর খেলা শেষ হলে, সে কি বুলি! কোন টিমের কত ভাল রেকর্ড সব আমাদের ঠোঁটস্থ রাখতে হতো। ক্রীড়া সাংবাদিক রা আমাদের কাছে কিছুই না। কারন তর্ক যুদ্ধ বাঁধলে, তখন রের্কড গুলো বিরাট কাজে লাগে।
আমাদের মেসের মালিক ছিল খেলাপ্রিয় মানুষ। তাই আমাদের পাগলামোতে তিনি কিছু মনে করতেন না। বরং তিনিও এসে আমাদের তর্কযুদ্ধে যোগ দিতেন। কারন তিনি ছিলেন পুরো মোহনবাগানি,তাই মোহনবাগানের বিরুদ্ধে কোনো কথা একদম সহ্য করতে পারতেন না। তবে ভারত– পাকিস্তান ম্যাচের দিন আমরা সবাই এক দলে হয়ে যেতাম। ম্যাচের দিন সকালে উঠেই ভারতের পতাকা উড়িয়ে দিতাম। এটা হয়তো জাতীয়তাবাদ বোধ থেকেই হতো।

প্রেমের শুরু

প্রেম ভাইরাস টা বোধ হয় হঠাৎ করে, কোনো কারন ছাড়াই শরীরে প্রবেশ করে। তাই বেশ কিছুদিন ধরেই,বুলুর মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। বুলু, যখন তখন আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।আর মিটি মিটি হাসে। ওর হাসি দেখলে আমার বুকটা দপ দপ করে কেঁপে ওঠে।আসলে বুলুর হাসির সাথে,আমার বুক কাঁপা ছিল সমানুপাতিক সম্পর্ক। অর্থাৎ ও যত বেশী হাসত,আমার বুক ও তত জোরে কাঁপত।
এক শীতের রাতে ঘটনা টা ঘটল। বেশ কিছুদিন ধরে রিয়াল মাদ্রিদ হারের ধারা বজায় রেখেছিল। সে রাতে হঠাৎ জিতে গেল বার্সালোনার সাথে। উফ! কি চেঁচামেচি অর্ঘের। মনে হল রাত আড়াইটের সময় ভোটের বিজয় মিছিল বেরিয়েছে। আমরাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়।তর্কযুদ্ধ বেঁধে গেল দুই দলের। ব্যাস কেস টা ঘটল সকাল বেলা। ঘুম থেকে উঠে দেখি,হরিপদ কাকু হাজির আমাদের মালিকের কাছে।–" তোমার বাড়ির বাঁদর গুলোর জন্য, আমার বাড়ির মেয়েগুলোর পড়াশুনা, ঘুম লাটে উঠেছে। সারক্ষন ছেলেগুলো ঐ পিছনের জানালা খুলে রাখে।"
ছোটো খাটো মানহানির কেস খেয়ে গেলাম। মালিক ডেকে পাঠাল রবিন,আর আমাকে। কারন, কিছু ঘটলে ইস্টবেঙ্গল দলের আগে ডাক পড়ত। মোহনবাগানিরা এ ব্যাপারে ছাড় পেত। কিছু দুম দাম, ধমক খেয়ে ঘরে চলে এলাম। বুঝতে বাকি ছিল না, অভিযোগ গুলো কাদের। ওই চ্যাঁদোড় মেয়েগুলো ছাড়া আর কারও নয়। মনে মনে রাগে ফুঁসতে লাগলাম দুজন।প্রতিশোধ নেবই। প্লান টা ছকে ফেললাম।রবিন কে বলতেই ও এককথায় রাজী। জানি,ওই মেয়ে গুলো কে জব্দ করা যাবে না,তাই সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল হরিপদ কাকুর বাগানের উপর।
ঘড়িতে রাত এগারো টা বাজে।চারিদিক নিস্তব্দ হয়ে এসেছে। জানালার একটা রড খুলে, আমি আস্তে আস্তে বাগানে ঢুকে পড়লাম। আজ সাধের বাগানের দফারফা করবই। সব থেকে বড় একটা ফুলকপি কেটে,জানালা দিয়ে রবিনের হাতে দিয়ে দিলাম। আরেক টার অর্ধেক কাটা শেষ হয়েছে সবেমাত্র, ঠিক তখনি পাঁচিলের পাশে একটা মানুষের ছায়া দেখতে পেলাম।দেখি, বুলু রাতে খাওয়ার পর ব্রাস করতে করতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কি করবো ভেবে পেলাম না। ছুটে জানালা গলে একদম ঘরের ভেতর। কাল সকালে যে কি অপেক্ষা করছে,সেটা কল্পনা করতে করতে রাতের ঘুম চলে গেল।
ভোর বেলা হরিপদ কাকুর চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। –' বাঁদর', হতচ্ছাড়া,বজ্জাত ছোঁড়া যতসব!
জানালাটা খুলে দেখি, পাড়ার ছ্যাচ্চোড় ছেলে বিল্টু টাকে এই সব ভাষায় গালাগালি দিচ্ছে। আর ওপাশ থেকে বুলু আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। তাহলে কি বুলু আমার নাম বলেনি? হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম ।
কিন্তু বুকের মধ্যে আবার ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। বুলু আমার নাম বলল না কেন?তবে বুলু কি আমায় ভাল বাসে? মনের ভেতর দু'টো কদম ফুল ফুটল।
কিছুদিন পর একটা ঘটনা ঘটে গেল হঠাৎ করেই। একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল ব্যাপার টা। আর তাতেই আমাদের মেসে গভীর শোকের ছায়া নেমে এল। উত্তম কুমার মারা যাওয়ার পর, টলিউড ইন্ডাস্ট্রি তে বোধ হয় এত শোকের ছায়া নামে নি। দিনটা ছিল রাখি পুর্নিমা। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি,ওই বাড়ির চার মুর্তি হাজির। দুজনের হাতে রাখি, এক জনের হাতে লজেন্স। বুলু একটা করে রাখি নিচ্ছে,আর প্রত্যেকের হাতে বেঁধে দিচ্ছে। রবিন, রিতম, অর্ঘ,বাবাই,টুপাইদের মুখ গুলো দেখলাম সব বাংলার পাঁচ, ছয়,সাত,আট অক্ষরের মতো চেহারা নিয়েছে।
আমি ঘরে খাটের উপর বসেছিলাম। বুলু আমার পাশে এসে, হাতে একটা লজেন্স দিয়ে, রাখি না বেঁধেই মুচকি হেসে চলে গেল। বুঝতে পারছিলাম মেসের ছেলেগুলো সব আমার দিকে ট্যাঁরা চোখে চাইছে। যাইহোক পর দিন থেকে সকাল সাড়ে ন'টায় জানালার পাশে জটলা কমে গেল।কেউ আর জানালা দিয়ে তাকাতো না। মনে মনে খুব আনন্দিত হলাম।এত কিছুর মধ্যে আমার প্রেমটাই টিকে গেলো মনে হয়!

রাগ ও অত:পর ভালবাসা

প্রেম যেখানে থাকে,ক্যাচাল সেখানে থাকবেই। ভিলেন ছাড়া কখনো সিনেমা হয়?
কয়েকদিন ধরে ব্যাপার টা খেয়াল করছি। জানালা দিয়ে আমার সব কিছু নজরে পড়ে। কয়েকটা ছেলে হরিপদ কাকুর বাড়িতে মাঝে মাঝে আসে। মেয়েগুলোর সাথে কথা বলে চলে যায়। বুলু কেও মাঝে মাঝে,তার মধ্যে একটা ছেলের সাথে হেসে হেসে কথা বলতে দেখেছি। এবং সেটা পর পর দু'দিন। যাকে মনে মনে ভালবাসো, তার সাথে অন্যকোনো ছেলে যদি কথা বলে তাহলে মনের অবস্থাটা কেমন হয়, বলুন? মনে মনে কষ্ট ও পাচ্ছিলাম আবার রাগ ও হচ্ছিল ছেলেটির উপর। বুলুর সাথে, আমারই কথা হয় না; শুধু চোখাচোখি হয়। আর ওই ছেলেটি কথা বলছে? ভাগ্যিস!হাতের পাশে বন্দুক ছিল না,নইলে গুলি গোল্লার বরিষণ শুরু করে দিতাম।
তিন দিন ধরে মনে মনে কষ্ট পাচ্ছি।বুলু সত্যিই আমাকে ভালবাসে তো? না,আমার দিকে তাকিয়ে একটু সময় কাটায়?এ টেনসন সত্যি নেওয়া যায় না।এর থেকে হাতে রাখি পরিয়ে দিলে ভালো হত। সব ল্যাটা চুকে যেত।
সেদিন সন্ধ্য বেলা বাজার থেকে ফিরছি। আকাশ টা মেঘ করে এসেছে। হয়তো একটু পরেই বৃষ্টি নামতে পারে। কাছে ছাতা নেই,তাই জোরে জোরে পা চালাচ্ছি। হঠাৎ পিছনে সাইকেলের ক্রিংক্রিং আওয়াজ পেলাম। তাকিয়ে দেখি বুলু সাইকেলের উপর। আমার পাশে এসে সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়াল।
আমি কোনো কথা না বলে হাঁটতে লাগলাম। ও বলল,-" বৃষ্টি আসছে আমার সাইকেলে চলো।"
আমি চুপ করে ছিলাম। অনেকটা জোর করে আমার হাতে সাইকেল টা ধরিয়ে দিল। বুকটা দুরু দুরু করতে শুরু করল। আমি সাইকেলে প্যাডেল করছি আর বুলু পিছনের সিটে বসে। বলেই ফেললাম,-" তুমি সেদিন আমাকে বাঁচালে কেন? তুমি তো দেখেছিলে, চুরি আমিই করেছিলাম।"
 বুলু চুপ করে রইল। আবার জিজ্ঞেস করলাম,-" মেসের সবাই কে রাখি বাঁধলে,আমাকে বাঁধলে না কেন?"
বুলু হাসল। আমার পিঠে জামার উপর একটা হাতের স্পর্শ টের পেলাম। একটা ঠান্ডা হিমস্রোত যেন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। শুধু একটা কথা কানে এল, -" তোমায় খুব ভালবাসি তাই।"
কথাটা কানের ভেতর দিয়ে সোজা মাথায় না গিয়ে বুকে এসে ধাক্কা মারল। একটা ঝোড়ো হাওয়ায় যেন খড় কুটোর মতো উড়ে গেলাম। জাপানে যদি 'মনোরেল' চলে, তবে এই মুহুর্তে আমি 'মনোসাইকেল' চালাচ্ছি। সাইকেলের চাকা দু'টো রাস্তা থেকে যেন শূন্যে উঠে গেছে। আর আমরা দু'জন ভেসে চলেছি মহাশূন্যে। মনে হল,'নাসা' না পারলেও আমারা দু'জন প্লুটো গ্রহের কাছে পৌঁছে গেছি সাইকেল নিয়ে।
 ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাস্তার আলোগুলো জ্বলতে শুরু করেছে। দুজনই ভিজছি। বুলু আমার পিঠের জামাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

1 comment:

  1. Khub prebictable galpo ts.bt topic r presentation ta valo chilo...

    ReplyDelete

Powered by Blogger.