প্রিয়ঙ্কন চ্যাটার্জীর ছোটগল্প পড়ুন 'অন্য বসন্ত'



মার্চের মাঝামাঝি এরকম অকাল নিম্নচাপে সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। প্রিয় দুপুরে যখন কলেজ ঢুকছে,  তখন বেশ জোরেই বৃষ্টি পড়ছিলো। প্রিয়র কলেজের সামনেই গঙ্গা নদী। প্রিয় ওর কলেজের ক্লাসরুমে বসে, বাইরে বৃষ্টি দেখছিলো। কলেজে এসে জানলো বৃষ্টির জন্য আজ ম্যাডাম আসবেন না। আর কি হবে! প্রাণ ভরে নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করে, যখন শেষ বিকেলে বেরিয়ে এলো কলেজ থেকে, তখন বৃষ্টি থেমেছে! কলেজ গেটের পাশে ঝুমকোলতা গাছে চড়াই পাখী দেখতে পেলো বহুদিন পর। বৃষ্টি থামতেই চ্যাটচ্যাটে গরম লাগছে। আজকাল শীতের পর এই বসন্তকাল তো এই চড়াই পাখীর মতোই বিলুপ্তপ্রায়। রবি ঠাকুর একবিংশ শতকের কবি হলে, বসন্ত নিয়ে আর এতো গান-কবিতা লেখা হতোনা। এমন সময় পকেট থেকে ফোন বার করে অনলাইন এসে দেখলো, তনয় মেসেজ করে বলেছে, ৫:৩০ সময় বটতলার মনজিনিসের সামনে দাঁড়াতে। দরকার আছে। তনয় ওর বাল্যবন্ধু।  দরকারে তো দাঁড়াতেই হবে।


মনজিনিসের সামনে গিয়ে তনয়কে ফোন করায় বললো, "আসছি ভাই। দশ মিনিট।"- অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিছুক্ষণ পর তনয় তার বাইক নিয়ে এসে হাজির হলো।
"বাড়ীতে কাকীমাকে ফোন করে বল, তুই আমার সাথে একটু যাবি। বাড়ী ফিরতে একটু দেরী হবে।"
"মানে? তোর লাইফে  ডিমান্ড টা কি বলতো? আর এক মাস পর ইউনিভার্সিটি ফাইনাল!! আর এখন তোর সাথে ঘুরতে যেতে হবে!?মাজাকি হচ্ছে?"
বরাবরের মতো ফাজিল হেসে পাশ কাটালো। বললো, "চল চল। এমনিতেই দেরী হলো। আর দেরী করে লাভ নেই"
প্রিয় বুঝলো কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তাই ওর বাইকে চড়ে ওর সাথে রওয়ানা হলো। যেতে যেতে বাড়ীতে জানিয়ে দিতে ভুললো না।
ঘন্টাখানেক বাইক সওয়ারী হয়ে  পৌঁছোলো হাওড়ার এক অঞ্চল- কলকাতা শহরের উপকন্ঠে।  এক বাড়ীর সামনে গিয়ে তনয় বাইক থামালো। জায়গাটা বেশ সাজানো। পুরো শহর না হলেও শহরের ছাপ আছে। যাকে মফস্বল বলে। এই মফস্বলের আলাদা নস্ট্যালজিয়া আছে। এরা অনেক না পাওয়ার মধ্যেও যেটুকু পায়, তাই দিয়ে নিজেরা খুশী থাকার চেষ্টা করে।
কিন্তু সেই মুহুর্তে প্রিয় কিছুই বুঝছিলো না, তনয় কোথায় নিয়ে এসেছে। তবে ওর প্রিয় বন্ধুর উপর ওর যথেষ্ট ভরসা আছে যে, এখন জিজ্ঞাসা করলেও কোন উত্তর দেবেনা। তাও প্রিয় বললো, "কোথায় আনলি? এখানে কে আছে?"
-" তোর স্বপ্নপুরন করতে আনলাম!"
-"মানে?"
নিরুত্তর তন্ময় হাত রেখেছে কলিংবেলে। সুরেলা শব্দ শেষ হতেই দরজা খুললেন এক প্রৌঢ়।  তনয়কে দেখেই বললেন, "আয় আয়। ভেতরে আয়। হঠাৎ কি ব্যাপার? কি জরুরী দরকার বললি?"
তনয় ঘরে ঢুকে সোফায় বসে বললো," কাকু এ প্রিয়। আমার ছোটবেলার বন্ধু। ইকনমিক্স নিয়ে আমার কলেজেই পড়ছে। তোমাকে এর কথাই বলেছিলাম।আর প্রিয় ইনি অজয় সেনগুপ্ত। আমার বাবার মামাতো ভাই।  সেনগুপ্ত পাবলিশার্স এর মালিক।"
প্রিয়কে দেখে অজয়বাবু হেসে বললেন, "আচ্ছা তাহলে তুমিই সেই প্রমিসিং রাইটার। তনয় তোমার কথা খুব বলে।"
প্রিয় একটু ঘেঁটে গেলো। সে লেখে। এটা তার প্যাশন। গত ১১ বছরের অভ্যাস। আর কলেজে ওঠার পর থেকে সিরিয়াসলি! নিজেদের ছোট লিটল ম্যাগাজিনের দল আছে। এখন নিজের গল্পের বই বার করার ইচ্ছাও আছে। কিন্তু এরকম অনেকেই আছে! কোন প্রকাশকই বা আর নতুন লেখকের বই ছাপতে চায়। আর নিজের টাকায়...? স্বপ্নেও ভাবেনা সে। বাড়ীতে তার এই লেখালিখি নিয়ে বরং তুমুল অশান্তি হয়। বাবার সাফ কথা, "আগে নিজে চাকরী পাও। তারপর যা খুশি করবে!"তাই ইচ্ছাটা বাস্তবায়িত হবার কোন চান্স নেই। এটা সে জানে। এই তনয় ওর বন্ধু হলেও লেখালিখি থেকে দশ আলোকবর্ষ দূরে থাকে। এসবে বিশেষ পাত্তা দেয়না। বরং মাঝে মাঝেই বাবার মতো জ্ঞান দেয়, 'এসব করে কিছু হবেনা প্রিয়। পড়ায়  আরো বেশী কনসেন্ট্রেট  কর। আর সেই তনয় তার পাবলিশার কাকুকে ওর লেখার কথা বলে,  তাঁর বাড়ী নিয়ে এসেছে। হিসাবটা মেলাতে পারছিলোনা প্রিয়।
অজয়বাবুর কথায় বাস্তবে ফেরে প্রিয়।-" তনয় বলছিলো তুমি নাকি তোমার নিজের লেখা ছাপাতে চাও? কিন্তু তোমার মতো এমন অচেনা  নতুন কারুর লেখা ছাপার রিস্ক আমি কেন নেবো। যদি লস হয়! তার দায় কে নেবে? "
অপমানে প্রিয় লাল হয়ে গিয়ে, সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো," সরি স্যার!  আমি আসলে এই ব্যাপারে জানতাম না। তনয় আমাকে কিছু না জানিয়ে এখানে এনেছে। আপনি আপনার বড়ো লেখক নিয়ে থাকুন। লাভ করুন। কিন্তু আপনি আমার লেখাকে অপমান করতে পারেননা।"
সোফা থেকে উঠে দরজার দিকে এগোতেই পেছন থেকে অজয়বাবুর হা-হা করে হাসির আওয়াজ পেলো। অবাক হয়ে প্রিয় ঘুরে তাকাতেই অজয় বাবু আন্তরিক হাসি মাখা গলায় বললেন, " আরে রাগ করছো কেন? আমি সাহিত্যের প্রতি, তোমার লেখার প্রতি ভালোবাসাটা পরখ করছিলাম শুধু! দেখছিলাম, আদৌও তুমি জেনে বুঝে এগোচ্ছ, নাকি আবেগে চলছো! তুমি আপাতত পাশ। পরেও পারবে তো!"
- কথাগুলো শুনতে শুনতে প্রিয়র মুখটা আনন্দে ভরে উঠছিলো। প্রিয় বুঝতে পারলো ওর মন অজয়বাবুর কথার উত্তর গুলো মনের মধ্যেই আওড়াচ্ছে," আমি জেনে বুঝেই করছি তো। জ্ঞান হবার পর থেকেই নিজের এবিলিটি কতটা সেটা ভালো ভাবে বুঝতে শিখেছি। তাই কলেজে উঠেও কোনওদিন  বাবাকে হাজার টাকার জিন্স কিংবা বারোশো টাকার জুতো কিনে দিতে বলিনি। শুধু এই লেখালিখি একমাত্র নেশা। যার জন্য  সৎ পথে থেকে যা খুশী করতে পারি।"
এই সময় তনয় লাফিয়ে উঠলো খুশীতে! "সত্যি তুমি তাহলে ওর লেখা ছাপবে?"
 অজয়বাবু বললেন, "তোর কথা কি ফেলতে পারি! তাছাড়া তুই ওর যে লেখাগুলো পড়িয়েছিস, আমার পছন্দ হয়েছে। এবারের পুজোয় আমাদের প্রকাশনীর থেকে নতুন লেখক হিসাবে ওর লেখাই প্রকাশ করবো। তবে প্রিয়, এটা কিন্তু মস্ত বড়ো সাধনার বিষয়। শুধু একটা বই ছাপলেই হয়না। তার পরেও অনেক দ্বায়িত্ব। পারবে তো তুমি সামলাতে?"
আবেগে উত্তেজনায় প্রিয়র মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছিলো না। ও মাঝে মাঝে শুধু ওর বাল্যবন্ধুকে দেখছিলো। যে কোনদিন ওর লেখা ভালোভাবে পড়েও দেখেনি, সে কিনা ওর অজান্তে লেখাগুলো ওর কাকুকে পড়িয়েছে।
এমন সময় আবার অজয়বাবু বলে উঠলেন, "কি হলো? পারবে তো তুমি?"
প্রিয় বুঝছিলো, জীবনটা কবাডি খেলার মতো। একবার দম ধরে সুযোগের ঘরে ঢুকে পড়তে হয়। তারপর শুধু ইফোর্ট।সেখানে দম ছাড়লে চিরতরে আউট জীবনের কোর্ট থেকে। জীবন সব বিজিতকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়না। সবাইতো আর হ্যাপি নিউ ইয়ারের শাহরুখ চার্লি খান হয়না!
প্রিয় অজয়বাবুর চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় বললো, "পারবো স্যার।"- অজয়বাবু হেসে বললেন, "আরে স্যার কি আবার! তুমি তনয়ের বন্ধু। আমাকে কাকু বলেই ডাকবে। আর তুমি সামনের রবিবার তোমার লেখা নিয়ে এসো।"
আরো কিছুক্ষণ একথা সেকথার পর দুজনে অজয়কাকুর থেকে বিদায় নিলো।
বাইকে করে ফেরার সময় প্রিয় খুশিতে ভাসছিলো। এতোদিনে তার স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে। বৃষ্টিটা একদমই নেই। আকাশে তারা ফুটেছে। পরশুদিন দোলপূর্ণিমা। আকাশে গোল চাঁদ উঠেছে। হাসনুহানার গন্ধ আসছে। তনয় প্রিয়দের পাড়ার মোড়ের সামনে বাইক থামালো। অদূরেই রেলস্টেশন। অফিসযাত্রীদের ঘরে ফেরার পালা! আর সে স্বপ্ন দেখছে দূর গন্তব্যে যাত্রার! ও তনয়কে জড়িয়ে ধরলো," সত্যি ভাই, তুই আজ যা করলি,  অ্যাম রিয়েলি গ্রেটফুল টু ইউ! আমার এখনো গোটা ঘটনাটা একটা স্বপ্ন মনে হচ্ছে!"
- "আরে ধুর! এ আর এমন কি! এতো ভাবিসনা। বরং লেখা থেকে যা পাবি তার অর্ধেক আমাকে দিস! অ্যাকচুয়ালি, অ্যাম ইন ক্রাইং নীড অফ মানি নাউ!.... ঠিক আছে? এখন আসি। কাল কলেজে বসন্ত উৎসব। সময় মতো চলে আসিস। " বাইকে স্পিড তুলে বেরিয়ে যায় তনয়!
হঠাৎ আকাশের চাঁদটা মেঘে ঢেকে গেলো কি! পায়ের তলায় মাটিটা কি একটু কেঁপে গেলো! মাটি কাঁপলো, নাকি পনেরো বছরের বন্ধুত্ব! লেখা বিক্রির অর্ধেক... কিছু শুরু হবার আগেই গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি? এই কি বন্ধুত্ব?
প্রিয়র চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে এলো। রাস্তার দু ধারে দোলের জন্য রঙ, আবির বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এই বসন্ত উৎসবের আগেই, হঠাৎ ওর জীবনটা বেরঙ্গীন হয়ে গেলো। ও সম্বিৎ হারিয়ে উদভ্রান্ত হয়ে হাঁটছিলো। কিন্তু কোনদিকে হাঁটছে সে? এই অন্ধকার থেকে সে কি আর আলোয় ফিরতে পারবে? ওর পাড়ায়, প্যারাট্রুপারের মতো সন্ধ্যে নামছে।  চারপাশের বাড়ী ফেরার তাড়ায় লোকজন  ওকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলো। টোটোর খুচ্রো গুনছে চালক! রাস্তার  ধারের চায়ের দোকানে বিক্ষিপ্ত ভাবে লোকজন জমে আছে! প্রচুর মুখের সারি চারপাশে। মুখ নাকি মুখ মুখোশের ভিড়? এসবের মাঝেই প্রিয় সরে যাচ্ছে ওর রুপকথার থেকে; কষ্টে ভেঙ্গে আসছে শরীর-মন।
কে জানে, এই কষ্ট জীবনে কেন আসে! কি শেখায় এই কষ্ট!
প্রিয় শুনতে পেলো, অদূরে প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা হচ্ছে, ডাউন ব্যান্ডেল-হাওড়া লোকাল, ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে! বাড়ীর দিকে হাঁটতে হাঁটতে প্রিয় ঠিক করে নিলো, সামনের রবিবার কিছুতেই আর সেখানে ও লেখা নিয়ে যাবেনা। কারুর ঘোষণা করে দেওয়া জীবনের প্ল্যাটফর্মে সে পা রাখবেনা।

নিজের প্ল্যাটফর্ম যে নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়!

( কলেজের গেটের ঝুমকোলতা গাছ, বসন্তের সেই চিরসবুজ বিকেল আর জীবনে সাফল্য আর প্রতিষ্ঠার জন্য লেখকের জীবনযুদ্ধ ছাড়া বাকী সব কিছু কাল্পনিক)



লিখেছেন প্রিয়ঙ্কন চ্যাটার্জী

No comments

Powered by Blogger.