|| রুপা ||অনুগল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন



(১)

সকাল বেলা ছেলের বাড়ি থেকে রুপাকে দেখতে এল।

পাত্রের নাম সুদীপ রায়।পাত্র উচ্চবংশ, খুব ফর্সা না হলেও একেবারে কালো বলা যায় না, বেশ লম্বা-চওড়া। মাথায় ঘন কালো চুল। সুদর্শন। সরকারি চাকুরী। এক কথায় যাকে বলে হিরের টুকরো ছেলে। কথা বলার সময় মুখে একটা স্মিত হাসি লেগেই থাকে।

দরজার আড়াল থেকে ছেলে কে এক পলক দেখে মা কে ইশারায় ডেকে রুপা বলল,-" আমি বসবো না ওদের সামনে। আমাকে ওরা পছন্দ করবে না। আমার আর এসব একদম পছন্দ হয় না।"

আত্ম সন্মান সবারই থাকে। রুপার ও আছে। রুপা শিক্ষিত। ইংরেজী বিষয় নিয়ে এবছর মাস্টার ডিগ্রী কমপ্লিট করেছে। কতবার আর সহ্য করা যায়! কতবার এরকম কাপড় পড়ে, সেজে -গুজে ছেলের বাড়ির লোকের সামনে বসতে হবে। এটা কি ফ্যাসন শো হচ্ছে!  আগেও দু'বার ঘটেছে।ছেলের বাড়ি থেকে পছন্দ হয়নি। এবারেও সেরকম কিছু একটা ঘটবে-তা মনে মনেই আন্দাজ করে রেখেছে রুপা।তাকে পছন্দ না হওয়ার কারন ও জানে সে।


রুপার যখন জন্ম হয়েছিল,তখন লাল টুক টুকে ফর্সা গায়ের রঙ। সবাই আহ্লাদে বলেছিল এ মেয়ে রাঙা টুকটুকে ফর্সা হবে। কিন্তু ঘটলো তার বিপরীত। যত বয়েস বাড়তে লাগলো একটু একটু করে রঙ বদলাতে শুরু করলো। ফর্সা থেকে আধ ফর্সা, আধ ফর্সা থেকে শ্যামলা, শ্যামলা থেকে কালো। তার উপর অসুখ-বিসুখ ছাড়লো না। রোগে ভুগে ভুগে চেহারা রোগা-পাতলায় পরিনত হল। মা-বাবা কোনোদিন নিজের সন্তানের অযত্ন করেনা। রুপা কেও করেনি।এক মেয়ে, তাই অযত্ন করার কথাও নয়।
একটা ছোটো প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে রুপার বাবা। মাইনে ভালো না হলেও সংসার চলে যায়। তার উপর মেয়েকে এতদূর পড়াশুনা করিয়েছেন। আর এই সব কথা ভেবে মা-বাবার কথায় না বলতে পারে না রুপা। কিন্তু আজ আর ছেলের বাড়ির লোকের সামনে যেতে চাইলো না সে।

 রুপার মা, মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,-" ওরকম করে না,মা। তোর বড় মাসীর দেখা পাত্র। দেখবি তোকে পছন্দ করবে। "
এই বড় মাসীর কথা শুনলে রুপার মাথায় রাগ চেপে বসে। মায়ের থেকে যেন তার বড় মাসী বিয়ের জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। সপ্তাহে সপ্তাহে এসে মায়ের কাছে কানে ফুস মন্ত্র।


মায়ের কথায় না বলতে পারলো না রুপা। অবশেষে সেজে-গুজে পাত্রের সামনে গিয়ে বসলো। এখন আর লজ্জা লাগে না তার।গায়ে সয়ে গেছে। সব জানা -শোনা প্রশ্ন। রুপা গিয়ে একবার চোখ তুলে তাকালো। শুধু ছেলে নয়, ছেলের বাবা-মা,দিদিও আছে।
প্রাথমিক পরিচয়ের পর ছেলের মা রুপার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,-" কত দূর পড়েছো, মা?"
-" ইংরেজী নিয়ে এবার মাস্টার্স শেষ করলাম।" শান্ত গলায় উত্তর করলো রুপা।
মেয়ের উত্তরের সাথে বাবা যুক্ত করলেন,-" ও পড়াশুনায় খুব ভালো। এই পড়াশুনা শেষ করে চাকরীর জন্যে পড়ছে। অনেক ইন্টারভিউ তে ও ডাক পেয়েছে।"
রুপার বাবা শেষ কথা গুলো একটু জোর দিয়ে বললেন। যদি চাকরীর জন্যে তার মেয়ে কে পছন্দ করে।

খাওয়া -দাওয়া পর্ব শেষ হলে ছেলের বাবা বললেন,-"আপনার মেয়ে কে দেখে ভালো লাগলো। বাড়িতে গিয়ে ওর জেঠুর সাথে কথা বলি, তারপর আপনাদের ফোন করে জানাবো।"

ফোন নাম্বার নিলেন পাত্রের বাবা। হাসি মুখে তারা বিদায় হলেন।

(২)

-" ঘর,পরিবার সব ভালো, তবে মেয়াটা যেন বড্ড কালো। আর রোগা।বুক-টুক কেমন যেন ভেতরে ঢোকা। আমাদের পরিবারে এরকম কালো মেয়ে বৌমা করে আনে নি কেউ। তোমার আর তিন ভাই কে দেখছো না। রাঙা টুসটুসে বৌমা এনেছে।...আমার ছেলের জন্যে এরকম কালো বৌমা আনতে পারবো না। তুমি অন্যমেয়ে দেখো...।" বাড়ি ঢুকে সুদীপের মা, সুদীপের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন।
-"সে দেখাই যেতে পারে। তবে এনাদের কে না করে দিই। " বললেন সুদীপের বাবা।
-"এখনি বলার কি দরকার। কয়েক দিন যাক। এমনি ই ফোন না করলে বুঝে যাবে। এরকম কালো মেয়ের বাবা-মা সহজেই বুঝতে পারে, ফোন না করার কারন। আর ফোনের অপেক্ষা ও করে থাকে অনেক দিন।

এবার সুদীপের দিকে তাকালেন তার মা। বললেন,-" কি রে বাবু, তুই কিছু বল। "
-"আমি আর কি বলবো, তোমরা যা ঠিক করবে সেটাই হবে।" স্মিত হেসে বলল সুদীপ।
-"তোর বাবার বন্ধু, সমরেশ কাকু একটা মেয়ের কথা বলেছিল, সেটা দেখলে কেমন হয়!"

-"ওহ! হ্যাঁ, তাইতো আমি তো একদম ভুলে গিয়েছিলাম। ও মেয়েটি ভালো। গ্রাজুয়েশন করছে।" ভুলে যাওয়া কথা হঠাৎ মনে পড়লে ঠিক যেমন অবস্থা হয় ঠিক তেমন মুখ করে বললেন সুদীপের বাবা।

-" তবে আর কি, একদিন চলই দেখে আসি। দেখলেই যে নিতে হবে,তেমন ব্যাপার তো না।"

হায়রে সমাজ!
মাঝে মাঝে ট্রেনে হকার দের কাছে, বা কোনো ফুটপাতের দোকানদার মুখ থেকে শুনতে পাওয়া যায়,-"দেখা-শোনা ফ্রি। কেনা-কাটা আপনার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। "

এ যেনও ঠিক তেমনি।


(৩)

-" ছেলের বাড়ি থেকে কোনো ফোন করলো না তো। তিন দিন হয়ে গেল।" রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে বলল রুপার বাবা। কিছুটা হতাশা বেরিয়ে এল তার বুকের ভেতর থেকে। তবে কি ওদের মেয়ে পছন্দ হয় নি!

একমনে ভাত খাচ্ছিল রুপা। খাওয়া থামিয়ে বলল,-"বাবা! তুমি এখনো ফোনের আশায় বসে আছো? কতবার বলেছি, আমার বিয়ে নিয়ে অত ভেবো না। তোমার এমনিতেই হাই প্রেসার।"
-" ভাবি কি রে আর সাধে,মা। তোর ছেলে-মেয়ে হলে বুঝবি,ভাবনারা কোথা থেকে কিভাবে আসে।"
-" আচ্ছা, সে না হয় বুঝবো। তবে এখন ও সব বাদ দাও তো।"

রপার মা এতক্ষন চুপ-চাপ মেয়ে আর বাবার কথা শুনছিলেন। এবার মুখ খুললেন তিনি। -" আরে! হয়তো কোনো কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন ওনারা। ফোন করবে নিশ্চয়। আর মেয়ের বাবা-মা দের অত  অধৈর্য হলে চলে বলো!"

রাগ হচ্ছিল খুব মায়ের কথা শুনে। কিন্তু খাওয়ার সময় আর ঝগড়াঝাঁটি করলো না রুপা। শান্ত হয়ে খেয়ে, নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলো।

এক সপ্তাহ কাটলো।ছেলের বাড়ি থেকে কোনো ফোন এল না আর। ফোন না এলেও একটা চিঠি রুপার সব দু:খ-যন্ত্রনা ভুলিয়ে দিল। পোস্টম্যানের হাত থেকে চিঠি টা খুলে আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিল রুপা। ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,-"মা, চাকরী টা পেয়ে গেছি।"
মাস খানেক আগে রাজ্য সরকারের ক্লার্কের পদের ইন্টারভিউ দিয়েছিল রুপা। সেই চাকরীর জয়েনিং লেটার এসেছে।


রুপার অফিস বেশি দূরে নয়। প্রথমে বাড়ি থেকে বাসে পনেরো মিনিট। তার পর বাস স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে মিনিট সাতেকের মধ্যেই। একদিন অফিস থেকে বেরিয়ে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল রুপা। হঠাৎ একেবারে মুখো-মুখি সুদীপের সাথে দেখা। এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় পেল না রুপা। সুদীপই প্রথমে কথা বলল।-" কেমন আছেন?"
-"ভালো। আপনি? "
-" চলে যাচ্ছে। তো এদিকে কি মনে করে!"
রুপা প্রথমে ভেবেছিল চাকরীর কথাটা এড়িয়ে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললো।-"আমার অফিস এখানে।"
-" কবে চাকরী পেলেন!"
-" এই তো কয়েকদিন হলো।"
-" বাহ!.. আমিও কাজে এদিকে এসেছিলাম। আপনার সাথে দেখা হয়ে গেল।"
কোনো প্রকার উৎসাহ দেখালো না রুপা। বাস আসতেই উঠে পড়লো দু'জন।

(৪)

এবার মেয়ে দেখতে গিয়ে সুদীপের বাড়ির সবার মেয়ে কে এক নজরে পছন্দ হয়ে গেল। রাজপ্রাসাদের মতো মেয়ের বাড়ি। মেয়ে তেমনি দেখতেও সুন্দর। ফর্সা টুকটুকে গায়ের রঙ। টোকা মারলে রক্ত বেরিয়ে আসবে।এরকম তো একটা মেয়ে চাইছিলো তারা এতদিন ধরে। কিন্তু এবার বাধ সাধলো মেয়ের বাড়ি থেকে। সব ঠিকই ছিল। কিন্তু ফোন করতেই মেয়ের বাড়ি থেকে জানালো, মেয়ে এখন বিয়ে করতে চায় না। কথাটা বলে ফোন কেটে দিয়েছিল মেয়ের বাড়ির লোক।

-"আরে মেয়ের কি অভাব নাকি দেশে? আরও মেয়ে আছে।" সুদীপের বাবা বললেন।
-"ভাবতে পারো তুমি, ছেলের মাইনে কত জিজ্ঞেস করে, মেয়ের মা!... আমার ছেলেও ফ্যালনা নয়। " রাগে গুমরে বললেন সুদীপের মা।
-"দেখছি, ওর জেঠু আরেক টা মেয়ের কথা বলেছিল।"
-" তাই দেখো।"

এসব দিন সাতের আগের কথা।
আজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সুদীপ মা কে বলল,-" মা, আজ সেই মেয়েটিকে দেখলাম। বাস স্ট্যান্ডে। নূতন চাকরী পেয়েছে।"
-" কোন মেয়ে?" মা বললেন।
-" ওই যে প্রথম দেখতে গেলাম।"
-"ওহ! চাকরী পেয়েছে?"
-" বেশ কথা বলল, হেসে।"
-"তাই নাকি!... ভালোই ছিল মেয়েটা। শুধু একটু কালো।"
-" কালো হলে আর কি করবে বলো! আজ কাল যা দিন পড়েছে, একজনের টাকায় আর সংসার চলে না। স্বামী-স্ত্রী দু'জনরই চাকরী চাই।"

ছেলের মনের কথা পড়ে ফেললো মা। বলল,-" হ্যাঁ, সেটাও ঠিক। জিনিষ পত্রের দাম যেভাবে হু হু করে বাড়ছে, তাতে একটু ভালো ভাবে থাকতে গেলে এক জনের টাকায় আর সংসার চলবে না। তবে তোর বাবা কে বলি,  একবার ফোন করতে।"
-"দেখ, তোমরা যা ভালো বোঝো। "  সুদীপ উঠে নিজের ঘরে গেল।

(৫)

ফোনটা বেজে উঠলো ঠিক টিভি দেখার সময়। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে রোজ সিরিয়াল দেখা অভ্যেস রুপার। শুধু রুপা নয়,রুপার মা ও মেয়ের সাথে বসে পড়েন। আর বাবা কোথায় যাবেন? বাধ্য হয়ে বাবা ও যোগ দেন মা আর মেয়ের সাথে। ঠিক এমন সময় রুপার বাবার ফোন টা বেজে উঠলো।

উঠে গিয়ে খাটের উপর থেকে ফোন হাতে নিলেন রুপার বাবা।বিস্মিত গলায় চাপা স্বরে বলল -"এই ছেলেটার বাড়ি থেকে ফোন করেছো গো। দেখি কি বলছে..।"
রুপার বাবা ফোন ধরলেন। বেশ কিছুক্ষন কথা হল। তারপর ফোন রেখে হাসি মুখে উত্তেজিত হয়ে বললেন,-" এই শুনছো, ওরা আমার মেয়ে কে পছন্দ করেছে।"
-"তাই না কি গো! তুমি হ্যাঁ বলে দাও নি!"বলল রুপার মা।
-" রুপার থেকে শুনে,ফোন করে জানাবো বলেছি।"
-"তুই কি বলছিস, মা?" রুপার দিকে তাকিয়ে  জিজ্ঞেস করলেন তার মা।


রুপা বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতী। খুব সহজেই ব্যাপার টা বুঝে গেল। তারপর একটু হেসে বাবা-মার  দিকে তাকিয়ে বলল,-" না, মা ওনাদের কে বলে দাও, আমি বিয়ে করবো না।"
আর তোমাদের বলছি,-"যদি আমার বিয়ে দিতে চাও, তবে একটা ভালো, সৎ, বেকার ছেলে দেখো।"

মেয়ের কথা রাখলেন বাবা।

স্বদেশ কুমার গায়েন ( ফ্রেব্রুয়ারী, ২০১৭)

1 comment:

Powered by Blogger.