|| সম্পর্কের গল্প কথা || ছোট গল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন।





(১)

কিছুক্ষন আগে পর্যন্ত আকাশ টা পরিষ্কার ছিল। সৌনক সিগারেট ধরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জানালার ধারে।ধোঁয়া ছাড়ছিল একটা নিদির্ষ্ট সময় অন্তর। সন্ধ্যা নেমে গেছে অনেক আগেই।তবুও চারিদিকে আলো।ঝকঝকে পরিষ্কার। কলকাতা শহরে মনে হয় সন্ধ্যা নামে না।আর নামলেও তা বোঝা যায় না।বাঘাযতীনের এই ফ্লাটের উপর থেকে শহরের অনেকটাই দেখা যায়।এই মুহুর্তে সৌনক ফ্লাটের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দেখছিল সে সব।রাতের বেলা কলকাতা শহরটা যেন এক মায়াবী রুপ ধারন করে। সৌনকের জানালা থেকে সামনের রেল লাইন দেখা যায়। ট্রেন গুলো সারা দিন সাপের মতো শিস দিতে দিতে ছুটছে।ওদের পেটের ভেতর কত মানুষ চলাচল করে সারাদিন। তবুও কোনো ক্লান্তি নেই। ক্লান্তি শুধু ঐশীর।অফিস থেকে ফিরলেই, ওর যত ক্লান্তি জাগে।দিন দিন ও কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে।রাতের বেলা কাছে গেলে প্রায় দিন বলে, আজ মুড নেই;শরীর টা খুব ক্লান্ত লাগছে।অন্যদিন হবে।এই ভাবে কত রাত কাটানো যায়? আর যেদিন বা একটু মুড হয়, সেদিন আর আগের ঐশী কে পায় না সৌনক। মনে হয় যেন,একটা জড় বস্তুকে আঁকড়ে ধরে আছে।ঐশী আগে তো এমন ছিল না!

সৌনক মনে মনে ভাবে।ঐশী ও ঠিক এই একই দোষ দেয় সৌনক কে। সিগারেট টা আর শেষ পর্যন্ত টানলো না সৌনক।নীচে ফেলে দিয়ে জুতো দিয়ে ঘষে দিল। জানালা দিয়ে একবার বাইরে আকাশের দিকে তাকালো।কোনো তারার দেখা নেই। এই তো কিছু আগেই ছিল।তবে কি আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে? সৌনক সেটা বুঝতে পারলো পাঁচ মিনিট পর।ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলো।সেই সাথে টিপ টিপ বৃষ্টি। জানালা গুলো বন্ধ করে দিয়ে, খাটের উপর শুয়ে পড়লো সে।
ঘড়িতে সাড়ে আটটা।অফিস থেকে ঐশী প্রতিদিন ন'টার সময় ফেরে। মাঝে মাঝে সাড়ে ন'টাও বেজে যায়। বাইরে বৃষ্টিটা বেড়েছে বোধ হয়। সাথে ঝড়ের দাপট।এরকম সময় ঐশী কাছে থাকলে কত ভালো হত! জমিয়ে একটা চুমু তো খাওয়া যেত। মনে মনে ভাবলো সৌনক।

সৌনক একটা বড় কোম্পানিতে কাজ করে। মাল্টি ন্যাশানাল কোম্পানি।বেশ বড় পদ,বেতন ও মন্দ নয়।আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই শরীর টা ভালো লাগছিল না তার,তাই অফিস যেতে ইচ্ছে করিনি।ঐশীও একটা বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে।ওর অফিস সল্টলেকের কাছে। সকাল বেলা সৌনক ঐশীকে বলেছিল,"তোকেও আজ যেতে হবে না।ছুটি নিয়ে নে।"
ঐশী বলেছিল,-" না রে আজ হবে না।জরুরী একটা মিটিং আছে।বস কামাই করতে বারন করেছে।আমি অফিসে গিয়ে ফোন করবো। দুপুরে খেয়ে নিবি।"
ঐশী মাত্র একবার ফোন করে খবর ও নিয়েছিল সৌনকের। খাট থেকে উঠে আবার একটা সিগারেট ধরালো সৌনক। চেয়ারে বসলো হেলান দিয়ে। সম্পর্ক টা কি আর সেই বিয়ের আগের মতো নেই! কোথাও কি হারিয়ে যাচ্ছে বাঁধন টা! নইলে,অফিসে তার সামনের টেবিলের বসা রিমি কে দেখলে শরীরের মধ্যে একটা শিরশিরানি জাগে কেন?রিমির সাদা জামার উপর দিয়ে স্পর্ষ্ট উঁচু বুকটা দেখলে ভিতরের আদিম সত্তা যেন জেগে উঠে।চোখ দু'টো তিরের মতো গিয়ে বেঁধে থাকে সেখানে।আর রাত এগারো টার সময় অফিস থেকে ঘরে ফিরে,ক্লান্ত শরীরে ঐশী কেও কাছে টানতে ইচ্ছে করে না। ঐশী গায়ে হাত রাখার চেষ্টা করে কিন্তু কই সে সব অনুভুতি? আর এই জন্যেই ঐশীও তাকে দোষারোপ করে।
রিমি মেয়েটা তাকে বার বার বলে, -"সৌনক দা,চলো একদিন আমার ফ্লাটে।আমি একাই থাকি।কফি খেতে খেতে গল্প করা যাবে।"
রিমি শুধু কফি খেতে ডাকে? না,অন্যকিছু। সৌনকের যেতে ইচ্ছে করে।কিন্তু ঐশীর জন্যে পারে না। কিন্তু এই ভাবে চলতে লাগলে আর কত দিন?রিমির কাছে তো যেতেই হবে। আচ্ছা, ঐশীর ও কি অফিসে কোনো সম্পর্ক আছে? আজকাল যেন একটু বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে ও। ন'টার সময় ঘরে ফেরে,তবে ওর অত ক্লান্তি কিসের? বরং সেদিক থেকে আমি অনেক পরে ফিরি।তাই ক্লান্তি আমারই একটু বেশি আসে। তাই আমি হয়তো ওর মনের মতো সময় ও কে খুশি করতে পারি না।না, আমরা ক্লান্তির দোষ দিয়ে দু'জনই অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছি?
ধুর! কি ভাবছি এসব।সন্দেহ জিনিষ টা খুব খারাপ।একবার কোনো সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়লে,সে সম্পর্ক ভাঙবেই।আর ঐশী ওরকম মেয়েই নয়।কলেজে পড়ার সময় কোনো মেয়ের দিকে তাকালেই,ও একদম সহ্য করতে পারতো না। সারক্ষন আমাকে চোখে চোখে রাখতো। সৌনক কথা গুলো ভাবতে ভাবতে সিগারেট শেষ করে ফেললো।

(২)

ঘড়িতে ন'টা বাজলো।বাইরে একই ভাবে ঝড় বৃষ্টি বয়ে চলেছে।ঐশী এখনো তো এলো না! তবে কি ওর আজ ও আসতে দেরি হবে?ফোন টা নিয়ে ঐশীর নাম্বার টা বের করলো সৌনক। সবুজ বোতাম টিপলো।
-"হ্যালো! বল।"ঐশী ফোন তুললো।
-"কোথায় তুই?"
-"আরে আর বলিস না, প্রচন্ড ঝড়ে কোথায় ইলেক্ট্রিক তার ছিঁড়ে গেছে।ট্রেন সব বন্ধ।দেরি হবে।তুই খেয়ে নিস।"
-"আচ্ছা!"
সৌনক ফোন টা রেখে দিল। আজও সেই একই কেচ্ছা হবে।প্লিজ আজ নয়,খুব ক্লান্ত লাগছে! আবার চেয়ার টেনে বসে পড়ল সৌনক।আমরা কি পরস্পর দুরে সরে যাচ্ছি?না,সেই কথাটাই ঠিক- পুরানো হয়ে গেলে কোনো কিছু আর ভালো লাগে না।প্রতিদিন সেই একই জিনিষ... একঘেয়ে হয়ে আসে। কিন্তু ভালোবাসা কি পুরানো হয়? না,ভালোবাসার মানুষটাই পুরানো হয়ে যায়?
সেই কলেজ লাইফের অফুরন্ত প্রেমের আনন্দ, খুনসুটি,দুষ্টুমি, বিয়ের পর আজ কি সব ফিকে হয়ে এসেছে।তবে কি আর ভালোবাসা নেই আমাদের মধ্যে? এর সঠিক কারন সৌনক খুঁজে পায় না।প্যাকেট থেকে আরেক টা সিগারেট বের করে ধরায়।অতিরিক্ত ভাবনায় ডুবে গেলে, সিগারেটের প্যাকেট শেষ করা সৌনকের অভ্যেস। পরপর তিনটে সিগারেট শেষ করে একটা কারন খুঁজে বের করে সৌনক। প্রতিদিনের এই কর্মব্যস্ততা, সকালে উঠে বেরিয়ে যাওয়া,রাতে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরা,সারাদিন অফিসের কাজের ব্যবস্থায় পরস্পর কে ফোন না করা,সারাটা দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাটানো-এই সব ঘটনা গুলো কি আমাদের নিজেদের কে পরস্পর কে আলাদা করে দিচ্ছে? সারা সপ্তাহ কাজের পর রবিবার এলে,ঐশী ওর দাদার কাছে যায়,অসুস্থ বাবাকে দেখতে।সেদিন টি তেও একসাথে সারাটা দিন কাটানো যায় না। কিছুই আর ভাবতে পারছে না সৌনক। বিয়ের পর সৌনক,ঐশী কে বলেছিল,-"তোর কাজ করবার কি দরকার আছে?আমি তো ভালোই বেতন পাই।আরাম করে রাজরানীর মতো থাক না ঘরে।"
কিন্তু ঐশীর অনেক দিনের ইচ্ছে, উঁচু ফ্লাটে থাকবে।আর ফ্লাটে থাকতে গেলে দু'জনরই ইনকাম দরকার।তার উপর তৃতীয় জন এসে উপস্থিত হলে অনেক খরচ।আর এই বাজারে একটু ভালোমতো থাকতে গেলে স্বামী- স্ত্রী দুজনরই ইনকামের প্রয়োজন আছে।তাই সৌনকের একটু অনিচ্ছা সত্বেও, শেষ পর্যন্ত ঐশী কাজ টা নিয়েছিল।

(৩)

শিয়ালদহ স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে ঐশী।কোন রাতে ট্রেন চলতে শুরু করবে তার ঠিক নেই। পাশে ওর অফিসের কলিগ রনিত দাঁড়িয়ে। রনিত ছেলেটার প্রতি ঐশীর কেমন একটা দুর্বলতা আছে। মাঝে মাঝে রনিতের দিকে তাকিয়ে থাকে। অফিসে তার যেকোনো কাজে হেল্প করে দেয় রনিত। তারপর বাড়ি ফেরার সময় বাস থেকে নেমে গল্প করতে করতে শিয়ালদহ সাউথ প্লাটফর্ম পর্যন্ত আসে।আজও এসেছে। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে একবার উঁকি মেরে রনিত বলল,-" ঐশী আমার বাসায় চলো।এতক্ষন এখানে দাঁড়িয়ে কি করবে! ঝড় বৃষ্টি কখন থামবে ঠিক নেই।ট্রেন ও চলতে হয়তো দেরি হবে।আর আমার এক বন্ধু শিয়ালদহ প্যানেলে কাজ করে,ওর কাছে ফোন করে জেনে নেবো কখন আবার ট্রেন চলতে শুরু করবে।"
-"না,ঠিক আছে।তুমি যাও।"ঐশী বলল।
-"না, না তোমাকে এই অবস্থায় রেখে যেতে পারবো না। তুমি চলো তো।"
রনিতের কথা ফেলতে পারে না ঐশী।আসলে ফেলতে ইচ্ছেও হয় না।শিয়ালদহের কাছেই থাকে রনিত। একাই থাকে।বাবা-মা মুম্বাই তে দাদা-বৌদির কাছে। বৃষ্টিতে আধভেজা হয়ে অটো ধরে রনিতের বাসায় পৌঁছায় দু'জন।চাবি দিয়ে তালা খোলে।ভেতরে ঢুকে আলো জ্বেলে দেয় রনিত। দোতলা বাড়ি।ঢুকেই সোজা সিড়ি দোতলায় উঠে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দু'জন।উপরের সব লাইট জ্বেলে দেয়।তারপর বেডরুমে ঢুকে ঐশীকে সোফায় বসতে বলে রনিত।
-"তুমি একটু বসো।আমি কফি করে আনছি।" রনিত বেরিয়ে যায়।
ঐশীর কেমন একটা অস্বস্তি লাগে। কেন আজ আসলো এখানে? পাঁচ মিনিট পর কফি নিয়ে ঐশীর পাশে সোফায় বসে পড়ে রনিত। একটু বেশি কাছে।ঘরের ভেতর টিউব লাইটের আলো, আধঘুমো মানুষের মতো যেন ঝিমোচ্ছে।ঐশী কফি মগে চুমুক দেয়।রনিতের চোখ দুটো যেন তার দিকে। কি চাইছে ও?
-"তোমাকে আজকাল খুব মনমরা দেখি।কি হয়েছে?"রনিত বলে।
-"কিছু না তো।"ঐশী উত্তর দেয়।
রনিত হেসে বলে,-"কিছু তো একটা হয়েছে।মুখ দেখলেই বোঝা যায়।"
-"তাই নাকি! এখন তবে কি বুঝতে পারছো?" ঐশী বলল।
বাইরে বৃষ্টি টা বোধহয় থেমে গিয়েছে।ঝোড়ো হাওয়া ও নেই। আরেকটু হলেই,ঐশীর উষ্ণ ঠোঁট দুটো রনিতের ঠোঁটের ফাঁকে ঢুকে যেত।নিজেকে সামলে নিল ঐশী। নিজের কোমর থেকে রনিতের হাত দুটো সরিয়ে দিল সে।
-"কি হল ঐশী?" রনিত জিজ্ঞেস করল।
-"কিছু না।আমি এবার উঠি।"
ঐশী,রনিতের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা রাস্তা ধরে হেঁটে শিয়ালদহ স্টেশনে চলে এল। সারা শরীর কাঁপছে তার। ট্রেন আবার স্বভাবিক। সোনারপুর গামী একটা ট্রেনে উঠে বসলো ঐশী। মনের ভেতর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে।আরেক টু হলেই,সব শেষ হয়ে যেত।সৌনক কে এভাবে সে কোনোদিন ঠকাতে পারবে না। রাতে শোবার সময় সৌনক কাছে টানতেই,ঐশী বললো,-"প্লিজ! আজ ছাড়।মনটা একদম ভালো নেই।"
-"কোন দিন তোর ভালো থাকে? আজ মন খারাপ,তো কাল ক্লান্তি!"
-"তুই তো ওই একই কথা বলিস। তখন কিছু হয় না?"
-"হু!বলি।তবে, আজকাল কাল তুই একটু বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছিস!"
-"কি বলতে চাইছিস তুই?"
-"সেটা ভালো করে বুঝতে পারছিস তুই!"
দশ মিনিট ধরে দু'জনের তর্ক চললো।তারপর থেমে গেল। সেই কলেজ লাইফে তাদের প্রায় ঝগড়া হত।কিন্ত পাঁচ মিনিটের বেশি গড়াই নি। আজই শুধু দশ মিনিট গেল। কিছুক্ষন পর শৌনক একটা সিগারেট ধরালো।তারপর টয়লেট গেল।ফিরে এসে আলোটা নিভিয়ে, ঐশীর বিপরীত দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল।


(৪)


সকালবেলা কারও মধ্যে কথা হল না।যে যার মতো কাজে বেরিয়ে গেল। এভাবে আর কতদিন চলে! তার ও একটা মন,ইচ্ছে সবকিছু আছে। এরকম ফ্যাকাশে,রঙচটা মরচে ধরা সম্পর্ক নিয়ে দিনের পর দিন বয়ে বেড়ানো যায় না। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে সৌনকরা এসে থামলো। গাড়ি থেকে নামলো দু'জন।রিমি আর সৌনক। সামনেই রিমির ফ্লাট।অফিস থেকে বেরোনোর সময় রিমি বার বার বলছিল,-"সৌনক দা,চলো আজ আমার ফ্লাটে।তোমার বাড়ি যাওয়ার পথেই তো পড়ে।একটু কফি টেস্ট করে যেও।"
কথাটা বলে মুচকি হেসেছিল রিমি। রিমির কথায় কি অন্য ইঙ্গিত আছে?আর থাকলেও বা কি! আজ সে রিমির সাথে যাবে। বেশ সাজানো গোছানো ঘর।মেয়েরা মনে হয় একটু সাজগোজে বেশি মন দেয়,সে নিজের শরীর হোক বা, বেডরুম।
-"শৌনক দা,ওপাশে বাথরুম আছে চোখে মুখে জল দিয়ে নাও।আমি একটু কফি করে আনি।" রিমি কিচেনে ঢুকতে ঢুকতে বললো।
শৌনক বাথরুমে গেল।চোখে মুখে বেশ করে জল দিল।অনেকটা ঠান্ডা লাগছে।বাথরুম থেকে বেরিয়ে আবার শোফায় এসে বসলো। কিছুসময় পর রিমি দু'টো কফি মগ নিয়ে এসে তার পাশে বসে পড়ল। -"সৌনক দা,ভালো লাগছে?"কপি মগ টা শৌনকের হাতে দিল রিমি।
শৌনক কফিতে একটু চুমুক দিয়েই বলল,-"বাহ! দারুন টেস্ট হয়েছে।"
রিমি দুষ্টিমির সুরে বলল,-"ওহ! তুমি শুধু কফি টেস্ট করতে এসেছো?"
সৌনক বুঝতে পারছে,রিমি কি বলতে চাইলো।
-"কি হয়েছে সৌনক দা তোমার? আজকাল তোমাকে বড্ড ফ্যাকাশে লাগে।আমাকে বলো!" রিমি বলল।
সৌনক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। কফি মগটা রেখে,রিমি কে জড়িয়ে ধরলো খুব জোরে। ঠোঁটের ভেতর ঠোঁট রাখলো।শৌনক যেন পাগল হয়ে উঠেছে।সেই সাথে রিমি ও। দু'মিনিট পর রিমিকে ছেড়ে দিয়ে শৌনক হাঁপাতে লাগলো।মুখের উপর থেকে নীচে একবার হাত টানলো।মুখটা ঘেমে উঠেছে।
-"কি হল,সৌনক দা! ছেড়ে দিলে কেন?চলো আমার বেডে?" রিমি আরও কাছে এগিয়ে এল শৌনকের।
শৌনক সরে গিয়ে বলল,-"না,আজ উঠি।"
শৌনক আর এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না। এখানে থাকলে,আরও কিছু ভুল হয়ে যেতে পারে।রিমির ফ্লাট থেকে বেরিয়ে গাড়ি ধরে সোজা চলে এল শিয়ালদহ স্টেশনে।তারপর বাড়ির পথ।

কলিং বেলের আওয়াজে,ঐশী উঠে দরজা খুলে দিল।শৌনক ভেতরে ঢুকলো।তারপর বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল।তারপর টেবিলে ঢাকা দেওয়া খাবার খেয়ে,খাটে এসে শুয়ে পড়ল। ঐশীর এখনো কোনো কথা বলেনি! খুব অস্বস্তি হতে লাগলো শৌনকের।
-"ঐশী!" সৌনক হাত রাখলো ঐশীর হাতে উপর।
-"কি!"
-"চল না,আমরা আবার সেই কলেজের দিন গুলোতে ফিরে যাই। দিনের পর দিন এই ব্যস্থতা যেন আমাদের সম্পর্কটা কে গিলে খেয়ে নিচ্ছে।"
ঐশী সৌনকের দিকে ঘুরে,জড়িয়ে ধরলো সৌনক কে। বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেললো। বললো, -"চল না,কোথাও বেড়িয়ে আসি।আমার আর ভালো লাগছে না।সেই সব দিন গুলোতে আমরা যেমন শহরের এই ব্যস্থতা কে ফেলে কোনো শান্ত মফস্বল শহরে ঘুরতে বেরিয়ে পড়তাম!"
শৌনক আরও কাছে টেনে নিল ঐশী কে।-"সামনের রবিবার যাব।"


(৫)

আজ রবিবার।ঘড়িতে বিকেল পৌনে চারটে। বাঘাযতীন স্টেশন থেকে টিকিট কাটলো দু'জন। ক্যানিং লোকাল।কলেজে পড়ার সময় একবার গিয়েছিল দু'জন।জায়গাটা শান্ত নয়।তবে নদীর দিকটা বেশ নির্জন।অতটা কোলাহল মুখর নয়। সেসময় বেশ ভাল লেগেছিল দু'জনের।কিন্তু সময়ের অভাবে বেশিক্ষন থাকা হয়নি।আজ আবার সেখানে যেতে ইচ্ছে করলো।
নদীর পাড়ে যখন দু'জন পৌঁছালো তখন বিকেল গড়িয়ে পড়েছে নদীর চরে।শান্ত হাওয়া বইছে। ঠান্ডা,শীতল।অনেকেই বসে আসে নদীর এই পুরানো ঘাট টি তে।এক দিকে বেশ কয়েক জন প্রেমিক- প্রেমিকা চোখে পড়ল সৌনকের।হেসে হেসে গল্প করছে তারা।প্রেম করার জন্যে এরকম মুক্ত জায়গা মনে হয় আর নেই! ভাঁটার সময় এই নদীতে জল থাকে না।হাঁটু পর্যন্ত নেমে যায়।সৌনক নদীর গভীরে তাকিয়ে দেখলো,বেশ কিছু ছেলে-মেয়ে হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে আছে। ঐশীর হাত ধরে সৌনক বলল,-"চল,আমারাও ওই জলে গিয়ে দাঁড়াই।"
-"না।আমার ভয় করে।"ঐশী বলল।
-"আরে কিছু হবে না।চল,না!" সৌনক জোর করে টেনে নিয়ে গেল ঐশী কে।দু'জন হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে নদীতে নামলো।
-"উফ! জলের কি টান!" ঐশী জড়িয়ে ধরলো সৌনক কে।
দু'জন দাঁড়িয়ে আছে।কতদিন পর যেন তারা মুক্ত পাখির মতো।
-"ভালো লাগছে তোর? সৌনক জিজ্ঞেস করলো ঐশী কে।
-"না,একদম না।" বলে হাতে করে এক মুঠো জল নিয়ে সৌনকের গায়ে ছিটিয়ে দিল ঐশী।
-"ওই,কি করছিস কি! ভিজে যাব তো!"
-"বেশ করছি।তুই ভিজে যা।আজ তোকে ভিজিয়ে দেব।" আরও জল ছিটিয়ে দিল ঐশী।

সন্ধ্যা নেমে গেছে।কালো হয়ে এল নদীর জল। সামনে দিয়ে একটা ডিঙি নৌকা ধীরে ধীরে যেতে দেখলো ঐশী।একটা হাঁক দিল মাঝি কে।
-"ও মাঝি! আমাদের নিয়ে যাবে?"
-"কোথায় যাবেন আপনারা?ওপারে যাওয়ার জন্য ব্রিজ আছে।" মাঝি হেঁকে বললো।
-"আমরা ওপারে যাব না।তোমার যেখানে ইচ্ছা নিয়ে চলো।নদীতে ঘুরে বেড়াবো।তোমার উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও পাবে।" ঐশী ও হাঁকলো।
সৌনক হাত ধরে টানলো ঐশীর।
-"কি করছিস! রাত হয়ে এসেছে, আমাদের এবার ফিরতে হবে।"
-"তুই থামতো।"
নৌকায় উঠলো দু'জন।নদীতে মনে হয় জল বাড়ছে।না হয়,যেখান দিয়ে নৌকা টা যাচ্ছে, সেখানে একটু গভীরতা আছে।একটু একটু করে ভেসে চললো নৌকা। সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে গেছে।ঠান্ডা জলো হাওয়া এসে শরীরে শিরশিরানি জাগিয়ে তুলেছে। আকাশে বড় চাঁদ উঠেছে।আজ কি পুর্নিমা?হবে হয়তো,নইলে এত আলো কেন! জোছনালোক নদীর জলে ঢেউ খেলতে লাগলো।চিক চিক করছে নদীর চর।সে এক অপুর্ব মায়ালোক। আবছায়া আলো।কারও মুখ স্পর্ষ্ট দেখা যায় না।নৌকার একপ্রান্তে দু'জন গা ঘেঁষে বসে আছে। চুপচাপ।কারও মুখে কথা নেই। অন্যপ্রান্তে মাঝি বসে হাল টানছে। জোছনালোকে মাঝি টা কে মাটির ঢিপির মতো মনে হল ঐশীর।
-"ওই চুপচাপ কেন এত!"সৌনকের হাত ধরলো ঐশী।
সৌনক কিছু বললো না।শুধু ঐশীর চোখের দিকে তাকালো। ভালোবাসা এখনো পুরানো হয়নি। কোনোদিন পুরানো হয় ও না।নইলে আজ এত ভালো লাগছে কেন? একটু একটু করে সৌনকের মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিল ঐশী। সেই অপরুপ চন্দ্রালোকের সৌন্দর্য,জলো বাতাশ, নোনা জলের অন্তহীন ছলাৎ ছলাৎ শব্দ গায়ে মেখে আজ দু'টো সুখপাখি ডানা মেলেছে ভালোবাসার আকাশে। এভাবে জড়িয়ে ধরে কতক্ষন কেটে গেল কারোও খেয়াল নেই।মাঝির হাঁকে চমক ভাঙলো দু'জনের।
-"ও দিদি ভাই,রাত অনেক হলো। শেষ ট্রেন দশটা কুড়ি তে।"
হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো সৌনক।দশটা বাজে।মাঝি তাড়াতাড়ি তিরে নৌকা ভিড়ালো। নৌকা থেকে পাড়ে নেমে,পার্স থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে মাঝির হাতে দিয়ে বললো,-"আবার আসবো।"
মাঝি নোট দেখে বললো,-"এত টাকা!খুচরো নেই।"
-"খুচরো চাইনি।তুমি নাও।"
মাঝির হাতে টাকাটা গুঁজে দিয়ে দু'জন ছুটলো প্লাটফর্মের দিকে।
~~~~

এবার 'গল্পপড়ুয়া' ব্লগের সমস্ত লেখা পড়ুন মোবাইল অ্যাপে। ডাউনলোড করে নিন 'গল্পপড়ুয়া' অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ। ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.