|| অসমাপ্ত গল্প || ছোট গল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন


আস্তে করে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে, দরজাটা হাল্কা করে বন্ধ করে দেয় নিশা। আগোছালো ঘরটা, অপরিষ্কার, চারিদিকের কোনায় কোনায় মাকড়শার জালে ভর্তি। টেবিলের উপর টা তে বই গুলোর উপর পুরু ধুলোর স্তর,- অনেকদিন ঝাড়াঝাড়ি না করলে যেমনটা হয় আর কি! খাটের উপর জামা প্যান্ট গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।
- "কি রে রিজু! তোর এমন অবস্থা কেন? "— ঘরের চারিদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে নিশা প্রশ্ন করলো।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে লোহার রড টা ধরে বাইরের আকাশ টা দেখছিল রিজু। নিশার ডাকে পেছন ফিরে  তাকাল,- "তুই! কখন এলি?"
— "ভূমিকা করিস না। নিজেকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার মানে টা কি? নিজের চেহারাটা কি হয়েছে, একবার আয়নায় দেখেছিস? জেঠু, জেঠিমার সাথেও নাকিআজকাল ভাল করে কথাও বলিস না!"
নিশার চোখের দিকে তাকায় রিজু।-" তাতে তোর কি রে নিশা! আমার জন্যে তোকে এত ভাবতে বলছে কে?"
একটা বিরক্তিকর নিশ্বাস ফেলে নিশা।-"রিজু! তুই আমার সব থেকে কাছের বন্ধু। তোর এই অবস্থা কি করে সহ্য করব বল?"
হ্যাঁ,এবার আপনারা ঠিক ধরেছেন রিজু আর নিশা হল বন্ধু। শুধু বন্ধু বললে ভুল হবে,- একেবারে অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু। বাবা, মায়ের পর নিশার যদি খুব প্রিয় কেউ থেকে থাকে- তবে সে হল রিজু।


এ গল্পের শুরু হয়েছিল অনেকদিন আগে ,তাই একটু আগে থেকেই আপনাদের কে বলা যাক। নিশার বাবা কমলেশ বাবু চাকরী সূত্রে যখন এই রামমোহন পল্লী তে আসেন, তখন নিশার বয়েস দশ।পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্রী সে। রিজুদের বাড়ির পাশেই জায়গা কিনে দোতালা বাড়ি তৈরি করছিল তারা। আর সেই সূত্রে প্রতিবেশী হিসাবে এই দুই বাড়ির মধ্যে মাখামাখি, বন্ধুত্ব। রিজুর সাথে একই স্কুলে পড়ত নিশা,শুধু স্কুল নয় একে বারে কলেজ পর্যন্ত দুজন আলাদা হয়নি। সারাদিন এত ঝগড়া, মারপিটের পরেও একে ওপর কে না দেখে থাকতে পারে না ওরা।
তখন ক্লাস টেনে পড়ে দুজন। খুব ঝগড়া হল একদিন। তিন দিন কথা হয়নি। এমনকি রিজু ও ঘর থেকে বেরোই নি। চারদিনের মাথায় রিজুর ফোনে ম্যাসেজ এল। নিশা লিখেছে,-তোকে কথা বলতে হবে না। কিন্তু একবার ছাদে আয় প্লিজ! তোকে না দেখতে পেলে আমার মন টা ভাল লাগে না।
রিজু চুপ করে থাকেনি। সঙ্গে সঙ্গে ম্যাসেজের উওর দিয়েছিল, ও লে বাবা! তোর বিয়ে হয়ে গেলে কি করবি তখন?
নিশার রিপ্লাই এল,  -তখন আলাদা ব্যাপার! আর বিয়ে হলেও বা কি, তুই আমার মনের একটা জায়গায় সব সময় থাকবি।
রিজু আর ঘরের ভেতর থাকেনি। ছাদে গিয়ে নিশার সামনা সামনি দাঁড়িয়ে ছিল।

সেদিন এক দুপুরে কলেজের মেহগনি গাছের নীচে রিজু আর নিশা বসেছিল। নিশা বলল,"- রিজু, কলেজের কোনো মেয়েকে তোর পছন্দ হয় না ?
রজনীকান্তের স্টাইলে আঙুলে চশমা টা কয়েক পাক ঘুরিয়ে চোখে পরে নিল রিজু। বলল,-" ভাট! কলেজে একটা প্রেম করার মতো মেয়ে আছে নাকি? পারফেক্ট ফিগার কোনো একটা কেও দেখলাম না।"
- "ওরে আমার হিরের টুকরো ছেলে রে! তুই কি ফিগার দেখে প্রেমে করিস? চিন্তা করিস না, তোর জন্য একটা পারফেক্ট ফিগার দেখে মেয়ে এনে দেব" কথাটা বলে হো হো করে হাসতে হাসতে নিশা, হাত দিয়ে একটা স্কেচ দেখাল রিজুর সামনে।
নিশার মাথায় একটা চাটি মেরে রিজু বলল,"- আজকাল তোর মুখে ,কোনো কথাই আটকাচ্ছে না। বাড়ি চ' কাকীমাকে বলছি।"
রিজুর নাক টানলো নিশা। বলল,- "তোর সাথেই শুধু এরকম একটু বলি! এর মধ্যে আবার কাকীমাকে আনছিস কেন?"
দুষ্টমি করতে করতে কলেজের তিনটে বছর কখন যেন পার হয়ে গেল। এখন আর কলেজে আড্ডা টা হয় না,সন্ধ্যে বেলা নিশাদের বাড়ি বসেই সবাই মিলে সিরিয়াল দেখতে দেখতে আড্ডাটা হয়।
একদিন সন্ধ্যায় রিজু নিশাদের বাড়ি যেতেই নিশার মা বলল, — "রিজু! কাল কিন্তু কোথাও যাবে না। রিয়াকে একটা পাত্র পক্ষ দেখতে আসছে। তোমার বাবা মাকে বলেছি, তুমি তো বিকালে বাড়ি ছিলে না।"
আরেকটু হলেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যেত রিজু, নিজেকে কোনো রকমে সামলে নিল।-" খুব ভাল খবর তো কাকীমা! নিশা কোথায়?"
-"ও উপরে ওর রুমে আছে।"
এক ছুটে সিঁড়ি দিয়ে উঠে, নিশার রুমে ঢুকলো রিজু।খাটের উপর বসে সাদা কাগজের উপর তুলি দিয়ে ছবি রঙ করছে নিশা। কোনো কথা না বলে, ছবির উপর গড়িয়ে শুয়ে পড়ল রিজু।
- "দিলি তো ছবিটা নষ্ট করে।"—তুলিতে রঙ মাখিয়ে রিজু মুখে মাখিয়ে দিল নিশা।
একটা দুষ্ট হাসি নিয়ে রিজু বলল,- "কি রে! তোর আর তর সইছে না! এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে হচ্ছে?"
- "ওই, বাজে কথা বলবি না। হঠাৎ করে মামা রা ঠিক ফেলল।"
রিজু, নিশার পায়ে চিমটি কেটে বলল,- "তোর তো একটা হিল্লে হয়ে গেল। এবার আমার দিকে একটু দেখ।"
- "দেখব, দেখব! একদম পারফেক্ট মেয়ে আনতে হবে তো! " হাসলো নিশা।


রাত সাড়ে ন'টা। রাতের খাওয়া ও শেষ। আজ আর পড়তে বই নিয়ে বসতে ইচ্ছে করলো না রিজুর। রাতে বিছানায় শুয়ে রিজু, এপাশ ওপাশ করতে লাগল। কিছুতেই ঘুম আসছে না। কিন্তু এরকম তো কোনোদিন হয় না। জানালাটা খুলে নির্জন রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল। মনের ভেতর কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে তার। যখন নিশার বিয়ের খবর টা শুনেছিল তখন একটু অবাক হলেও, মনে মনে আনান্দ ও হচ্ছিল।—কিন্তু এখন এমন হচ্ছে কেন? কোনো উওর পেল না রিজু। কোল বালিশ টা কে আঁকড়ে ধরে শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন পাত্রপক্ষ দেখতে এল নিশা কে। ছেলে কে অপছন্দ করার কারন নেই। ব্যাঙ্গালোরে একটা বড় বেসরকারি কোম্পানি তে সন্মানীয় পদে চাকরী,দেখতেও মন্দ নয়। নিশার পাশে পুরোপুরি মানানসই। নিশাকেও খুব পছন্দ ছেলের মা। ছেলের তাড়া ছিল। বোধ হয় বিয়ে করেই ব্যঙ্গালোরে ফিরবে।তাই খুব তাড়াতাড়ি বিয়ের দিনক্ষন ও ঠিক হয়ে গেল। পাত্র পক্ষের সবাই চলে যেতেই নিশা, রিজু কে জিজ্ঞেস করল,—" কেমন দেখলি রে ছেলেকে?"
হাতে বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাথা একসাথে লাগিয়ে রিজু হেসে বলল, - "একদম পারফেক্ট।"
-" যাহ! " নিশার চোখে -মুখে লজ্জা।

আগামীকাল নিশার বিয়ে। বিয়ের আগের দিন রাতে রিজুর মন টা যেন খুব খারাপ করতে লাগল। কোথায় যেন একটা কষ্ট হচ্ছে তার। চোখের দু টো পাতা এক করতে পারছে না। বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগল রিজু। বার বার কেন নিশার মুখ টা তার চোখের সামনে আসছে? বার বার কেন মনে হচ্ছে,- নিশা শুধু তার। নিশাকে ছেড়ে, নিশা কে না দেখে সে কি ভাবে থাকবে?
সারা বাড়িটা রঙিন আলোয় ঝলমল করছে। সানাই বাজছে, আত্মীয় স্বজনে গমগম করছে পুরো বাড়িটা। বরের গাড়ি এখনো আসেনি। দোতালায়,দরজাটা খুলে নিশার ঘরে ঢোকে রিজু। লাল শাড়িতে নিশাকে যেন আজ অন্যরকম লাগছে। এ রূপ রিজু আগে কখনো ও দেখিনি। ঘরের ভেতর কেউ নেই, আয়নার সামনে বসে আসে নিশা। রিজু কে দেখে ঘুরে বসল নিশা,- "ওই! বোস ওখানে। কেমন লাগছে আমায়?"
রিজু চুপ করে বসে রইল। কিছুটা অবাক হল নিশা। আবার জিজ্ঞেস করল,- "কি রে! চুপ করে আছিস?"
নিশার দিকে চোখ তুলে তাকাল রিজু। বলল,— "আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে নিশা।"
— "সে তো আমারো হচ্ছে। তোকে যে আর প্রতিদিন দেখতে পাব না।"
— "ও কষ্ট নয় রে। "
-" মানে?"
- "তুই বিয়ে টা করিস না নিশা।তোকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। মনে হয় তোকে আমি ভালবেসে ফেলেছি, নইলে তোর পাশে ওই ছেলেটি কে কেন মেনে নিতে পারছি না?বার বার কেন মনে হচ্ছে তুই শুধু আমার, তোর উপর শুধু আমার অধিকার।"
নিশা বিদ্যুৎ এর মতো এক ঝলকে চেয়ার ছেড়ে রিজুর সামনে এসে দাঁড়াল,-"কি বলছিস রিজু এসব! আজ আমার বিয়ে! তোর মাথা ঠিক আছে তো?তুই আমার ছোটোবেলার বন্ধু। তুই কি করে এসব ভাবলি!....  আর আজ কেন বললি! "
- "বিশ্বাস কর নিশা,এই অনুভব টা আগে কখোনো হয়নি। কিন্তু তোর বিয়ে যেদিন ঠিক হল সেদিন থেকে সব কেমন যেন ওলোট পালোট হয়ে গেল।তোকে অনেকবার বলতে চেয়েও পারেনি।" নিশার হাত ধরলো রিজু।
-"কি করছিস রিজু! হাতটা ছাড়। পাগলামো করিস না প্লীজ! কেউ দেখে ফেলবে।"
 উলুধ্বনির শব্দ শোনা যাচ্ছে মনে হয় বরের গাড়ি ঢুকছে। চোখের কোনায় এক ফোঁটা জল নিয়ে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে এল রিজু। দুলতে থাকা দরজার পর্দার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল নিশা।


বিয়ের একদিন পর বরের সাথে ব্যাঙ্গালোরে চলে গেল নিশা। দীর্ঘ দু'মাস পর আজ আবার  তার বাবা, মার কাছে এসেছে সে । রিজু দের বাড়িতে গিয়ে,তার বাবা মাকে প্রনাম করে নিশা।
-" জেঠিমা, রিজুকে দেখছি না তো?"
— " ওর কথা আর বলিস না। হঠাৎ করে কেমন যেন হয়ে গেছে। আমাদের সাথে ঠিক মতো কথা বলে না, ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করে না।"
নিশার বুক টা কেঁপে উঠল। ভিতর থেকে যেন একটা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল।
—" কি যে হল, ছেলে টার ? সারাদিন একা একা ঘর বন্ধ করে বসে থাকে। তুই যা উপরে- দেখ, ওকে ডেকে আনতে পারিস কিনা? আমি জল খাবার তৈরী করছি তোদের জন্যে।"

একবুক চাপা কান্না নিয়ে,সিঁড়ি দিয়ে উঠে তাই রিজুর ঘরে ঢুকে, দরজা টা হাল্কা করে বন্ধ করে দেয় নিশা।..........
-" রিজু, নিজেকে কেন এভাবে শেষ করছিস?"
রিজু খুব বিরক্ত হয়। বলে,- "আমাকে নিয়ে তোর ভাবতে হবে না। তুই সুখে আছিস।"
নিশা চোখের জল মোছে, - "হ্যাঁ! আমি সুখে আছি। কিন্তু তুই এটা কি জীবন কাটাচ্ছিস?"
- "তুই এখন যা নিশা।ভাল লাগছে না আমার।"
-" রিজু, এরকম করিস না প্লীজ! আমাকে সারা জীবন অপরাধী করে রাখিস না।"
রিজু রাগে,বিরক্তি তে একটা বই এর পাতা টেনে দু' ভাগ করে দেয়,- "তুই আমাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছিস?"
নিশা, এগিয়ে গিয়ে দু হাতে রিজুর মাথাটা ধরে। ওর চোখের দিকে তাকায়,-" তুই কি চাস রিজু? তুই তো আমাকে পেতে চেয়েছিলিস,না?  নে, আমাকে জড়িয়ে ধর...!
- "ছাড়!, ছাড় আমাকে। কি করছিস নিশা?" তুই এখন অন্যের স্ত্রী।
নিশা রিজুর হাতটা খুব জোরে চেপে ধরে বলল, — কেন ছাড়ব! তুই কি চাস বল? তোকে চুমু খেতে হবে,না তোর সাথে আমার এক রাত থাকতে হবে?"
নিশা নিজের ঠোঁট দুটো, রিজুর ঠোঁটের খুব কাছে নিয়ে যায়। এক ধাক্কায় নিশা কে দুরে ঠেলে দিয়ে খাটের উপর বসে পড়ে রিজু। সারাটা শরীর যেন তার কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা গলায় রিজু বলল,- "কি বলছিস তুই এ সব? তোকে ভালবাসি,তার মানে এই নয় যে, তোর সাথে এই সব করব .....!"
দুহাতে চোখের জল মোছে নিশা,- "তুই এখনো ছোটো আছিস রিজু। ভালবাসা মানে শরীর ছাড়া আর কিছু নয়। তোর এই অবস্থা দেখে কি করে আমি সুখে থাকব বল? তুই চাস না, আমি ভাল থাকি?"
রিজু নির্বাক হয়ে নিশার জলভরা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে নিশার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মুখে হাসি নিয়ে মাথায় একটা আলতো চাপড় মেরে বলে,- "তুই না বোকা খুব! তোকে ভালবাসার হ্যাঙ্গওভার কাটানোর একটু সময় দিবি না? এর পরের বার যখন আসবি,তখন দেখবি ভাল হয়ে গেছি।"
রিজুর পেটে জোরে চিমটি কেটে ধরে নিশা,- "বল, আর কখনো গোমড়া মুখো হয়ে বসে থাকবি না?"
- "আচ্ছা বাবা! আর থাকব না।"
নিশা' রিজুর মাথাটা নিজের কাছের দিকে টেনে নেয় পরম আদরে। রিজুর কপাল টা ভিজে উঠেছে, নিশার দুই ঠোঁটের স্পর্শে।—" নীচে চল। জেঠিমা জল খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে।"

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.