|| প্রথম দেখা || ছোটগল্প ||~ স্বদেশ কুমার গায়েন।



এই দিন'টা না এলেই বোধ হয় ভালো হত-
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ভাবলো স্বাগতা। কি দরকার ছিল দেখা করার? বেশ তো ভালোই কেটে যাচ্ছিল গল্প করে। রোজ দিন-রাত ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে গল্প। শুধু হাতের খসখস শব্দ। মন্দ ছিল কি? হয়তো মন্দ ছিল না। কিন্তু একদিন তো দেখা করতেই হতো। আর শুভদীপ তো সব জানতেই পারতো। কত দিনই বা লুকিয়ে রাখতো এই চরম সত্যি টা!

কিছুসময় পর স্বাগতার মা এসে ঘরে ঢুকলেন। চেহারায় ব্যস্ততা। বোধহয় বাইরে কোনো জরুরী কাজ করছিলেন। কাজ ছেড়ে উঠে এসে কিছু খুঁজছেন। কিছুক্ষন ঘরের ভেতর ইতস্তত ঘোরাঘুরি করে বললেন-" কি রে, কোথাও বেরোচ্ছিস?"
-"হু।" মুখ দিয়ে শব্দ করলো স্বাগতা।
-"যেখানেই যাস, সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরিস।"
মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো স্বাগতা। তারপর পারফিউম টা হাতে নিয়ে নিজের জামার উপর ছড়ালো। আর কিছুটা মায়ের কাপড়ের উপর উড়িয়ে দিল। ভুর ভুর করে গন্ধময় হয়ে উঠল সারা ঘর।
-"ধেত! কি যে করিস না তুই। পাগলি মেয়ে একটা।" স্বাগতার মা চলে গেলেন।



এখনো পুরোপুরি বিকেল নামেনি আকাশে। জানালার পাশ দিয়ে বাইরে একবার চোখ রাখলো স্বাগতা। রোদের ঝিলিক খেলে যাচ্ছে নীল-সাদা মেঘে। কম্পমান গাছের পাতায় রোদের চিরিক কাটছে। বালু চিকচিকের মতো। ঘাড়ে একটা ছোট ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো সে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে আবার। মায়ের আদেশ। বাড়ির গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে একবার আকাশের দিকে চাইলো স্বাগতা। তারপর ব্যাগ থেকে রোদ চশমা টা বের করে চোখে পরলো। স্বাগতার বাড়ি দমদম। দমদম মেট্রো স্টেশন থেকে খুব বেশি দূরে নয়। অটোতে মিনিট বারো-পনেরো লাগে।রাস্তায় নেমে একটা অটো দেখতে পেল। হাত দিয়ে থামালো সেটাকে। তারপর উঠে বসলো।

মেট্রো স্টেশনে অতটা ভিড় নেই এখন। অটো থেকে নেমে, ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে কিছুটা হেঁটে মেট্রো প্লাটফর্মে ঢুকলো স্বাগতা। তারপর রবীন্দ্র সদন যাওয়ার একটা টিকিট কাটলো।  দমদম থেকে রবীন্দ্র সদন যেতে মিনিট কুড়ি-পঁচিশ লাগে। আগেও অনেক বার গিয়েছে সে। তাই রাস্তাটা অজানা নয় তার কাছে। অবশ্য কলকাতার অনেক কিছুই তার জানা। বাবা- মার সাথে অনেক জায়গা ঘোরা আছে। সময় টা বেশি নয়। কিন্তু বুকের ভেতরটা উত্তেজনায় দপ দপ করছে। আর মিনিট কুড়ি পর তার ভালোবাসার মানুষ কে প্রথম দেখতে পাবে । শুভদীপের ওখানেই থাকায় কথা। গত রাতে ফোনে মেসেজ করে বলেছিল। মিনিট পাঁচেক পর  ঝম ঝম শব্দ করতে করতে গাড়ি এসে থামলো প্লাটফর্মে। সেই সাথে অল্প মানুষের কোলাহল ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। সবার নামা হয়ে গেলে, একটা কামায় উঠে ফাঁকা সিট দেখে বসে পড়লো স্বাগতা। সত্যিই বুকের ভেতর টা গীটারের টুং টাং এর মতো কম্পিত হচ্ছে। একটা সুরের সৃষ্টি হচ্ছে। ভালোবাসার সুর না, বিষাদের? আজ প্রথম দেখা টাই কি, শেষ দেখা হবে?


সম্পর্ক টি বেশি দিনের নয়। এই মাস খানেক হবে। হিসেব করে দেখলে মাস খানেক ও হয়নি। এখনো দিন পাঁচেক বাকি। সেদিন সন্ধ্যায় আঁকার ক্লাস থেকে ফিরে ফেসবুক টা লগ ইন করেছিল স্বগতা। ঘরে থাকলে তার দু'টো জগত তৈরী হয়। প্রথমত হল, বই পড়া আর দ্বিতীয়ত হল গান শুনতে শুনতে ফেসবুক। ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট করার পর টিভি দেখা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। চেনা পরিচিত ছাড়া আর তেমন  কারও সাথে ফেসবুকে কথা বলে না স্বাগতা। অনেকেই মেসেজ করে, কিন্তু কোনো রিপ্লাই সে দেয় না। তাই ধৈর্য হারা হয়ে সবাই মেসেজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সেদিন ফেসবুক টা অন করতেই একটা ছেলের মেসেজ পেল। এক সাথে পাঁচটা মেসেজ। শুভদীপ নাম ছেলেটির। বাড়ি গড়িয়া। অনেক দিন আগে একবার ছেলেটির প্রোফাইলে ঢুকেছিল স্বাগতা। আজ আরও একবার ঢুকলো। মন্দ দেখতে নয় ছেলেটি। চোখে সানগ্লাস পরে, কোনো গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য ছবিতে আজকাল সবাই কে বেশি সুন্দর লাগে।যেদিন থেকে সে অ্যাকাউন্ট খুলেছিল, সেদিন থেকেই এই ছেলেটি তার ফ্রেন্ডলিস্টে। কোনোদিন কথাও হয়নি। ফেসবুকে রোজ নূতন নূতন বন্ধু জোটে আর হারিয়ে যায়। সেই প্রথম অ্যাকাউন্ট খোলার দিনের কোনো বন্ধু কে আর অন লাইনে দেখা যায় না। কিন্তু এ ছেলেটি তিন বছর ধরে একই ভাবে আছে। মেসেজ টা খুলে দেখলো স্বগতা।-" হাই! তোমাকে গত তিন বছর ধরে একই ভাবে রোজ দেখছি, কিন্তু আলাপ করা হয় নি কোনোদিন। তাই আজ ইচ্ছে টা দমিয়ে না রেখে মেসেজ দিলাম। " সাথে একটা স্মাইলি।
ভার্চুয়ালি নস্টালজিক ব্যাপার। স্বাগতা ও যেন নস্টালজিক হয়ে পড়লো। সত্যিই তো!  তিন বছরে সেই প্রথম দিনের অনেক বন্ধু হারিয়ে গেছে তার ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে, কিন্তু এই ছেলেটি আজও আছে। একই ভাবে রোজ অন লাইনে দেখতে পায়।
মনের ভেতর একটা স্বল্প হাসি নিয়ে মেসেজ টাইপ করলো স্বাগতা।-" হাই! আমি আসলে অচেনাদের সাথে তেমন কথা বলি না। বাট, আমিও তোমাকে দেখি রোজ অনলাইনে।"
ওপার থেকে সাথে সাথেই মেসেজ এল,-" পরিচয় করলে চেনা হয়ে যাবেন। প্রথমে তো সবাই অচেনাই থাকে।"

সেই পরিচয়ের শুরু, তারপর রোজ কথা। দিনের বেলা রোজ কথা না হলেও, রাতে অবশ্যই কথা হবে। সব কিছু যেন হঠাৎ করেই ঘটে  জীবনে। আর ঠিক সে ভাবেই হঠাৎ করেই ছেলেটির সাথে জড়িয়ে পড়লো স্বাগতা। একটু একটু করে কথা বলার ইচ্ছে টা বেড়ে চলল। কেন এমন হয়? স্বাগতা মনে মনে ভাবে, কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের সাথে কথা বলে অসীম শান্তি পাওয়া যায়। সব সময় কথা বলতে ইচ্ছে করে। তার কথা শুনতে ইচ্ছে করে। শোনা কিম্বা বলা তো নয়! ফোনে তার মেসেজ দেখা। এই সামন্য মেসেজ পড়ার মধ্যেও এক ধরনের মাদকতা আছে। আনন্দ আছে। ভালোলাগার মানুষের শুধু 'হ্যালো!' লেখা মেসেজ ও বুকের ভেতর টেউ তোলে।মন জুড়িয়ে আনে।শুভদীপ ও যেন তার কাছে তেমনি। ভালোলাগার মানুষ। ভালোলাগার না, ভালোবাসার? স্বাগতা জানে না।

গতকাল রাতে খাওয়ার পর নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিল স্বাগতা। তার এই ছোট্ট ঘর খানি একান্ত নিজস্ব। দক্ষিন দিকের একটা জানালা আছে। সেখান দিয়ে বাইরের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। নীল আকাশে মাঝে মাঝে ঘুড়ি ওড়ে। পাখিরা ডানা মেলে। রোদ হাসে। মেঘেরা ভাসে। আবার ভুস করে একটা রকেট সাদা আঁচড় কেটে চলে যায়। রাতের আকাশ আরও মায়াবী হয়। অগুন্তি তারার ঝিকিমিকি। যেন চোখ পিট পিট করে সবাই স্বাগতা কে দেখে। কেউ এসে বিরক্ত করে না তাকে। বিশেষত এই রাতের বেলা তো নয়। মাঝে মাঝে তা  মা এসে দিনের বেলা পরিষ্কার - পরিছন্ন করে দিয়ে যায়। নিজেও সব কিছু গুছিয়ে রাখে।রাতে খাওয়ার পর ড্রয়িং নিয়ে বসা তার অভ্যাস। কিন্তু শুভদীপের সাথে পরিচয় হওয়ার পর সেই টাইম টা বদলে গেছে। এখন ছবি আঁকা চলে গেছে দিনের বেলা। আর রাতে শুধু তার ভালোলাগা মানুষের সাথে কথা। বিছানা টা তৈরী করে, ঘরের লাইট অফ করে দেয় স্বাগতা। তারপর ফেসবুক টা অন করে শুয়ে পড়ে। ফেসবুক অন করেই শুভদীপ কে একটা মেসেজ করে।-" ওই, এখনো অন হও নি কেন?"
মিনিট তিনেক পর মেসেজ আসে শুভদীপের,-" এই তো এলাম। দিদির সাথে কথা বলছিলাম।"
-" তো যাও বলো কথা দিদির সাথে। অন হলে কেন?" মেসেজে অভিমানের সুর বাজলো।
-" এবার তো সারারাত তোমার সাথে বলবো।"
-" বলতে হবে না যাও।"
-" কি ব্যাপার আজ এত অভিমান?"
-" রাগ হচ্ছে। অভিমান নয়।"
-" কার উপর রাগ?"
-" তোমার উপর।"
-" কি করলাম আমি?"
-" আমার রাগ করতে ইচ্ছে করছে, তাই করবো। কারও উপর রাগ করতে পারি না তাই।"
শুভদীপের  স্মাইলি পাঠালো তিনটে।
-" হাসতে হবে না অত।"
চুপ করে রইলো শুভদীপ। মিনিট খানেক পার হল। আবার মেসেজ লিখলো স্বাগতা।-" কোথায় গেলে আবার?"
-" একটা কথা বলবো, স্বাগতা? অনেক দিন ধরে ভাবছি বলবো।" টাইপ করলো শুভদীপ।
-"কি কথা! এতদিন ভাবছো, তো বলছো না কেন?"
-" যদি কিছু মনে করো?"
-"আচ্ছা, মন টা খুলে বাইরে রেখে দিলাম, এবার বলো।"
কিছু বললো না শুভদীপ। স্বাগতার কথা শুনে আরও কয়েকটা স্মাইলি পাঠালো। শুধু হাসির কথা বলে মেয়েটি, ফোনের মেসেজে।
-"দাঁত না বের করে, বলো।" লিখলো স্বাগতা।
একটা লম্বা দম নিয়ে শুভদীপ টাইপ করলো,- "আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।"

কথাটা শুনে ভালো লাগলেও চমকে উঠেছিল স্বাগতা। ফোনের কীপ্যাডে টাইপ করলো,-" হি হি! সামনে থেকে দেখলে আর ভালোবাসতে না।"
-" ভালোবাসা দেখে হয় না। মন থেকে আসে।" শুভদীপের মেসেজ।
-" আমাকে কেউ কোনোদিন 'ভালোবাসি' বলেনি। আমাকে দেখলে, তুমি পালাবে।"
-" কেন,তুমি বাঘ না, ভল্লুক! যে পালাবো? তুমি খুব সুন্দরী।বরং আমাকে মানায় না তোমার পাশে।"
-"আমি অত সুন্দরী নই। ছবিতে দেখায় ওরকম।"
স্বাগতা দেখতে বেশ ভালো। হাসি-খুশি মনের মেয়ে। তবে সব সুন্দরী মেয়েদের এই এক সমস্যা, সে যতই সুন্দরী হোক না কেন, বার বার মনে হয় সে মোটেও সুন্দরী নয়-তার থেকে আরও অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে। স্বাগতা ও এর বাইরে নয়। তার মেসেজের উত্তরে শুভদীপ টাইপ করলো,-" যাই হও তুমি। আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি।"
-"প্লীজ শুভ! ভালোবেসো না। সত্যি বলছি, আমাকে দেখার পর-তুমি কখনোই ভালোবাসবে না।"
-" কেন এরকম বলছো, তুমি! আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি।"
-"পাগলামো করো না। তুমি জানো না আমাকে তাই বলছো।"
-" জানার কোনো দরকার নেই। আমি শুধু তোমার কাছে থাকবো তাই জানি।"
-"জেদ করো না, শুভ।"
-" কাল তবে দেখা করো, আমার সাথে। দেখা করার পর প্রমান হয়ে যাবে,আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা?....তোমাকে দেখে পালাই কিনা!"
চমকে উঠলো স্বাগতা।কিছুক্ষন নিশ্চুপ রইল। নিজেই অনেক আগে থেকেই মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছে শুভদীপ কে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সম্পর্ক টা আর বেশিদূর নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। পরে দু'জনরই কষ্ট হবে। সে কথা ভাবতেই এখন থেকেই যেন কষ্ট শুরু হয়েছে তার মনে। একটা মনঃকষ্ট যেন তাকে আদর করে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। শুভদীপ কে ছাড়া সে থাকতে পারবে কি করে?আর  কি বা বলবে শুভদীপের মেসেজের উত্তরে?
-" কি হল চুপ করে কেন? প্লীজ! না বলো না। তুমি যেখানে বলবে, সেখানে যাব আমি।"
বিষন্ন মনে টাইপ করলো স্বাগতা।-" আচ্ছা, কাল দেখা করবো। "
-"সত্যি! কোথায় যাব বলো?... শিয়ালদা, দমদম প্লাটফর্ম....!  কোথায় যেতে হবে...!"যেন হাজারটা ফুল ফোটার উচ্ছ্বাস ঝরে পরলো ইনবক্সে।
-" ভিক্টোরিয়া।"
আরও কিছুক্ষন কথা বলে ফোন টা রাখলো স্বাগতা। ঘুমোতে পারলো না। সারক্ষন উশখুস। এপাশ-ওপাশ করলো।সত্যি কথা টা শুভদীপ কে বলে দিলেই হতো। ঝামেলা চুকে যেত। কিন্তু শুভদীপ যদি আর মেসেজ না করে? আর তার সাথে সম্পর্ক না রাখে? তার মন যে মানছে না। একটিবার শুভদীপ কে দেখতে ইচ্ছে করছে স্বচক্ষে। মনে হচ্ছে,শুভদীপের থেকে সেই বেশি ভালোবেসে ফেলেছে এই সম্পর্ক টা কে।তাই দেখা হওয়ার পর না হয় সত্যি টা জানলো।

ভালোবাসা যদি সমুদ্র হয়, তবে স্বাগতা আর শুভদীপ দু'জন সেই সমুদ্রের অচেনা নাবিক। আর কাল তারা এক নতুন দ্বীপে পাড়ি দিতে চলেছে। ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে মেট্রো এসে থামলো রবীন্দ্র সদনে। দরজা খুলে গেল। সিট থেকে উঠে, প্লাটফর্মে নেমে পড়লো স্বাগতা। তারপর মাটির পেটের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এক্সাইডের আকাশের দিকে একবার তাকালো। পরিষ্কার রোদ ঝলমলে আকাশ। সেই আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে চারিপাশে একবার  তাকালো স্বাগতা। শুভদীপের তো এখানেই থাকার কথা ছিল। সাদা টী-শার্ট, নেভি ব্লু জিনস।কয়েকপা সামনে হেঁটে এসে চারিদিকে উঁকি-ঝুঁকি মারলো। হঠাৎ কানের কাছে একটা আওয়াজ পেল-" হাই, স্বাগতা!দেখ,তোমাকে ঠিক চিনতে পারলাম।"
ভয় পাওয়া অবস্থায় শুভদীপের দিকে চাইলো স্বাগতা। তারপর হাসলো।
-"চলো!.... " বলল শুভদীপ।
এক্সাইড মোড় থেকে বেরিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করলো ওরা। ট্রাফিক সিগ্যনালে রাস্তার উপর শত শত গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির হর্নের প্যাঁক প্যাঁক শব্দ।নন্দন পেরিয়ে ভিক্টোরিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলো দু'জন। শেষ বার বাবা-মার সাথে এখানে ঘুরতে এসেছিল স্বাগতা। এসব অবশ্য বছর তিনেক আগের কথা। আজ আবার এল তার ভালো লাগার মানুষের সাথে। ভেতরে ঢুকে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে গাছের নীচে বসলো দু'জন।পাশাপাশি।বিকেল নেমে এসেছে সামনের সবুজ ঘাসে। গাছের আড়ালে সূর্যটা উঁকি দিচ্ছে। রোদ-ছায়া খেলছে।
-" জানো, কি ভালো লাগছে আজ!.... তোমায় বলে বোঝাতে পারবো না।" হাসি মুখে বলল শুভদীপ।
মুচকি হাসলো স্বাগতা। শুভদীপের চোখের দিকে তাকালো। সেই চোখের অতলে তাকিয়ে শুভদীপ বলল,-" খুব যে, বলেছিলে তুমি সুন্দরী নও... খারাপ দেখতে...এখন তো আমাকে দেখেই, তুমি আর ভালোবাসবে না।......... সে তুমি ভালো নাই বাসতে পারো। কিন্তু আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি।"জলের মতো কল কল শব্দে কথা বলে যেতে লাগলো শুভদীপ। কিছুক্ষন বক বক করার পর একটু থামলো সে। তারপর স্বাগতার দিকে তাকিয়ে বলল,-" কি হল! তুমি কোনো কথা বলছো না? তোমার ভালো লাগেনি, আমার সাথে দেখা করে? "
মুহুর্তের মধ্যে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো স্বাগতার। মুখ ফুটে একবার জোরে বলতে ইচ্ছে করলো,খুব ভালো লাগছে আমার শুভ। কিন্তু বলতে পারলো না। অনেক চেষ্টা করলো কথা বলার। কোনো আওয়াজ বেরুলো না। চোখের জল গাল বেয়ে আরও নীচে নেমে গেল।
-" কি হল! কাঁদছো কেন তুমি?.. কি হয়েছে? " অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো শুভদীপ।
মুখের কাছে হাত নিয়ে, একটা সাংকেতিক চিহ্ন প্রকাশ করলো স্বাগতা। আর সেটা দেখেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো শুভদীপের। একটা চাপা হাহাকার ভেতর থেকে শব্দ হয়ে বেরিয়ে এল।-" তুমি কথা বলতে পার না! "
মাথা নীচু করে দু'পাশে মাথা নাড়লো স্বাগতা। চোখ দিয়ে অবিরাম বৃষ্টির ধারা নেমেছে।

দু'জনই নিস্তব্দ। চারিপাশের যুবক-যুবতীদের কথা ভেসে আসছে। হতবম্ভের মতো স্বাগতার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো শুভদীপ। তারপর আরও কিছুটা এগিয়ে তার পাশে গিয়ে বসলো। স্বাগতার মাথা ধরে নিজের ঘাড়ের কাছে জড়িয়ে বলল,-" আমি এখনোও তোমাকে ভালবাসি।..আরও বেশি করে বাসবো।"
গাছের আড়াল থেকে সূর্য টা সরে এসেছে। বেশ হাসি-খুশি।

স্বদেশ কুমার গায়েন ( মার্চ, ২০১৭)

No comments

Powered by Blogger.