|| শেষ কয়েক দিনের গল্প || ছোটগল্প || স্বদেশ কুমার গায়েন




(১)


চোখ খুলতে কষ্ট হল।তবুও ধীরে ধীরে চোখ দু'টো খুলতেই প্রথম তাকে দেখতে পেলাম। পাতলা, চিকন চেহারার উপর ধবধবে দুধ সাদা ড্রেস,মাথায় সাদা টুপি।মাঝারি উচ্চতা।চোখে সরু ফ্রেমের সাদা কাচের চশমা।তার ভেতর দিয়ে অচেনা দু'টো চোখের শান্ত চাহনি।মেয়েটির বয়েস খুব বেশি নয়।আমারই মতো-চব্বিশ কি পঁচিশ।বা,আরও একটু কম হতে পারে।তার হালকা ফর্সা মুখে,তুলি দিয়ে টানা ঠোঁটের ফাঁকে এক টুকরো হাসি লেগে আছে।
এক অপরুপা! অনন্যা!
এ কোথায় আমি?আমি তো এখানে ছিলাম না। কিভাবে এলাম আমি? ঘাড় ঘুরিয়ে চারিপাশে দেখলাম।সারি সারি বেড পাতা ঘর টির মধ্যে। তার উপরে আমার মতো অনেকেই শুয়ে আছে। হসপিটলই মনে হল আমার।কিন্তু আমি তো হসপিটলে ছিলাম না। এখানে এলাম কি করে!
-"এখন কেমন লাগছে?"
সেই তুলি টানা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটা প্রশ্ন এল আমার দিকে। আমি কোনো উত্তর না দিয়ে বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।মেয়েটি আবার হাসল। না,তার মুখটাই ওমন হাসি হাসি সবসময়।
-"মাথায় আর যন্ত্রনা হচ্ছে?"
আমি আস্তে করে না বললাম।হাতের উপর ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করলাম।
-"উহু! একদম ওঠার চেষ্টা করবেন না এখন। শুয়ে থাকুন।যখন বলব,তখনি উঠে বসবেন।" সাদা ড্রেস পরিহিতা মেয়েটি বলল।
আমি বাধ্য ছেলের মতো আবার শুয়ে পড়লাম। মেয়েটির হাতে একটা ইনজেকসানের সিরিঞ্জ। একটা ছোটো টিউব থেকে ওষুধ টেনে নিল।বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল সিরিঞ্জ টা। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,-"কই,আপনার হাত টা দেখি?"
আমি একটা হাত এগিয়ে দিলাম। মেয়েটি তার একটা হাত দিয়ে, আমার হাত ধরল।যেন এক বৈশাখী সন্ধ্যায় হঠাৎ ঝরে পড়া ঠান্ডা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল আমার হাতের উপর।
-"আঁ....আ..আ...উ....চ"
-"কিছু হবে না।একদম লাগবে না...।
কি সুমিষ্ট কন্ঠ! আমি মুগ্ধ দৃষ্টি তে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।এখন মেয়েটি খাতার উপর পেন দিয়ে কিছু লিখছে।খস খস আওয়াজ পাচ্ছি।
-"আমি এখানে এলাম কি করে?"
তাকে প্রশ্ন করলাম আমি।মেয়েটি চোখের পাতা তুললো।যেন একটা গোলাপ কুঁড়ি,সদ্য পাপড়ি মেললো।
-"আপনি না,খুব কথা বলেন। এখানে আপনাকে, ভূতে এনে দিয়েছে।"
মুচকি হাসলো মেয়েটি।আবার চোখ নামিয়ে খাতার উপর কি সব লিখতে শুরু করলো। আমি একটু হালকা বোধ করলাম। মাথার ভেতর চাপা পড়ে থাকা বড় বড় পাথর গুলো সরে যাচ্ছে। মনে পড়ে গেল।আস্তে আস্তে এবার আমার সব মনে পড়ল। আমি তো অফিসে ছিলাম।তারপর? মাথায় এক অসহ্য যন্ত্রনা শুরু হল। মনে হল, সমস্ত শিরা-উপশিরা গুলো এক মুহুর্তে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।আমি ডানা কাটা পাখির মতো ছটফট করতে লাগলাম।পা দু'টো টলতে লাগলো। কোনোরকমে টলতে টলতে চেয়ারের উপর গিয়ে বসে পড়লাম।অনীক ছুটে এসে আমাকে ধরে ফেলেছিল।তারপর আর কিছু মনে নেই আমার। হয়তো ওরাই আমাকে এই হসপিটলে এনে ভর্তি করেছে।
-"ওরা কোথায়?আমাকে যারা এখানে এনেছিল।"আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।
-"চলে গেছে।আবার বিকালে আসবে।"
আমি অনুরোধের সুরে বললাম,-" একটু উঠে বসতে পারি।"
-"আচ্ছা বসুন।"সেই হাসি মুখ আবার দেখলাম। আমার নিশ্চিত, এ মেয়েটির মুখটাই হাসি হাসি। ভীষন রকমের সুন্দর।নইলে প্রতি কথায় কেউ হাসে! ডাক্তার বাবু এলেন।-"নন্দিতা, ইনজেকসান টা দিয়েছো?"
মেয়েটির নাম তাহলে নন্দিতা। নন্দিতা সেন, চৌধুরী,না ভট্টাচার্য ? কিছু একটা হবে।আবার নাও হতে পারে।ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ বলল মেয়েটি।তারপর ডাক্তার বাবু আমার দিকে ফিরলেন। বললেন,-" কি রকম লাগছে এখন?"
-"ভাল।এখন অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।"
-"আচ্ছা, আপনার মাঝে মাঝেই কি এরকম মাথা যন্ত্রনা করে?"
-"হ্যাঁ! এক -দু' মাস পর পর।আগে প্রায় মাসে মাসে যন্ত্রনা করতো,যখন নাইন টেনে পড়তাম।"
-"মাথার কোন দিক টিতে বেশি হয় যন্ত্রনা টা?"ডাক্তার বাবু জিজ্ঞেস করলেন।
আমি হাত দিয়ে মাথার ডান দিক টা দেখালাম। আর কিছুই বললেন না ডাক্তার বাবু।মেয়েটির সাথে নীচু গলায় কিছুক্ষন কথা বললেন।তারপর চলে গেলেন।মেয়েটি আমার দিকে ফিরতেই জিজ্ঞেস করলাম,-"কি বললেন উনি?"
-"সেরকম কিছুই না।কিছু রিপোর্ট করতে হবে। তারপর বলবেন।" মেয়েটিও চলে গেল।

(২)

পুরুলিয়া জেলার এই ছোট্টো রেল শহর আদ্রা। বেশির ভাগ অবাঙালী মানুষের বাস।এই মুহুর্তে রেলের হসপিটলের বেডে শুয়ে অসহ্য লাগলো আমার।এই গুমোট পরিবেশের মধ্যে মানুষ কি করে থাকে?এর ভেতরেই তো আরও সবাই অসুস্থ হয়ে পড়বে!আমার ফোনটা খুঁজতে লাগলাম।স্ক্রিন টা অন করতে দেখলাম সাড়ে চারটে বাজে।
বাইরে পুরুলিয়ার আকাশে এতক্ষনে বিকেল নেমে গেছে। এরপর শিমুল তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘ ভেসে বেড়াবে। যেন পাল তোলা নৌকা। ঘাটে ঘাটে নোঙর ফেলবে।তারপর উপরের আকাশ টা নীল শাড়ি খুলে হলুদ শাড়ি পরবে;তারপর লাল শাড়ি।লাল বলের মতো সূর্য টা আস্তে আস্তে শালবন,লাল পাথুরে মাটির রাস্তা,উঁচু-নীচু টিলা,পার্বত্য এলাকা পেরিয়ে পশ্চিমের কোলে ঢলে পড়বে। দুরের উঁচু কালো কালো পাহাড় গুলো আরও কালো হয়ে আসবে।
মেয়েটি পাশ দিয়ে যেতেই জিজ্ঞেস করলাম,-"একটু শুনবেন?"
-"তাড়াতাড়ি বলুন।খুব বিজি আমি।"
-"ওই জানালাটা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখা যায়?"আমি হাতের আঙুল টা জানালার দিকে করলাম।
মেয়েটি বিস্ময়ে আমার দিকে এগিয়ে এল।-"আপনি আকাশ দেখবেন!"
একটু হাসি মুখ করে বললাম,-"আমি প্রতিদিনই প্লার্টফর্মে বসে আকাশ দেখি।সেই আকাশে কখনো বিকেল নামে।কখনো কালো কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে। পাখির দল উড়ে বেড়ায়।দখিন হাওয়া ছুটে আসে। সেই হাওয়ায় বক পাখিরা ডানা ভাসিয়ে রাখে।আর আমি এক দৃষ্টে সেই সব দেখি।আমার ও পাখির মতো ডানা মেলে দিতে ইচ্ছে করে।"
মেয়েটি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল।-"আপনি তো বেশ কাল্পনিক মানুষ !"
আমি মাথা নীচু করি।মেয়েটির দিকে তাকাতে পারি না।
-"আচ্ছা! জানালার পাশে গিয়ে দেখুন।"এই বলে মেয়েটি চলে গেল।
বেড থেকে নেমে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। রেলের এই হসপিটল থেকে বাইরে টা পরিষ্কার দেখা যায়। হলুদ শাড়ি পরে আছে বাইরের আকাশ টা।একটু পর আবার লাল পরবে।যদি ঘন মেঘ করে আসে?তবে কালো শাড়ি পরবে।
-"কি দেখছেন?"মেয়েটি কখন এসে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারিনি।আমি তার দিকে ফিরে তাকালাম।বাইরের হলুদ আকাশের মতো সুন্দর লাগছে মেয়েটি কে। চোখ দু'টো তে কি মায়া ভরা! আমি সেই মায়ার বাঁধনে বার বার আঁটকে যাচ্ছি।
-"দেখুন,পাখিরা কেমন উড়ে উড়ে খেলা করছে!"
আমি আবার বাইরে তাকালাম। মেয়েটি ও আমার সাথে তাকালো।বলল,-"সত্যিই, খুব সুন্দর।"
মিনিট দশেক পর অনীক আর করন এল। আমরা রেলের একই অফিসে কাজ করি। অনেক্ষন বসে গল্প করলাম। প্রায় এক ঘন্টা। তারপর ওরা চলে গেল।শরীর এখন পুরোটাই সুস্থ।ভাবছি,আর থেকে কি করবো, ঘরে চলে যাই।কিন্তু ডাক্তার বাবু যেতে দিল না।আমি বাধ্য ছেলের মতো আবার শুয়ে পড়লাম।এদিক ওদিক তাকালাম।চারিপাশের এত সাদা ড্রেসের মধ্যে,সেই মেয়েটিকে আর দেখছি না তো! রাত আট টার সময় মেয়েটি এল। সাদা নার্সিং ড্রেস আর নেই।একটা ব্রাউন কালারের সালোয়ার কামিজ পরে আছে।পিঠে একটা ব্যাগ।মুখ ফসকে বলে ফেললাম,-"এত সময় কোথায় ছিলেন আপনি?"
মেয়েটি হাসল।বলল,-"আমার ডিউটি শেষ। আবার কাল রাতে আসবো।"
-"কাল..রাত!"
এমন ভাবে কথাটা বললাম,যেন এক বছর পর আসার কথা বলল। মেয়েটি চলে গেল। অনেকক্ষন তাকিয়ে রইলাম তার চলে যাওয়ার পথে।তবুও যেন তাকে দেখতে পাচ্ছি।আমার চোখের পাতায় লেগে আছে সে।

(৩)

পর দিন ঠিক রাত আটটায় মেয়েটি এল।আমার বেডের পাশে এসে দাঁড়ালো।আমি উঠে বসলাম। সেই সাদা ড্রেস,মাথায় সাদা টুপি। হাসি হাসি মুখ, শান্ত চোখের মায়া ভরা চাহনি....।
-"কেমন আছেন?"মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞেস করল।
-"ভাল।"
-"যে ওষুধ গুলো দেওয়া ছিল, সেগুলো ঠিক ঠাক খেয়েছেন?
-"আমার ওষুধ খেতে ভাল লাগে না।"আমি বললাম।
-"সেকি! তাই বললে হয়।ওষুধ গুলো ঠিক করে না খেলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়বেন।"

আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।এই প্রথম বার।
-"সকালে মাথার স্ক্যান রিপোর্ট টা করিয়েছেন?"
-"হ্যাঁ,করিয়েছি।আগামী কাল রিপোর্ট টা দেবে বলেছে।"
-"আচ্ছা।কাল তবে রিপোর্ট টা এনে ডাক্তারের কাছে দেবেন।"
আমি মাথা উপর-নীচ করলাম। ওয়ার্ডের বাইরে থেকে মেয়েটিকে কেউ ডাকলো।-"নন্দিতা! চল্লিশ নম্বর বেডের স্যালাইন শেষ হয়ে গেছে।"
-"আপনি খেয়ে,নিন।আমি আবার পরে আসবো।"মেয়েটি বলল। তারপর বাইরে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষন পর একটা স্যালাইনের বোতল নিয়ে চল্লিশ নাম্বার বেডের দিকে চলে গেল।আমার চোখ দু'টো যেন তার সাথে সাথে ঘুরছে।না, আমার মন টা তার সাথে ঘুরছে? হয়তো দু'টোই তার সাথে সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রতি মুহুর্তে।

আমার ভালো লাগছে না।কবে ছাড়া পাব এখান থেকে?বেড থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়ালাম। আকাশে গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। আজ হয়তো পূর্নিমা।জোছনালোকে ভাসছে বাইরের বন্ধুর ভূ-প্রকৃতি।
-"চাঁদ দেখছেন?" মেয়েটির গলার আওয়াজ পেলাম।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম,মেয়েটির দিকে।-"হ্যাঁ। বসে বসে আর ভাল লাগছিল না।"
মেয়েটি হাসল।টিউব লাইটের আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মুখটা।
-"আচ্ছা দেখুন।তবে বেশি সময় নয়।রাতের ওষুধ টা খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ুন।"মেয়েটি আবার চলে গেল।
এত ব্যস্ত কেন মেয়েটি?রাগ হল আমার। রাত দশ টা বাজে।ঘুম এল না। মেয়েটির মুখ টা কেন ভাসছে আমার চোখে?এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আর হয়তো কোনোদিন দেখা হবে না।যদি ঈশ্বর চায়,আবার হয়ে যেতেও পারে।
-"এখনো ঘুমোন নি আপনি?" মেয়েটি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।
-"ঘুম আসছে না।...আমার রাতে ঘুম আসতে চায় না।"আমি বললাম।
-"কেন?"
-"জানি না।আপনি আজ সারা রাত জেগে থাকবেন?"
-"হ্যাঁ,থাকবো।"
-"আমার সাথে গল্প করবেন সারা রাত?"
মেয়েটি হাসল।-"একদম না। আপনার ঘুমের প্রয়োজন এখন।"
-"আপনার সাথে কথা বললে,আমার ঘুম পড়া হয়ে যাবে।"
-"মানে!"
আমি চুপ করে রইলাম।কথাটা বলা ঠিক হয়নি। মেয়েটি হঠাৎ আমার পাশে বেডের উপর বসল। আমি উঠে বসতে গেলাম।
-"উঁহু।উঠতে হবে না।শুয়ে থাকুন।"
আমি ছোট্টো ছেলের মতো আবার শুয়ে পড়লাম।
-"আপনার বাড়ি কোথায়?"মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।
-"অনেক দুর।আপনি চিনবেন তাই?"
-"অনেক দুর বলে কোনো জায়গার নাম তো শুনিনি।"মেয়েটি হাসলো।
আমিও হেসে ফেললাম।-"অনেক দুর মানে, কলকাতা ছাড়িয়ে সেই দক্ষিন চব্বিশ পরগনা।"
-"ওহ! আমার বাড়ি কাছাকাছি ই। আসানসোল।"
-"ও,কয়লা খনির পাশে?"
-"না....না...।"মেয়েটি হেসে পড়ল আমার কথা শুনে।
আমার আসানসোল নামটা শুনলেই আগে কয়লা খনির কথা মনে পড়ে।
-"আপনি এখানে রেলে কত বছর চাকরী করছেন?" মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।
-"বেশি দিন নয়।বছর দু'য়েকের একটু বেশি হবে।আপনিও এই রেলের হসপিটলে চাকরী করেন?"
-"হুম।তিন বছর হল।"
-"জানেন,আপনি খুব ভাল।আমার সাথে কেউ কোনোদিন এমন ভাবে কথা বলিনি।মনে হয় আপনার সাথে সারাক্ষন গল্প করি।"
-"তাই?" মেয়েটি হাসলো।
আমি জোর দিয়ে হ্যাঁ বললাম। পাশের বেড গুলোতে রোগীরা সব ঘুমোচ্ছে।শুধু আমরা দু'জন জেগে আছি।অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করলাম।ভোর রাতে চোখে ঘুম নেমে এল।


(৪)

পরদিন মেয়েটিকে আর দেখলাম না।বিকেলের দিকে অনীক এল। জমিয়ে গল্প করলাম অনেকক্ষন। সন্ধ্যার দিকে ও আমার রিপোর্ট টা তুলে জমা দিয়ে দিল ডাক্তারের কাছে। মেয়েটিকে বার বার দেখতে মন চাইছে।কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আমি ভালোবেসে ফেলেছি মেয়েটি কে।কিন্তু কতদিন বা কথা বলবো? কাল, পরশু,তরশু......।তার পর তো এখান থেকে চলে যেতে হবে।
সারা রাত টা আধো ঘুম,আধো স্বপ্নে কেটে গেল। সকালে মেয়ে টি এল। আমার পাশে বসল।হাতে কতক গুলো কাগজ।সম্ভবত আমার রিপোর্ট গুলো হবে।
-"আপনি কাল আসেন নি কেন?"
-"আগের দিন রাতে ডিউটি করলাম না!"মেয়েটি হেসে উত্তর করলো।
-"ওহ! তাইতো।আমি ভুলে গিয়েছিলাম।সরি।"
-"আচ্ছা,আপনার বাড়ির লোক কেউ আসেনি? মানে,আপনার বাবা, মা?"
মেয়েটির গলার স্বর কেমন একটা শোনালো। আমি কথা বললাম না।মেয়েটির দিক থেকে চোখ নামিয়ে চুপ করে রইলাম।
-"কি হল চুপ করে,আছেন কেন?"
-"আমার কেউ নেই।" গলাটা আমার ধরে এল,মিথ্যে কথাটা বলতে গিয়ে।
-"নেই মানে?"
আমি নিশ্চুপ রইলাম।মেয়েটির চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না।
-"আচ্ছা, আমার রিপোর্ট দেখে ডাক্তারবাবু কি বললেন?কবে ছেড়ে দেবে আমাকে?আমি মেয়েটির দিকে তাকালাম।
সে চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। আমি আবার বলতে শুরু করলাম।-"জানেন, আমি সব সময় মরে যেতে চাইতাম।কিন্তু এখন আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করছে।"
-"কেন?"মেয়েটি ভাঙা গলায় বলল।
আপনার জন্য আবার বাঁচতে চাই।আপনাকে একটু দেখার জন্য বাঁচতে চাই।আপনার সাথে কথা বলার....কথাগুলো বলতে পারলাম না। ঠোঁটের ডগায় আটকে গেল। হেসে বললাম,-"জানি না।তবু আজ খুব বাঁচতে ইচ্ছে করছে।"
আমি মেয়েটির চোখে,চোখ রাখতেই অবাক হয়ে গেলাম। তার চোখ দু'টো জলে ছল ছল করছে।
-"এ কি আপনার চোখে জল কেন?"আমি বিস্মৃত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
মেয়েটি একই ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখটা মলিন, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ফ্যানের হাওয়ায় সামনের চুল গুলো এলো মেলো ভাবে চোখের উপর এসে পড়ছে।
-"এ কি আপনি কাঁদছেন কেন? জানেন না, নার্সদের কাঁদতে নেই।"
মেয়েটির চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ল।আর বসে থাকতে পারলো না মেয়েটি। রিপোর্ট গুলো আমার পাশে রেখে হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আর ফ্যানের হাওয়ায় আমার কাগজের রিপোর্ট গুলো বেডের উপর এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

আমার নূতন ফটোগ্রাফি ব্লগসাইট দেখতে ভিজিট করুন http://www.picsalove.blogspot.com

No comments

Powered by Blogger.