অ্যাডভেঞ্চার গল্প " রেমা- কালেঙ্গার জঙ্গলে "





অ্যাডভেঞ্চার গল্প"রেমা- কালেঙ্গার জঙ্গলে"


শেষ পর্যন্ত আমি যে বেঁচে কলকাতায় ফিরতে পেরেছি,এটাই আমার অনেক ভাগ্যের ব্যাপার।নেহাত কপাল জোর না থাকলে এরকম বিপদের সামনে থেকে ফিরে আসা যায় না। ড: মালহোত্র আর, ডা: ইসলাম সাহেবের  কথা ভাবলেই,  এখনো আমার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে।  কি ভয়ানক বিপদের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছি!

পাতাটার কথা আমাকে প্রথম বলেছিলেন, ড: মালহোত্র। ভদ্রলোক ঢাকা ইউনিভার্সিটির  উদ্ভিদ বিজ্ঞানের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট। ছ'ফুটের কাছাকাছি লম্বা চেহারা। পেশিবহুল। মুখের গড়ন টা ও লম্বাটে। কাঁচা-পাকা চুলে ভর্তি মাথা। সব সময় সাদা একটা ফিনফিনে শার্ট পরে থাকেন।বয়েস পঞ্চাশ পেরিয়ে গেলেও,  এখনোও শরীরের তেজ কমেনি। প্রথম দেখেই  যে কেউ বলবে, এ ভদ্রলোক সেনাবাহিনীতে  চাকরী করতেন। ভদ্রলোকের সাথে আমার  পরিচয় কলকাতা ইউনিভার্সিটি তে। আমি  কলকাতার মৌলনা আজাদ কলেজে বোটানি পড়াই। সেইহেতু ওনার সাথে আমার পরিচয় টি  ও বেশ জমে গিয়েছিল।

সেবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, উদ্ভিদ বিজ্ঞান  নিয়ে একটা আলোচনা সভার আয়োজন করা  হয়েছিল। মূলত বিষয় ছিল চিকিৎসা ক্ষেত্রে  সরাসরি উদ্ভিদের প্রভাব। এ ব্যাপার টা সেই প্রাচীন যুগ থেকে আমাদের দেশে চলে আসছে। যাকে বলে কবিরাজি বিদ্যা-জড়িবুটি। আজও নতুন নতুন পরীক্ষা চলছে। সে সময় মানুষ সরাসরি উদ্ভিদ কে রোগ নিরাময়ের উপায় হিসাবে ব্যবহার করতো। কোনো গাছের পাতার রস, ছালের রস, কাঁচা শিকড়- নানা সময়ে মানুষ রোগ সারাতে ব্যবহার করেছে। তারপর যুগের উন্নতির সাথে সাথে সেসব হারিয়ে গেছে। কিন্তু আজও অস্বীকার করার উপায় নেই, মানব শরীরের উপর উদ্ভিদের প্রভাব নিয়ে। ভদ্রলোকের মাত্র আধঘন্টার বক্তৃতা শুনে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আরও নানা দেশের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী রা উপস্থিত ছিলেন আলোচনা সভায়। তাদের নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা শুনিয়েছিলেন। কিন্তু ওনার বক্তৃতা আমাকে আলাদা ভাবে আর্কষন করেছিল। সামন্য একটা গাছের ছালের রস দিয়ে যদি কোনো মৃত বা, প্রায় মৃত কোনো ব্যক্তি কে বাঁচিয়ে তোলা যায় তবে এর থেকে মনে হয় বড় আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানে আর হবে না। কিন্তু ব্যাপার টা নিয়ে তিনি এখনো নিশ্চিত নয়। তার পরীক্ষাটা প্রথম পর্যায়ে চলছে। একটা মৃতপ্রায় ইঁদুরের উপর তিনি প্রথম পরীক্ষাটি শুরু করেছিলেন। একটা পজেটিভ সাড়া ও পেয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হল, গাছটি বাংলাদেশের কোনো জঙ্গলে পাওয়া যায় না। এমন কি আমাদের এই উপমহাদেশীয় এলাকায় এ গাছ জন্মাবে না, সেটিও তিনি জানিয়েছেন। তিনি গাছটির সামন্য ছাল সংগ্রহ করেছিলেন উত্তর আমেরিকার একটা জঙ্গল থেকে। কিন্তু পরে ভিসা সমস্যার জন্য আর আমেরিকায় যেতে পারেন নি। তাই তার পরীক্ষাও সেখানে থেমে আছে। ভদ্রলোকের বক্তৃতা শুনলেই বোঝা যায়, তিনি দেশ-বিদেশের অনেক জঙ্গল ঘুরে বেড়িয়েছেন। একবার দক্ষিন আফ্রিকার একটা জঙ্গলে, এমন একটা ফুলের সন্ধান পেয়েছিলেন, যেটার গন্ধ একবার নিলেই সারক্ষন হাসি পায়। সেবার খুব নাজেহাল হয়েছিলেন ভদ্রলোক। সেই হাস্যরসকর অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা সভায় জানান।

উদ্ভিদ সম্পর্কে আমার একটু বেশি আগ্রহ থাকায়, ওনার সাথেই আগ বাড়িয়েই পরিচয়  করেছিলাম। সেটা হয়তো উনি বুঝতে  পেরেছিলেন। বেশ মিশুকে টাইপের মানুষ হলেও  সবার সামনে গাম্ভীর্য টা বেশ বজায় রাখতে  পারেন। আমাকে আলাদা করে ডেকে বললেন,- "আমার শিক্ষকতা জীবনে, উদ্ভিদ সম্পর্কে  এরকম আগ্রহ কোনো স্টুডেন্টের মধ্যে দেখেনি।  তোমার মধ্যে সেটা পেলাম। আমার ফোন নাম্বার টা রাখো। আর যোগাযোগ করো।"
সেই থেকে ড: মালহোত্রের সাথে আমার পরিচয়। নতুন কোনোকিছুর সন্ধান পেলেই  আগে ওনার সাথে যোগাযোগ করি। উনিও নতুন  কোনোকিছুর এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলে,  আমাকে বলেন। বেশ কিছুবার ঢাকায় ওনার  সাথে গিয়েও দেখা করেছি।সত্যি বলতে ওনার  সঙ্গ পেয়ে আমার ও অভিজ্ঞতা দিনকে দিন  বেড়েই চলেছে। সেটা নিজেই বুঝতে পারি।

আজ সকালে স্নান করে কলেজ বেরোনোর সময় ড: মালহোত্রর ফোন এল। রীতিমত গলার  স্বরে উত্তেজনা। নতুন কিছু আবিষ্কার করে  ফেললে, যেমন হয় ঠিক তেমন। ফোন টা রিসিভ  করে বললাম,-" হ্যাঁ, স্যার বলুন।"
-" চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটা নতুন আবিষ্কার হতে চলেছে, অভিজিৎ।" ড: মালহোত্রের গলা  উত্তেজনায় কাঁপছে।
-" কি!" আমিও উত্তেজিত হয়ে পড়লাম।
-" সব কথা ফোনে বলা যায় না। তুমি শিঘ্রী  ঢাকায় চলে এসো।"
-" আচ্ছা। আমি খুব শীঘ্রই ঢাকা পৌঁছাচ্ছি।"

ড: মালহোত্র ফোন রেখে দিলেন। মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা শুরু হয়েছে। এই নতুন  আবিষ্কারের সঙ্গী হতে চলেছি আমিও।


আগেই পাসপোর্ট করা ছিল। ভিসা করতে ও বেশি সময় লাগলো না। দু'দিন পরই দমদম  বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইটে উঠে পড়লাম। সোজা  ঢাকা। বিমান বন্দরের বাইরে ড: মালহোত্র   আমার জন্যেই গাড়ি নিয়ে ওয়েট করছিলেন।  বাইরে বেরোতেই  ওনার সাথে দেখা হয়ে গেল। হাসি মুখে আমার দিকে এগিয়ে এসে হাত   বাড়িয়ে দিলেন।  -" আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো,অভিজিৎ? "
আমি কিছু না বলে, একটু হাসলাম। বিমান  বন্দরের বাইরে গাড়ী রাখা ছিল। ড: মালহোত্রর  নিজস্ব গাড়ী। ড্রাইভার কে নির্দেশ দিতেই,  গাড়ী নিয়ে  ড্রাইভার আমাদের পাশে এল। গাড়ী তে উঠে  বসলাম আমি। গাড়ী হাইওয়ে ধরে ছুটলো। প্রশ্নটা আর না করে থাকতে পারলাম না। ড:  মালহোত্রের দিকে চেয়ে বললাম,-" হঠাৎ এমন জরুরী তলব কেন বলুন তো!"
-" পরে বলবো। আগে ঘরে চলো।" ড: মালহোত্র কাগজে মনোনিবেশ করলেন। আমি ও কাচ নামিয়ে ঢাকা শহরের উপরে চোখ মেলে দিলাম।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর ড: মালহোত্রের বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ী থামলো। আগেও কয়েকবার  এখানে আসার সূত্রে, এ জায়গা আমার  পরিচিত। গাড়ী থেকে নেমে, ওনার বাড়িতে গিয়ে ঢুকলাম। দোতলায় আমার জন্যে একটা ঘর  আগে থেকেই ঠিক করেছিলেন। ঘরটা দেখিয়ে তিনি বললেন,-" আগে ফ্রেশ হয়ে, একটু কফি খেয়ে নাও। তারপর আসল কথা বলা যাবে।"

ব্যাগটা রেখে, বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বেঁটে করে একজন মধ্য বয়স্ক লোক কফি এনে টেবিলে রেখে দিল। -" বাবু, কফি।"
-" রাখ টেবিলের উপরে।" বললাম আমি।
তারপর ড্রেস টা পালটে,  কফিতে চুমুক দিতেই শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব চাঙ্গা হয়ে উঠলো। কি এমন হতে পারে, যার জন্যে ড: মালহোত্র এত জরুরি তলব দিলেন। মনে মনে ভাবতে শুরু করলাম আমি।
পাঁচমিনিট পর উনি আমার ঘরে এলেন। -" চলো অভিজিৎ, এবার আসল ব্যাপার টা তোমাকে দেখানো যাক।"
-" চলুন।" উঠে পড়লাম আমি।


ওনার ল্যাবরেটরি আমি আগেও দেখেছি। যাতে কেউ ডিসস্টার্ব না করতে পারে, সেই জন্যে, সব কিছুই নিজের বাড়িতে বানিয়েছেন। বাড়িতে মানুষ বলতে, তিনি একা। আর একজন কাজের লোক। সারা বছরই উদ্ভিদের সন্ধানে বনে বাদাড়ে ঘুড়ে বেড়ানোর জন্যে বিয়ে থা আর করে হওয়া উঠেনি। তা একদিক থেকে ভালোই করেছেন ভদ্রলোক।
ল্যাবরেটরি তে ঢুকে ল্যাপটপ টা অন করে আমাকে ডাকলেন।-" অভিজিৎ,এই পাতা টা লক্ষ্য করো।"
আমি ল্যাপটপের উপর ঝুঁকে পড়লাম। সবুজ রঙের একটা পাতা। বেশি বড় নয়। অনেকটা পান পাতার মতো দেখতে। তবে পাতাটার শিরা-উপশিরা গুলো গাঢ় লাল রঙের। যেটার জন্যে পাতাটি কে বেশ আকৃষ্ট লাগছে। আর পাতার মাঝখানে একটা রিং এর মতো ছিদ্র। শুধু মাত্র এই ছিদ্রর জন্যে এই পাতা আগে কোথাও দেখেনি আমি। ল্যাপটপের কাছ থেকে সরে এসে, ড: মালহোত্র বললেন,-" এই পাতা টাই চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করতে চলেছে।"
-" কিরকম!" চোখ বড় করে বললাম।
-" ক্যানসারের ওষুধ। এই পাতার সামন্য রস খেয়ে ক্যানসার ঠিক হয়ে গেছে।"
-" কি বলছেন কি!"
-" ঠিকই বলছি। আমাদের সবরকম পরীক্ষা করা হয়ে গেছে। ক্যানসার আক্রান্ত একজন মানুষের উপর আমরা পরীক্ষা করেছি। সাকসেসফুল! " চোখ-মুখ উজ্বল হয়ে উঠলো ড: মালহোত্রের।
-" আমি তো বিশ্বাস করতেই পারছি না। এই পাতা যদি পাওয়া যায়, তাহলে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বেঁচে যাবে, সামন্য খরচে।"
-" সে তো নিশ্চয়! আর সেই জন্যেই তোমাকে ডাকা। আমারা এই পাতার খোঁজে অভিযানে বের হবো আমরা।"
-" কোথায়?"
-" এই পাতাটা আমি প্রথম পাই, এখানকার কার একশ্রেনীর অাদিবাসীর কাছ থেকে। তারাও জানে না, পাতাটা কোথা থেকে পেয়েছিল। তারপর পর এই পাতাটা নিয়ে, আমার ডাক্তার বন্ধু মমিনুল ইসলামের সাথে দেখা করি। ও আর আমি দুজনে মিলে পরীক্ষা চালাই।"
-" কিন্তু পাবেন কোথায়?"
-" সেটাই বড় প্রশ্ন। কিন্তু ওই আদিবাসীরা কালেঙ্গায় থাকে। ওখানে রেমা- কালেঙ্গা নামে একটা বনভূমি আছে। আমার দৃঢ় ধারনা, ওই বনভূমি থেকে কোনো ভাবে পাতাটা পেয়েছে।"
-" রেমা-কালেঙ্গা!"
-" হুম। সুন্দরবনের পর, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহওম বনভূমি।"
মাথা উপর-নীচ করলাম আমি। ল্যাপটপ টা বন্ধ করে ড: মালহোত্র বললেন,-" কালই পাতার সন্ধ্যানে বেরোবো আমরা। তুমি এখন রেস্ট নিয়ে নাও। কাল ডা: ইসলামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো।"


পরদিন ভোর বেলা ডা: ইসলাম গাড়ী নিয়ে এলেন। আমাকে সাথে ওনার পরিচয় করিয়ে দিলেন ড: মালহোত্র। মাঝারি উচ্চতার মোটাসোটা মানুষ। মধ্যবয়স্ক। তবে চোখ দেখলেই বোঝা যায়, তীক্ষ বুদ্ধিতে ওনার মস্তিষ্ক ধারালো আছে। পরনে একটা নেভি ব্লু রঙের সুট, আর একটা গ্রিন কালারের শার্ট। ইন করা। প্রথমেই করমর্দন করে হেসে বললেন,-" তোমার কথা ড: মালহোত্রের মুখে অনেক শুনেছি। উদ্ভিদ সম্পর্কে তোমার নাকি আগ্রহ প্রচুর? "
-" তা একটু আছে বৈকি।"
-" বেশ বেশ। সব নিশ্চয় শুনেছো ড: মালহোত্রের মুখে। ব্যপার টা কিন্তু এখন গোপন থাকা চাই।"
আমি হেসে বললাম,-" আমাকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতে পারেন।"
ডা: ইসলাম হাসলেন। তারপর সব গুছিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে পড়লাম। আমাদের তিনজনরই কাছে ব্যাগ। ব্যাগে দরকারি জিনিষপত্র, কিছু খাবার-দাবার আর জলের বোতল। ড্রাইভার গাড়ী স্টার্ট দিল।



বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক পাহাড়ি বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা। ঢাকা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় এই বনভূমি টি অবস্থিত। প্রায় ত্রিপুরা বর্ডারের সীমান্তবর্তী এলাকায়। ডা: ইসলাম আর ড: মালহোত্রের এদিক টা চেনাজানা। তাই তারাই আমাকে গাইড করে নিয়ে গেলেন। বেশ অনেক্ষন গাড়ি চললো। তারপর  গাড়ি এসে থামলো, কমলাপুর স্টেশনে। এখান থেকে ট্রেন যাত্রা হবে। স্টেশনে নেমে সামন্য কিছু খেয়ে নিলাম আমরা। চা- বিস্কুট জাতীয়। ডা: ইসলাম বললেন,-" কি বাংলাদেশের চা ভালো লাগছে তো?"
আগে কফি খেয়েছিলাম ড: মালহোত্রের বাড়ি তে। চা এই প্রথম খাচ্ছি। "বাহ! মন্দ নয়।" হেসে বললাম আমি। ড: মালহোত্র চা শেষ করে বললেন,-" এখান থেকে ট্রেনে শ্রীমঙ্গল।  সেখান থেকে জীপে কালেঙ্গা।"
আগে থেকেই টিকিট করা ছিল তাই আমাদের কোনো প্রবলেম হল না। ট্রেন আসতেই উঠে পড়লাম। ভারতের অনেক জায়গায় ট্রেন ভ্রমন করেছি। বাংলাদেশে এই প্রথমবার। জানালা দিয়ে চোখ রাখলাম বাইরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে। কতক্ষন তাকিয়ে ছিলাম জানি না। ড: মালহোত্রের আলতো ধাক্কায় চমক ভাঙলো। -" উঠে পড়ো। শ্রীমঙ্গল এসে গেছে।"

স্টেশনের বাইরে জীপ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। জীপে করে আমরা যখন কালেঙ্গা ফরেস্টে পৌঁছোলাম তখন পৌনে বারোটা বাজে। অনেক টুরিস্ট বাস কে লক্ষ্য করলাম। বেশ জাঁকজমক জায়গা টা। যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য জঙ্গল দেখা নয়, তাই ড: মালহোত্র কোনো গাইডের ব্যবস্থা করলেন না।
সেটাই স্বাভাবিক, আমাদের উদ্দেশ্য টা সম্পুর্ন গোপনীয়। জীপ থেকে নেমে আমরা, ব্যাগ গুলো পিঠে ঝুলিয়ে নিলাম। ড: মালহোত্র বললেন,-" আমরা চোরা পথে বনে প্রবেশ করবো। যেদিক টা তে আদিবাসী দের বাস,  সেদিক থেকে বনে ঢোকার চোরা পথ আছে।"

আমার মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়ে গেছে অনেক আগে থেকেই। তিনজন হাঁটতে শুরু করলাম, জঙ্গলের মেন রাস্তা ছেড়ে উলটোদিকে। যেদিকে আদিবাসীদের বাস। কিছুটা হাঁটার পর জঙ্গলের গা ঘেঁষে কিছু ঘরবাড়ি দেখা গেল। সম্ভবত ওটাই আদিবাসী দের গ্রাম। আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম আমরা। একটা জায়গায় এসে থামলেন ড: মালহোত্র। এখান একটা ঘাসলতায় পুর্ন সরু রাস্তা জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেছে। প্রথম দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না,এটা একটা রাস্তা। সেই সরু রাস্তা দিয়ে আমরা জঙ্গল ভিতরে প্রবেশ করলাম।
ঘন জঙ্গল। সবুজ গাছপালা, কাঁটা লতায় পরিপুর্ন। ঘাস, লতাপাতা পেরিয়ে আগে আগে হেঁটে চললেন, ড: মালহোত্র। মাঝে আমি, আর সব শেষে ডা: ইসলাম। একটু গিয়েই ড: মালহোত্র দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,- " সবাই সবধান!নদীর দিকে মেছো বাঘ ছাড়া আর কোনো হিংস্র জন্তু এ জঙ্গলে হয়তো নেই, কিন্তু বিশাক্ত সাপ প্রচুর আছে। তাই সবাই সাবধানে পা ফেলে চলবে।"

ড: মালহোত্রের চোখে একটা সন্ত্রস্ত ভাব লক্ষ্য করলাম। তারপর এগোতে লাগলাম আবার।  মাঝে মাঝে কাঁটা লতায় আমাদের জামা প্যান্ট বেঁধে যাচ্ছে। ড: মালহোত্র গল্প করতে করতে এগিয়ে চললেন। কিন্তু তার চোখ দু'টো দু'পাশে তীক্ষ ভাবে ঘোরাফেরা করতে লাগলো। -" এ জঙ্গলে অনেক দেখার জিনিষ আছে অভিজিৎ। পাঁচ- ছয় রকমের কাঠবেড়ালি দেখতে পাবে। অনেক প্রকার বাঁদর ও আছে,  তবে এদিকে দেখতে পাবে বলে মনে হয় না।"

-" আর হিংস্র বন্য জন্তু?"
-" না তেমন কিছু নেই। ওই যে বললাম, নদীর দিকের সাইট টা তে মেছো বাঘের দেখা মেলে। ওরা তেমন হিংস্র হয় না। আর এত গভীর জঙ্গলের দিকে আসে না। তাই তো খালি হাতে এলাম। নইলে বন্দুক নিয়ে আসতাম।"
-" আপনার বন্দুকের কথা তো আগে বলেন নি!"
-" দরকার পড়েনি তাই। আমার কাছে লাইসেন্স করা রাইফেল আছে।"

হঠাৎ  পিছন দিক থেকে ড: ইসলামের গলার স্বর পেলাম। -" আ!"
আমরা দু'জন তড়িঘড়ি পিছনে তাকালাম।- "
কি হল, ডা: ইসলাম? "
-" তেমন কিছু নয়। একটু কাঁটা লেগে পা ছড়ে গেছে। এগিয়ে চলুন।"
-" সাবধান! চোখ কান খোলা রেখে চলুন।আমার কিন্তু কাঁটা ভয় নয়। ভয় সাপ কে নিয়ে। " ড: মালহোত্র বারবার সাবধান বাণী শোনালেন।

আমরা আরও অনেকটা হাঁটলাম। আমাদের সবাই চোখ আসেপাশে চষে বেড়াচ্ছে। লক্ষ্য সেই পাতা। যদি কোথাও চোখে পড়ে। তাহলে এই পৃথিবী থেকে ক্যানসার নামক ভয় টা চলে যাবে। একটু একটু করে জঙ্গল ঘন হয়ে এল। আর চারিদিকে আরও নি:ঝুম । শুধু আমাদের পায়ের খস খস শব্দ। সত্যিই অনেক প্রজাতির গাছ আছে এ জঙ্গলে। কিন্তু সেসব দেখার সময় আমাদের দিকে নেই। হঠাৎ ই ড: মালহোত্র থমকে দাঁড়ালেন। দু'হাত পাশে প্রসারিত করে দিলেন। ফিস ফিস করে বললেন, -" শুনতে পাচ্ছো অভিজিৎ? "
-" কি স্যার!"
-" ফোঁসসসস!" ডাক্তার ইসলাম পিছন থেকে বললেন।

এবার কানে এল আমার শব্দ টা। সামনের কাঁটা-লতার জঙ্গলের ভেতর থেকে শব্দ টি আসছে। ড: মালহোত্র দু'পা পিছিয়ে এসে বললেন,-" এ রাস্তায় আর যাওয়া আমাদের ঠিক হবে না। অন্য রাস্তা ধরতে হবে।"
তিন জন সেটাই করলাম। আমাদের কাছে কম্পাস আছে। সেটা দেখে এবার আমরা  পশ্চিম দিকে চলতে লাগলাম। এদিকের জঙ্গল টা আরও ঘন। আগের মতোই চলছি আমরা। ড: মালহোত্র হাতে একটা গাছের ডাল নিয়ে লতা-পাতা সরিয়ে এগিয়ে চলতে লাগলেন। তার পিছন পিছন আমার। বেশ অনেক্ষন হেঁটে চলেছি। সূর্যের আলো ও পড়ে আসতে লাগলো। হঠাৎ একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে এলো আমাদের। সেই সাথে পায়ের নীচের মাটি স্যাঁতসেঁতে হয়ে এল। ড: মালহোত্র আমাদের দিকে ফিরে চাইলেন।- "কিসের গন্ধ বলো তো? ফুলের গন্ধ তো অবশ্যই। কিন্তু এরকম গন্ধ আমি আগে কখনো পায়নি।"

আমাদের কাছেও বিস্ময় সৃষ্টি করলো এ গন্ধ।
আমরা আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম। ঘন গাছ পালার পাতার ফাঁক দিয়ে বিকেলের সূর্যের আলো এসে ঝিমমিক খেয়ে পড়ছে। এদিকের বনটা যেন আরও নিস্তব্দ হয়ে গেল। গাছের পাতা গুলোও মাথা নাড়াচ্ছে না। পায়ের নীচের মাটি আরও ভিজে ঠেকলো। জুতো একটু একটু করে বসে যেতে লাগলো। ডা: ইসলাম বললেন, সামনে কোনো জলাভূমি থাকতে পারে। সেটাই স্বাভাবিক। কিছুটা এগিয়ে যেতেই গাছের ফাঁক দিয়ে জলাভূমি দেখতে পেলাম। তাড়াতাড়ি আমরা এগিয়ে গেলাম সেই দিকে। যত এগিয়ে যাই যতই গন্ধটা নাকে বেশি করে আসতে লাগলো। এখানে মনে হল উঁচু জমি ঢালু হয়ে জলাশয়ের দিকে নেমে গেছে। কিছুটা ফাঁকা জায়গা। আমরা তিনজন গিয়ে সেই জলাভূমির কাছে দাঁড়ালাম। কি দেখছি আমরা! নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছি না। ছোট্টো জলাভূমির ওপারে আমাদের চোখ একদৃষ্টে নিবন্ধ হয়ে গেল। পরষ্পরের মুখের দিকে তাকালাম। সকলের চোখে মুখে হাসি। সেই একই পাতা!,  সেই একই রঙ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার আমাদের থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত দূরে। ড: মালহোত্র ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে, কয়েক ঢোক জল খেলেন। আমিও হাতে জলের বোতল বের করলাম। ডা: ইসলাম উত্তেজনায় জলাভূমি তে নামতে গেলেন। ড: মালহোত্র ছোট্টো চিৎকারে তাকে থামিয়ে দিলেন। -" জল আর জঙ্গল, এই দু'টো জিনিষ কে কখনই বিশ্বাস করতে নেই।"

থমকে গেলেন ডা: ইসলাম। জলাভূমিটা চওড়ায় ছোটো। লম্বায় বেশি। ড: মালহোত্র এক পা জলে নামিয়ে হাতের লম্বা গাছের ডাল টা জলের ভেতর ডুবিয়ে দিলেন। -" না বেশি জল হবে না। আমার পিছন পিছন এসো সবাই। কিন্তু সাবধান! আমার কিন্তু এই জঙ্গলে একটাই ভয় সাপ।"
এগোতে লাগলাম আমরা। জল একটু একটু বাড়তে লাগলো। হাঁটুর উপর পর্যন্ত উঠে গেল। সেই সমেত এগিয়ে চললাম। ড: মালহোত্র সামনে হাতের ডাল টা ডুবিয়ে, খুব সন্তর্পণে এগিয়ে চলতে থাকলেন। না, বিপদ কিছুই ঘটল না। আমরা নিরাপদেই জলাভূমি থেকে পাড়ে উঠে গেলাম। আমাদের চোখ মুখে আনন্দে একটা ঝিলিক কেটে গেল। আমাদের হাত কয়েক দূরেই, নতুন আবিষ্কার। পরষ্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছি। কিন্তু তখনও আমরা বুঝতে পারিনি, আমাদের জীবনে একটা এতবড় বিপর্যয় ঘটতে চলেছে। এগিয়ে গেলাম আমরা গাছ গুলির দিকে। ড: মালহোত্র বললেন,-" ক্রিপার টাইপ! আমি তো ভেবেছিলাম বড় কোনো গাছ হবে।"


অনেকটা পান গাছ, কিম্বা কিছু ধরনের আগাছার মতো লতানো গাছ। কিন্তু তার পাতার অদ্ভুত রঙ,  আর সুমিষ্ট গন্ধের জন্যে বেশ আকর্ষনীয়।  ফুল ও ধরে আছে প্রতিটা পাতার খাঁজে খাঁজে। বেশ লক্ষ্য করলাম, প্রজাপতি, মৌমাছি রা ফুলে বসে মধু আহরন করছে। ড: মালহোত্র আসে পাশে ঘুরে আমাদের হাঁক দিলেন,-" আরে এদিকে এস!"
আমরা সেদিকে ছুটতেই অবাক হয়ে গেলে। সারাটা জঙ্গল জুড়ে গাছ টি লতিয়ে আছে। বড় বড় দাঁড়িয়ে থাকা গাছ গুলোকে ঘিরে, পেঁচিয়ে উপরে উঠে গেছে। সূর্যের আলো ও কমে আসতে লাগলো। ড: মালহোত্র বললেন, -" আর দেরি করা ঠিক হবে না আমাদের। "

আমরা পিঠ থেকে ব্যাগ গুলো নামিয়ে একটা গাছের নীচে রাখলাম। বড় গাছটির গা পেঁচিয়ে  লতিয়ে উপরে উঠে গেছে। তার পাশেই পাতার জঙ্গল। ড: ইসলাম ব্যাগ থেকে দু'টো ছুরি বের করে একটা ড: মালহোত্রের দিকে এগিয়ে দিলেন। তারপর দু'জন এগিয়ে গেলেন গাছের দিকে। আমি পিছনে দাঁড়িয়ে রইলাই। এরপর  ড: মালহোত্র গাছটির একটা পাতা ছিঁড়লেন।

আমার যেন মনে হল গাছটি নড়ে উঠল। চোখের ভুল ও হতে পারে। ডা: ইসলাম বললেন,-" মালহোত্র! এভাবে পাতা তুলতে অনেক সময় লাগবে। চলুন গাছটি যতটা সম্ভব কেটে নিয়ে ব্যাগে ভরে চলে যাই।"
-"ঠিকই বলেছো।" কথাটা বলেই আরেকটি পাতা ছিঁড়লেন ড: মালহোত্র।
এবার পরিষ্কার দেখতে পেলাম পাশের বড় গাছে লতিয়ে উঠে যাওয়া গাছটির শাখা প্রশাখা নড়ে উঠল আপনা হতেই। তারপর একটু একটু করে আগলা হয়ে নীচের দিকে নামতে লাগলো। সেই সাথে লতানো জঙ্গল টা যেন একটু একটু করে নড়ছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম,-" স্যার! গাছের পাতা ছিঁড়বেন না।"
আমার কথা হয়তো ডা: ইসলাম শুনতে পান নি। ছুরি চালিয়ে দিলেন গাছের শরীরে। আর সেই সাথে বিদ্যুতের মতো আমার সামনে ঘটে গেল সেই বীভৎস ঘটনা। লতানো গাছের ডগা আলগা হয়ে নেমে এসে ড: মালহোত্রের গলায় পেঁচিয়ে ধরলো। একদম দড়ির মতো। তারপর নীচে লতিয়ে থাকা গাছ গুলো যেন সাপের মতো এসে ডা: মালহোত্রের পা বেঁধে ফেললো।তার সারা শরীরে  জড়িয়ে ধরলো গাছের শাখা- প্রশাখা। ওদিকে ডা:  ইসলাম এক মুহুর্তে আমার চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গেলেন। তার শরীর মুহুর্তের মধ্যে হারিয়ে গেল গাছের জঙ্গলের মধ্যে। শুধু তার মৃত্যুর আগের ভয়ঙ্কর চিৎকার আমার কানে এল। সারাটা জঙ্গল জুড়ে যেন, তোলপাড় শুরু হয়েছে।
আমার শরীর থর থর করে কাঁপতে লাগলো। কি বীভৎসতা! ড: মালহোত্রের সমস্ত শরীরে সবুজ  লতা-পাতা জড়িয়ে ধরেছে। তার মুখটা আর  দেখা গেল না। নিস্তব্দ হয়ে গেলেন তিনি।
আমি ভয়ে 'বাঁচাও' বলে চিৎকার করে উঠলাম। হঠাৎ একটা লতানো গাছ,একটু একটু করে  এঁকে বেঁকে  আমার দিকে আসতে লাগলো।  একটু একটু করে পিছোতে লাগলাম।দম বন্ধ  হয়ে আসছে আমার। আর এক মুহুর্ত দেরি না  করে পিছন ফিরে দৌড়। কতক্ষন ওই জঙ্গলের  ভেতর দৌড়েছিলাম জানি না। তারপর আর  কিছু মনে নেই আমার।


যখন চোখ খুললাম, তখন দেখি আমার চারিদিকে কিছু আদিবাসী লোকজন ঘিরে আছে। আবছায়া ভোর। এদিক-ওদিক তাকালাম। কিছু ঘর বাড়ি দেখতে পেলাম। সবাই আদিবাসী ভাষায় নিজেদের মধ্য কি বলাবলি করতে লাগলো। তার সবটা আমার বধোগম্য হল না। এরপর সেখান থেকে, ঠিকানা ধরে ঢাকা চলে এলাম। একদিন হোটেলে কাটিয়ে পরদিন সোজা কলকাতা। আর কোনোদিন হয়তো ওই রেমা-কালেঙ্গার জঙ্গলে যাওয়া হবে না। যেতেও চাই না। আজ সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা লিখতে লিখতে গাছটির ভয়ানক বীভৎসতা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।

পুনশ্চ :জঙ্গলের তথ্যসূত্র - উইকিপিডিয়া ও গুগল।
 স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.