|| খোকা ঘরে আয় || ছোটগল্প || স্বদেশ কুমার গায়েন




(১)


-" যদি আমার ভাল চাও, তাহলে আর আমার সাথে কোনোদিন যোগাযোগ করো না।"– কথাটা বলেছিলাম আট বছর আগে।
তারপর আর কোনোদিন কথাও বলেনি। কোনো যোগাযোগ রাখেনি মানুষ দুটির সাথে। যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন ও বোধ করিনি। মানুষ দু'জন এখনো বেঁচে আছে কিনা, তাও জানি না। সেদিনের পর থেকে তারাও আর আমাকে বিরক্ত করেনি। চোখের জল ফেলতে ফেলতে মেনে নিয়ে ছিল আমার কথা। আমার মতো অমানুষ,নীচ্,অধম,পাষন্ড,ছেলে না হলে, কেউ নিজের বাবা–মাকে এমন কথা শোনাতে পারে না!
আট বছর আগে যখন এই কথাটা বলি তখন আমার কলেজের প্রথম বর্ষ শেষ। পড়াশুনার জন্য দক্ষিন ২৪ পরগনার ছোট্টো শহরের মেসে থাকি।বাড়ি থেকে মাসে মাসে পড়াশুনার খরচ আসে।আর দু'একটা টিউসন করে হাত খরচ দিব্যি চলে যায়। ভেবেছিলাম,পরের বছর থেকে টিউসন টা বাড়িয়ে পড়াশুনার খরচ ও চালিয়ে নেব। গ্রামের বাড়ি ছেড়েছি এর আরও দুবছর আগে। তখন আমার শরীরে উন্মত্ত যৌবন আগত; মন, আবেগে কানায় কানায় পরিপুর্ন। পক্ষীশাবক নতুন উড়তে শিখলে যেমন সারাদিন গাছে গাছে উড়ে বেড়ায়,মা,বাবার কথা মনে পড়তে চায় না,– আমার অবস্থাও ঠিক তেমনই ছিল।ছোটোবেলা থেকেই আমার একটা অভ্যাস এখনো রয়ে গেছে,– বেশীরভাগ মানুষ যেটা করতে বলে, আমি ঠিক তার বিপরীত করে বসি। জানিনা! এমন কেন হয়। অন্যের স্বপ্নকে নিজের ঘাড়ে চাপাতে একদম পছন্দ হয় না।তাই এরকম একটা ছেলের সাথে,বাবা– মায়ের যে সব সময় ঝামেলা হবে,সেটাই স্বাভাবিক!
আর ঝামেলা টা সেদিনই চরমে বাঁধল,যেদিন আমাকে পড়াশুনা ছেড়ে চাকরী পেয়ে চলে আসতে হল এই আসানসোল শহরে। উড়নচন্ডীর মতো উড়ে বেড়ানোর বয়েসে,যদি কারও জীবনকে এই ভাবে বাঁধা ধরা ছকে ফেলে দেওয়া হয়,সেটা কখনই কেউ মেনে নিতে পারে না। বিশেষ করে আমার মতো কুড়ি বছরের যুবকের পক্ষে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব হল না। দক্ষিন ২৪ পরগনার ছোট্টো শহর ছেড়ে, যেদিন এই রেল শহরে এলাম,সেদিনই পালাতে ইচ্ছে করল। এরকম বয়েসের সন্ধিক্ষণে কারও চাকরীতে মন টেকে না। তাই আমিও সেটা পারছিলাম না।বাড়িতে যেদিন ফোন করে বললাম, আমি চাকরী করতে পারব না;এখন পড়াশুনা করতে চাই।" তখন বাবা– মা, আত্মীয় স্বজন রা অনেক কথা শোনালো। বুঝতে পারলাম,আমার সিদ্ধান্ত টা কেউ মেনে নিতে রাজী নয়।
সেদিনের রাত টা আজও মনে আছে। আকাশে তারা গুলো মিট মিট করে তাকাচ্ছিল। দূরে মালগাড়ির তীক্ষ হর্নের আওয়াজ ভেসে আসছে। আর বাড়ির সাথে আমার কথা কাটাকাটি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল। আমার বাবা– মা চোখের জল ফেলতে ফেলতে বোঝাচ্ছিল,– এ যুগে একটা চাকরীর, দাম কত খানি! কিন্তু আমার অবুজ মন সেদিন সমস্ত বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল।কিছুই সহ্য হচ্ছিল না।ঠিক তখনই রাগের মাথায় কথাটি বলে ফেললাম,-"তোমাদের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই।যদি আমার ভাল চাও, তাহলে আমার সাথে কখনোও যোগাযোগ করো না।"
নিজের ফোন নাম্বার টিও বদলে ফেলেছি,– যেন ওরা আর কোনো যোগাযোগ না করতে পারে।

(২)

এসব আট বছর পূর্বের কথা।কিন্তু আট বছর পর ও আমার মন টা বদলাই নি। কিছু কিছু মানুষের মন এইরকম নিষ্ঠুর হয়,– তারা একবার কাউকে ভালবাসতে শুরু করলে,শুধু অন্ধের মতো ভালবেসে যায়। আর কাউকে ঘৃনা করতে শুরু করলে,সারা জীবন তাকে ঘৃনা করে যায়। আমারও মন বোধহয় সেইরকম ছিল।তাই মান–অভিমান,দু:খ–কষ্ট, রাগ,যন্ত্রনা বুকের মধ্যে চেপে রেখে,আট টা বছর বয়ে গেছে নদীর জল ধারার মতো কূল কূল শব্দে। তবুও আমার একবারও তাদের কে দেখতে যেতে ইচ্ছে করেনি।যতটুকু জানি,অত্যন্ত নীচ্ মনভাবাপন্ন না হলে,কোনো মানুষ এরকম হতে পারে না।
এতদিন বাদে কথা গুলো আজ আবার মনে পড়ল রোহিণীর জন্যে।যদিও ও এর আগেও চেষ্টা করেছে বেশ কিছু বার। কিন্তু আমি আমল দিতে চাইনি। বছর খানেক হল রোহিণী কে বিয়ে করে সংসার পেতেছি। একটু ভুল বললাম,– ঘটনাটা একটু উলটো। রোহিণীই আমাকে জোর পূর্বক বিয়ে করে সংসার পেতেছে। ও আমার জীবনে, চারিদিকের কালো অন্ধকারের মধ্যে, এক চিলতে প্রদীপের শিখার মতো।যার দিকে তাকিয়ে একটুখানি সুখের পরশ পাওয়া যায়। আজ রোহিণীর জন্মদিন। বিয়ের পর ওর প্রথম জন্মদিন পালন করছি।বিকেলে অফিস থেকে ফিরে ঘরটা সাজিয়েছি নিজের হাতে। কেকের চার পাশে পঁচিশ টা মোমবাতি জ্বালিয়ে, ছুরিটা রোহিনীর হাতে ধরিয়ে দিয়েছি। এক টুকরো কেক কেটে, আমার মুখে ঢুকিয়ে দিল। কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললাম," কি গিফট লাগবে, বলো তোমার?"
রোহিনী আমার গলা জড়িয়ে,আবদুরে গলায় বলল,"আমি তোমার বাড়ি যেতে চাই। তোমার বাবা– মাকে দেখতে চাই"
ছিটকে সরে গেলাম ওর থেকে।– "তোমাকে অনেকবার বলেছি, ওই কথাটা কখনোও বলবে না!"
–"কেন বলবো না! নিজের বাবা– মাকে দেখতে একবার ও তোমার ইচ্ছে করে না? ওদের প্রতি এত নিষ্ঠুর কেন তুমি?আট বছর ধরে মনের মধ্যে একটা রাগ পুষে রেখে কি লাভ? "
রোহিনীর গলায় হতাশা ঝরে পড়ল।রাগ আর অভিমান,–এক জিনিস নয়। কিন্তু আমার যেন, রাগের থেকে অভিমান ছিল বেশী। তাই রোহিনীর কথায়,নিজের মন কে ভিজতে দিলাম না। সমস্ত রাগ, অভিমান,যন্ত্রনা বুকের মধ্যে জমিয়ে রেখে বললাম,-" না! আমার কোনো ইচ্ছে করে না"
–" তোমার না করলেও, আমার ওনাদের কে দেখতে ইচ্ছে করে।"
রোহিনীর চোখে জল এল। কেক টা ফেলে রেখে লম্বা লম্বা পা ফেলে সোজা বেডরুমে ঢুকে গেল। সারা সন্ধ্যে কোনো কথা হল না।রোহিনীকে ছাড়া একা একা কোনোদিন ছাদে বসেনি। কিন্তু আজ বসতে হল।রাতে পাশাপাশি শুয়ে ওর গায়ে হাত রাখতেই,আমার হাত টাকে সরিয়ে দিল। বুঝলাম রাগ হয়েছে। আস্তে আস্তে কানের পাশে গিয়ে বললাম,-" কাল সকালেই আমরা রওনা দেব।"
রোহিনী চকিতে পাশ ফিরে বলল,-" সত্যি! যাবে তুমি?"
-" একটা নয়,তিনটে সত্যি।"
হঠাৎ তমসাছন্ন রাতের কালো ভেদ করে জোনাকি পোকাগুলো যেন উড়ে বেড়াতে লাগল। এক রাত জাগা পাখি তীক্ষ চিৎকারে, জানালার পাশ দিয়ে উড়ে গেল। জানালার নীচের কলা গাছের শুকনো পাতা,হাওয়ায় সর সর আওয়াজ করতে শুরু করল। আর রোহিনী, পরম আদরে আমার মাথাটিকে, নীজের বুকে চেপে ধরল।আট বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত রাগ, অভিমান,যন্ত্রনা গুলো একটু একটু যেন হারিয়ে যাচ্ছে। চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা আনান্দশ্রু একটু একটু করে রোহিনীর শরীরে মিশে যাচ্ছে।ও আমার মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিল। অন্তহীন' সিনেমার একটা গানের লাইন মনে পড়ে গেল,-" তুমি মায়ের মতোই ভাল..."
রোহিনীর বুকে মুখ লুকিয়ে,সারা রাত জেগে রইলাম। ঘুম আসতে চাইলো না।শুধু ভাবছি, –কখন ভোর হবে! সময় যেন আর কাটতে চাইছে না। ভোর রাতে চোখ দুটো একটু বন্ধ হয়ে এল। চোখ খুলতেই দেখি রোহিনী তৈরী হচ্ছে। আলমারি থেকে দু'– তিনটে শাড়ি বের করল।
আমি খাটের উপর উঠে বসে,চোখ কচলে বললাম,-" এই! তুমি শাড়ি পড়ে যাবে?"
-" হ্যাঁ! এই প্রথম তোমার বাড়িতে যাচ্ছি;গ্রামের
দিকে সবাই শাড়ি পরে,বুঝলে।"
খুব হাসি পেল আমার। বললাম,-" এই দশ বছরে পরে কি,সেসব আর গ্রাম আছে?"
-" সে নাই থাকুক! আমি শাড়ি পরেই যাব।"ব্যাগ গোছাতে গোছাতে রোহিনী আবদুরে গলায় বলল।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। খাট থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। ফোনটা নিয়ে অফিসের প্রভা দা কে জানিয়ে দিলাম যে আমি দশ দিনের ছুটি নেব। খুব এমার্জেন্সী!

(৩)

বুকের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা শুরু হয়েছে। –সেটা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এক অদ্ভুত ভালোলাগা যেন সারা শরীর টাকে অবশ করে দিচ্ছে। রোহিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে, ওকে একটা মনে ধন্যবাদ দিলাম। আর আদর টা তুলে রাখলাম।

দশ বছর বাদে মোটর ভ্যানে বসে,নিজের গ্রামের রুপ পরিবর্তন দেখছিলাম। সেই সব মাটির রাস্তা, ইটের রাস্তা আর নেই।সবুজ মাঠের মাঝ দিয়ে কংক্রিটের ঢালাই করা চওড়া রাস্তা সাপের মতো বেঁকে চলে গেছে। আর মোটর ভ্যান গুলো তার উপর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলেছে। রাস্তার দুপাশে ইলেক্ট্রিকের পোস্ট। বুঝলাম,গ্রামে বিদ্যুৎ ঢুকেছে। বেশিরভাগ বাড়ি প্রায় ইটের তৈরি। দুপাশের বড় বড় পুকুর গুলোতে নাল ফুল,ঘেটু ফুল,শাপলা ফুল মাথা তুলে আছে; কোথাও বা কচুরিপানা, কলমীলতার জঙ্গলে পরিপুর্ন। নীল আকাশে পাখিদের দল হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে।
বাড়ির সামনে রাস্তার উপর যখন মোটর ভ্যান থামল,তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। রাস্তার ইলেক্ট্রিক পোস্টের লাইট গুলো জ্বলে উঠেছে। আশেপাশের বাড়ি গুলোতে বিদ্যুতের বাল্ব জ্বলছে। বড় কংক্রিটের রাস্তা থেকে একটা মাটির রাস্তা নেমে গেছে ভেতরের দিকে। এই রাস্তার প্রথম বাড়িটিই আমার। ভ্যানওয়ালা কে পয়সা মিটিয়ে দিয়ে,রোহিনীর হাত ধরে রাস্তায় নামলাম। স্বপ্নের মতো মনে হল যেন। বাড়ির সামনের সেই পুকুর টা এখনোও আছে,তার পাশে বুড়ো শিরিষ গাছটিও। জন্মের পর থেকে এই গাছটিকে আমি দেখে আসছি। আনান্দে চোখে জল চলে এল। মনে হল একটা ছোটো ছেলে এসে আমার পাশে হাঁটছে। তার পর ছেলেটি মা, মা চিৎকার করতে করতে পুকুরের পাড় দিয়ে ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই ছোট্টো বেলার 'আমি' টাকে চিনতে অসুবিধা হল না। আমারও খুব ইচ্ছে হল এই বয়েসে মা,মা করে ছুটে যেতে। কিন্তু পারলাম না।
গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই,আমার ছোট্টো বাড়ি টি দেখতে পেলাম। চারিদিকের বিদ্যুতের আলোর মধ্যে,একরাশ অন্ধকার তাকে ঢেকে রেখেছে। ধীরে ধীরে ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম দু'জন।পুব দিকের ধানের গোলাটা এখনোও আছে। তার পাশের তুলশী মঞ্চে, একজন বয়ষ্ক মহিলা কে সন্ধ্যা দিতে দেখতে পেলাম।সেই সন্ধ্যার আলো–আঁধারিতে নিজের মা কে চিনতে ভুল করিনি। বারান্দায় দোলনায় বসে,কেউ যেন দোল খাচ্ছে।আমাদের দেখে বারান্দার ভেতর থেকে সে বলল,-"ওগো! দেখেতো, বাইরে কারা যেন এসে দাঁড়িয়েছে।"
বাবার গলার স্বর টা এসে বুকে ধাক্কা মারল। অনেক টা ভাঙা ভাঙা স্বর। বয়েস হলে যেমনটা হয়।মা,তুলশী মঞ্চের পাশ থেকে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর আমাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল," তোমরা কারা বাবা? কাদের বাড়ি যাবে?"
আমার বুকের ভেতর কান্না বাঁধ ভাঙতে শুরু করছে। বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করল।কান্না বের হল না।গলার কাছে এসে সব জড়িয়ে যাচ্ছে।তারপর মা, বাবার দিকে ফিরে বলল,-" ঘর থেকে আলো,আর আমার চশমা টা বের করে আনাতো! চিনতে পারছি না"
বাবা,আলো নিয়ে মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাবার চোখে চশমা উঠেছিল জানতাম।কিন্তু মায়ের যে দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে, সেটা আজ বুঝতে পারলাম। আমাদের দুজন কে,তারা ভাল করে দেখতে লাগল। আমার গলার কাছে স্বর টা আঁটকে যাচ্ছে। দু'চোখ দিয়ে,জলপ্রপাতের মতো জল গড়িয়ে পড়ছে জামার উপর।রোহিনী আমার আরও কাছে সরে এল। সমস্ত শক্তি একত্রিত করে বললাম,-" মা! আমাকে চিনতে পারছ না?"
আমার কথায় সামনের দুজন যেন কেঁপে উঠল। আলোটা আরও সামনে আনল। কাঁপা কাঁপা হাতে মা,আমার গালে হাত রাখল। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,-" শুনছো! বাবু এসেছে।"
আর কোনো কথা নেই। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে দু'জন।কেরোসিনের সেই মৃদু আলোয় দেখতে পেলাম,দুজনের চশমার ভেতর দিয়ে চোখের জল গাল বেয়ে নীচে গড়িয়ে পড়ছে।

সেই মুহুর্তে, পিছনের বাঁশ বন থেকে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখি গুলো সব এক সাথে কিচির মিচির করে ডেকে উঠল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

আমার নূতন ফোটোগ্রাফি ব্লগ সাইট। যারা ছবি তুলতে ভালোবাসে,সবাই কে স্বাগতম। ব্লগে ঢুকতে লিঙ্কে ক্লিক করুন। www.picsalove.blogspot.com

No comments

Powered by Blogger.