|| রতন মিস্ত্রীর গল্প || ছোটগল্প ||~স্বদেশ কুমার গায়েন



(১)

রতন এ'পাড়ার ইলেক্ট্রিসিয়ান। কালো,ছিপছিপে চেহারা। পাঁচ ফুট, আট ইঞ্চির কাছাকাছি লম্বা। পাতলা চেহারার জন্যে আরও বেশি লম্বা দেখায় তাকে। ডান গালে একটা ছোটো কাটা দাগ আছে। ছোটোবেলায় পোলিও রোগ হওয়ার কারনে,ডান হাতের তুলনায় বাঁহাত টা একটু সরু। লিকলিকে ধরনের। বয়স প্রায় সাতাশের কাছাকাছি। পোড় খাওয়া ইলেক্ট্রিসিয়ান বলতে যেটা বোঝায়, রতন ঠিক সেরকম।এত পড়াশুনা জানা,সার্টিফিকেট ধারি নতুন ছেলে এ লাইনে এলো,গেলো কিন্তু রতনের সার্ভার কেউ ডাউন করতে পারলো না।একই গতিতে স্পীড দিয়ে চলেছে। বরং তারা নিজেরাই তল্পি তল্পা গুটিয়ে পালিয়েছে। যত বড় বাড়ি হোক না কেন,ঘরের ওয়্যারিং,আলো,ফ্যান লাগাতে গেলেই সবার আগে রতন মিস্ত্রীর ডাক পড়ে। আরে বাবা, অভিজ্ঞাতার একটা দাম আছে তো!
পনেরো বছর এ লাইনে কাজ করছে সে।সেই এইট পাশ করার পর থেকে আর পড়াশোনা করা হয়নি তার। বাবা অ্যাক্সিডেন্টে প্যারালাইসিস হয়ে গেল। পুরোপুরিভাবে কর্মক্ষম হয়ে পড়ল। মা ও আর পেরে ওঠে না। চোখেও কম দেখে।বয়েস টা তো বাড়ছে,তাই কাজ করতে গিয়ে হাঁফিয়ে ওঠে।শেষ মেষ পড়াশুনা ছেড়ে,পাড়ার রবিন দা কে ধরা করা করে এই ইলেক্ট্রিক লাইনে ঢুকে পড়ল। প্রথম প্রথম রবিন দার  হেল্পারি করতে লাগলো।
মাকড়শার মতো দেওয়ালে উঠে ড্রিল মেসিন দিয়ে দেওয়াল ছিদ্র করা,হ্যামার দিয়ে কাঠের গুটকা মারা ,তারপর ক্যাচিং লাগানো।দুবছর যেতেই পুরোদস্তুর পাকা মিস্ত্রি হয়ে গেল। পড়াশুনা না জানলে কি হবে,রতন কাজ করতে করতে ইলেক্ট্রিক সম্পর্কে সব শিখে গেছে। আর্থিং কেন প্রয়োজন, ফিউজ কি,কেন লাগানো হয়,সুইচ, থ্রিপিন প্লাগ কি সিস্টেমে চলে, একটা সুইচে কিভাবে অনেক গুলো আলো একসাথে অফ করা যায়, অারও অনেক কিছু। এখন দেখেই বলে দিতে পারে,কোনটা ফেজ তার আর কোনটা নিউট্রাল তার। রতন যে বাড়িতে একবার কাজ করে,সে বাড়িতে একবছরের মতো আর যেতে হয় না।আর সব থেকে বড় ব্যাপার হল রতনের ব্যবহার,কারও থেকে কোনোদিন এক পয়সা বেশি নেয় না। পার্টি-পলেটিক্স দের মতো চিটিংবাজি তার স্বভাবে নেই। তাই এ পাড়ায়, এমনকি পাড়ার বাইরেও রতনের কদর খুব। পাড়ার ছেলে-ছোকরা থেকে বুড়ো এক ডাকে সবাই 'ইলেক্ট্রিক রতন' বলে চেনে তাকে।

(২)

দোতালা ঝাঁ চকচকে বিশাল বাড়ি। মার্বেল পাথর বসানো। তার বারান্দা দিয়ে রতন হাঁটতে থাকে। পেছনে হাত বাঁধা। কিচেনে সুগন্ধি ভাতের সুবাস ভুর ভুর করে বেরোচ্ছে। নিচে একটা চার চাকার গাড়ি। ড্রাইভার টা জল দিয়ে পরিষ্কার করছে চাকা গুলো। পাথর বসানো মেঝের উপর দিয়ে হাঁটতে বেশ আরাম লাগছে রতনের। হঠাৎ বউ এর ডাকাডাকি তে ঘুম ভাঙলো রতনের।স্বপ্ন টা স্যাট করে পালিয়ে গেল। দিলে তো স্বপ্নটার বারোটা বাজিয়ে!
রতনের বড়লোক হতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু প্রতিদিন এই এক বিরক্ত কর অবস্থা। বউ এর ঠেলায় স্বপ্ন টুকুও দেখা হয় না। বছর খানেক হল বিয়ে করেছে রতন। নিজের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। মায়ের জোরাজুরিতে বিয়ে টা করতে হয়। রতনের মা বলেছিল,-"খোকা রে,আর কতদিন আইবুড়ো থাকবি?এবার একটা বিয়ে কর। অন্তত বৌমার হাতের ভাত খেয়ে একটু শান্তি পাই।"
রতন জানে,এ লাইনে একটু পরিশ্রম করতে পারলে অনেক মাল্লু আছে। এমনিতেই এখন তার রোজ তিনশ টাকা।দু'টো বাড়ি কাজ করতে পারলেই ছ'শো টাকা।তবে প্রতিদিন দু'টো বাড়ি কাজ করা হয়ে ওঠে না। পরের বছর থেকে আরও পঞ্চাশ টাকা রোজ বাড়াবে বলে মনে করেছে রতন। বড় বড় চাকুরী জীবি বাবুরা, তাদের মাইনে বাড়ছে বলে, আনন্দে লাফায়, হই হল্লা করে। আবার না বাড়ালে, অবরোধ, প্রতিবাদ, মিছিল, এরকম কত কিছু আছে। তবে রতন কেন বাড়াবে না? পরের বছর থেকে রতনের ও মাইনে বেশি দিতে হবে।
মায়ের কথার জবাবে রতন তাই বলেছিল,-"এখন বিয়ে করে কি হবে?এখন খাটার সময়,সারাদিন খেটে খুটে পয়সা রোজগার করে নিই।বিয়ে পরে দেখা যাবে।"
-"তাই বললে কি হয়, সবাই কে বিয়ে করতে হয়।" রতনের মা বলে।
শেষ পর্যন্ত মায়ের জোরাজুরিতে দুরসম্পর্কের এক মাসীর দেখে দেওয়া মেয়েকে বিয়ে করে রতন। রতনের বউ জয়া মন্দ নয়।বেশ ভালো। মাঝারি উচ্চতা,শ্যামলাই রঙ,সুস্বাস্থ্যবতী।হাঁটার সময় ভরা যৌবন যেন ছলকে পড়ে।নতুন বাড়িতে এসে জয়া বেশ মানিয়ে নিয়েছে।নিজের মতো।জয়ার মা নেই।তাই রতনের বাবা,মা কে নিজের বাবা-মায়ের মতোই দেখে। পর ভাবে না কখনো।
বউ এর ডাকাডাকি তে তেতো মুখে উঠে পড়ল রতন।চোখ কচলে উঠে বসতেই হাতে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দিল জয়া।বিয়ের পর থেকে প্রতিদিন সকালে রতনের এই একটা কাজ পার্মানেন্ট হয়ে গেছে। বিনা বেতনে।দাঁতে ব্রাস ঘষে,চোখে মুখে জল দিয়ে,চায়ের কাপ টা শেষ করে তাড়াতাড়ি বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।মোড়ের মাথায় ভোলার চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যেতেই, ভোলা হাঁকলো,-"আরে,ও রতন দা,একটু শুনে যাও!"
-"না হবে না।তাড়া আছে।"রতন বলে।
-"জরুরি দরকার গো।"
রতন ভোলার দোকানে গিয়ে লম্বা বেঞ্চে বসে। চায়ের গ্লাসে চামচ নাড়তে নাড়তে ভোলা বলে,-"কি ব্যাপার রতন দা, চা খাওয়া ছেড়ে দিলে নাকি?"
-" না রে! এখন বাড়িতে তোর বৌদি সবার জন্যে চা বানায়।"
-'তাই নাকি?"
আসলে রতনের একটা শখ আছে। বড় বড় বাড়ির লোকদের স্টেটাস কপি করা। এসব রতনের স্বপ্ন। সেবার একবাড়ি ইলেক্ট্রিকের কাজ করতে গিয়ে দেখলো,বাড়ির বউ টা গ্যাসে চা তৈরী করে সবাই কে দিচ্ছে। তাই দেখে রতনের ও শখ হল। টাকা জমিয়ে পরের মাসে গ্যাস কিনে ফেলল। আর সঙ্গে চা। সেই থেকে জয়া প্রতিদিন সকালে উঠে চা করে।
-"ভাট বকিস না। কি বলবি বল?" রতন বাঁকা মুখে কথাটা বললো ভোলাকে।
-"আরে দেখো না, ওই বাড়ির দাদা টা বলছিল দোতলার ঘর গুলো ওয়্যারিং করার জন্য,তো আমি তোমার কথা বলেছিলাম।আজ বিকালে তোমার সময় হবে?"ভোলা হাতের আঙুল দিয়ে তার দোকানের সামনের দোতলা বাড়িটা দেখালো।
মুখ্যমন্ত্রীর তবুও ডেট পাওয়া যায়, কিন্তু রতনের ডেট পাওয়া খুব মুসকিল।'বিকালের' কথা শুনে এক কথায় না করে দিল রতন।
-"আরে দেখো না।লোকটা বার বার এসে বলছিল।"
-"আজ বিকাল!"
একটু ভাবলো রতন। স্কুলের কাজ টা এখনো শেষ হয়নি। সপ্তখানেক লাগবে হয়তো।
-"না,আজ বিকাল হবে না। কাজ আছে। কাল সকালে যাব।"
-"এই নাও, এক কাপ চা খেয়ে যাও।"
একটা গ্লাস এনে রতনের সামনে ধরলো ভোলা।
-"না, না অত তেল মারার দরকার নেই! এখন বাজার যেতে হবে।"
-"আমি আজ বিকালে বলে রাখবো। কাল সকালে অবশ্যই যাবে কিন্তু!"
-"আচ্ছা,ঠিক আছে।"
ভোলার দোকান থেকে বেরিয়ে, সোজা বাজারের পথ ধরলো। দেরি হলে আবার বাড়ি তোলপাড় হবে!


(৩)

বাজার শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে একবার অসিতের বাড়িতে গেল রতন। অসিত রতনের হেল্পার। সমস্ত কাজে সে অসিত কে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। ইঁচড়ে পাকা ছেলে। তবে বেশ পরিশ্রমী। রতনের বিশ্বাস, একদিন অসিত ও তার মতো জায়গায় যাবে।শুধু দোষের বলতে, কাজের থেকে একটু বেশি গল্প করে অসিত। অসিতের বয়স বাইশের একটু বেশি।ক্যানসারে বাবা মারা যাওয়ার পর,কাজের জন্য ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তখন রতনই তাকে এই লাইনে ঢুকিয়ে নেয়। অসিতের বাড়ির সামনে গিয়ে হাঁক পাড়লো রতন।
-"এই,অসিত বাড়ি আছিস?"
দু'বার ডাকার পর সাড়া দিল অসিতের মা।
-"না,বাড়িতে নেই। ও তো বাজারে গেল একটু আগে।"
দু'একটা কথা বলে বেরিয়ে এল রতন।আবার ছোঁড়া টা কে ফোন করতে হবে বাড়ি গিয়ে। দু'টাকা নষ্ট। বাড়ি ফিরে বাজারের ব্যাগটা রান্না ঘরে রেখে,জামাটা খুলে ফ্যানের নীচে বসলো সে। খাটের উপর থেকে ফোনটা নিয়ে অসিত কে ফোন লাগালো। ফোন তুললো অসিত।
-"হ্যাঁ বলো,রতন দা।"
-"শোন,কাল স্কুলের কাজে যাব না। সকালবেলা ভোলার দোকানের সামনে চলে আসবি।"
-"আচ্ছা, ঠিক আছে।"
তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিল রতন। বিকালে এ পাড়ার দেবু ডাক্তারের বাড়িতে একটা ছোটো কাজ ছিল, সেখানে গেল রতন।অনেক দিন ধরে বলছিল ডাক্তার। তাই,না করতে পারি নি।
পরদিন সকালে ভোলার দোকানের সামনে হাজির হল রতন।অসিত ও এসেছে।যন্ত্রপাতির ব্যাগ নিয়ে গেট ঠেলে বাড়িটির ভেতরে ঢুকলো দু'জন। কলিং বেল চাপলো রতন। দু'বার।দরজা খুলে একটা বউ বের হল। গোলাপি নাইটি পরা। বুকের উপর ওড়না নেই।
-"কি চাই?" বউ টি বললো।
রতনের কথা বলার আগে,অসিত কথা বলে উঠলো,-"বৌদি,আমরা ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী।দাদা আসতে বলেছিল।"
-"ও দাঁড়াও।আমি ডেকে দিচ্ছি।"
বউটি ভেতরে চলে গেল। বউ টি চলে যেতেই অসিত চাপা স্বরে বলে উঠলো,-"কি মাল গো, রতন দা। বিদ্যা বালান ও হার মেনে যাবে।কি ফিগার! ভিতরে মনে হয় ব্রা পরেনি।এ বাড়ি আগে কেন কাজ করতে আসি নি!"
-"তুই থাম তো।"হাঁক দিল রতন।
এ সব ছেলে ছোকরাদের নিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক কিছু সামলাতে হয়। রতন সে সব জানে।কিছুক্ষন পর,বাড়ির কর্তা বাইরে এল। তাদের সামনে। রতনের মতোই বয়েস।বা, রতনের থেকে একটু বয়েস বেশি হবে।তবে ফর্সা।
রতন বলল,-"ভোলা বলেছিল...।"
কথা শেষ হবার আগেই,লোকটি বললো,-"বুঝতে পেরেছি। তোমরা ভেতরে এসো।"
লোকটির সাথে ঘরের ভেতর ঢুকলো রতন। মেঝেতে,দেওয়ালে পাথর বসানো।চকচক করছে। তার বাবার মতো একটা বৃদ্ধ মানুষ, একটা চেয়ারে বসে আছে।চোখে চশমা। হাতে খবরের কাগজ।তার পাশে আরেক টা চেয়ারে তার মায়ের মতো একজন বৃদ্ধা বসে আছে।দৃষ্টি বাইরের দিকে। তাদের  মুখের দিকে তাকিয়ে রতন বুঝতে পারলো,এরা লোকটির বাবা-মা। একটু পরেই লোকটির সাথে এবার দোতলায় উঠলো রতন। উপরের ঘরে পাথর বসানো নেই।তবে দেওয়ালে পেন্টিং টা দারুন।দু'টো শোবার ঘর, একটা কিচেন,বাথরুম, বারান্দা, সিড়ির ঘর দেখিয়ে দিয়ে লোকটি বলল,-"এ
গুলো ওয়্যারিং করতে হবে।পরশু আমার গেস্ট আসবে,তাই কাজটা তাড়াতাড়ি করে দিতে হবে। টাকা পয়সা নিয়ে ভেবো না।"
রতন ভালোকরে একবার চারিদিকে চাইলো।কম করে দু'দিন সময় তো লাগবেই! মনে মনে কয়েকটা কাঁচা খিস্তি দিল ভোলা কে।
-"দু'দিন লাগবে।"
তারপর কি কি জিনিষ লাগবে তার একটা লিস্ট তৈরী করে লোকটির হাতে দিল।
লোকটি বলল,-"এসবের আমি কিছু বুঝিনা।কত টাকা লাগবে বলো, সেটা দিয়ে দিচ্ছি।তোমরাই কিনে আনো।"
টাকা নিয়ে অসিত বাজারে বেরিয়ে গেল। চারিপাশ দেখে মনে মনে হিসেব কষে নিল রতন।তারপর চেয়ার- টেবিল খাটিয়ে ড্রিল মেসিন দিয়ে দেওয়ালে ছিদ্র করতে শুরু করে দিল। এক ঘন্টা পর অসিত ফিরে এল সমস্ত জিনিষ পত্র নিয়ে। রতন তখন টেবিলের উপর বসে পা দুলিয়ে বিড়ির ধোঁয়া ছাড়ছিল। অসিত তারগুলো হিসেব অনুযায়ী কাটতে কাটতে বলল,-"রতন দা,উপরে ওঠার সময় বিদ্যা বালান কে দেখলাম।নীচে ঘর ঝাঁট দিচ্ছিল। আরেকটু মাজা নীচু করলেই দেখা যেত।"
-"কি?" রতন বলল।
অসিত হেসে বললো,-"বায়োস্কোপ।"
দেওয়ালে ড্রিল চালাতে চালাতে হাঁফিয়ে উঠেছিল রতন। তারপর আবার সোজা লাইনে ক্যাচিং বসিয়ে হ্যামার দিয়ে কাঠের গুটকা মারা। একটা দেওয়াল শেষ করে নীচে নেমে এসে বলল,-"অসিত,এবার তুই একটু মার।আমি নীচে গিয়ে একটু জল খেয়ে আসি,আর একটা জলের বোতল ও আনি।"
সিড়ি দিয়ে নীচে নেমে রতন সেই বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা কে ছাড়া কাউকে দেখতে পেল না।ওদের কাছে গিয়ে জল চাইবো? একবার ভাবলো রতন। না,সেটা ভালো দেখায় না। কিচেন থেকে ইলিশ মাছের গন্ধ ভুর ভুর করে বেরুচ্ছে।এখন ইলিশ মাছ! রতন কিচেনের দিকে গেল।একটু কাছে যেতেই,চাপা আওয়াজ কানে এল।একটা মহিলা কন্ঠ,-"এই ছাড়োনা এখন। ধুর!কি যে করো না। ভাল্লাগে না। রান্না টা করতে দাও।"
আর একহাত এগিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেতরে চোখ রাখলো রতন। বউটি গ্যাসের সামনে দাঁড়িয়ে রান্না করছে।আর লোকটি পিছন দিক থেকে বউ কে জড়িয়ে ধরে আছে। ঘাড়ে,পিঠে, গালে চুমু খেয়ে যাচ্ছে। বন্য আদর। রতন আর দাঁড়াতে পারলো না।কয়েকপা পিছিয়ে এসে হাঁক দিল,-"দাদা,একটু জল হবে।" দু'বার ডাকার পর লোকটি বেরিয়ে এল।
-"কি হয়েছে?"লোকটির মুখে স্পর্ষ্ট বিরক্তি দেখতে পেল রতন।
-"জল।"
আবার কিচেনে ঢুকে একটা জলের বোতল নিয়ে এল লোকটি।জল খেয়ে এবং হাফ বোতল জল নিয়ে উপরে উঠতেই অসিত জিজ্ঞেস করলো,-"কি রতন দা,নীচে কিছু দেখলে নাকি?
রতন ও ঘটনার কিছু বললো না। টেবিলের উপর উঠে তার গুলো লম্বা করতে করতে বললো-"কাজ করতো।শুধু উলটো পালটা। পিন গুলো একদম বসিয়ে মারিস।"
জোরে জোরে হ্যামারের বাড়ি মারতে মারতে অসিত বলল,-" রতন দা, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। তাই এসব এখন আর তোমার ভাল্লাগে?"
উফ!ছেলেটা বড্ড কথা বলে! অসিতের কথায় কথা না বাড়িয়ে কাজে মন দিল রতন ।


(৪)

রতনের শখ টা জাগলো বিকালে কাজ থেকে ঘরে ফেরার সময়। হাতে গরম গরম টাকা এসেছে। আজ বাড়িতে ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে যেতে হবে।মনে মনে ছক কষে নিল। টাকা নিয়ে বাড়ি না ফিরে সোজা বাজারে গেল রতন। ছোটো মতো দেখে একটা ইলিশ মাছ কিনে বাড়ি ফিরল। আ! কি আনন্দ হচ্ছে তার। বাড়ি ঢুকেই বউ কে ডাকলো।
-"জয়া,দেখো কি মাছ এনেছি।"
ভেতরে কাজ করছিল জয়া।কাজ ফেলে ছুটে এল বাইরে। -"ও মা! এখন ইলিশ মাছ! এত দামী মাছ আনতে গেলে কেন?"
-"আজ যে বাবুর বাড়ি কাজ করছিলাম,তারা দেখি ইলিশ মাছ রাঁধছে। তাই আমারও খেতে ইচ্ছে হল।"
-"তবুও এত দামী মাছ,আমাদের খাওয়া মানায় না।"
-"তুমি ভালো করে রান্না করতো।অত কিছু ভাবতে হবে না। আমাদের বুঝি শখ আহ্লাদ থাকতে নেই!"
-"দু'পয়সা রোজগার করো বলে, শুধু বড় লোক দের মতো করে চলা হয়েছে তোমার! ওরা যা করবে তোমার ও তাই করতে হবে?"
মাছ কেটে, জল দিয়ে পরিষ্কার করে রান্না করতে বসলো জয়া।সরষে বাটা দিয়ে রান্না করতে বলেছে রতন। রতনের খুব প্রিয়। কিছুক্ষন পর ইলিশ মাছের গন্ধ সারা বাড়ি ছড়িয়ে পড়লো।গন্ধ শুকে রতন রান্না ঘরে হানা দিল। গ্যাসের সামনে দাঁড়িয়ে রান্না করছে জয়া। একদম ঐ বাড়ির বউ টির মতো লাগছে। ধীরে ধীরে রান্না ঘরে ঢুকে বউ কে পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরলো রতন। ঘাড়ের কাছে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
-"কি করছো কি এখন? ছাড়ো!"
রতন ছাড়লো না।আরও জোরে জড়িয়ে ধরলো। বলল,-"জানো, আজ ঐ বাড়িতে কাজ করতে করতে জল খাওয়ার জন্য রান্না ঘরে উঁকি মারতেই দেখি,লোকটি বউ কে ঠিক এরকম ভাবে পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরেছে। গলায়,ঘাড়ে পিঠে চুমু খেয়ে যাচ্ছে।"রতন জয়ার অনাবৃত পিঠে চুমু খেল।
-"ওহ! তাই তোমার ও শখ জেগেছে এরকম করার। আর ওই ভাবে কেউ অন্যের ঘরে উঁকি মারে!"জয়া বললো।
পেটের কাছ থেকে হাতটা উপরের দিকে ওঠাতে লাগলো রতন।
-"আমি কি করবো! আমি তো জল খেতে গিয়েছিলাম।"
-"এবার ছাড়ো।অনেক হয়েছে।"
বাইরে থেকে রতনের মা হাঁক পাড়লো।-"রতন রে,একবার এদিকে আয় বাবা!"
-"ধুর বুড়ি টা না,ডাকার সময় পায় না।বউ কে আদর করার সময়....।"
বিরক্ত হল রতন।
-"ওরকম বলতে নেই।এখন যাও তো,একটু রান্না করে নিই। রাতে দেখবো,কত আদর করতে পারো!" জয়া হাসলো।
বউ এর মুখে রাতের কথা শুনে খুব খুশি হল রতন। রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।


(৫)

পর দিন আবার সেই বাড়িতে কাজে গেল রতন। বেশির ভাগ কাজ টা হয়ে গেছে।সামন্য কিছু কাজ বাকি। সুইচ বোর্ড লাগনো,টিউব লাইট বসানো,টিভির জন্যে আলাদা একটা পয়েন্ট তৈরী করা-এরকম হ্যানা ত্যানা কাজ।প্লাস্টিকের বোর্ডে সুইচ গুলো বসাতে বসাতে অসিত বললো,-"রতন দা,এত তাড়াতাড়ি কাজ টা শেষ করে দিলে?আরেক টা দিন বাকি রাখো না! এরকম একখান জিনিষ সব বাড়িতে পাওয়া যায় না।"
-"ফালতু না বকে কাজে মন দে।কাল থেকে আবার স্কুলের কাজ টাতে লাগতে হবে।" রতন
বললো।
বিকাল চারটে তে ঘরের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল। মেন সুইচ থেকে কারেন্ট দিয়ে দেখলো,সব পয়েন্ট ঠিকঠাক।রতন খুশ। যন্ত্রপাতির ব্যাগ নিয়ে উপর থেকে দু'জন নীচে নামতেই বৌ টি কে গেটের কাছে দেখতে পেল।আরও দু'জন অচেনা লোক দাঁড়িয়ে। বৌ টি ভেতরের দিকে মুখ করে হেঁকে বললো,-"এই শুনছো, বৃদ্ধাশ্রম থেকে লোক এসেছে গাড়ি নিয়ে। তোমার বাবা - মা কে বলো।"

চমকে উঠলো রতন।কিছুক্ষন পর ঘরের ভেতর থেকে,সেই বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা বেরিয়ে এল।পিছনে পিছনে লোকটি মানে,তাদের ছেলে।বৃদ্ধ-বৃদ্ধার পরনে নতুন পোষাক।তবুও চোখে জল গড়াচ্ছে।
রতনের ভেতর টা কেমন ঠান্ডা হাওয়ার মতো হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।অচেনা লোক দু'টি তাদের কে ধরে বাইরে গাড়িতে নিয়ে তুললো।ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে গাড়ি চলে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে পেল সবাই।

আজ বাড়ি ফিরে রতন কোনো কথা বললো না। সন্ধ্যা বেলা রান্না ঘরে ঢুকে জয়ার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। রতনের এরকম অবস্থা দেখে দুষ্টমির সুরে জয়া বললো,-" কি গো আজ এত চুপচাপ কেন? কিছু করবে না?তোমার বাবুর বাড়ি থেকে, আজ নতুন কি কায়দা-কানুন শিখে এলে?সোজা শোবার ঘরে উঁকি মেরেছিলে নাকি!"
রতন তবুও চুপচাপ।জয়া এবার রতনের চোখের দিকে চাইল। রতনের চোখ জলে ভরা।
-"কি গো,তোমার চোখে জল কেন?"
আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না রতন।কাঁদতে কাঁদতে জয়া কে জড়িয়ে বুকে টেনে নিল।বললো-"আজ যেটা শিখে এলাম,সেটা আমি কখনই
করতে পারবো না।"
-"কি শিখলে!"
-"জানো,লোকটি আর তার বৌ তাদের বৃদ্ধ বাবা-মা কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়েছে।চোখের জল ফেলছিল বুড়ো মানুষ দু'টি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।আমি কোনোদিন পারবো না এরকম।"
জয়ার চোখেও জল এল।রতন কে আদর করে আরও কাছে টেনে নিল। বাইরে থেকে মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেল রতন।-"রতন রে,একবার বাইরে আয় বাবা!"

চোখের জল মুছে,বাইরে বেরিয়ে এল রতন।



স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

আমাদের নতুন ফোটোগ্রাফি, আর্ট, ড্রয়িং ব্লগ।রোজ নতুন কিছু দেখুন। ভিজিট করুন : http://www.picsalove.blogspot.com


No comments

Powered by Blogger.