|| শিক্ষক || অনুগল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন




(১)

স্যারের কথা শুনে,সেদিন আমার চোখে জল এসেছিল.....।
উপেন্দ্র নাথ বৈদ্য স্যার কে আমাদের স্কুলের সবাই যমের মতো ভয় পেত।বেঁটে-খাঁটো, মোটা, ফর্সা চেহারা।মাথায় হাল্কা সাদা-কালো চুল, মাঝখানে টাক আর চোখে একটা মোটা ফ্রেমের কড়া পাওয়ারের চশমা।বয়স বাহান্নর কাছাকাছি। রাশভারী মানুষ,চোখে-মুখে সব সময় একটা গাম্ভীর্য ফুটে আছে।যেটা দেখে ক্লাস ফাইভের বাচ্চারা থেকে শুরু করে,ক্লাস টেনের দাদারা- সবার বুক ধড়ফড় করতো।ভয়ে কেউ তার ক্লাসে টু-শব্দটি করতো না।

আমাদের স্কুল টা ছিল সরল রেখার মতো। চারিপাশে নারকেল,আম,বট নানাপ্রকার গাছ-গাছালির ছায়া। সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ। পাশ দিয়ে দু'হাত চওড়া পাকা ইটের রাস্তা স্কুলের গেট থেকে গিয়ে বড় রাস্তার সাথে মিশেছে। স্যার,যখন এই রাস্তা দিয়ে স্কুলে ঢুকতেন,তখন সারা স্কুল সজাগ হয়ে যেত।কেউ অকারনে মাঠে,কিম্বা ক্লাসের বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতো না।ভয়ে সবাই ঘরে ঢুকে যেত। তবে,আমি কিন্তু স্যার কে অকারনে কাউকে মারতে দেখিনি। বরং তিনি বার বার ছাত্র-ছাত্রীদের বলতেন,-"বুঝতে না পারলে, আমাকে তোরা একশ বার একই জিনিষ জিজ্ঞেস করবি।"
তবে পড়া না করে এলে,সেদিন সবার কপালে বিপদ ঘন্টা বাজতো। স্যার,ইংরাজী বিষয় পড়াতেন।ক্লাস ফাইভ থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত।ইংরাজী বিষয়ের উপর ছিল তার অগাধ জ্ঞান।কিন্তু সবথেকে মজার ব্যাপার তিনি, ইংরাজী বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন না।পরে আমরা জেনেছিলাম,তিনি কর্মশিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক হিসাবে স্কুলে ঢুকেছিলেন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক মারা যাওয়ার পর,তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসাবে স্কুলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু কোনোদিন প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে গিয়ে বসতেন না।স্কুলের অনান্য শিক্ষকরা অবশ্য সেই চেয়ারে গিয়ে বসতো। এমন কি টিচার্স রুমেও তাকে বসতে দেখি নি। বাইরে বারান্দায়,একটা চেয়ার,টেবিল রাখা থাকত। সেখানেই সারক্ষন স্কুলের কাগজপত্র নিয়ে পড়ে থাকতেন। কিন্তু ক্লাসে যেতে কখনও লেট করতেন না।এমন কি,স্কুলেও তাকে কোনোদিন আমরা লেট করে ঢুকতে দেখেনি। প্রার্থনা সঙ্গীতের আগেই এসে ঠিক হাজির হতেন।আর আমরা যেদিন দেখতাম,প্রার্থনা সঙ্গীতের আগে তিনি আসেন নি,সেদিন সারা স্কুলে খুশির ধুম পড়ে যেত।কারন প্রার্থনা সঙ্গীতের পর তিনি কখনও স্কুলে আসতেন না। আর আমরা মহাআনন্দে ইংরাজী বই বন্ধ করে ব্যাগের নীচে সাঁটিয়ে দিতাম।

(২)
স্যারের একটা জিনিষে আমার খুব কৌতূহল জেগেছিল। এবার সেই গল্পটা বলি।গ্রামের দিকে সপ্তাহে দু'দিন বাজার বসতো।সেই রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের,-"হাট বসেছে শুক্রবারে,বক্সীগঞ্জের পদ্মপারে...।" এর মতো।স্যার স্কুল শেষে,এই দু'দিন বাজার করতে যেতেন।আমিও তখন ক্লাস নাইনে পড়ি,তাই বাড়ির বাজার করতে আমাকেও যেতে হত।
বিকেলে সাইকেল আর ব্যাগ টা নিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়তাম। বাজারে ঢোকার মুখেই,রাস্তার পাশে একটা মুচির বাড়ি।সেই বাড়িটির সামনে, রাস্তার উপর একটা পঙ্গু মেয়ে,বাটি হাতে করে বসে থাকতো।কুচকুচে কালো গায়ের রঙ, ছেঁড়া পোষাক পরনে।বয়স খুব বেশি নয়,বারো কি তেরো হবে।মেয়েটি কথা বলতে পারতো না। হাঁটতে ও পারতো না।পা দু'টো কাঠির মতো সরু। হামাগুড়ি দিয়ে,পা টেনে টেনে চলতো।আর মুখ দিয়ে অস্ফুট আওয়াজ করতো।পথ চলতি লোক দু'এক টাকা করে মেয়েটি কে দিত। কেউ বা দিত না।আমি স্যার কে লক্ষ্য করতাম।উনি কখনো টাকা দিতেন না।প্রতি সপ্তাহের এই দু'দিন, বাজার করে বাড়ি ফেরার পথে, একটা বড় বিস্কুটের প্যাকেট কিনে মেয়েটির হাতে দিয়ে যেতেন।এমন কি,তিনি যখনই কোনো কারনে বাজারে আসতেন,তখন একটা করে বিস্কুটের প্যাকেট কিনে দিয়ে যেতেন মেয়েটির হাতে।
সেবার দুর্গাপূজার আগমনী সুর বেজে উঠেছে প্রতি ঘরে ঘরে। একদিন সন্ধ্যায় স্যারের সাথে বাজারে দেখা হল।হাতে একটি ব্যাগ।বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম, সেই ব্যাগ থেকে একটা নতুন জামা বের করে পঙ্গু মেয়েটি কে দিলেন। আমার খুব কৌতূহল হতো এই ব্যাপার টি নিয়ে। খুব জানতে ইচ্ছে করতো।কিন্তু ভয়ে কোনোদিন স্যার কে জিজ্ঞেস করতে পারতাম না। একদিন সব ভয় দুরে সরিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। বললাম,-"স্যার,আপনি ওই মেয়েটি কে প্রতি সপ্তাহে বিস্কুটের প্যাকেট কিনে দেন কেন?"
স্যারের মুখ টা বদলে গেল আমার কথা শুনে। একটা বিষন্নতা ভাব দেখা দিল।তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,-"আমার মেয়েটিও এরকম হাঁটতে পারে না। কথা বলতে পারে না। সারাদিন এক জায়গায় বসে থাকে।"
আমার মুখের কথা মুহুর্তেই ফুরিয়ে গেল।অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম স্যারের দিকে।
~~

ডাউনলোড করে নিন 'গল্পপড়ুয়া' অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ। আর ব্লগের সব গল্পপড়ুন আপনার হাতের মুঠোয়। ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন। http://www.mediafire.com/file/no8rm8bza5xaqnf/Golpoporuya.apk

স্বদেশ কুমার গায়েন  (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.