|| ডার্টি স্টোরি:সব চরিত্র কাল্পনিক হয় না || ছোটগল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন



গল্পটি সম্পর্কে: এটি কোনো গল্প নয়, হয়তো বা, গল্প। এ লেখাটি আমাদের চারিপাশে ছড়িয়ে থাকা চেনা-জানা কিছু মানুষের গল্প।তাদের জীবনের খন্ড খন্ড চিত্র।তাদের একান্ত মনের ভেতরের গল্প।নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার প্রয়াস।

গল্পপড়ুয়া ফেসবুক পেজ লাইক করুন :
http://www.facebook.com/golpoporuya

(১)

ফোনের অ্যার্লামের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল বিপুলের। ঘড়িতে ভোর সাড়ে তিনটে।তাড়াতাড়ি বালতি টা হাতে নিয়ে টয়লেটে ছুটলো।তারপর টয়লেট থেকে বেরিয়ে দাঁতে ব্রাস ঘষল কিছুক্ষন। সুমন,দেবু,রীতম এখনো অঘোরে ঘুমোচ্ছে।প্যান্ট জামা গলিয়ে,সাইকেল টা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিপুল।সাইকেলে চড়ার আগে পেছনের বড় ক্যারিয়ারে সামান-পত্র গুলো ভালো করে বেঁধে নিল।শক্ত দড়ি দিয়ে তৈরী গোলাকার জালের ভেতর নতুন হাড়ি, কড়াই, থালা, গ্লাস,আরও বিভিন্ন বাসন পত্র।এই সব নতুন জিনিষ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফেরি করাই হল বিপুলের ব্যবসা। কুড়ি বছর বয়েসে বাপের ব্যবসাতে সে হাত লাগিয়েছে।বুড়ো বাপ টি কে আর কতদিন খাটাবে! মন্দ নয় ব্যাবসাটি।একটু পরিশ্রম করলে বেশ ভাল পয়সা আছে।



রাস্তার মোড়ে একটা একচালা টিনের ছাউনি দেওয়া চায়ের দোকান।সাইকেল টি কে দোকানের সামনে দাঁড় করালো বিপুল।স্টেশনে যাওয়ার রাস্তায় এই দোকানটি ভোর হতেই খোলা থাকে।ফার্স্ট ট্রেনে কলকাতায় কাজে যাওয়ার লোকেরা এখান থেকেই সকালের জল জলখাবার টা সেরে নেয়। দোকানের ভেতর ঢুকেই হাঁক পড়লো বিপুল,-"খুড়ো,চা আর লাড্ডু।"
একজন সাদা চুলের,বুড়ো মতো লোক কাচের গ্লাসে চা,আর একটা তিন টাকার লাড্ডু এনে বিপুলের হাতে দেয়।এ দোকান বিপুলের চেনা জানা।গত এক বছর ধরে এই দোকানের চা আর লাড্ডুর নিয়মিত কাস্টোমার।লাল সূর্য টা ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছে আকাশের পুব কোনে। চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে বিপুল একবার সেদিকে থাকায়। তারপর সাইকেলে চড়ে বসে। আজ অনেক দুর যেতে হবে। কালকের বাজার টা ভাল যায় নি।তারপর চামেলী ও, আজ তাদের বাড়িতে যেতে বলেছিল।ওর বাবা-মা নাকি বাড়িতে থাকবে না।এটাই সেরা সুযোগ। সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দেয় বিপুল।

(২)

-"এই,শোনো না, পেপার দেওয়া ছেলেটিকে ছেড়ে দাও,না। অন্য একজন কে ঠিক করো।"
-"কেন!পেপার দেওয়া ছেলে আবার কি করল?
-"ছেলেটির নজর খারাপ,সব সময় আমার বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে।"
-"ধুর! কি যে বলো!"
গতকাল রাতে স্বামীর বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে আদুরে গলায় বলেছিল নীলিমা।
এখন সকাল সাড়ে ছ'টা।বাইরে টা রোদ ঝলমলে।সূর্যের কাঁচা রোদ মেখে বসে আছে উঁচু উঁচু দোতলা বাড়ি গুলো।পিচ রাস্তার পাশে ইলেকট্রিক পোস্টের উপর কুড়ি-পঁচিশ টা কাক তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচাচ্ছে। নীচে কালো রাস্তার উপর একটা কাক মরে পড়ে আছে। দেবু বুঝতে পারল,এই কাকেদের প্রতিবাদের ভাষা।তাদের ও নিরাপত্তা,সুরক্ষা নেই এই শহরে।ক্ষতিপুরন চাই। দেবু মনে মনে হাসে।তারপর সাইকেল টা চালিয়ে, স্টেশনের সামনে গিয়ে থামে।স্ট্যান্ড টা ফেলে প্লার্টফর্মে ওঠে।শ্যামল দার কাছ থেকে, হিসেব করে খবরের কাগজ গুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয় দেবু।তারপর ব্যাগটা সাইকেলে ঝুলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।সঞ্জয় পল্লীর তৃতীয় বাড়িটির সামনে গিয়ে সালকেল থামায়।গেট ধাক্কায়। জোরে হাঁক পাড়ে।
-"বৌদি! পেপার"
দরজা খুলে নীলিমা বেরিয়ে আসে। দেবু তাকায়। মুখের দিকে নয়, সরাসরি বুকের দিকে। ওড়না টা ঠিক করে নেয় নীলিমা।-"দাও।"নীলিমা খবরের কাগজটা হাতে নেয়।
-"বৌদি! টাকাটা?"দেবু নীচু গলায় বলে।
-"কালকে দিয়ে দেবো।তোমার দাদা গত কাল ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে পারিনি।"
নীলিমা পেছন ঘোরে।ঘরে ঢুকতে যায়।দেবু আবার বলে ওঠে,-"বৌদি! একটু খাবার জল হবে।"
নীলিমা বিরক্ত হয়।চোখে-মুখে সেই বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠে।কর্কশ স্বরে বলে,-"দাঁড়াও, আনছি।"
নীলিমা পেছন ঘুরে ঘরে ঢোকে। দেবুর চোখ আটকে যায় কোমোরের নীচে।চোখ গুলো বড় বড় হয়।বুকের ভেতর টা ঢিপ ঢিপ করে কাঁপে।
-"উফ! কি দুলছে! মালটাকে একবার....যদি একবার পেতাম!...পেপারের টাকা পয়সা আর কিছুই নিতাম না।যদি জড়িয়েও ধরতে পারতাম........কি শান্তি.....।"ঠোঁটে একবার জিভ বোলায়।
তিন ঢোকে জল টা শেষ করে আবার সাইকেলে চাপে দেবু। হাতের ঘড়ির দিকে তাকায়।পৌনে ন'টা বাজে।আর তিন-চারটে বাড়ি বাকি আছে। পেপার গুলো শেষ করে আবার স্টেশনে যায়।
প্লার্টফর্মের উপর একটা ছোটো স্টল।রোল আর ডিম টোস্ট।চোখে-মুখে,হাতে জল দিয়ে নেয় সে।তারপর রোল বানাতে শুরু করে।দেবুর বয়েস একুশ কি বাইশ।গত সাত মাস ধরেই এই কাজই করে আসছে সে।সকাল বেলা বাড়ি বাড়ি পেপার দিয়ে, দুপুর বারোটা পর্যন্ত রোলের দোকানে কাজ করে। কয়লা খনি তে কাজ করতে গিয়ে বাবা মারা যাওয়ার পর,মা কে নিয়ে ছোট্ট সংসার।গ্রামে শাড়িতে জরি বসানোর কাজ করে তার মা। আর নিজে শহরে এই কাজ করে রোজকার করে।মাসে মাসে হাজার খানেক টাকা পাঠায় তার মায়ের কাছে।তাতেই দিব্যি চলে যায় সংসার। বেশ কিছুসময় পর তীব্র গর্জন করতে করতে অজগর সাপের মতো হেলতে দুলতে ট্রেন এসে ঢুকলো প্লার্টফর্মে। মানুষের ইতস্তত কথা-বার্তা ছড়িয়ে পড়ে সারা প্লার্টফর্ম ময়। দেবু কোনোদিকে না তাকিয়ে রোল বানানোয় মন দেয়। এক একটা ট্রেন তার কাছে দেবতার সমান।


(৩)

সকাল সাড়ে ন'টা বেজে গেছে।সুমন আধবোঝা চোখে একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। দু'টো শালিক পাখি বসে আছে,জানালার বাইরে আতা গাছের পাতার ফাঁকে।এত সকাল পর্যন্ত সুমন কোনোদিন শুয়ে থাকে না।প্রতিদিন সকালে উঠেই টিউসন পড়াতে ছুটতে হয়।আজ সকালে টিউসন নেই।দু'বছর হল গ্রাজ্যুয়েসন পাস করেছে সুমন। পড়াশুনায় মন্দ ছিল না সে। মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন নাম্বার আছে তার। তবুও ভাগ্য সাথ দিল না।অনেক সরকারি চাকরীর পরীক্ষা দিয়েছে,কিন্তু একটাতেও পাশ করতে পারিনি।কত বেসরকারি সংস্থায় ইন্টারভিউ ও দিল,কিন্তু কোথাও একটা হিল্লে হল না।এসব কথা মনে পড়লে তার চোখে জল আসে।বাবা-মার কাছে আর টাকা চাইতে পারে না। কোন মুখে চাইবে?এতদিন তো তারাই টানলো। তাই সকাল,বিকাল,সন্ধ্যা তিন বেলা টিউসন পড়িয়ে বেড়ায়। সপ্তাহে কোনোদিন বাদ দেয় না।ক্লাস টেন পর্যন্ত,অংক আর ইংরাজী বাদে সব সাবজেক্ট পড়ায় সুমন।বাড়ি গিয়েও স্পেসাল পড়িয়ে আসে।রেট একটু বেশি।মাসের শেষে সাড়ে চার হাজার টাকাও তার কাছে, চল্লিশ হাজারের মতো লাগে।তিন বেলা পড়াতে সুমনের পরিশ্রম হয়,কষ্ঠ হয়।তবুও সব সহ্য করে।সারাদিনের পর সন্ধ্যায় মৌমী কে পড়াতে গেলেই তার সব ক্লান্তি দুর হয়ে যায়।

মৌমী, সুমনের ক্লাস টেনের ছাত্রী। এবছর মাধ্যমিক দেবে।ক্লাস এইট থেকে মৌমীকে পড়ায় সুমন।দেখতে সুন্দর,স্মার্ট মেয়ে। পড়তে পড়তে যখন মৌমী,সুমনের চোখের দিকে তাকায়,সুমন তাকিয়ে থাকতে পারে না।অস্বস্তি হয় তার।কেমন যেন দুর্বল লাগে নিজেকে।মৌমী কেন সারক্ষন তার দিকে তাকিয়ে থাকে না?সুমন নিজের মনে বলে।পড়ার সময় একটা গেঞ্জি আর টাইট ফুল প্যান্ট পরে মৌমী।চেয়ারে বসে, খাটের উপর ঝুকে পড়ে,যখন বিজ্ঞানের বংশগতি, জনন,হরমোনের চ্যাপটার টা বুঝে নেয়,তখন সুমনের চোখ মৌমীর গেঞ্জির ভেতরে প্রবেশ করে।স্পষ্ট দেখা যায় আসন্ন যৌবন ভরা বুকটা।চোখ সরিয়ে নেয় সুমন। কিছুক্ষণ পর আবার তাকায়।এরকম ঘটনা প্রায় ঘটে।তার ক্লাস নাইনের ব্যাচের দু'টো মেয়ের দারুন ফিগার। পাতলা গেঞ্জির উপর দিয়ে বাইরে থেকেই ভেতরের সাদা টেপ টা স্পর্ষ্ট দেখা যায়।আর একটু নীচু হলেই...! ছেলেরা সব হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। সুমনের ও চোখ চলে যায়। মন্দ নয় দেখতে।এসব এখন চোখ সয়ে গেছে। ঘরে ফিরে সবার সাথে এ সব গল্প করে সুমন।তবে মৌমীর ক্ষেত্রে খুব অস্বস্তি লাগে তার। গলা খাকারি দিয়ে আওয়াজ করে।
-"মৌমী একটু,খাবার জল আনাতো।"
মৌমী জল আনতে চলে যায়।কি দোষের আছে? সে তো মৌমী কে খুব ভালবাসে।এই তো কিছুদিন আগে,স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার মোড়ে দেখা হতেই, আইসক্রিম খাওয়ার বায়না করেছিল মৌমী।সুমন না করতে পারিনি। মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতে যাওয়ার বায়নাও করে।

খাট থেকে নেমে ব্রাসে,কোলগেট লাগায় সুমন। পাশের খাটে এখনো রীতম ঘুমোচ্ছে।মালটার ঘুম ভাঙিয়ে দিলে মন্দ হয় না-সুমন ভাবে। পরক্ষনে ভাবে,না থাক-কাল রাতে হলদিরামে ক্যাটারিং এর কাজ করে, সকালের ট্রেনে ঘরে ফিরেছে।এখন ডেকে তুললে খচে বোম হয়ে যাবে। বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় সুমন।
পরিষ্কার আকাশ।সাদা মেঘ ভাসছে। ধীরে ধীরে রোদের তেজও বাড়ছে। যেন থার্মোমিটারে পারদ চড়ছে।হঠাৎ ঘরের ভেতর ফোনটা বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে আবার ঘরে ঢোকে সুমন। দেবুর ফোন।কল টা রিসিভ করে কানে লাগায়।
-"বল,দেবু।"
-"কি মামা! এখনো ঘুম দিচ্ছ নাকি?"
-"না,না...বল।"
-"এই, বাজার থেকে মাছ কিনে আন,না! শুনলাম,আজ নাকি মাছ সস্তা যাচ্ছে!"
-"ও।ঠিক আছে।" ফোন রেখে দেয় সুমন।পাশের টিউব ওয়েলে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে নেয়। ব্রাস টা রেখে খাটের নীচ থেকে,মুড়ির কৌটা টা বের করে আনে।একটা বাটিতে,কিছু মুড়ি আর চানাচুর মিশিয়ে মুখে দেয়। খাওয়া শেষ হলে, বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল খেয়ে,বাজারের ব্যাগ টা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।


(৪)

শহর ছেড়ে একটু বিছিন্ন এই মেস বাড়িটা উত্তর দক্ষিনে লম্বালম্বি। পুব দিকে মুখকরা।পাশাপাশি তিনটে ঘর।সামনে টানা বারান্দা।তার কিছুটা সামনে একটা বড় পুকুর। পাকা ইটের শান বাঁধানো ঘাট।বাইরে থেকে,কাজ করতে বা পড়াশুনা করতে আসা ছেলেরা এখানে থাকে। এই তিনটে ঘরের,একটিতে এরা চারজন থাকে। ঘরের ভেতর তিনটি খাট,ঘরের তিন কোনায়। একটিতে বিপুল,একটিতে সুমন, আর আরেকটিতে দেবু আর রীতম একসাথে থাকে।
বিকালে কাজ না থাকলে ঘুরতে যায় নদীর ধারে।কোনো কোনোদিন সিনেমা দেখতে যায়। সুমন সব সময় যেতে পারে না।টিউসন থাকে।যে দিন ফাঁকা পায়,সেদিন একসাথে বের হয়। তারপর হোটেল থেকে রুটি,তরকারি নিয়ে রাতে ঘরে ফেরে। সঙ্গে মাঝে মাঝে মদের বোতল ও থাকে।

আজ রাতে টিউসন থেকে সুমন টেবিলের উপর মদের বোতল দেখতে পায়।একটা গ্লাসে অর্ধেক ঢালা।দেবু আর রীতম এক সাথে ফোনে কি যেন দেখছে।বিপুল কানে হেডফোন গুঁজে পড়ে আছে।সুমন উঁকি দেয় দেবু আর রীতমের ফোনে।
-"কি দেখসিস রে দু'টো?"
-"মামা! আছে,সানি লিয়ন নয়।নতুন আইটেম এনেছি।উফ! মাল টা যা না!"
সুমন একটু দেখেই চোখ সরিয়ে নেয়।উফ! তোরা কি শুরু করেছিস বলতো এখন! রান্না টা করতে হবে না?
দেবু ফোন বন্ধ রেখে,সুমনের দিকে ফেরে।বলে,-"মামা! তোমার আর কি! তুমি তো পড়াতে গিয়ে লাইভ দেখে আসছো,তোমার ছাত্রীর...।"
মাঝপথে দেবুর কথা থামিয়ে দেয় সুমন।-"একদম ফালতু বলবি না। আমি ও কে ভালবাসি।ও আমাকেও ভালবাসে।"
-"ভালবাসলে বুঝি দেখতে নেই? আর তুই কি করে বুঝলি,যে ও তোকে ভালবাসে?"রীতম ফিক করে হাসে।
-"ভাল না বাসলে,সিনেমায় যাওয়ার কথা বলে? এ সব ভালোবাসা-টালোবাসা তোদের খুপড়িতে ঢুকবে না।"
-"সে ও ঠিক।আমরা ও সব পেম-টেম বুঝিনা। আমাদের পেম হল,দিনের বেলা কাজ করো, আর রাতের বেলা সানি লিয়ন।
রীতমের কথার রেশ টেনে দেবু বলে,-"আমার আবার সবিতা ভাবি।.........উহহ!সঞ্জয় পল্লীর বৌদির মুখ টা ভাবতে যা লাগে!"
রীতম আর দেবু হো হো হো হেসে উঠল।সেই হাসিতে যোগ দেয় বিপুল।ফোন টা রেখে বিপুল, খাটের উপর উঠে বসে।ফস করে একটা বিড়ি ধরিয়ে দেওয়ালে হেলান দেয়। বিড়িতে এক টান মেরে,ধোঁয়া টা রিং এর মতো গোল গোল করে ছেড়ে বলে,-"আমার ফোনে পটানো চামেলী কে, এতদিন পর আজই প্রথম পেলাম,বিকালে ফাঁকা বাড়িতে।ওর মা- বাবা কেউ বাড়িতে ছিল না। দারুন খেলে মেয়েটা।পুরো টি টোয়েন্টি ম্যাচ।বলে বলে ছক্কা....।"
তিন জনই ঘুরে তাকায় বিপুলের দিকে ।দেবু চোখগুলো গোল গোল করে বলে,-"মামা!তাই বলো, এখন বুঝতে পারছি,আজ ফিরতে তোমার এত লেট কেন?তলে তলে তো অনেক দুর পৌঁছে গেছো।"
-"তলে তলে কি আছে?আমি ওকে ভালবাসি।"
-"তাই নাকি? তারপর?"রীতম বলে।
-"তারপর আবার কি?একটা ভালো দিন দেখে চামেলীকে বিয়ে করবো, সুন্দর একখান সংসার হবে,দু-তিনটে বাচ্চা হবে,আমি কাজ থেকে ফিরলে,এক গ্লাস জল এগিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে, আমি আদর করে বুকে টেনে নেব........।" বিপুল স্বপ্নের জগতে ডুব দেয়।
-"শালার,গাছে কাঁঠাল আর গোফেঁ তেল হয়েছে।" সুমন বিরক্ত হয়।

"এদের ভেতর এখন থাকলে সেন্সরবোর্ড অস্বীকৃত আরও যে কতরকম কথা হবে,তার কোনো ঠিক নেই।এরা ভালোবাসা জিনিষটাই বোঝে না।এদের না বোঝানোটাই ভাল।"- বিড় বিড় করে কথা গুলো বলে, জামা-প্যান্ট টা ছেড়ে, কোমোরে গামছা জড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়।আকাশে থালার মত গোলাকার চাঁদ ভেসে আছে।মনে মনে চাঁদের গায়েই,তুলি দিয়ে, চোখ,মুখ,ঠোঁট,চুল এঁকে দেয় সুমন।মৌমীর গোলাকার মুখ টা দেখতে পায়। কি অপরুপ লাবন্যময়! কি সুন্দর সে মুখের হাসি! যেন কেউ মুক্তো ছড়িয়ে দিচ্ছে।আর সুমন সেই মুক্তো কুড়িয়ে নিজের বুকের ভেতর রেখে দেয় যত্ন করে।মৌমীর হাতটা জড়িয়ে ধরে সুমন। পাশাপাশি হাঁটতে থাকে।মাঠ-ঘাট,নদী, তেপান্তের সবুজ প্রান্তর পেরিয়ে শাল-মহুয়ার জঙ্গলে। শুকনো পাতার খসখস শব্দ মেখে আরও এগিয়ে যায়,হাঁটতে থাকে অন্তহীন, তুষারাবৃত পর্বতমালা পেরিয়ে এক অজানা জগতে পৌঁছায়।যেখানে কেউ নেই,শুধু মৌমী আর সুমন।
বিপুলের,আচমকা ধাক্কায় সেই অজানা জগত থেকে,ধপ করে এসে পড়ে এই মেসের বারান্দায়।
-"কি বে! কি ভাবছিস?"বিপুল আবার কাঁধ ঝাঁকায়।সুমন মনে মনে হাসে।তারপর জুতোটা পায়ে গলিয়ে কল তলায় চলে যায়।


(৫)

সময় থেমে থাকে না।কারও বাধা মানে না। নিজের খেয়ালেই বয়ে চলে।এই ছোট্টো মেসের চার দেওয়ালের ভেতর দু'টো বছর পার হয়ে যায়।তবুও চারজনের কেউ ছাড়াছাড়ি হয়নি। আজও এক সাথে আছে।আজও এক সাথে সিনেমা দেখতে যায়।একসাথে ঘুরতে যায়। প্রতিনিয়ত একসাথে লড়াই করে যায়,এই কঠিন জীবন যুদ্ধের চোরা স্রোতে। নিজেদের মতো করে বাঁচে।

আজ রাতে খাওয়ার পর,সুমন খোলা জানালার পাশে বসে।মন মরা।বাইরে জোছনালোকে ঘরবাড়ি গুলো ভিজছে।পাশের খাটে বিপুল, কার সাথে ফোনে উলটো পালটা কথা বলছে। নিশ্চয় কোনো মেয়ে হবে! রাতে একমাত্র মেয়েদের সাথেই এরকম কথা বলা যায়।সুমন মনে মনে ভাবে।না, বিপুলের সেই মেয়ের সাথে আর সংসার করা হয়নি।কিছু দিন পর চামেলী অন্য একটা ছেলের সাথে ব্যাঙ্গালোরে ভেগে যায়।বিপুল তাতে একটুকুও দু:খ ও পায়নি। চোখে জল পর্যন্ত আসেনি।পর দিনই আরেকটা মেয়ে সেট করেছে।
আসলে ওটা ভালোবাসা ছিল না। সুমন নিজের মনে বলে।তার চোখের কোণে জল নেমে আসে। সে ও কি কোনোদিন ভেবেছিল যে, মৌমী তার জীবন থেকে হারিয়ে যাবে! কেনই বা হারাবে না? কি আছে তার মধ্যে? এতবছরে একটা চাকরী জোটাতে পারল না।মনে মনে নিজের অদৃষ্টকেই দোষারপ করল।দু'দিন আগে এক সরকারি চাকুরের সাথে মৌমীর বিয়ে হয়ে যায়।সুমন কে কার্ড দিয়েছিল। সুমন কিছু বলতে পারিনি।কথা গুলো এসে আটকে যাচ্ছিল ঠোঁটের ডগায়। মৌমীর বাবা-মা, বার বার করে বিয়েতে আসতে বলেছিল। সে যেতে পারি নি।মায়ের অসুস্থতা দেখিয়ে সারাদিন মেসের ঘরে শুয়েছিল।
বেশীক্ষন বাইরে তাকিয়ে থাকতে পারে না সুমন। জোছনালোক,যেন সূর্যের রশ্মির মতো তীব্র হয়ে উঠেছে।চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। হাত দিয়ে চোখটা মুছে নেয়। পাশের খাটে,দেবু আর রীতম এখনো জেগে আছে। মুখের উপর ফোন।নিশ্চয় সানি লিয়ন,মিঁয়া খলিফা দেখছে।আওয়াজ শুনে বুঝতে পারল।এর আগেও এ সব দেখেছে সুমন। দেবু,রীতমের চাপে পড়ে।তেমন ভালো লাগেনি।মনে ভালোবাসা,প্রেম থাকলে এসব ভালো লাগে না।শুধু নিজের প্রেমিকার কথা ভাবতে ভাল লাগে, তার বুকে একটু মাথা রাখতে ইচ্ছে করে,ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু আজ নিজে থেকেই চোখের জল মুছে, দেবুর খাটে গিয়ে উঠে সুমন।তিন জন এক খাটে ঠাসাঠাসি করে চোখ রাখে ফোনের স্ক্রিনে।
~~~~~~



স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.