|| কন্যাদান || ছোটগল্প || ~স্বদেশ কুমার গায়েন






(১)

–"এবার তো একটা ভাল ছেলের খোঁজ কর।"
– "চেষ্টা তো করছি, কিন্তু সেরকম ছেলে পাচ্ছি কই?যে, তোমার মেয়েকে বিয়ে করবে?"
–"তাই বলে তো আর হাত গুটিয়ে কি আর বসে থাকলে চলে! মেয়েটার বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে। যেভাবেই হোক বিয়ে দিতে হবে।আর এখন বিয়ে না দিতে পারলে, পাড়া–প্রতিবেশীরা সব কুনজরে দেখবে।"
– "কি করব বলো তো! আমার মাথায় কিছু আসছে না।–গত মাসে চার–পাঁচ টা ছেলে এসে দেখে গেল কিন্তু কেউ পছন্দ করল না। কয়েকজন তো আবার এত টাকা চাইল,যে আমার বাড়ি ঘর জমি–যায়গা সব বেচে দিলেও হবে না।"
একটা বড় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল পরমা। স্বামীর দিকে পাশ ফিরে বলল, – কি আর করবে বল! মেয়ে আমার রঙে চাপা। কিন্তু মুখের কাটিং টা তো চাঁদপানা। কালো মেয়েকে,আজকাল কালো ছেলেও বিয়ে করতে চায় না।"
বিভুতি কপালের উপর হাত দিয়ে সটান হয়ে শুয়ে আছে।চোখ দুটো তার উপরের দিকে। চোখের কোনে কয়েক ফোঁটা জল এসে জড়ো হয়েছে।কপালের উপর থেকে হাত টা সরিয়ে বলল,– "এই জন্যেই তো কষ্ট করেও মেয়েকে কলেজে পড়ালাম। আজ–কাল লেখা পড়া জানা মেয়ে অনেকে নিতে চায়।কিন্তু তার পরেও..কিছু হল না।"
বিভুতি আর কথা বলতে পারল না।গলাটা যেন তার শুকিয়ে এল। এক বুক হতাশা নিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল সে । অনেক রাত হয়েছে,গ্রামের সব বাড়িগুলো ঘুমে অচৈতন্য।শুধু বিভুতি আর পরমার চোখে ঘুম নেই।খোলা জানালা দিয়ে আধ খাওয়া রুটির মত চাঁদ দেখা যাচ্ছে। পরমা তাকিয়ে থাকে সেই দিকে।চাঁদের আলো বড় কুল গাছটির ফাঁক দিয়ে পরমার মুখে এসে পড়ছে। চোখ দুটো তার জলে ভেজা।


(২)

গ্রামের রাস্তার বড় দিঘি টির পাশে একটা ঝাকড়া তেঁতুল গাছ। অনেক দিনের পুরানো। মোটা মোটা শিকড় গুলো মাটির বাইরে বেরিয়ে এসেছে।এই গাছটির পাশে কাঠা দশেক জায়গার উপর,এক প্রান্তে টিনের ছাউনি দেওয়া বিভুতির ঘর।এছাড়া তার বিঘে খানেক জমিও আছে,–বর্ষা কালে তাতে ফসল ফলিয়ে কোনোরকমে অর্ধেক বছরের খোরাকি চলে।দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে বিভুতির মাঝারি সংসার। নিজে সারাদিন এর ওর বাড়ি কাজ করে বেড়ায়।লোকে যেটা দেয়,হাসি মুখে নেয়। কারও কাজে কোনোদিন না করে না। পরমা বাড়িতে বসে, দিন–রাত শাড়িতে জরি বসানোর কাজ করে।এখন চোখে একটু কম দেখতে পেলেও হাতটা চলে যন্ত্রের মত। মাস খানেক হল চোখে একটা চশমা নিয়েছে ডাক্তারের পরামর্শে। প্রতিদিন গড়ে আট–দশটা শাড়ির অর্ডার পায়। মন্দ নয়,কিন্তু এই কাজ করে একটা সংসার শুধু চলে যেতে পারে,–মেয়ের বিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে মেয়েই বড়। মেঝো ছেলেটার বয়েস বারো বছর,আর ছোটো ছেলেটির বয়েস দশ।দু'জনই গ্রামের একটা হাইস্কুলে পড়ে। অনেক কষ্ট করে মেয়েটিকে কলেজের পড়া শিখিয়েছে বিভুতি। ইচ্ছা ছিল মেয়েটিকে একটা ভাল ছেলের ঘরে বিয়ে দেবে, যাতে একটু ভাল খেয়ে পরে বাঁচতে পারে। কিন্তু সেটা যে কত কঠিন,তা আর বুঝতে বাকি নেই কারও। কেন এই রুপ নিয়ে জন্মালি তুই আমার ঘরে? বড় ঘরে গিয়ে মরতে পারলি না? মাঝে মাঝে নিজের অদৃষ্টকেই দোষ দেয় বিভুতি।

আজ সকাল থেকেই আকাশ টা কেমন মন গুমরে বসে আছে।হালকা রোদ আকাশে, নিস্তেজ, মনমরা। রাতের জল দেওয়া ভাত খেয়ে বারান্দার মাথায় চুপ করে বসে,আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বিভুতি। আজ তার একদম কাজে যাওয়ার মন নেই। ছেলে দুটো সকাল হতেই কোথায় যে বেরিয়েছে কে জানে! মেয়ে শিউলি,আর পরমা ঘরের ভেতর কাজে ব্যাস্ত। হঠাৎ ঘটক মহাশয়ের ডাকে ঘুম ভাঙল বিভুতির।
–"কি বিভুতি,এত মনমরা কেন?"
বিভুতি,পাশ থেকে বসার জায়গা টা এগিয়ে দিল,ঘটক মহাশয়ের দিকে।–"কি আর করব বলুন! সবই তো আপনি জানেন!"
–" মেয়ের বাপ,হয়ে অত ভেঙে পড়লে চলে?"
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল বিভুতি।পকেট থেকে কাগজে মোড়া একটা পানের খিলি বের করে মুখে পুরে দিল ঘটক মহাশয়। তারপর আধো আধো স্বরে বলল, –" একটা ভাল সম্বন্ধ এনেছি। পাশের গ্রাম থেকে। ছেলের বাড়ি বেশ অবস্থা সম্পন্ন। আর মানুষ হিসেবে তারা মন্দ নয়।"
বিভুতি একটু নড়ে চড়ে বসল। চোখে–মুখে যেন একটা ঝিলিক খেলে গেল।অনেক ব্যার্থতার পর একটা আশার আলো দেখলে যেমনটি হয় ঠিক তেমন।পরমা, ঘটক মহাশয়ের কথা শুনে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে।
–" কবে আসবে পাত্রপক্ষ? পরমা প্রশ্ন করল।
–" সামনের বুধবার আসতে বলেছি। মেয়েকে একটু ভাল করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখবেন। যা রঙে চাপা, মেয়ে আপনার!" ঘটক মহাশয় পান চিবোতে চিবোতে উঠে দাঁড়াল।
পরমার মুখটা নীচু হয়ে এল।এরকম মেয়ের বাবা–মা হলে, কথা তো একটু শুনতেই হবে।


(৩)

–"তুই দেখেনিস দাদা,দিদির এবার বিয়ে হবেই।"
–"কি জানি! আমার খুব ভয় করছে,আজও যদি ওরা দিদিকে পছন্দ না করে।"
–"আমাদের দিদি টা কত ভাল!তবুও কেউ পছন্দ করে না কেন বলতো?"
–" কি জানি! পাড়ার সবাই বলে,– তোর দিদির গায়ের রঙ কালো। তাই কেউ বিয়ে করতে চায় না।"
–"দিদি একা একা কাঁদে, জানিস?"
–"আমিও দেখেছি,দিদিকে কাঁদতে।"
–"এবার দেখিস দাদা,আমার মন বলছে দিদিকে ঠিক ওরা পছন্দ করবে।"
–"করলে তো খুব ভাল হবে।"
–"দিদির বিয়েতে কেমন মজা হবে বলত?সারা বাড়িতে আলো জ্বলবে,লোকজন আসবে! যেমনটা টুপাই এর দিদির বিয়েতে হল।"
–"ধুর! ওদের অনেক টাকা। আমাদের তো অত টাকা নেই।"
–"তুই কি রঙের জামা পরবি?"
–"আমি নীল রঙের জামাটা পরব। তুই কি রঙের?"
–"আমি সবুজ রঙের জামাটা। সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াবো।"
দুই ভাই গল্প করতে করতে পাড়ার মোড়ে বিপিনের দোকানের সামনে এসে পৌঁছায়। রাস্তার পাশে, বিপিনের ঘরের সাথেই যুক্ত তার ইটের তৈরী পাকা দোকান। চা,পান,বিড়ি, সিগারেট,বিস্কুট, লজেন্স,তেল, মশলা,চিনি থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ তার দোকানে পাওয়া যায়।
–"ও বিপিন কা,দু'শো চা,আড়াইশো চিনি,আর একটা বিস্কুটের প্যাকেট দাও তো।"
–"কেন রে,বাবলু! চা কি করবি এই সাত সকালে? তোর দিদির কি আবার আজ কোনো ছেলে দেখতে আসছে নাকি?" দাঁড়ি পাল্লায় চিনি মাপতে মাপতে বিপিন জিজ্ঞেস করল।
– "হ্যাঁ! আজ দিদিকে দেখতে আসবে,–পাশের গ্রাম থেকে।"
–"এটা ধরে কত নাম্বার ছেলে হল বলতো?" বিপিন একটা বিদ্রুপের হাসি হাসল।দু'ভাই কিছুই বুঝতে পারল না।ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল।
চিনি আর চা এর ঠোঙা টা হাতে নিতে নিতে, ছোটো ভাইটি বলল,– "দেখবে,এরা ঠিক দিদি কে পছন্দ করবে।"



(৪)


পাত্র মন্দ নয়।লম্বা,চওড়া চেহারা। গায়ের রঙ খুব কালো নয়,মাথায় হালকা কালো চুল ও ডান পাশে টেরি কাটা। একটু বয়েস হলে কি হবে,বেশ মানানসই।পরমার মনে ধরল ছেলেটিকে। পাত্রপক্ষ ও পছন্দ করল মেয়েকে। কিন্তু এবারও বাধ সাধল,–সেই পণ নিয়ে।ছেলের মা স্পর্ষ্ট বলে দিলেন,–" এ যুগে এরকম দাবী,এমন কোনো ব্যাপারই না। যদি পারেন তো ঘটক মশাই মারফৎ জানাবেন!"
রাতে খাটের উপর শুয়ে দু'জন উসখুস করতে লাগল। চোখের পাতা দু'টো কিছুতেই এক জায়গায়নহচ্ছে না।
–"ষাট হাজার টাকা!"
–"তুমি আর না কোরো না গো। রাজী হয়ে যাও। যে ভাবেই হোক টাকা টা জোগাড় কর।"
পরমা,তার স্বামীর গায়ে স্নেহের হাত রাখল।
– "তাই ভাবছি !কোথায় যে পাব এত টাকা! তার উপর বিয়ের জন্যে আরও খরচ আছে।"
–"এরা তো তবু কম বলেছে,–আগে যারা এসেছিল তারা তো লাখের নীচে নামেনি।"
–"তুমি ঘুমাও। আমি ভেবে দেখছি,কিসে কি করা যায়।"
সকালে নতুন সূর্য উঠল। ঝলমলে রোদ,পরিষ্কার আকাশ।রাতেই বিভুতি ঠিক করে নিল,এই ছেলের সঙ্গেই তার মেয়ের বিয়ে দেবে,–সে যত কষ্টই হোক।দু'দিন বাদে ঘটক মহাশয়ের দ্বারা সে সংবাদও পাঠিয়ে দিল ছেলের বাড়িতে।



(৫)


ছোটো বাড়িটা লাল–নীল আলোয় সাজানো। আজ বিয়ে,–বর ও এসে গেছে।বিয়ের বাদ্যি বাজছে।আশে পাশের দু'চার ঘর পাড়া প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রন করেছে বিভুতি।দু'ভাই নতুন জামা প্যান্ট পরে সারা বাড়িতে দাপা দাপি করছে। টিউব লাইটের আলোয় কনের মুখটা বড় মায়াময় হয়ে উঠেছে। যতটা পেরেছে,নিজে হাতে মেয়েকে সাজানোর চেষ্টা করেছে পরমা। নিজের বিয়ের সময়,মার কাছ থেকে পাওয়া গহনা গুলো,মেয়ের হাতে পরিয়ে দিয়েছে। সাতপাক,শুভদৃষ্টি,মন্ত্রপাঠ সব নির্বিঘ্নে কেটে গেল। একটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পরমা আর বিভুতি। এতদিন যেন মাথার উপর একটা পাথর চাপা পড়ে ছিল! সকাল বেলা চোখের জলে মেয়েকে বিদায় করল দুজন।নতুন জামাই এর হাত ধরে কান্নাকাটি করল পরমা।–"বাবা,আমার মেয়েটিকে যেন কষ্ট দিও না।"

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে গেল। বারান্দার খুঁটি তে এক ভাবে ঠেস দিয়ে বসে আছে বিভুতি। চোখ দুটো জলে ভরা।রাতেও ভালো করে কেউ খেতে পারল না। ভোরের আলো ফুটতে,এখনো বেশ কিছু দেরি।পরমা,ঘুমন্ত বিভুতিকে ধাক্কা দিতে লাগল।
–"ও গো,শুনতে পাচ্ছ? ওঠে পড়,রাত শেষ হয়ে এল তো। অনেক পথ হাঁটতে হবে।"
পরমার ধাক্কায়,বিভুতি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। পাশের খাট থেকে ছেলে দু'টো কে ডেকে তুলল। সমস্ত ব্যাগ,জিনিষপত্র ,কাপড়–চোপড় সব রাতেই গুছিয়ে রেখেছিল পরমা। পুবের আকাশ টা সবে মাত্র একটু একটু লাল হতে শুরু করেছে। দু'একটা পাখিদের ঘুম ভেঙে গেছে। পাশের তেঁতুল গাছ থেকে তার শব্দ শোনা যাচ্ছে।সারাটা পাড়া এখনো ঘুমিয়ে আছে। ছেলে দুটোর চোখ ঘুম জড়ানো।চোখ কচলাতে কচলাতে বড় ভাই টা বলল,–"এত ভোরে তোমরা কোথায় যাচ্ছ?"
–"আমরা সবাই শহরে যাব, খোকা।"
–"কেন? আমরা আর এ বাড়িতে থাকব না?"
বিভুতির চোখে জল চলে এল। নিশব্দে সে জল টপ টপ করে রাতের অন্ধকারে ঘরের মেঝেতে পড়তে লাগল। কেউ কি দেখতে পেল সে জল?
–" না। এ বাড়িতে আর থাকব না। শহর অনেক ভাল জায়গা। ওখানে কাজ করলে অনেক টাকা পাওয়া যায়।"
তারপর সমস্ত ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে, দরজা খুলে সামনের উঠানে নেমে এল চার জন। ভোরের আকাশ লাল হল।চারিপাশ টা একটু একটু করে পরিষ্কার হয়ে গেল। পাখিরা ঘুম ভেঙে কলরব তুলল। আর বিভুতির পরিবার এক অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল। এখনো অনেক পথ হাঁটতে হবে।.....দ্রুতো পা চালালো চারজন।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.