|| পুরী এক্সপ্রেস...বিগিনিং অফ লাভ || ছোটগল্প || ~ স্বদেশ কুমার গায়েন।




( ১)

রাতের রঙিন আলোয়,হাওড়া স্টেশনটি কে রুপকথার নগরীর মতো মনে হয়। গঙ্গার এপার থেকে দেখলে মনে হবে রুপকথা গল্পের বই এর পাতা থেকে রাজ প্রাসাদ কে কেটে এনে এখানে কেউ বসিয়ে দিয়েছে।আর সেই সব কল্পলোকের মানুষজন তার ভেতরটাকে সারাটা দিন কোলাহল মুখর করে রেখেছে।
ডিসেম্বর মাসের রাতের ব্যাস্ত স্টেশন।রাত ঠিক নয়,তবে আবার সন্ধেও নয়।সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। শীতের সময়,একটু তাড়াতাড়ি ই গঙ্গার জলকে কালো করে,টুপ করে সূর্য টা হারিয়ে যায় আকাশের অন্তরালে।ঘন কুয়াশার
আস্তরনএকটু একটু করে নেমে আসে গঙ্গার বুকে। তারপর ধীরে ধীরে পুরো শহর টা ঢুকে যায় কুয়াশার কোলের ভেতর। ট্রেন ছাড়তে এখনো এক ঘন্টা বাকি। একুশ নম্বর প্লার্টফর্ম থেকে আট টা পঞ্চান্নর হাওড়া–পুরী সুপার ফার্স্ট এক্সপ্রেস। প্লাটফর্মের উপর বোর্ডে লাগানো সাদা কাগজে চোখ বোলাতে লাগল রনিত। রোগা–পাতলা চেহারা,মাঝারি উচ্চতা। মাথার চুল গুলো এলোমেলো।পিঠে একটা কলেজ ব্যাগ।স্লিপার ক্লাসের টিকিট। ওয়েটিং লিস্টে ছিল,কিন্তু শেষ মুহুর্তে সেটা কনফার্ম হয়েছে।অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে নিজের সিট নাম্বার টা পেল রনিত। জানালার পাশে সিটের উপর নিজের ব্যাগ টা রেখে জানালার কাচ টা তুলে দিতেই,যেন একটা হাল্কা ঠান্ডার ঢেউ এসে লাগল মুখে।প্লাটফর্মের টিউব লাইটের সাদা আলোয় সব যেন অদ্ভুত লাগছে! কালো কালো পোকা গুলো আলোর চারিদিকে লাট্টুর মতো ঘুরছে।ভারী সুন্দর! মন কেমন করা। কি যে সুন্দর,সেটা শুধু রনিতেই জানে।হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো সে।এখনো আধ ঘন্টা বাকি ট্রেন ছাড়তে।অবশ্য রনিতের কোনো তাড়া নেই। উদ্দেশ্যেহীন পথিকের যেমন কোনো তাড়া থাকে না,সময় যেমন তাদের হারাতে পারে না; ঠিক অনেকটা সেই রকম।হাওড়া থেকে পুরী যেতে প্রায় আট ঘন্টা সময় লাগে।অর্থাৎ ট্রেনটি ঠিক সময়ে ছাড়লে, ভোরে পুরী স্টেশনে পৌঁছে যাবে।জানালা দিয়ে একমনে বাইরের শীতল, ভেজা–ভেজা পরিবেশকে টা দেখছিল রনিত। হঠাৎ পিছন দিক থেকে একটা মেয়ের কন্ঠস্বর ভেসে এল।

–" ওই, হ্যালো! শুনতে পাচ্ছেন? এ সিট টা আমার।"
তিনবার ডাকার পর চমকে ঘুরে তাকালো। পাঁচজন মেয়ের একটা টিম। প্রত্যেকের পিঠে ব্যাগ, হাতে লাগেজ। মাথায় শীতের টুপি,গায়ে লাল সোয়েটার পরিহিতা,ফর্সা মুখের একটি মেয়ে রনিতের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, –"এই সিট টা আমার।"
কিছুটা অপ্রস্তুত হল রনিত।এরকম ভুল তো সে করে না। পকেট থেকে টিকিট টা বের করে, ভালো ভাবে দেখল তারপর মেয়েটির সামনে ধরল।
-"এটা কি করে সম্ভব? একই সিটে একটা ছেলে আর মেয়েকে এক সাথে দিয়ে দিল!"মেয়েটি তার বান্ধবীদের দিকে মাথা ঘোরালো। একটা কোঁকড়ানো চুলের মেয়ে মুচকি হেসে বলল, –"তোর ভাগ্যটাই ভালো রে! আমাদের চার জন উপর নীচে দুটো বার্থ পেয়ে গেছি।"
চারজন হো হো হো করে হেসে উঠল।একরাশ বিরক্তি নিয়ে,ব্যাগ টা সিটের উপর ফেলে দিয়ে বান্ধবীদের সিটে বসে পড়ল মেয়েটি।কি করবে এখন?একটা ছেলের সাথে কি করে এক সিটে থাকবে সে? কিছুসময় পর টিকিট পরীক্ষক আসতেই জিজ্ঞাসা করল,–"স্যার! এটা কেমন করে হল? একই সিটে ছেলে আর মেয়ে এক সাথে?"
সবার টিকিট গুলো পরীক্ষা করতে করতে তিনি চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন,–" মাঝে মাঝে এরকম একটু হয়ে যায়। প্লিজ! একটু কো–অপারেট করে নিন!"

তীব্র শব্দে ট্রেনের হর্ন বাজলো।ধীর গতিতে ঝম ঝম শব্দ করতে করতে ট্রেন টি এগিয়ে চলল, –চারিদিকে উঁচু উঁচু বাড়ি,ল্যাম্পপোস্টের আলো গুলোকে পিছনে ফেলে রেখে।রনিত তখনো একভাবে চোখ ডুবিয়ে আছে বাইরের সেই কুয়াশা মোড়া আলো–আঁধারিতে।
–" এই যে শুনুন,আমার খুব ঘুম পেয়েছে। আমি শোব।আর জানালা টা বন্ধ করুন,ঠান্ডা ঢুকছে!"
রনিত মেয়েটির চোখের দিকে চাইল।তারপর কিছু না বলে উঠে চলে গেল গেটের কাছে।
-"উফ!বাঁচা গেল।" যেন একটা আপদ বিদায় হয়েছে–সেই রকম একটা ভাব দেখিয়ে মেয়েটা সটান হয়ে শুয়ে পড়ল সিটে।

(২)

বাইরে কুয়াশা স্নাত রাত।ট্রেনের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে,তারাও যেন ছুটে চলেছে।গেটের খোলা দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রনিত। কুয়াশা এসে তার মুখটা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।ডিসেম্বরের শেষ,তাই শীত টা জমিয়ে পড়েছে। চারিদিক টা অস্পর্ষ্ট হয়ে আছে। প্রায় রাত বারোটা বাজতে চলল। বাইরের দমকা হাওয়ায় শরীর টা একটু একটু কাঁপছে।পুরীতে তার ঘুরতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। তবুও যাচ্ছে। কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই।ভবঘুরের মতো। বাইরের ধোঁয়াশাময় কালো অন্ধারের দিকে তাকিয়ে একটা ভাবনার রাজ্যে ডুব দিল সে। কি দরকার ছিল রেশমা,তোর এতবড় মিথ্যা কথাটা বলার?কেন বললি না,যে তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! তাহলে আর নিজের ভালবাসা টাকে তোর সামনে বের করতাম না। কষ্টটা নিজের বুকেই চেপে রাখতাম। তোর জন্যে তো আমি,ধর্ম, ঘর–পরিবার,বাবা–মা সব ছাড়তে রাজী হয়েছিলাম। কিন্তু তবুও তুই আমার জন্যে একটুখানি জায়গা ও রাখতে পারলি না!
চোখে বৃষ্টি নামল রনিতের। ফোনটা কখন থেকে বেজে চলেছে,তার খেয়াল নেই। পকেট থেকে ফোন টা বের করে,রিসিভ করে কানে লাগালো রনিত।
—"বাবু,কোথায় আছিস তুই?"
–"যেখানে আছি ভাল আছি।"
–"তুই বাড়ি আয়!"
– "আমার জন্যে চিন্তা করো না।"
–"কি হয়েছে তোর? এরকম করছিস কেন?"
– "ফোন টা রেখে দাও। আর ফোন করো না।"
 ফোন কেটে দিল রনিত।মনের ভেতর টা যেন, কয়লার মতো পুড়ে পুড়ে যাচ্ছে।ট্রেনের দরজা দিয়ে ফোনটা যেই বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে যাবে, ঠিক তখনি মেয়েটিকে দেখতে পেল।সেই মেয়েটি। কখন যে,এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে, একদম বুঝতে পারেনি। এতক্ষন হয়তো দাঁড়িয়ে তাকেই দেখছিল। ফোনের কথা গুলো কি মেয়েটি শুনেছে?রনিতের চোখে তখনও জল গড়িয়ে পড়ছে।মেয়েটি কি তার চোখের জল দেখতে পেয়েছে?কোনোরকমে জল মুছে আবার বাইরের অন্ধকারে তাকালো।
–"হাই! আমি সায়নী।আপনি বাইরে কেন?. .... হ্যালো! আপনার সিটে চলুন।"
–"আপনি যান। ঘুমিয়ে পড়ুন।" রনিত মেয়েটির দিকে তাকালো।
–"আরে,আমরা ঘুমোতে আসেনি।পুরীর সমুদ্র দেখতে যাচ্ছি। সারা রাত জেগে আড্ডা হবে। আপনিও নিশ্চয় পুরী যাচ্ছেন? বাই দ্য ওয়ে, আপনার নাম টা কি সেটা জানা হল না!"
–"আমাকে, আপনি করে বলবেন না।আমার নাম রনিত।"
–"আচ্ছা,তুমি করে বলবো। এবার চলো"সায়নী হাসল।

(৩)

শেষ অক্ষর 'ব' দিয়ে......
'বাতোকো তেরি হাম ভুলানা সকে..হোকে জুদা হম,না জুদা হো সকে'
সায়নী আর রনিত গানের মাঝে ঢুকলো।
–" ওই সায়নী,তোর 'ক' দিয়ে!" উপরের বার্থ থেকে একটা মেয়ে বলল।
–" কভি যো বাদল বরষে,দেখু মে তুযে আঁখে ভর কে.....!"
–"জিও! তোর তো রোমান্টিক গান ছাড়া মুখ দিয়ে আর কিছু বের হয় না।"
সায়নীর সাথে ছেলেটিকে হঠাৎ আসতে দেখে, সবাই সায়নীর মুখের দিকে চাইল। কি হল মেয়েটার? টয়লেটে গিয়ে কি মতিভ্রম হল! ছেলেটিকে ডেকে আনার কি দরকার ছিল?সিটে বসতে বসতে সায়নী বলল, –"ও পুরী যাবে।ওর নাম রনিত।"
এর মধ্যে ছেলেটির নাম ও জানা হয়ে গেল! ব্যাপার টা তো একদম বীজগনিতের সূত্রে পড়ছে না! নতুন কোনো সূত্র আবিষ্কার করল নাকি?
–হাই! রনিত!  আমি নিশা,...আমি নেহা.....আমি মৌমিতা,...আর আমি পামেলা। একটা ছোটো খাটো প্রাথমিক পরিচয় পর্ব শেষ হল যেন।
–"ওই মেয়েরা,তোমরা কি সারা রাত গান– বাজনা করবে?"পাশের বার্থ থেকে একজন কাকু টাইপের লোক বলল।এতক্ষন লোকটি শুয়ে ছিল,কিন্তু রাত দুপুরে গানের লড়াই যেরকম জমে উঠেছে, সেটা দেখে আর শুয়ে থাকতে পারল না।
–"কাকু, আমরা ঘুরতে যাচ্ছি,মৌন মিছিল করতে যাচ্ছি না–যে চুপ করে বসে থাকব! একটু কো– অপারেট করুন,প্লিজ!"  হি হি হি করে হেসে উঠল সকলে। লোকটি তৎক্ষণাৎ বুঝগেল, এ মেয়েদের সাথে কথায় পেরে ওঠা যাবে না। তাই আবার চাদড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।
রাত এখনো অনেক বাকি।কালো অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে,মাঝে মাঝে তীব্র বাঁশি বাজিয়ে, দুপাশের নির্জনতা কে ভেদ করে ছুটে চলেছে লোহার অজগর টি।পুরী স্টেশনে ট্রেন পৌঁছতে ভোর পাঁচটা বেজে যাবে।সবাই আবার গানের জগতে ভেসে গেল।একটা মনে রাখার মতো স্মৃতি যেন,সবাই তাদের স্মৃতিপটে বাঁধিয়ে রাখতে চাইছে।


(৪)

–"কোথায় গেল বলতো ছেলেটি?"পুরী স্টেশনে নেমে সায়নী এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো।
আমাদের একটু আগেই তো নামলো। এইটুকু সময়ের মধ্যে বেপাত্তা হয়ে গেল!
–"তোর জেনে লাভ কি রে সায়নী? একটা অচেনা ছেলের জন্য বিচলিত হচ্ছিস কেন?"
–"না রে, ছেলেটিকে গতকাল রাতে ট্রেনের দরজায় একা একা দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখেছিলাম। আর ফোনে কি সব বলছিল। আমার মনে হয় মনে মনে খুব কষ্ট পেয়ে এখানে এসেছে।।"
–" ও!আর সেই কান্নার জলে তুই ভিজে গেছিস!" ঝাঁঝিয়ে উঠল মৌমিতা।
– "না, ঠিক তা....!" কথা আর শেষ হল না,তার আগেই নেহা হাত ধরে টেনে ধরল।
–"চল,আগে তো হোটেলে পৌঁছাই!"
পুরী স্টেশন থেকে সমুদ্র সৈকত গাড়িতে কুড়ি মিনিটের পথ। সমুদ্রের পাশ দিয়েই সারি সারি বিলাস বহুল,মাঝারি মানের হোটেল। পাঁচজন একটা গাড়িতে উঠে পড়ল। হোটেলের রুম আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। রুমে ঢুকেই সবাই ফ্রেস হয়ে বেডের উপর এলিয়ে পড়ল। সারা রাত জেগে গান বাজনার ধকল টা তো আর কম নয়? মাথার টুপি,আর নীল রঙের জামা টা খুলতে খুলতে নিশা বলল,-"বেলা দশ টার আগে আর কিছু নয় বস। এখন জাস্ট ঘুম।"
সবাই একটু একটু করে চোখ বুজল। খাটের শুয়ে উশখুশ করতে লাগল সায়নী। –ছেলেটা কাঁদছিল কেন?ছেলেরা কি, কাঁদে?
এই ভাবে সে কোনো ছেলে কে তো কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি। সেদিন সন্ধ্যায়,গলির মাথায় ল্যামপোস্টের আলোটা কাঁপছিল, থর থর করে। সৌম্য কি কেঁদেছিল সেদিন?কই কাঁদেনি তো! দু'বছরের সম্পর্কের দড়িটা এক টানে ছিঁড়ে দিয়ে রাস্তার ধুলো উড়িয়ে বাইক টা নিয়ে মিশে গিয়েছিল বড় রাস্তার গাড়িরন্যে।একা একা সে দাঁড়িয়ে ছিল ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া,মনমরা নিয়ন আলোয়। তারই তো দু'চোখ দিয়ে জল পড়ছিল সেদিন। সায়নী খাট থেকে উঠে,জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।সূর্যটা একটু একটু করে যেন সমুদ্রের ভেতর থেকে উঠে আসছে। কিন্তু একটা অচেনা ছেলের কান্না, তাকে এত ভাবাচ্ছে কেন? কেন ছেলেটির কথা মনে পড়ছে বার বার! "
হাজার টা প্রশ্ন এসে জোড়ো হল মনের ভেতর। যার কোনো সঠিক উত্তর জানা ছিল না। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর সত্যিই নোটবুকে খুঁজে পাওয়া না।


(৫)

সকালের রোদ টা পুরো ছড়িয়ে পড়েছে সারা সমুদ্র সৈকতে। সোনালী বালু ঢাকা পুরো বেলাভূমি টা সূর্যের কাঁচা রোদে চিক চিক করছে। বালুর উপর,একটা বোল্ডারে হেলান দিয়ে বসে দিগন্ত রেখার দিকে তাকিয়ে আছে রনিত।বড় বড় উঁচু ঢেউ গুলোকে মনে হচ্ছে পাহাড় শ্রেনী। সে দৃশ্য অতীব সুন্দর। ভাষায় বর্ননা করা যায় না।
–"এই রনিত তুমি,কোথায় চলে গিয়েছিলে?" অকস্মাৎ প্রশ্নে রনিত চমকে উঠল। উপরের দিকে চাইতেই সায়নীকে দেখতে পেল।একটা ছোটো প্যান্ট আর গেঞ্জী পরে দাঁড়িয়ে আছে।
বান্ধবী গুলোকে আসে পাশে কোথাও দেখল না। তারপর টুপ করে সায়নী,রনিতের পাশে বসে পড়ল।
–"একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?"কপালের উপর থেকে চুল সরালো সায়নী।
–"বলো,কি কথা?"
–" গত রাতে তুমি কাঁদছিলে কেন?চমকে উঠল রনিত।সায়নী তাহলে রাতে সব দেখেছে!
–"বাড়ির সাথে ঝামেলা হয়েছে?" সায়নী ফের জিজ্ঞেস করল।
—"না" রনিত দুই দিকে মাথা নাড়লো।
–" তবে? প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়া কেস নাকি?" রনিতের মুখের দিকে চেয়ে হাসল,সায়নী। সত্যি! মেয়েটিকে যত দেখছে,তত অবাক হচ্ছে সে। এমন ভাবে কথা বলছে,যেন তার কত দিনের পরিচিত! রনিত এবার সায়নীর চোখে,চোখ রেখে মৃদু হাসলো। চোখে মুখে যেন একটা ভাষা ফুটে উঠেছে।
–"তুমি,এত কিছু জান কি করে?"
দুর থেকে ঢেউ এর শব্দ ভেসে আসছে।আকাশ টা পরিষ্কার হয়ে এল।একটু একটু করে মানুষের কোলাহল বাড়ছে।
—"আরে জানি,জানি! এরকম সবারই হয়। তাই বলে কেউ মুখ গোমড়া করে বসে থাকে?"
রনিত কিছু বলতে পারল না। সায়নীর মুখের দিকে বাচ্চা ছেলের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
–"এই যে রনিত বাবু! কোথায় ছিলেন?আমাদের সায়নী,আপনার জন্যে বিচলিত হয়ে পড়েছে!" বান্ধবী গুলো সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।চমকে উঠল দুজন। কখন যে কথা বলতে বলতে সায়নী, রনিতের একটু বেশী কাছে চলে গেছে বুঝতে পারিনি।একটু সরে বসল।
–"তুই কি যাবি স্নান করতে? না,বসে গল্প করবি?" পামেলা,সায়নীর দিকে তাকালো।
–"তোরা যা। আমি একটু পরে আসছি"
–"এসে আর লাভ নেই! তুই গল্প কর।'চার জন হাসতে হাসতে চলে গেল।
–" রনিত,চলো যাই!"
–" না,তুমি যাও।আমার সমুদ্রের ঢেউ খুব ভয় লাগে।"
–"আমি তো আছি। ধরে রাখব।" গোলাপি ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সায়নী সাদা চকচকে দাঁত গুলোতে যেন হাসির ঝিলিক কাটলো।
হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে আছে দুজন।জল থেকে ঠান্ডা টা যেন একটু একটু করে শরীর ভেতর দিয়ে মাথায় উঠছে।একটা শিরশিরানি ভাব। দূর থেকে এক মানুষ সমান বড় একটা ঢেউ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
–"ভয় করছে,রনিত?"
অজান্তেই সায়নীর হাতটা চেপে ধরল রনিত। আর সেই সঙ্গে একটু একটু করে ঢেউ টা এসে তাদের সামনে এসে মিলিয়ে গেল।হয়তো আরেকটা ভালবাসার জন্ম হল, কলকাতা থেকে এত দূরে পুরীর সমুদ্রের জলে।


(৬)

পুরীর স্টেশন টা রাতের আলোয় ঝলমল করছে। বিকেলে এক ঘন্টা রনিত,সায়নীর সাথে ঘুরে বেড়ালো সমুদ্রের ধারে। নীল আকাশ টা যেন, অনেক দূরে সমুদ্রের জলে ডুবে গেছে। দুজনের মনের মধ্যে জমে থাকা অনেক কথা হল।

 রাত আট টার পুরী–হাওড়া সুপার ফার্স্ট এক্সপ্রেস।সবাই স্টেশনে হাজির।
–"তুই,কি প্রেমে ট্রেমে পড়েছিস নাকি?নইলে ছেলেটিকে,আবার নিজের সিট শেয়ার করে নিয়ে যেতে চাইছিস কেন?ওর তো অন্য কামরায়।" মৌমিতা,সায়নী কে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে গেল।
–" বুঝতে পারছি না! তবে ওর সাথে যেতে খুব ইচ্ছে করছে।"
–"ও! তবে এটা বুঝতে পারছি,তোর সার্কিটে গোলমাল দেখা দিয়েছে।"
মৌমিতা মুখ বাঁকিয়ে ব্যাগ টা হাতে তুলে ট্রেনের দিকে এগিয়ে গেল। ছুটে গিয়ে মৌমিতা কে টেনে ধরল সায়নী।–"রাগ করছিস তোরা?"
মুচকি হাসল মৌমিতা।সায়নীর গাল টা আলতো করে টিপে দিয়ে বলল,–"নারে! তোর জিনিষ,তুই সামলা।"

রাতের কালো অন্ধকার করে ভেদ করে,লোহার অজগর টি ছুটে চলেছে।আর সেই সাথে যেন তীব্র গর্জন।সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।শুধু দু'জন জেগে আছে।পাশাপাশি বসে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে আছে তারা।জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাশ এসে হুড়মুড়িয়ে ঢুকছে।
–"রনিত,শীত করছে না? বলল সায়নী।
–"আমি শীতের কিছু আনতে ভুলে গিয়েছিলাম।"
–"আমার টুপি টা নাও!"
অবাক হয়ে গেল রনিত।টুপি টা রনিত কে দিয়ে, চাদর টা ভাল করে গায়ে জড়িয়ে নিল সায়নী।

সকাল সাড়ে পাঁচটা।হাওড়া থেকে শিয়ালদহ গামী বাস টা ব্রিজের উপর দিয়ে ছুটছে দুরন্ত গতিতে। গঙ্গার উপর সাদা কুয়াশায় আস্তরন সকাল,তাই রাস্তা পুরো ফাঁকা। কখনো কখনো কিছু ভালবাসা হয়তো তৈরী হয় এমন অদ্ভুত ভাবেই।এমন হঠাৎ করেই,কোনো কারন ছাড়াই, নিজের অজান্তেই।
শিয়ালদহ মেন শাখার প্লার্টফর্ম থেকে ট্রেনে ওঠার আগে রনিতের খুব কাছে এল সায়নী। চোখে, চোখ রাখল।চারিদিকি মানুষের ভিড়, ব্যাস্ততা।ক্রমাগত মাইকে ট্রেনের ঘোষনা চলছে। চাপা স্বরে বলল,–" নাম্বার টা রইল,ফোন করব।আর মন খারাপ করবে না।"
তারপর বারাসাত লোকালে উঠে গেল। রনিত কিছু বলতে পারল না। শুধু তাকিয়ে রইল ট্রেনটির দিকে, যতক্ষন না,সেটা চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.