ছোটগল্প পড়ুন "একটি সুসাইডের গল্প" ~ স্বদেশ কুমার গায়েন





হঠাৎ করে আজ আমার মরার ইচ্ছেটা অগ্নুৎপাতের মতো জেগে উঠল।মাঝে মাঝেই এরকম হয় আমার। শুধু আমার নয়, আপনাদের মধ্যে অনেকের এরকম হয়, সেটা আমি জানি। কখনো কখনো ইচ্ছে করে, – ধুর! এ জীবন আর ভাল লাগছে না, এর থেকে মরে গেলে বেঁচে যেতাম। এই 'মরে' গিয়ে 'বেঁচে' যাওয়া ব্যাপার টা ছোটোবেলায় শুনলেও -তখন বোঝার ক্ষমতা হয়নি। কিন্তু আজ বুঝতে পারি মানুষ 'মরে' গিয়েও অনেক সময় 'বেঁচে' যায়।তবে,সুসাইডের অনেক কারন থাকে,– প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে কেউ সুসাইড করে, কেউ বা প্রেমে প্রতারিত হয়ে, কারও দাম্পত্য কলহ সহ্য না হয়ে, কেউ আবার জীবন থেকে সব কিছু হারিয়ে মুক্তি চায়,আবার কেউ কেউ বেকারত্বের জ্বালায়, চাকরী না পেয়ে সুসাইড ও করতে পারে। কিন্তু আমার ব্যাপারটা ঠিক উপরের কোনোটির মতো নয়, – আমি প্রেমে হোচট খায়নি, বেকার ও নই ,সাদামাটা একটা সরকারি চাকরী করি, আমার জীবন থেকে সব কিছু এখনও হারিয়ে যায়নি। তবু ও আমার মরার ইচ্ছে হল। কিন্তু এই মরার ইচ্ছে টা আমার হঠাৎ করে জন্মায় নি। অনেকদিন ধরে একটা যন্ত্রনা কুঁরে কুঁরে খাচ্ছিল,– যখন,একটা ছোটো পরীক্ষা– নিরীক্ষার পর ,সম্পর্ক, ভালবাসার আসল ব্যাপার টা বুঝতে পারলাম। আর সেটা বোঝার পর, যন্ত্রনা টা আমাকে প্রতি মুহুর্তে পিন ফোটাচ্ছিল বুকের কাছে। তাই আমার ও আর সহ্য হল না-মরে যেতে ইচ্ছে হল।



গলির ভেতর একটা মদের দোকান থেকে, একটা বিয়ারের বোতল, আর একটা গলার নলি কাটা ছুরি নিয়ে, এই মুহুর্তে সাত তলা বিল্ডিং এর ছাদের কার্নিসে দাঁড়িয়ে আছি। রাত ন'টা বাজে। এত উপর থেকে, নীচের মানুষ গুলো কে একদম বোঝা যায় না। রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয় মানুষ গুলোকে পিঁপড়ের মতো মনে হয়। এখনও ট্যাক্সি , দু'একটা অটোও চলছে রাস্তা দিয়ে। এখান থেকে ঝাঁপ দিলে, আমি হয়তো ছ' তলার কাছে গিয়ে হার্টফেল করেই মরে যাব। তারপর দেহটা মাটিতে আছড়ে পড়বে।
অবাক হলেন তো এবার! ভাবছেন, আমি এখান থেকে ঝাঁপই যখন দেব, তাহলে মদের বোতল আর গলার নলি কাটার ছুরি আনার কি দরকার ছিল? ওগুলো আনার দুটো কারন আছে। প্রথমত আমি খুব ভীতু। আগেও অনেকবার সুসাইড করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ভয়ে শেষ পর্যন্ত পারেনি। তাই আজ ঝাঁপ দেওয়ার আগে মদ খেয়ে নেব ঠিক করেছি। আর দ্বিতীয়ত, আমার সুসাইড করার সময় আশ্চর্যজনক ভাবে একটা অচেনা মানুষ এসে যায়। আমার থেকে কিছুটা দুুরে দাঁড়িয়ে থাকে।তাই আজ ঠিক করেছি আগে ওই টাকে মারব, তারপর নিজে মরব।
ছাদের উপর বসে, বোতল টা মুখের কাছে এনে পর পর কয়েক ঢোক খেলাম । গা টা যেন গুলিয়ে উঠল। এর আগে কোনোদিন এসব খায়নি তো,তাই বোধহয় এমন হচ্ছে। এই প্রথম আর এটাই শেষ। আমার সুসাইডের কারন টা কেউ জানতে পারবে না। কেননা,বাড়িতে সুসাইড নোটে কারন হিসেবে আমার নিজের নামই লিখে রেখেছি। অন্য কাউকে দোষারোপ করবই বা কেন? আমার ভাল লাগছিল না, তাই আমি মরতে এসেছি। তবে হ্যাঁ, কারন টা শুধু আপনাদের কেই বলে যাব, মরার আগে।– আপনাদের কাছে এটা অপ্রিয় মনে হলেও ব্যাপার টা সত্য।
যেদিন আমি জন্মেছিলাম,সেদিন আমার বাবা চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, জোঁয়ার– ভাঁটা , রাশি দেখে বলেছিল– এ ছেলে খুব অনুভূতিপ্রবন, আবেগী হবে। ঘটনাক্রমে আমি হয়েও ছি সেই রকম। ছোটো ছোটো ঘটনা,বা স্বাভাবিক ঘটনা গুলোই আমাকে নাড়া দিয়ে যায়। আঘাত করে। পড়াশুনাতে খুব একটা খারাপ ছিলাম না। কিন্তু ভাগ্যে বৈশাখী খরা চলছিল।গ্রাজুয়েশন পাশ করার পর ফ্যাঁ ফ্যাঁ করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সব চাকরীর পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু মিলছে না। তাই বলে আমি হাল ছেড়ে দেয়নি, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সংসারে অভাব,অনটন ছিল, তবে দু বেলা না খেয়ে থাকার মতো অবস্থা নয়।একদিন অনেকটা রাগ করেই মা বলল,– "আর কত দিন বুড়ো বাপের ঘাড়ের উপর বসে খাবি? এবার তো একটা কাজ জোগাড় কর। ও বাড়ির বুবাই কে দেখ,সকাল– সন্ধে অফিস করে ফেরে।"
এরকম কথা বলাটাই স্বাভাবিক। কারন ছেলে বড় হয়ে কাজ করে সংসারের দায়িত্ব নেয়। কিন্তু ওই যে স্বাভাবিক কথা গুলো, আমাকে বেশী নাড়া দেয়।অশান্ত করে তোলে। শান্ত ভাবে বলেছিলাম,– "সামনে দুটো ফাইনাল ইন্টারভিউ আছে! আরও একটা পরীক্ষায় পাশ করে আছি।"
সেদিন মায়ের কথায় কিছু মনে করেনি,দু:খে– অভিমানে সুসাইডের কথাও তখন ভাবি নি। তবুও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক টা কেমন যেন হয়ে গেল। এদিকে প্রেম টাও মাথার উপর চড়ে বসেছে। পালায়, পালায় করছে শুধু। কিন্তু পালায় নি-কারন রিমি আমাকে হয়তো সত্যি খুব ভালবাসতো। তাই বাড়ির অমতে ও আমার অপেক্ষায় বসে ছিল। সত্যিই তো ! বেকার ছেলের সাথে কেউ মেয়ের বিয়ে কখনো দেয়?
অবশেষে যখন চাকরী পেলাম, তখন সবার কি আনন্দ। এটাও স্বাভাবিক ঘটনা,কিন্তু আমার কাছে সেই অস্বাভিক মনে হচ্ছিল। তাই আলাদা হয়ে চুপ করে বসে ছিলাম। কারন চাকরী টা আমার পছন্দ হয়নি। কাজ করতে করতে, হাঁপিয়ে উঠতাম, খুব কষ্ট হত। তবুও বাড়ির কথা ভেবে সব সহ্য করে নিতাম। চার বছর কেটে গেল।  নিজের মনের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে, সরকারের চাকরগিরি করে যাচ্ছি। বাড়ির চেহারাটাই পালটে গেল।মা, বাবা সবাই কত খুশি। সংসারের সমস্ত খরচ নিজে নিলাম,মাসের শেষে কিছু টাকা মায়ের হাতে দিতাম।– এখন, আমার মতো ভালো ছেলে নাকি হয় না!
যে বছর চাকরী পেয়েছিলাম, সেই বছরেই বিয়ে করলাম রিমিকে। সেও খুব খুশি। অফিস থেকে ফেরার পথে, কিছু শপিং করে আনলে খুব খুশি হত। মা বলতো,– বৌমা, বাবুর জন্যে একটু সরবত করে দাও! কত কষ্ট করে এসেছে। রিমির জন্যে কিছু আনলে, ও সেদিন আমাকে সারা রাত আদর করত,ভালবাসতো। কিন্তু আমার কষ্ট টা কেউ বুঝত না।
 চাকরীও যে মাঝে মাঝে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে সেটা চাকরী পাওয়ার আগে বুঝিনি। আর যখন সেটা বুঝলাম তখনি মরার ইচ্ছে টা ভেতরে ভেতরে দানা বাঁধতে শুরু করল। সেই ইচ্ছে টা সম্পুর্ন করল আরও একটা ঘটনা।
এবার সেটা বলছি।
দিনের পর দিন বাড়িতে, আমার আদর যত্ন, ভালবাসা বেড়ে গেল। কেননা, নিজের কষ্ট হলেও, আমি তো কাউকে কোনো কিছুর অভাব রাখেনি। আর তখনই ইচ্ছে হল এদেরকে একটু পরীক্ষা– নিরীক্ষা করে দেখতে। প্লান টা কেউ দেইনি, আমার নিজেরই ছিল।কর্মক্ষেত্রে অসহ্য মানসিক যন্ত্রনা আর সহ্য হল না।দিলাম চাকরী টা ছেড়ে। বাড়িতে এসে কথাটা বলতেই, সবাই আকাশ থেকে পড়ল। কিছু দিন আগে যে ছেলেটা ছিল, সব থেকে ভাল, আজ হয়ে গেল সব থেকে খারাপ। এখন প্রতিদিন সকাল হলে আগের মতো বেরিয়ে যাই।সন্ধ্যায় খালি হাতে বাড়ি ফিরি। সরবত ও বন্ধ হয়ে গেল। রাতে রিমির পাশে গেলে,এখন আর আদর করে না। সরিয়ে দেয়। আমি জোর ও করি না। অথচ, একসময় আমাকে ওই জোর করে আদর করত। এগুলোও  স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ঘটনা গুলো আমাকে আঘাত করল খুব।এরা শুধু নিজেদের সুখ, আনন্দ টাই চায়-তাতে আমার যত কষ্ট হয় হোক,আমার মৃত্যু হলেও এদের কিছু যায় আসে না?

কোনো রকমে মদের বোতল টা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। পা দুটো টলছে। চারিপাশ যেন ঘোলাটে লাগছে। টলতে টলতে আবার ছাদের কার্নিসের পাশে এসে দাঁড়ালাম। নীচের দিকে তাকালাম। প্রায় ফাঁকা রাস্তা। এখন আর একদম ভয় লাগছে না। – মদ খাওয়া টা কাজে দিয়েছে তাহলে! উপরে মুখ তুলতেই দেখি,আকাশের তারা গুলো ঝিকমিক করছে।— এরা কেউ আমাকে ভাল বাসেনি। সবাই ভালবাসে আমার টাকা কে। এরা আমাকে চায় না, এরা টাকা পেলেই খুশি। আমার কষ্ট কোনোদিন অনুভব করিনি কেউ। ভেতর থেকে জমে থাকা কথা গুলো তরলের মতো ঢক ঢক করে বেরিয়ে আসতে লাগল।–  আজ থেকে সব টাকা তোদের দিলাম। আমার চাকরী টাও। কারন আমি চাকরী টা ছাড়িনি, মিথ্যে বলেছিলাম তোদের পরীক্ষা করার জন্যে। আমার কোনো চিন্তা নেই,কারন আমার মৃত্যুর পর, চাকরী টা আমার বউ পেয়ে যাবে।

কথাগুলো আকাশের দিকে তাকিয়ে এক মনে বলছিলাম। হঠাৎ দেখি পাশে এসে কেউ দাঁড়িয়েছে। চোখ দুটো, দুহাতে কচলে ভালকরে দেখলাম– সেই লোক টা। অচেনা লাগে তাকে। আমার সঙ্গে কোন সম্পর্ক আছে কিনা- অন্তত আমার মনে পড়ে না। এই লোক টির সাথে কি সম্পর্ক আমার? কেন আসে বার বার? প্রতিবার আমার সুসাইড করার সময় এসে হাজির হয়। আর আমি মরতে পারি না।
হাতের বোতল টা ছাদের উপর আছাড় মেরে বললাম,— "তুই আবার এসেছিস? আমাকে একটু শান্তিতে মরতেও দিবি না?"
নলি কাটা ছুরি টা হাতড়াতে থাকলাম।–" আজ তোকে মেরেই, তারপর নিজে মরব।"
ছুরিটা হাতে নিয়ে টলতে টলতে এগিয়ে গেলাম লোকটির দিকে। সজোরে চালিয়ে দিলাম তার বুকে। কোনো রক্ত বেরুলো না। তিন হাত পিছিয়ে এলাম। হাসতে হাসতে লোকটি বলল,–" মানুষের বিবেক কে কোনো দিন মেরে ফেলা যায় না। কোনো কিছু ভুল কাজ করতে যাওয়ার আগে আমারই মুখোমুখি হতে হয় সবার।"
একটা অসহ্য জ্বালা আমার শরীরটাকে ছিড়ে ফেলছে– "কি বলতে চাইছিস তুই? কত গুলো স্বার্থপর মানুষের সাথে থাকতে বলছিস! যারা শুধু নিজের স্বার্থ টাই বোঝে! এমনকি, ভালবাসেও স্বার্থ দেখে। সবাই এক এক টা মুখোশ পরে আছে, আর রঙ্গমঞ্চের অভিনয় করে যাচ্ছে।"
লোকটি এখনো হেসে চলেছে।–" সবাই স্বার্থপর? তুই স্বার্থপর নোস? তুই নিজে ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে মরতে চাইছিস। এটা স্বার্থপরতা নয়? তুই তো নিজে ভালথাকার কথা ভেবে চাকরী ছেড়ে দিতে চাইছিস, এটা স্বার্থপরতা নয়? তুই কি অন্যের কথা একবার ও ভাবছিস?"
আমার মাথা টা ঘুরতে লাগল।– "কি বলছিস এসব?"
– "ঠিকই বলছি সব। তুই ও তো নিজের খুশি, আনন্দের কথা ভাবছিস। ঠিক তেমনি তারাও তাদের কথা ভাবছে। একটু সূক্ষ ভাবে দেখলে বুঝতে পারবি,– নিস্বার্থ ভালবাসা বলে কিছুই নেই। আর আমরা সবাই স্বার্থপর। অপ্রিয় হলেও কথা গুলো সত্য।কারো উপর রাগ করে মরতে যাওয়া টা মুর্খামির পরিচয়। ভালো না লাগলে, চলে যা অন্য কোথাও,কিন্তু মরবি কেন?"
নেশা টা একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে। লোকটি একটু একটু এগিয়ে আসছে আমার দিকে। তবুও কথা বলে চলেছে লোকটি,–" বন্ধু, রিমি প্রেগনেন্ট। আরেক টা তোর জন্ম হতে চলেছে। তার কথা একটু ভাব। নইলে আবার স্বার্থপর হয়ে গেলি তো তুই।"
– কিন্তু! ....কি বলব, কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।
লোকটি আমার আরও কাছে এসে পড়েছে।— "বোঝানোটাই আমার কাজ। যুগ যুগ ধরে এটাই করে আসছি। তোকেও বুঝালাম, এবার ডিসিসান তোর।" লোকটি একটু একটু করে আমার শরীরের মধ্যে ঢুকে গেল।
নেশা সম্পুর্ন কেটে গেছে।পরিষ্কার আকাশে তারা গুলো আরও বেশি জ্বল জ্বল করছে। ছাদের উপর থেকে ছোট্টো শহর টা সম্পুর্ন দেখা যাচ্ছে। কালো অন্ধকারের ভেতর যেন মোমবাতি সাজিয়ে জ্বেলে রেখেছে শহর টা। পকেটের ফোনটা কখন থেকে বেজে চলেছে খেয়াল নেই। ফোনটা বের করে দেখি রিমির পনেরোটা মিসডকল। হাতের ঘড়িতে এগারোটা বাজে। আস্তে আস্তে ছাদ থেকে নামার সিঁড়ি দিয়ে, ছ'তালার লিফটের দিকে পা বাড়ালাম।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

প্রিয় বন্ধুরা, "গল্পপড়ুয়া " ব্লগটি আপনাদের ভালো লাগলে, আপনার সকল সাহিত্যপ্রেমী বন্ধুদের কে ব্লগ অ্যাড্রেস টি শেয়ার করুন। নিজে পড়ুন,অন্যদের কে ও পড়ান। ব্লগ অ্যাড্রেস : www.golpoporuya.in

No comments

Powered by Blogger.