স্মৃতিকথার গল্প " তখন পনেরো "





আমার জীবনে প্রথম প্রেম,ভালবাসা এসেছিল ঝড়ের গতিতে– অনেকটা টর্নেডোর মতো ঘুরতে ঘুরতে। তবে সেই টর্নেডোর ধাক্কায় তিন কিলোমিটার দূরে উড়ে যাইনি।শুধু,মাথার কল কবজা গুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শরীরের ভেতর অ্যাড্রিনালিন হরমোন, পুরীর সমুদ্রের মতো ঢেউ খেলতে শুরু করেছিল।

সতেরো বছর বয়েসে আমার জীবনে প্রথম প্রেম এল।তোমাদের অবাক লাগল তো! অবাক লাগারই কথা।এই একবিংশ শতাব্দী তে কারও সতেরো বছর বয়েস  প্রথম প্রেম আসে? ক্লাস সেভেন, এইটেই সবার প্রেমের হাতে খড়ি হয়ে যায়।কিন্তু আমার এসেছিল। আর এটাই আমার স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কারন যে ছেলে, মেয়েদের যমের মতো ভয় পায়,সামনে গেলে বুক ধড়ফড় ,দাঁত কড়মড় শুরু হয় ,তার সতেরো কেন সাতাশেও প্রেম আসে না। কিন্তু এটা গল্পের মূল বিষয় নয়। গল্পটা আরও  দু'বছর আগের। তখন আমার বয়েস পনেরো। আবার সাড়ে চৌদ্দও হতে পারে। তবে এটা হয়তো ভালবাসার গল্প নয়– এক অদ্ভুত ভাললাগার গল্প ।

আমাদের স্কুলটা ছিল সরলরেখার মতো। মাধ্যমিক স্কুল।দোতলা বিল্ডিং,উপরের তলা তে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেনীর ক্লাস ঘর। নীচের তলাতে প্রথমে, নবম শ্রেনীর ক্লাসরুম তারপর লাইব্রেরি ঘর, টিচারদের ঘর, আর সবশেষে দশম শ্রেনীর ঘর। দোতালা বিল্ডিং টির বাম পাশে তিন কামরার টালির ঘর। ছোটো বেলায় দেখতাম ঐ টালির ঘরেও ক্লাস হতো। এখন আর সেসব টালির ঘর নেই। সে জায়গায় আরও বড় বিল্ডিং উঠেছে। পুরো স্কুল টা সাদা রঙের, আর বর্ডার গুলোতে গাঢ় নীল রঙ দেওয়া। মাঝখানে গাঢ খয়েরি কালি দিয়ে বড় করে লেখা," উওর কোড়াকাটি হাইস্কুল"
কি অদ্ভুত নাম তাই না? – তোমাদের শুনে হয়তো হাসি পাচ্ছে।

স্কুলের সামনে,সবুজ ঘাসে ঢাকা বড় খেলার মাঠ। মাঠের দক্ষিন পাশে সারি সারি নারকেল গাছ। কালীপূজোর রাতে আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল, এই নারকেল গাছ থেকে নারকেল চুরি করে খাওয়া। অন্য দিনও চুরি করা যেত, কিন্তু কালীপূজার রাতে চুরি করে যেন একটা আলাদা মজা পেতাম। স্কুলের সামনে দিয়ে, আড়াই হাত চওড়া একটা ইটের রাস্তা পূব দিক দিয়ে ঘুরে বড় রাস্তার সাথে মিশেছে। এই রাস্তার পাশে একটা অনেক দিনের পুরোনো ঝাকড়া ঝাউ গাছ। অনেকদিনের বললাম, কারন–আমি জন্মের পর থেকে গাছটিকে দেখে আসছি। এখনও সেই একই রকম আছে। আর তার নীচে জল খাওয়ার জন্য একটা টিউবওয়েল।
তখন নবম শ্রেনীতে পড়ি। উপরের তলা থেকে আমাদের ক্লাস ঘর নীচের তলাতে সিফট হয়ে গেল। আর নীচের তলাই নেমেই মনে হল, কেমন যেন বড় বড় হয়ে গেছি। সবার মধ্যে কেমন যেন একটা দাদা ভাব। কথা-বার্তা গম্ভীর। কারও মধ্যে সেই ছুটো ছুটি,মারা মারি,হট্টোগোল ভাব টা নেই। শিক্ষক মহাশয় রাও আমাদের কথার গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন। কারও কারও গোঁফের নীচে কালো হতে শুরু করেছে। মেয়েদের মধ্যেও একটা পরিবর্তন লক্ষ করলাম,কেউ আর ছোটো ফ্রক পরে ক্লাসে আসে না। সালোয়ার-কামিজ,নইলে শাড়ি– ব্লাউজ। সবার মুখে যেন কেমন লাজুক লাজুক ভাব। প্রেম জিনিষ টা তখন খায়, না গায়ে মাখে জানতাম না। শুধু টিফিনের সময় আমাদের ক্লাসের কিছু ছেলে আর কিছু মেয়েদের খুঁজে পাওয়া যেত না। কারন টা পরে জানতে পারলাম, ওরা নাকি টিপিনের সময় স্কুলের পিছনে বড় বড় ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো রাস্তার দিকে যায়। কারন কী? কারন হল, ছেলে গুলো ক্লাস এইটের মেয়েদের সাথে ,আর আমাদের ক্লাসের মেয়ে গুলো দশ ক্লাসের দাদা দের সাথে প্রেম করতে।

প্রেম কিভাবে করে, তার থিওরি কিম্বা প্রাকটিক্যাল কোনও জ্ঞান আমার ছিল না। এরপর নানা জায়গায় প্রেমের প্রতিফলন দেখা গেল।–বসার বেঞ্চে,বা ক্লাস ঘরের দরজা, জানালায়, অথবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার দেওয়ালে, শিক্ষক মহাশয়ের টেবিলে, দক্ষিন পাশের সারি সারি নারকেল গাছে। ইট দিয়ে বা পেরেক দিয়ে যেন তামার অক্ষরে খোদাই করা প্রেমিক প্রেমিকাদের নাম।কোথাও লেখা 'কৌশিক প্লাস সুমনা', আবার কোথাও 'আমি তোমাকে ভালবাসি মৌমিতা', কোথাও বা ' শুধু তোমার জন্য পিউ'।শত শত লায়লা-মজনুর দল।
এসব নিয়ে আমিও মাথা ঘামাতাম না। আমি ছোটোবেলা থেকেই একটু চুপচাপ স্বভাবের। বাচ্চা বাচ্চা টাইপের।হঠাৎ করে মেয়েগুলো আমার থেকে যেন বড় হয়ে গিয়েছিল। –মেয়েরা মনে হয় একটু তাড়াতাড়ি বড় হয়ে ওঠে। হবে হয়তো! মেয়েদের সাথে কথা বলা তো দূরের কথা,মেয়েদের ধারে কাছেই যেতাম না। তিনটে কারন ছিল। প্রথমত, মেয়েদের ভয় পেতাম খুব। ক্লাস থ্রী তে থাকতে একবার এক বড় সড় চেহারার মেয়ে আমাকে মেরে ছিল। সেই থেকে যে ভয় টা পেয়ে বসল, সেটা আজও যাইনি। আর দ্বিতীয়ত, আমি খুব লাজুক ছেলে। আর তৃতীয় কারন টি হল,– একটা ভ্রান্ত ধারনা ছিল আমার মনে। মেয়েদের সাথে কথা বললে যদি সবাই খারাপ বলে!

যদিও এ ধারনা টা আজ আর নেই। লজ্জা টা একটু কেটেছে,কিন্তু ভয় টা সম্পুর্ন রয়ে গেছে...।বেশ কিছুদিন ধরে বুঝতে পারছিলাম–আমার মনের মধ্যে কিছু একটা ঘটছে। এবার সেই ঘটনায় আসি। ঘটনাটা ঘটে গেল, নিজের অজান্তেই। হঠাৎ করে একটা মেয়েকে শুধু দেখতে ইচ্ছে করতে লাগল। মেয়েটির ফর্সা গায়ের রঙ,পাতলা চেহারা,মাথায় কুচকুচে কালো চুল। চুল গুলো ঘাড় পর্যন্ত ছোটো ছোটো করে কাটা। বেশ ভালই দেখতে। মেয়েটির মুখ টা দেখলেই মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অদ্ভুত ভাললাগা শুরু হত। সব সময় মনে হত মেয়েটিকে দেখি।বার বার দেখি।মেয়েটি যখন সাইকেল চালিয়ে স্কুলে ঢুকতো, আমি তখন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতাম।তবে চারটে চোখ কোনোদিন এক জায়গায় হয়নি।
আমাদের নবম শ্রেনীর ক্লাস টি ছিল, দোতালায় ওঠা সিঁড়ির সামনেই। মেয়েটি সেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যেত। ক্লাসের দরজার পাশের ফার্স্ট বেঞ্চে বসে আমি সিঁড়ির দিকে চেয়ে থাকতাম,– কখন মেয়েটি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামবে! আর আমি তাকে দেখব। মেয়েটি টিউবওয়েলে জলের বোতল ভরতে গেলে, আমার ও সেই সময় জল তেষ্টা পেত। দু' জন বন্ধু কে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম,সেই তেষ্টা মেটাতে।অবশেষে, জানতে পারলাম মেয়েটি ক্লাস এইটের ফার্স্ট গার্ল। সে যেই হোক,আমার এই একটু প্রেমিক প্রেমিক হাব ভাব কেউ বুঝতে পারেনি, এমনকি আমার বন্ধুরাও না।
এক বছর কেটে গেল। আমাদের দশম শ্রেনীর ক্লাস ঘর চলে গেল,নীচের তলার বারান্দার একদম বাঁ প্রান্তে। আর মেয়েটিও সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে এল নবম শ্রেনীর ঘরে। বারান্দার দুই প্রান্তে দু'জন। মাঝখানে শুধু লাইব্রেরি আর টিচার দের রুম। এখন আরও বেশী, বেশী দেখতে পেতাম মেয়েটিকে। টিফিনের সময় আমাদের ক্লাসের কিছু ছেলে ঘরে বসেই মেয়েদের সাথে আড্ডা দিত। আর আমি, আমার গ্যাংস্টার দের নিয়ে, ব্যাট, বল আর উইকেট টা বগলদাবা করে সোজা মাঠে চলে যেতাম।আর বর্ষাকালে আমাদের আড্ডার জায়গা হত, নবম শ্রেনীর ঘরের সামনে। কিন্তু কোনো দিন মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। আর বলতেও চায়নি। কারন? ওই যে একটা নারী ভীতি আর লোকের কাছে খারাপ হয়ে যাওয়ার ভয়।
শীতকাল এলে মজা টা হত বেশী। কারন কোনো পিরিয়ড শেষ হলেই, বাইরে মাঠে রোদ পোহাতে চলে যেতাম। এই সময় শিক্ষক মহাশয় রা ক্লাসের বাইরে থাকলেও কিছু বলতেন না। কিন্তু লক্ষ্য থাকত সেই একটাই– যেন তেন প্রকারেন মেয়েটিকে একটু দেখা। কিন্তু বিশেষ কারনে ছাড়া মেয়েটি ক্লাসের বাইরে আসতই না।

স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিনটা সবার কাছে বিশেষ একটা স্মরনীয় দিন হয়ে থাকত। কারন এই দিন সবাই, সবার সাথে মেলামেশা টা বেশী করতে পারত। বা, যারা একটু স্পোর্টসে ভাল, তারা মেয়েদের কাছে হিরো হওয়ার জন্য প্রথম হওয়ার চেষ্টা করত। আমি এসবের মধ্যে কোনোদিন ছিলাম না। কারন আমাদের দশম শ্রেনীর লেবেলের যে প্রতিযোগিতা গুলো হত, সেগুলো তে শিক্ষক আমার নাম নিতেই চাইত না।আসলে, আমার চেহারা দেখে, প্রতিযোগীরা ভয় পেত। যেমন, ডিসকাস থ্রো করতে গিয়ে হয়তো, ডিসকাসের সঙ্গেই হাওয়ায় উড়ে যেতে পারি। হাইজাম্প দিতে গিয়ে হয়তো দড়িতে পা বেঁধে চিৎপটাং। আর আটশো মিটার রান! নিছক আনন্দ করতেই দৌড়াতাম। আড়াই পাক মারার পর আমরা কয়েকজন বন্ধু, প্রতিযোগী থেকে দর্শক হয়ে যেতাম।তবে খেলা ধূলায়, আমার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও,একটা জায়গায় বিশেষ ভূমিকা ছিল। ওই দিন বেশ হর্তা কর্তা টাইপের ভাব নিয়ে থাকতাম। কাগজ পত্র,নামের লিস্ট শিক্ষকদের কাছে পৌছে দেওয়া, বাচ্চাদের লাইনে ঠিকমতো দাঁড় করানো, ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক দায়িত্ব থাকত।
স্কুলের রাম পাকা ছেলে গুলো দু'টো খেলা দেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকত,– নবম দশম শ্রেনীর বড় বড় মেয়েদের, স্কিপিং, এবং মিউজিকাল চেয়ার। কিন্তু ওই দুটো খেলার সময় বয়ষ্ক শিক্ষক মহাশয় রা ছেলে গুলোকে একদম আশেপাশে দাঁড়াতে দিত না। কারন মেয়েদের অভিযোগ ছিল যে, ছেলেরা পাশে থাকলে ওরা ওই দুটো খেলা খেলবে না। স্কিপিং তো মোটেই
খেলবে না। আমি অনেক বোঝার চেষ্টা করতাম,
মেয়েদের এরকম অভিযোগ করার কারন কি? কিন্তু বুঝতেই পারতাম না। আজ বুঝতে পারি ,কেন মেয়েরা ওই অভিযোগ করত!
– তোমরা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছো!
যাইহোক, আমার বাচ্চা বাচ্চা টাইপের মুখ দেখে,সব জায়গায় আমার অ্যালাও ছিল। আমি এবং আরও কয়েকজন বন্ধু দাঁড়িয়ে দেখতাম। সেই মেয়েটিও খেলত। আমি মেয়েটিকে একদৃষ্টে দেখতাম। এ দৃষ্টি ছিল,– গভীর সমুদ্রের জলের মতো স্বচ্ছ, শিশুর হাসির মতো নিষ্পাপ।আমিও মনে মনে কামনা করতাম যে ওই মেয়েটিই ফার্স্ট হোক। কিন্তু মেয়েটি ফার্স্ট হয়নি, সেকেন্ড হয়েছিল।

এরপর মাধ্যমিক পরীক্ষা চলে এল। পড়ার চাপও বেড়ে গেল। তবুুও চাপের মধ্যে মেয়েটিকে মনে পড়ত। হয়তো আগের থেকে কম।তারপর একদিন মাধ্যমিক পাশ করে স্কুল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। মেয়েটির কথা তখনও অল্প স্বল্প মনে পড়ত। স্কুল ছেড়ে চলে আসার পর মেয়েটির জন্যে কষ্ট অনুভব করিনি। তাই এটা, ভালবাসার গল্প হয়ে ওঠেনি,– সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া একটা ছেলের অন্ত:সার শূন্য অদ্ভুত এক ভাললাগার গল্প হয়ে রয়ে গেছে। এরপর মাঝ দিয়ে অনেক বছর পার হয়ে গেছে। সে স্কুলের চেহারাই পালটে গেছে। চেনা জায়গা,অচেনা হয়ে গেছে।
তবুও আজ এতগুলো শীত পেরিয়ে একা একা যখন কোনো এক শীতের সকালে, নির্জন বাড়িতে, কুয়াশা মাখা রোদ গায়ে জড়িয়ে বসে সেই পনেরো বছর বয়েসের স্কুল জীবনের ছেলেমানুষির কথা গুলো মনে করি– প্রথমেই সেই মেয়েটির অস্পষ্ট মুখটা টা মনে পড়ে যায়। অজান্তেই মন টা হেসে ওঠে।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.