একটি ভালোবাসার গল্প " একটু একটু ভালোবাসা "




(১)

যেটা ভেবেছিলাম ঠিক সেটাই হল।শেষ ট্রেন টা চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল।এখন বাড়ি কি করে যাব?রাত বা কোথায় কাটাবো?

দিদির বাড়ি থেকে ফিরছি।শিয়ালদহ ওভার ব্রিজের ও মাথায় সুরেন্দ্রনাথ কলেজের সামনে বাস থেকে যখন নামলাম, তখন ঘড়িতে রাত এগারোটা বেজে সতেরো মিনিট।আমার গন্তব্যে যাওয়ার শেষ ট্রেন ছাড়ে এগারোটা বেজে আঠেরো মিনিটে।তখনি ভেবে নিয়েছিলাম,ট্রেন পাব না।তবুও একটা শেষ অদম্য ইচ্ছে নিয়ে ব্যাগ টা কাঁধে ঝুলিয়ে ছুট লাগালাম।ছুটতে ছুটতে যখন শিয়ালদহ সাউথ প্লার্টফর্মে এসে পৌঁছালাম, ততক্ষনে আমার ট্রেন প্লার্টফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।একটু খানি দেখতে পাচ্ছি।আর কিছু করার নেই! আবার সেই ভোর পাঁচটায় ট্রেন।এখন এই প্লার্টফর্মে বসে মশার কামড়ে সারাটা রাত কাটাতে হবে।নিরাশা, হতাশা অবসন্ন হয়ে থপ করে বসে পড়লাম একটা গোল শান বাঁধানো বসার জায়গায়।
প্রায় ফাঁকা স্টেশন।এত রাতে ভর্তি থাকার ও কথা নয়।সে আশাও আমি করি না।জনাকয়েক করে লোকজন গোল শান বাঁধানো বসার জায়গা গুলোতে গোল হয়ে ঘিরে বসে আছে। কিছু হকার মালপত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। দু'এক জন আর.পি.এফ ও চোখে পড়ল।বন্দুক ঘাড়ে,আর কানে ফোন লাগিয়ে হাসি মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।আমি ব্যাগ থেকে জলের বোতল টা বের করি।প্লার্টফর্মেরর কানায় গিয়ে চোখে মুখে, জলের ঝাপটা দিয়ে কয়েক ঢোক জল খাই। ভেতর টা ঠান্ডা হয়।তারপর জলের ট্যাব থেকে বোতলে জল ভরে নিয়ে আবার জায়গায় এসে বসি।আমি যেখানে বসে আছি,সেখান থেকে দূরের আকাশ টা দেখা যায়।মেঘহীন,পরিষ্কার নির্মল আকাশ।অগুন্তি নক্ষত্রপুঞ্জ ঝিকমিক করে।আমি সেই দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে পড়ি। ডুবে যাই তারাদের গভীরে।আমার ও ওই আকাশের তারা হতে ইচ্ছে করে।ছোটো বেলায় মা বলতো,মানুষ মরে যাওয়ার পর ঐ আকাশের তারা হয়ে জ্বল জ্বল করে। আমিও একদিন ঐ আকাশের তারা হবো।জ্বল জ্বল করবো সারা রাত।তখন কেউ হয়তো এরকম ভাবে,একলা নির্জন প্লার্টফর্মে বসে দেখবে।হয়তো বা, দেখবে না।আমার চোখ দু'টো নরম হয়ে আসে অনেক্ষন ভাবনার গভীরে ডুবে থাকি।এটা আমার একটা রোগ বলতে পারেন।যখন একা একা থাকি তখন, হারিয়ে যাই অজানা জগতে। আকাশের চোখ থেকে চোখ নামিয়ে পাশে তাকাতেই মেয়েটিকে দেখতে পেলাম।এতক্ষন বুঝতে পারেনি, কখন যেন একটি মেয়ে আমার পাশে এসে বসেছে। চোখে চোখ পড়তেই, মেয়েটি চোখ সরিয়ে নেয়। কিছু সময় পর আবার আমার দিকে তাকায় মেয়েটি।ফর্সা গোল মুখ টা কেমন যেন শুকনো শুকনো লাগছে। ফুলের পাপড়ির মতো চুল গুলো পাটে পাটে সাজানো নেই।কিছুটা এলোমেলো।অবিনস্ত্য।মাঝারি উচ্চতা,পটলচেরা চোখ,পুরু ঠোঁট, পাতলা গড়ন।তবুও মেয়েটিকে রোগা বলা যায় না। উচ্চতার সাথে বেশ মানানসই। দেখতেও মন্দ নয়। বয়স তেইশের বেশি হবে না,পরনে কামিজ,গলায় একটা আকাশী নীল রঙা ওড়না গোল করে জড়ানো। পিঠে মোটা কলেজ ব্যাগ।হয়তো অনেক জিনিষপত্র ব্যাগ টির ভেতর,তাই ওরকম মোটা দেখতে লাগছে।আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটি এবার হাসার চেষ্টা করে।সে হাসির মধ্যে আমি মিষ্টতা খুঁজে পাই না।একটা বিষন্নতার ছাপ স্পর্ষ্ট। মেয়েটির সেই সরল, শুকিয়ে যাওয়া মুখটির দিকে তাকিয়ে আমার কেমন মায়া লাগে।
বেশ কিছু সময় কেটে যায়।আমি ব্যাগ থেকে জলের বোতল টা বের করে গলাটা আবার ভিজিয়ে নিই। মেয়েটি আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে।কিছু বলতে চায় মেয়েটি? মনে মনে ভাবি আমি।
-"জল খাবেন?" মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করি আমি।
মেয়েটি কথা বলে না।উপর-নীচে মাথা নাড়ে। জলের বোতল টা এগিয়ে দিই।এক নিশ্বাসে বোতল টা শেষ করে ফেলে।মনে হয় যেন সারাদিন জল খায়নি! আমি অবাক হই।বোতল টা নিয়ে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখি।হাওড়া থেকে বেরিয়ে কয়েক প্যাকেট কেক কিনেছিলাম। সেগুলো বের করি।মেয়েটির দিকে একটা এগিয়ে দিয়ে বলি,-"খাবেন?"
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে কেক নেয়।
-"আপনিও কি ট্রেন মিস করেছেন?"
মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে এবার কেক খেতে খেতে কথা বলে।-"না।"
-"তাহলে রাতের কোনো ট্রেনে ঘুরতে যাচ্ছেন?"
-"না।"
-"তবে?"
মেয়েটি চুপ করে,মাথা নামিয়ে নেয়।কেক খেতে থাকে।মেয়েটি কে আমি ভালো করে পর্যবেক্ষন করি।কলকাতার বা আসে পাশের জেলার মেয়ে বলে আমার মনে হয় না। তবে মেয়েটি কি পথ হারিয়েছে?
আমার মনে প্রশ্ন জাগে।কিন্তু সে প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই-এত বড় মেয়ে পথ হারাবে কেন? যাইহোক আমার এত কিছু জেনে কি লাভ! একটা অজানা,অচেনা মেয়েকে একটু জল,আর কেক খেতে দিয়েছি এই অনেক।আমি আবার আকাশের দিকে তাকাই।তারা গুলো কে দেখে মনে হয়,কালো পেপার কাগজের উপরে যেন রঙের আঁচড় কাটা।
-"জল খাব।"মেয়েটির কথায় আমি তার দিকে ফিরে তাকাই।বোতলের জল শেষ।বলি,
-"একটু বসুন,আমি জল আনছি।আমার ব্যগটা দেখবেন।"
বোতলটা হাতে নিয়ে আমি জল আনতে যাই। রাতে ঠান্ডা জল পাই না।বোতল ভরে আমি ফিরে আসি।
-"এই নিন।"
মেয়েটি একটা ধন্যবাদ জানায়। তারপর জল খেতে থাকে।এত সরলতা ভরা মুখ আমি এর আগে কখনো দেখিনি।রাত একটা বাজে।তবুও মেয়েটি আমার পাশেই বসে থাকে। সে থাকতেই পারে।জায়গাটি আমার কেনা নাকি? আমার অত কিছু ভেবে লাভ নেই।চোখে ঘুম নেমে আসে।বসে বসেই ঘুমানোর চেষ্টা করি।ঘুম আসে না।তবুও চেষ্টা চালিয়ে যাই।ভোর পাঁচটায় স্টেশনের মাইকে আমার ট্রেনের অ্যানাউন্স হতেই, আমি উঠে পড়ি।ক্যানিং লোকাল দশ নম্বর প্লার্টফর্ম।ইলেক্ট্রিক বোর্ডের দিকে তাকিয়ে কনফার্ম হয়ে নিই।আমার বাড়ি চম্পাহাটি,তাই ক্যানিং লোকালে যেতে হয়।আমি ট্রেনে গিয়ে উঠতেই,মেয়েটিও আমার পিছু পিছু ট্রেনে ওঠে। আমার পাশেই বসে পড়ে।
-"আপনার বাড়ি কি এই ট্রেনে যেতে হয়?" আমি মেয়েটির দিকে তাকাই।
-"না।" বলে মেয়েটি।
-"ওহ! তাহলে আত্মীয়র বাড়ি যাচ্ছেন বুঝি?"
-"না।"
আমি আবারও অবাক হই।মেয়েটি সেই তখন থেকে না বলে যাচ্ছে।ব্যাপারটা কি?ব্যাপার যাই হোক, আমি এত কিছু জানতে চাইছি কেন?আর আমার জেনেও লাভ নেই।যে যেখানে খুশি ইচ্ছে যেতে পারে।


(২)

যথা সময়ে ট্রেন এসে চম্পাহাটি স্টেশনে থামে। ঘুম ভেঙে যায় আমার।পাশে তাকিয়ে দেখি, মেয়েটা এখনো আমার পাশেই বসে আছে।আমি কিছু না বলে,ট্রেন থেকে নেমে পড়ি।প্লার্টফর্ম দিয়ে কিছুটা হেঁটে রাস্তায় নামি।মেয়েটি আমার ঠিক পিছন পিছন আসে।আমার এবার খুব বিরক্তি লাগে।পিছনে ফিরে জিজ্ঞেস করি,-"আপনি কোথায় যাবেন?"
-"আপনার সাথে।" মেয়েটি উত্তর দেয়।
-"মানে!"
-"একটু থাকতে দেবেন কিছুদিন? কথা দিচ্ছি, আমি কিছুদিন পরই চলে যাব।"
মেয়েটির সরলতা মাখা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে, কথা গুলো শুনে,আমার ভেতরের মায়াদেবী আবার জেগে ওঠে।অনেক কষ্টে তাকে দমিয়ে রেখে বলি,-"আমি কোথায় থাকতে দেব?"
-"আপনার বাড়িতে।"
এ তো মহা মুশকিল! একটু খেতে দিয়েছি বলেই এখন শুতে চাইছে। এমনিতেই আমি একটা ভাড়া বাড়িতে থাকি।দোতলা বাড়ি। উপরের তলাতেই আমার ঘর। মালিক,অজিতেশ বাবু এ বাড়িতে থাকেন না।কলকাতায় ছেলে-বৌমার সাথে থাকেন।মাঝে মাঝে এখানে এসে ভাড়ার টাকা নিয়ে যান।আর সব কিছু ঠিক ঠাক আছে কিনা,তার তদারকি করে যান।
-"দেখুন,আপনি কেন এরকম করছেন,আমি বুঝতে পারছি না?আপনি কোথায় যেতে চান বলুন, আমি হেল্প করছি।"
-"আমাকে কটা দিন একটু আশ্রয় দিন,খুব বিপদে পড়েছি।তারপর চলে যাব।"
মেয়েটিকে খুব অসহায় মনে হতে লাগে আমার। ব্যাচেলর মানুষ,তারপর এরকম এক যুবতী মেয়েকে নিয়ে আশ্রয় দেওয়া যে কত চাপের সেটা আমি জানি। আমি ব্যাঙ্কে ক্লার্কের চাকরী করি। পাড়ায় একটা সন্মান আছে,কেউ যদি জেনে যায়? কেলেঙ্কারির একশেষ হবে।তবুও মেয়েটির করুন মুখ আর অসহায়তার কাছে, আমি আত্মসমর্পন করি।
এখনো পাড়া সম্পুর্ন জেগে ওঠেনি।ঘুমিয়ে আছে সবাই। মেয়েটি কে আমার সাথে করে ঘরে ঢোকাই।চারিপাশে একবার ভালো করে দেখে নিই।কেউ দেখতে পেল কিনা! না কেউ দেখতে পাইনি বোধ হয়। আমার বেডরুম টা বেশ বড়। ঢুকতেই সামনেই বামপাশে একটা শোবার খাট, একটা সোফা,আলমারি, টেবিল।টেবিলের উপর একটা বড় এল.ই.ডি টি.ভি, আর একটা ল্যাপটপ রাখা।বেডরুমের পাশেই কিচেন রুম। তার পাশে টয়লেট,বাথরুম অ্যাটাচমেন্ট।সামনে টানা বারান্দা।মেয়েটি আমার বেড রুমে ঢুকে ব্যাগটা খাটের উপর রাখে।চারিপাশে ভাল করে তাকায়। তারপর বলে,-"টয়লেট যাব।"
আমি টয়লেট,বাথরুম,কিচেন সব কিছু দেখিয়ে দিয়ে ঘরে এসে সোফায় বসে পড়ি।কি উঠকো ঝামেলা এসে ঝুটলো! একটা অচেনা,অজানা মেয়েকে এইভাবে কেউ.....তবে মেয়েটিকে দেখে ভদ্র ঘরের মেয়ে বলেই মনে হয় আমার।মেয়েটি টয়লেট থেকে ফিরে এসে বলে,-"স্নান করবো।"
-"বাথরুম তো দেখিয়ে দিলাম! আর জলও আছে। তবে বেশি ইউজ করবেন না,এটাই অনুরোধ।"
মেয়েটি হাসে।এখন আর ও কে মনমরা লাগছে না।বলে,-"হ্যাঁ, দেখেছি।কিন্তু একটা টাওয়েল দরকার।"
একটাই মাত্র টাওয়েল আমার।দিতে মন চায় না। তবু দিয়ে দিই।মেয়েটি ব্যাগ থেকে নিজের জামা-প্যান্ট বের করে নিয়ে চলে যায়।আর আমি দুপুরে খাওয়ার জোগাড়ে বসে পড়ি।


(৩)


সকাল গড়িয়ে দুপুর,দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সারা দুপুর-বিকেল ঘুমিয়ে থাকার পর,মেয়েটি কে এখন বেশ অনেকটা উচ্ছ্বল দেখায়।মুখের সেই ফ্যাকাশে ভাবটা আর নেই।অনেকটা চাপ মুক্ত।মেয়েটির কাছ থেকেই জানতে পারি,তার নাম অদ্রিজা সামন্ত।এর বেশি আর কিছু বলে না।আর আমি জানতেও চাই না।
প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলা আমার টি.ভি দেখার অভ্যেস। রিমোট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিউজ চ্যানেল দেখি। আজকাল যদিও দেখতে ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে খেলার চ্যানেলে দিয়ে রাখি।অদ্রিজা খাটের উপরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে।আমি তার দিকে মুড়ি আর চানাচুর মিক্সারের বাটি টা এগিয়ে দিই।বলি-"এই যে ধরুন।"
সে হেসে বলে,-"আপনি করে কথা বলবে না তো। বিরক্তি লাগে খুব আমার।তুমি খেতে থাকো। আমি একটু আসছি।"
অদ্রিজা হেসে বাইরে বেরিয়ে যায়।তারপর ফিরে এসে আমার পাশে সোফার একদিকে বসে পড়ে।ফোন বেজে ওঠে।আমার নয়, অদ্রিজার। খাটের উপর থেকে ফোন টা তুলে নিয়ে সে কানে ধরে।
-"হ্যাঁ,বল!" বলে অদ্রিজা ।
ফোনের ওপারের কথা আমি শুনতে পাই না।শুধু অদ্রিজার কথা শুনতে পাই।সে বলতে শুরু করে....।
"...হ্যাঁ, বিয়ে করে নিয়েছি।....এই তো আমার বর পাশে বসে আছে।দারুন দেখতে লাগছে।টি.ভি দেখছে।"
আমি চমকে উঠে অদ্রিজার দিকে তাকাই।কি বলছে ও! মেয়েটি যে এত স্মার্টলি কথা বলতে পারে,এর আগে বুঝতে পারেনি।অদ্রিজা আমার দিকে তাকিয়ে হাসে।মিষ্টি হাসি।খুব সুন্দর দেখায়।আবার অদ্রিজার কথা শুনতে পাই..... "না, রে কাল রাতে কিছু হয়নি।তবে আজ রাতে হবে....শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছে মাত্র...।"
আমি বিষম খাই।কি ঘটছে আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। টি.ভির দিকে আমার আর চোখ নেই। চোখ,অদ্রিজার চোখের দিকে।আরও কিছু কথা বলে সে ফোনটা রেখে দেয়। আমার কিছু বলার আগেই অদ্রিজা বলে ওঠে,-"আমার এক বন্ধু ফোন করছিল।"
-"এরকম বলছিলে কেন তুমি? "আমি জিজ্ঞেস করি।
অদ্রিজা কিছু বলে না।চুপ থাকে। আমিও আর কিছু জানতে চাইনা। টি.ভিতে মনোনিবেশ করি। বায়ার্ন মিউনিখের খেলা দেখি।
-"আমি সিরিয়াল দেখবো।"অদ্রিজা বলে।
কি অদ্ভুত! এমন ভাবে কথা বলছে যেন,টি.ভি টা তার! বিরক্ত হয়ে আমি রিমোট টা এগিয়ে দিই। সে রিমোট হাতে নিয়ে চ্যানেল ঘোরায়।'বালিকা বধূ' তে গিয়ে থামে।আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসে।বিরক্তি লাগে আমার।আমার ঘরে এসে আমার উপরেই........।
রাতের খাওয়া শেষ। বিশেষ কিছু নয়।আলু-পটলের তরকারি।আর কয়েকটা শুকনো বেগুন ভাজা। রাতে নীচের গেটে চাবি লাগিয়ে ঘরে ঢুকতেই,অদ্রিজা বলে,-"এক খাটে দু'জন শুতে পারবো না।"
আমার শোবার ও কোনো ইচ্ছে নেই।মনে মনে বলি আমি।
-"তো,তুমি কোথায় থাকবে?" আমি অদ্রিজা কে জিজ্ঞেস করি।
-"আমি খাটে শোবো,আর তুমি ওই সোফায়।" সোফার দিকে আঙুল দেখায় অদ্রিজা।
রাগে আমার শরীর রি রি করে ওঠে।সমস্ত রাগ চেপে রেখে,বালিশ টা নিয়ে,লাইট বন্ধ করে সোফায় শুয়ে পড়ি।
-"আর একটা কথা!" আবার ডাকে অদ্রিজা।
-"কি?"আমি রেগে বলি।
-"কাল সকালে তাড়াতাড়ি উঠে বাজার যাবে। রান্না করার কিছু নেই।"
আমার আরও রাগ ধরে।আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে এমন করে অর্ডার করেনি।আর কোথাকার কে,একদিন এসে যা শুরু করেছে! কবে যে বিদেয় হবে! না ও বলতে পারি না।একা থাকলে না হয় হোটেল থেকে খেয়ে নিতাম। কিন্তু ও যে একা ঘরে থাকবে!
-"আচ্ছা! যাব।"বলি আমি।
তারপর চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করি।ঘুম আসে না। মেয়েটির সরল মুখ টা বার বার চোখের পাতায় ভাসছে। আপনারা বিশ্বাস করুন, অদ্রিজার এই সব কর্মকান্ড আমাকে বিরক্ত করছে।কিন্তু সেই বিরক্ত ও আমার যেন খুব ভাল লাগছে।এরকম বিরক্ত এর আগে কেউ আমাকে করিনি।কি একটা হচ্ছে যেন,আমার ভেতরে।
ভালোলাগা! প্রেম! ভালোবাসা!
সকালে ঘুম থেকে উঠে বাজারে যাই। আলু,পটল, ভেন্ডি,ট্যামেটো সব বাজার করি।সঙ্গে রুই মাছ। অদ্রিজা রান্না করে।আমিও ও কে রান্নার কাজে সাহয্য করি। সকাল সাড়ে ন'টা বাজে।স্নান সেরে অল্প একটু খেয়ে আর টিফিন কৌটা তে ভরে বেরিয়ে পড়ি।যাওয়ার আগে অদ্রিজা কে ডেকে বলি,-"এই শোনো,আমার ফোন নাম্বার টা রাখো। কোনো অসুবিধা হলে ফোন করবে।আর হ্যাঁ, ভুলেও ছাদের উপর আর বাইরে বেরোবে না। ঘরের ভেতর বসে থাকবে।কেউ দেখতে পেলে আমার সন্মানের ছিটেফোঁটাও থাকবে না।"
অদ্রিজা দু'পাশে মাথা নাড়ায়।আমার ফোন নাম্বার টা সেভ করে নিয়ে ওর মোবাইল থেকে মিসড কল মারে দেয়।তারপর বাইরে থেকে দরজায় তালা মেরে বেরিয়ে পড়ি।


(৪)

নতুন ব্যাঙ্কের শাখা।তাই কাজের চাপ কম। দুপুরের খাবার টা সেরে চুপ করে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকি।অদ্রিজার কথা মনে পড়ে। ফোন থেকে নাম্বারটা খুঁজে বের করে সবুজ বোতাম টিপি।রিং হয়। অদ্রিজা ফোন রিসিভ করে।
-"বলো!"
কি বলবো আমি?চুপ করে থাকি।
-"কি হল,কিছু বলবে?আবার শুধায় অদ্রিজা।
-"তুমি খেয়েছো?" অদ্রিজা হাসে।আমি শুনতে পাই। যেন ঝরনার জল পড়ে।
-"বাব্বা! কি ব্যাপার?কাল বর বলেছি বলেই, আজ বরের মতো খবর নেওয়া হচ্ছে বুঝি!"
আমার কেমন একটা অস্বস্তি লাগে।
-"এ কেমন কথা! আমি জানতেও পারি না?"
-"হুম।পারো।খেয়েছি আমি।আর কি বলো?"
কি বলবো,কিছু মনে আসছে না।এরকম গল্প করার অভ্যাস আমার কোনোকালেই নেই। অনেক ভেবে বলি,-"কি করছো?"
-"এই তো,তোমার কথা মতো ঘরের ভেতর শুয়ে আছি।বাইরে বেরোই নি কিন্তু!"
-"ওহ!"
আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কিছুই মনে আসছে না।সব যেন ভেতর থেকে মুছে দিচ্ছে কেউ।
-"কি হল,কথা মনে আসছে না?"অদ্রিজা জিজ্ঞেস করে।
-"না।"
আমি ফোন কেটে দিই।ধুর!আমি কথাই বলতে পারি না।মুর্খদের থেকেও খারাপ।
সন্ধ্যা বেলা ঘরে ফিরতেই অদ্রিজা টিফিন তৈরী করে আনে।দু'জনের জন্যেই।আমি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসে পড়ি।খেতে খেতে দু'জন গল্প করি।
-"একটা সত্যি কথা বলবে?" আমি অদ্রিজা কে জিজ্ঞেস করি।
-"বলো,কি জানতে চাও?"
-"তোমার গল্প।কি তোমার পরিচয়?"
অদ্রিজার মুখ টা কালো হয়ে যায়। পাশ থেকে জলের গ্লাস নিয়ে এক ঢোক জল খেয়ে,গল্প বলতে শুরু করে সে.................আমার বাড়ি রঘুনাথপুর।পুরুলিয়া জেলায়।কিছুই চিনি না আমি এদিকের।একটা ছেলের সাথে আমার এক বছরের সম্পর্ক হয়।ফেসবুকে পরিচয়। তারপর আস্তে আস্তে সেটা ফোনে গড়ায়। ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আর ভালো গীটার বাজায়। আমাকে সে ভিডিও দেখিয়ে ছিল।খুব আনন্দ পেয়েছিলাম আমি।কারন,গীটার আমার খুব প্রিয়।আমি নিজে চোখে ছেলেটি কে কখনো দেখিনি। ফোটোতে দেখেছি শুধু।সে বলেছিল তার বাড়ি কলকাতার কাছে।কি যেন জায়গাটির নাম? বিধান নগর।একটু একটু করে কথা বলতে বলতে,আমি তাকে খুব ভালোবেসে ফেলি।সে ও আমাকে ভালোবেসে ফেলে। কিছুদিন আগে ছেলেটি বলে যে,বাড়ি থেকে তার বিয়ে ঠিক করছে, তুমি শিয়ালদহ স্টেশনে চলে এসো।আমি ওখানে অপেক্ষা করবো।তারপর কালীঘাট থেকে বিয়ে করে,আমার মাসীর বাড়ি অসম চলে যাব। ওর বিয়ের কথা শুনে,আমার অবস্থা পাগলের মতো হয়ে যায়।আমি বাড়ি থেকে ব্যাগপত্তর গুছিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ি। ওর দেওয়া ঠিকানা মতো হাওড়ায় এসে পৌঁছাই।কত লোক চারিদিকে। বেরোবার পথ পাই না।যেদিকে সবাই যায়,আমিও তাদের পিছন পিছন যাই।একজন কে জিজ্ঞেস করি, দাদা,শিয়ালদহ যাওয়ার বাস কোনটা?সেই আমাকে বাসে তুলে দেয়।বাস থেকে নেমে সবার কাছে শুনে শুনে আমি শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছাই। তারপর ছেলেটিকে ফোন করি।ফোন সুইচড অফ বলে।বেশ কিছু সময় পর আবার ট্রাই করি।একই কথা বলে। আমার অবস্থা পাগলের মতো হয়ে যায়।ভয় করতে থাকে।হঠাৎ আমার ফোনে একটা ম্যাসেজ আসে। ছেলেটির ম্যাসেজ।সে লিখছে, "বাড়ি থেকে তার প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে বিয়ে মেনে নেবে বলেছে। আর ও কে আমি এখনো ভালোবাসি।প্লিজ তুমি আমাকে ভুলে যাও।ক্ষমা করে দিও।"
কি করবো আমি? কোথায় যাব আমি?প্লাটফর্মে বসে দু'হাতে চোখ ঢেকে কাঁদতে থাকি।অনেক্ষন কাঁদি।তারপর ওদিকের প্লার্টফর্মে গিয়ে তোমাকে দেখতে পাই। তোমাকে দেখে একজন ভালো মানুষ বলে মনে হয়। কারন,যারা এক মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে তারার ঝিকমিক দেখে, চাঁদ দেখে,তারা কখনো কারও ক্ষতি করতে পারে না।তাই আপনার পিছু নিই...।
মেয়েটি ঝড়ের মতো কথা গুলো বলে একটু থামে।তার চোখ দু'টো ভিজে উঠেছে।আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে,অদ্রিজার কথা শুনে। বেশ কিছুসময় চুপচাপ থাকি দুজন।তারপর আমি মুখ খুলি,-"তুমি একটা অপরিচিত ছেলের জন্যে অত দূর থেকে চলে এলে?"
আমার কথার উত্তরে অদ্রিজা একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে,-"তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?"
-"না।"
-"তাহলে ভালোবাসার টান কি জিনিষ,তুমি বুঝবে না!"
-"সেটা ঠিক।তো এখন কি করবে বলে ঠিক করেছো?"
-"বাড়ি তো যেতে পারবো না।বাবা মেরে ফেলবে। ঘরে তুলবে না। পাড়ার সবাই ছি! ছি! থু!থু! করবে। বলবে,পালিয়ে যাওয়া মেয়ে।"
-"তবে?"
-"কোনো একদিকে চলে যাব।"
অদ্রিজা হাসে।আমার বুকের ভেতর টা ছ্যাঁত করে ওঠে।ও সত্যিই চলে যাবে নাকি?
অনেক রাত হয়েছে।খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়ে শুয়ে পড়ি দু'জন।আমার ঘুম আসে না। অদ্রিজার জন্যে খুব কষ্ট হয়।আমার মন অস্থির হয়ে পড়ে।ও যেন এখান থেকে না চলে যায়। কিছু করতে হবে না।শুধু আমার কাছেই থাকবে। আর গল্প করবে। আমি ও কে কোথাও যেতে দেবো না।


(৫)

পরদিন সন্ধ্যায় ব্যাঙ্ক থেকে ঘরে ফিরতেই দেখি দরজা খোলা।ঘরে কেউ নেই।যাওয়ার সময় আজ আমি বাইরে থেকে চাবি দিয়ে যাইনি। অদ্রিজাই ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল।আর বলেছিল,-"ভয় নেই আমি বাইরে বেরোবো না।"
অদ্রিজা! অদ্রিজা!
কয়েকবার ডাকি।কোনো সাড়া পাই না। টয়লেট, বাথরুম কিচেন তন্নতন্ন করে খুঁজি।কোথাও পাই না।ওর ব্যাগ টাও চোখে পড়ছে না। তবে কি ও চলে গেছে?
টেবিলের উপর চোখ পড়তেই, একটা কাগজ দেখতে পাই।কিছু লেখা তাতে।-"তুমি খুব ভালো মনের মানুষ সন্দীপ।আমাকে একটু আশ্রয় দেওয়ার জন্য,সারাজীবন তোমার কাছে ঋণী থাকবো।কিন্তু তোমাকে আর কষ্ট দিতে চাই না। তাই চলে যাচ্ছি।তুমি সামনে থাকলে আমার চলে যেতে খুব কষ্ট হবে।তাই তুমি ঘরে ঢোকার আগেই বেরিয়ে গেলাম।ভালো থাকবে।মন খারাপ করবে না।"
নীচে অদ্রিজা লেখা।
আমার বুকের ভেতরে যেন কেউ পেরেক পুঁততে থাকে। আমি ভালো থাকবো না অদ্রিজা। আমার মন ও ভালো থাকবে না।কি করে ভালো থাকবো? এই মুহুর্তে ভালোবাসার টান যে কি জিনিষ,আমি সেটা বুঝতে পারছি।
ঘর থেকে বেরিয়ে স্টেশনের দিকে ছুটি। হাতের ঘড়ির দিকে তাকাই।এখনো ডাউন ট্রেনের কিছু সময় বাকি আছে।আমি স্টেশনের কাছে পৌঁছাতেই প্লার্টফর্মে ট্রেন ঢোকে।পাগলের মতো আমার চোখ দু'টো ঘুরে বেড়ায় প্রতি কামরায়। কোথাও দেখতে পাই না।আমার বুকের ভেতর টা ভেঙে ভেঙে যেতে থাকে।একদল কষ্ট,যন্ত্রনা, হাহাকার ছুটে ছুটে আসছে আমার দিকে। হঠাৎ একটা কামরায় চোখ আটকে যায়। দেখি, অদ্রিজা দাঁড়িয়ে আছে।
আমি তাকিয়ে থাকি ওর দিকে।আমাকে দেখতে পায় ও।চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে আমার। ট্রেন হর্ন দিয়েছে।ছুটে ট্রেন থেকে নেমে আমার পাশে এসে দাঁড়ায় অদ্রিজা। ওর চোখেও জল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)
সকল গল্পপড়ুয়া বন্ধুদের শুভ নববর্ষের প্রীতি, শুভেচ্ছা ও অনেক ভালোবাসা। সকলে ভালো থাকবেন।

No comments

Powered by Blogger.